ইয়াজিদ – সাদাত হাসান মান্টো | রেখতা-উর্দু সাহিত্য । আমার সংস্কৃতি সিরিজ

সাআদাত হাসান মান্টোর ‘ইয়াজিদ’ দেশভাগ-পরবর্তী ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা এবং নদী কেন্দ্রিক কূটনৈতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে লেখা এক অনন্য মানবিক গল্প। যুদ্ধংদেহি মনোভাব, ঘৃণা আর অন্ধ জাতীয়তাবাদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে একজন সাধারণ মানুষের জীবনমুখী দৃষ্টিভঙ্গি মান্টো এখানে তুলে ধরেছেন। ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায়কে অন্ধ ঘৃণায় লালন না করে কীভাবে প্রজ্ঞায় রূপান্তর করা যায়, গল্পটি তারই এক অনন্য বার্তা।

‘ইয়াজিদ’ বিশ্লেষণ

দেশভাগের রক্তক্ষয়ী অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও মান্টো বিশ্বাস করতেন যে ঘৃণা দিয়ে কখনো জীবন চলতে পারে না। ‘ইয়াজিদ’ গল্পে তিনি তুলে ধরেছেন কীভাবে দুই দেশের শাসক ও রাজনৈতিক চাটুকারেরা সাধারণ মানুষকে অনবরত প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলে। ভারতে নদীর পানি আটকে দেওয়ার যে খবর গ্রামে পৌঁছায়, তা শুনে গ্রামবাসীরা কারবালার ঐতিহাসিক খলনায়ক ইয়াজিদের সাথে ভারতকে তুলনা করে স্লোগান দিতে থাকে।

গল্পের প্রধান চরিত্র করিমদাদ কিন্তু এই কৃত্রিম উন্মাদনায় ভেসে যায় না। দেশভাগের দাঙ্গায় সে তার বাবাকে হারিয়েছিল, কিন্তু প্রতিশোধের বিষ সে অন্তরে পুষে রাখেনি। নদীর পানি বন্ধ করার খবরে সে ভেঙে পড়ার বদলে সমাধান খোঁজে। তার মতে, কেবল শত্রুকে গালি দিয়ে বা বিষোদগার করে খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়া আটকানো যাবে না; তার বদলে নিজেদের জমিতে নতুন খাল খনন করতে হবে, গভীর কূপ খুঁড়তে হবে, আর খরাকে জয় করতে হবে।

গল্পের চরম মুহূর্তটি ঘটে যখন করিমদাদের ঘরে এক ফুটফুটে পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। সে তার নবজাতকের নাম রাখে ‘ইয়াজিদ’। সবাই যখন চমকে ওঠে এবং এই অভিশপ্ত নাম নিয়ে তীব্র আপত্তি জানায়, করিমদাদ তখন এক গভীর সত্য উচ্চারণ করে। সে বোঝায়, কেবল নামের কারণে কেউ খারাপ হয় না, খারাপ হয় মানুষের আচরণে। তার ছেলে এই নাম নিয়ে বড় হবে যাতে সে কখনো কারবালার ইয়াজিদের মতো নিষ্ঠুর কাজ না করে, বরং অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনকে জয় করতে শেখে।

মান্টো এখানে রাজনৈতিক শত্রুতার মুখে দাঁড়িয়েও এক অবিনাশী মানবিকতার কথা বলেছেন। রাষ্ট্র যখন কাটাতাঁার আর শূন্য ঘৃণার চাষ করে, তখন করিমদাদের মতো সাধারণ মানুষ জীবনের প্রদীপ জ্বালিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে।

‘ইয়াজিদ’ (গল্পের বাংলা অনুবাদ)

মূল: সাদাত হাসান মান্টো

দেশভাগের রেশ তখনও মেলেনি, হঠাৎ গ্রামে রটে গেল এক নতুন আতঙ্ক। ভারত নাকি পাকিস্তানের দিকে আসা নদীর পানি আটকে দেবে। সে সময় গ্রামের অলিগলিতে থমথমে ভাব। চারদিকে একটা কথাই ভেসে আসছে—ওরা আমাদের পানি বন্ধ করে মারতে চায়, ওরা আধুনিক যুগের ইয়াজিদ!

করিমদাদের বাবা দাঙ্গার সময় ওপারে মারা গিয়েছিলেন। অথচ করিমদাদকে কখনো সেই পুরনো কষ্ট বা ঘৃণা নিয়ে মাতামাতি করতে দেখা যায়নি। সে নিজের খেতে কাজ করত, নদীর দিকে তাকিয়ে হিসাব কষত।

সেদিন নদীর পাড়ে গ্রামের বেশ কয়েকজন লোক জড়ো হয়ে উত্তেজিত আলোচনা করছিল। একজন বলল, “ওরা যদি পানি বন্ধ করে দেয়, তবে আমরা না খেয়ে শুকিয়ে মরব। হিন্দুস্তান আমাদের সাথে চরম অন্যায় করছে!”

করিমদাদ শান্ত গলায় শুধাল, “পানি বন্ধ করলে আমরা গালিগালাজ করব, নাকি পানি পাওয়ার ব্যবস্থা করব?”

লোকটা চটে গিয়ে বলল, “তুমি কি ওদের হয়ে সাফাই গাইছ করিমদাদ? ওরা নদী আটকে দিচ্ছে আর তুমি মিটিমিটি হাসছ?”

করিমদাদ বলল, “হাসছি না ভাই। বলছি, নদীর প্রবাহ তো কোনো একজনের বাপের সম্পত্তি নয়। ওরা যদি বাঁধ দেয়, তবে আমরাও মাটি কেটে নতুন নালা বানাব। গালি দিলে তো আর শুকনো খেতে পানি আসবে না।”

গ্রামের মাতব্বরেরা করিমদাদের এই বাস্তববাদী কথা বুঝতে পারল না। তাদের কাছে গালি দেওয়াটাই ছিল প্রধান দেশপ্রেম।

ঠিক সেই দিনগুলোর এক শুভ্র সকালে করিমদাদের ঘরে আলো করে এলো এক পুত্রসন্তান। তার স্ত্রী জীনো ছেলেকে কোলে নিয়ে করিমদাদের মুখের দিকে তাকাল। করিমদাদের চোখে তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি।

পরদিন সকালে যখন গ্রামের লোক আর আত্মীয়স্বজন বাচ্চা দেখতে এলো, করিমদাদ সবার সামনে ডেকে বলল, “আমি আমার ছেলের নাম রেখেছি।”

জীনো সোৎসাহে জিজ্ঞেস করল, “কী নাম গো?”

করিমদাদ বেশ স্পষ্ট ও দৃঢ় গলায় বলল, “ইয়াজিদ।”

মুহূর্তের মধ্যে ঘরের পরিবেশ স্তব্ধ হয়ে গেল। সবার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। জীনো ভয়ে কেঁপে উঠে বলল, “তুমি এ কী বলছ! ইয়াজিদ? যে কারবালায় পানি বন্ধ করে দিয়েছিল, সেই অভিশপ্ত নাম তুমি নিজের ছেলের রাখছ?”

গ্রামের এক প্রবীণ লোক ধমকে উঠলেন, “তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে করিমদাদ? শয়তানের নামে কেউ নিজের সন্তানের নাম রাখে?”

করিমদাদ মোটেও বিচলিত হলো না। সে শান্তভাবে শিশুর তুলতুলে মুখটার দিকে তাকাল, তারপর সবার দিকে ফিরে বলল, “নাম কখনো মানুষকে খারাপ বা ভালো করে না, মানুষ খারাপ হয় তার কাজে। ইয়াজিদ নামটা শুনলেই মানুষ ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাই না? আমি চাই আমার ছেলে এই নামটা নিয়েই বড় হোক।”

সে এক মুহূর্ত থামল, তারপর আবার বলল, “ও যখন বড় হবে, সবাই ওকে জিজ্ঞেস করবে কেন তোর নাম ইয়াজিদ? তখন সে মনে রাখবে, অতীতে এক ইয়াজিদ মানুষের পানি আটকে কূলহীন তৃষ্ণা দিয়েছিল। কিন্তু সে সেই ভুল করবে না, সে শুকনো মাটিতে নদী কেটে আনবে, মানুষকে জীবন দেবে। ও যেন নামটাকে গালি না বানিয়ে এক নতুন শক্তিতে পরিণত করে।”

ঘরের সবাই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কারও মুখে আর কোনো কথা ফুটল না। করিমদাদ কোলে তুলে নিল ছোট্ট ইয়াজিদকে। জানালায় এসে দাঁড়াতেই দেখল, রোদের আলোয় ঝিলমিল করছে দূরের নদীটি, যার পানি থমকে গেলেও প্রবাহ থেমে থাকে না।