বাবু গোপীনাথ – সাদাত হাসান মান্টো | রেখতা-উর্দু সাহিত্য । আমার সংস্কৃতি সিরিজ

সাদাত হাসান মান্টোর ‘বাবু গোপীনাথ’ বোম্বাই শহরের ধনাঢ্য পরজীবী সমাজ, মানুষের ছদ্ম-নৈতিকতা এবং এক আপাত-বোকা মানুষের নিখাদ ভালোবাসার অনন্য গল্প। ধনকুবের পিতা মারা যাওয়ার পর বিপুল সম্পত্তির মালিক হওয়া বাবু গোপীনাথ এবং তার আশ্রিতা তরুণী জিনতের সম্পর্ককে ঘিরে গল্পটি আবর্তিত হয়। সমাজের চোখে যাকে নিছক অপব্যয় বা বোকামি মনে হয়, মান্টো তার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা এক গভীর মানবিক অনুভূতি ও চরম আত্মত্যাগের ছবি এঁকেছেন।

‘বাবু গোপীনাথ’ বিশ্লেষণ

গল্পের মূল চালিকাশক্তি হলো বাবু গোপীনাথের অদ্ভুত জীবনদর্শন। বিপুল ধনসম্পদ হাতে পেয়ে সে তা উড়িয়ে দিচ্ছে একদল চাটুকার, দালাল আর সঙ্গীদের পেছনে। সবাই জানে গোপীনাথকে ঠকানো সহজ, আর সে নিজেও সেটা জানে। কিন্তু জেনেবুঝেও সে কাউকে তাড়িয়ে দেয় না। তার এই উদাসীনতা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং শহরের ভণ্ড মানুষের মুখোশ চিনে নেওয়ার এক নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি।

জিনতের প্রতি গোপীনাথের মানসিকতাও গতানুগতিক পুরুষতান্ত্রিক বাসনার বাইরে। সে জিনতকে কেবল শারীরিক ভোগের বস্তু বানাতে চায়নি; বরং জানে একদিন তার টাকা শেষ হয়ে যাবে, তখন এই সরল মেয়েটি কীভাবে বাঁচবে। তাই নিজের সমস্ত অর্থ খরচ করে সে জিনতকে নাচ-গান শিখিয়ে একজন সফল বায়েজী বা পেশাদার গণিকা হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, যাতে তার অনুপস্থিতিতেও জিনত স্বাবলম্বী থাকতে পারে।

গল্পের শেষ পরিণতিতে যখন গোপীনাথের শেষ সম্বলটুকুও শেষ হয়ে যায় এবং জিনত এক নতুন ধনী খদ্দের খুঁজে পায়, তখন গোপীনাথের মধ্যে কোনো ক্ষোভ বা আক্ষেপ দেখা যায় না। যে চাটুকারেরা সারাদিন তার টাকা খেয়ে বেঁচে থাকত, তারা শেষ পর্যন্ত তাকে ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু গোপীনাথ নিজের সর্বস্ব হারিয়েও এক অদ্ভুত তৃপ্তি পায়, কারণ জিনতের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এক অপব্যয়ী উড়নচণ্ডী মানুষের মধ্যে মান্টো দেখিয়েছেন এক বিরল, স্বার্থহীন মানবিক অনুভূতি।

‘বাবু গোপীনাথ’ (গল্পের বাংলা অনুবাদ)

মূল: সাদাত হাসান মান্টো

বোম্বাই শহরের এক ঘিঞ্জি ডেরায় আমার সাথে বাবু গোপীনাথের পরিচয় হয়। কাথিয়াবাড়ের ধনী পিতার একমাত্র সন্তান গোপীনাথ। পিতা মারা যাওয়ার পর বিপুল সম্পত্তি হাতে পেয়ে সে বোম্বাই চলে এসেছিল। তার চারপাশে সারাদিন গোল হয়ে বসে থাকত একদল চাটুকার—যাদের কাজ ছিল গোপীনাথের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকা আর তার টাকায় মদ-মাংস উড়িয়ে দিন কাটানো।

গোপীনাথের সাথে থাকত জিনত নামে এক অতি সাধারণ, অনভিজ্ঞ মেয়ে। না সে ভালো গাইতে জানত, না তার মধ্যে বায়েজীদের মতো কোনো চটুলতা ছিল। কিন্তু গোপীনাথ তাকে অন্ধের মতো ভালোবাসত। সে জিনতকে সেরা পোশাকে সাজাত, তার জন্য নামজাদা ওস্তাদ ডেকে গান শেখানোর ব্যবস্থা করেছিল।

একদিন আমি গোপীনাথকে একান্তে পেয়ে বললাম, “গোপীনাথ সাহেব, আপনি তো বোঝেন যে এই লোকগুলো আপনার টাকা চুষে খাচ্ছে? আর জিনতকে নিয়ে এত খরচ কেন করছেন?”

গোপীনাথ মৃদু হেসে জবাব দিয়েছিল, “মান্টো সাহেব, আমি জানি এরা সবাই আমার টাকার জন্য আমার পেছনে ঘোরে। কিন্তু এতে আমার কোনো আফসোস নেই। আর জিনতের কথা বলছেন? ও বড় সরল মেয়ে। আমি চাই ও গান-বাজনাটা ভালো করে শিখুক। আমার তো একদিন সব টাকা শেষ হয়ে যাবে, তখন ও খাবে কী? আমি চাই ও নিজের পায়ে দাঁড়াক।”

গোপীনাথের এই যুক্তি শুনে আমি অবাক হয়েছিলাম। যে মানুষটা নিজের পকেটের শেষ পয়সাটা উড়িয়ে দিচ্ছে, সে ভাবছে এক অসচ্ছল মেয়ের ভবিষ্যতের কথা!

কয়েক মাসের মধ্যেই গোপীনাথের জমানো পুঁজি শেষ হতে লাগল। গাড়িবাড়ি বিক্রি হলো, হীরে-জহরত হাতবদল হয়ে গেল। যেসব চাটুকারেরা এতদিন তাকে ‘হুজুর হুজুর’ করত, তারা ধীরে ধীরে সটান সটকে পড়তে শুরু করল।

শেষ পর্যন্ত জিনতের জন্য এক নতুন ধনী খদ্দেরের জোগাড় হলো। জিনতকে তার নতুন ডেরায় পৌঁছে দেওয়ার দিন গোপীনাথ নিজেই উপস্থিত ছিল। তার পরনে তখন জীর্ণ পোশাক, পকেটে একটা কানাকড়িও নেই।

জিনত যখন গাড়িতে উঠে নতুন খদ্দেরের সাথে রওনা দিল, গোপীনাথের চোখ দুটো ছলছল করে উঠেছিল। কিন্তু সে কান্না কোনো হারানোর যন্ত্রণার ছিল না, ছিল এক পরম স্বস্তির।

গোপীনাথ আমার দিকে ফিরে পরম তৃপ্তিতে বলেছিল, “দেখলেন মান্টো সাহেব, জিনতের হিল্লে হয়ে গেল! এখন আর ও না খেয়ে মরবে না। আমার কাজ শেষ হলো।”

বোম্বাইয়ের ভিড় রাস্তায় একা দাঁড়িয়ে থাকা রিক্ত গোপীনাথকে দেখে সেদিন আমার মনে হয়েছিল, এই শহরের হাজারও ‘সুশীল’ আর চালিয়াত মানুষের চেয়ে এই উড়নচণ্ডী লোকটা কত বেশি মানুষ!