আমার সংস্কৃতি সিরিজ

সিয়াহ হাশিয়ে – সাদাত হাসান মান্টো | রেখতা-উর্দু সাহিত্য । আমার সংস্কৃতি সিরিজ

সাদাত হাসান মান্টো

সাদাত হাসান মান্টোর ‘সিয়াহ হাশিয়ে’ (কালো দাগ) ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়কাল নিয়ে লেখা প্রথাগত কোনো দীর্ঘ উপন্যাস বা গল্প নয়; এটি মূলত দাঙ্গাকবলিত মানবমনস্তত্ত্বের ওপর আঁকা কয়েকটি নির্মম, ধারালো ও অসংলগ্ন বাস্তবতার কোলাজ। মাত্র কয়েক লাইনের ৩২টি ছোট ছোট অনুগল্প নিয়ে গড়ে ওঠা এই সংকলনটি কেবল দেশভাগের রক্তপাতকেই দেখায় না, বরং দেখায় রাজনীতির নামে মানুষ কীভাবে তার মৌলিক মনুষ্যত্ব ও বিবেকবোধ হারিয়ে এক অদ্ভুত উন্মাদনায় মেতে উঠেছিল। ব্লাক-হিউমার বা কৃষ্ণরসিকতার মাধ্যমে মান্টো এখানে সামাজিক ভণ্ডামি আর সহিংসতার অবান্তরতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন এক নগ্ন আয়নায়।

‘সিয়াহ হাশিয়ে’ বিশ্লেষণ

দাঙ্গার মতো চরম দুর্যোগেও মানুষ কীভাবে লাভ-ক্ষতির হিসাব কষে, আর ধর্মীয় বিদ্বেষ কীভাবে মানুষের স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তাকে লোপ করে দেয়, ‘সিয়াহ হাশিয়ে’ তার এক নিরাসক্ত দলিল। মান্টো এখানে নিজে কোনো নীতিবাক্য বা বিচারক হিসেবে দাঁড়াননি। তিনি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় পক্ষকে খলনায়ক বা ভিকটিম বানাননি; বরং সহিংসতায় লিপ্ত সমস্ত পক্ষের যৌথ নৈতিক দেউলিয়াত্বকে অত্যন্ত রুঢ়ভাবে সামনে নিয়ে এসেছেন।

এই অনুগল্পগুলোর মূল শক্তি নিহিত রয়েছে এদের শেষ বাক্যে। খুব সাধারণ, দৈনন্দিন কথ্য ভাষায় শুরু হওয়া গল্পগুলো আচমকা এমন এক চরম অসংগতিতে গিয়ে শেষ হয়, যা পাঠককে কাঁপিয়ে দেয়। যেমন, একটি গল্পে দেখা যায় ভিড় জমেছে এক সমাজসেবকের মূর্তির গলায় জুতোর মালা পরাতে, আর সংঘর্ষে আহত দাঙ্গাবাজকেই শেষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে হচ্ছে সেই সমাজসেবকের নামাঙ্কিত হাসপাতালে। কিংবা অন্য একটি গল্পে, পেট্রোলের দাম বেশি বলে মানুষ পুড়িয়ে মারতে অতিরিক্ত পেট্রোল খরচ না করে স্রেফ একটা দেশলাই কাঠি ব্যবহারের যুক্তি খোঁজে ঘাতকরা।

এখানে মান্টো দেখিয়েছেন, উগ্র সাম্প্রদায়িকতার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো তা মানুষকে কেবল খুনই করে না, বরং খুনের মতো ভয়াবহ অপরাধকেও একটি স্বাভাবিক দৈনন্দিন ঘটনায় পরিণত করে। জীবনের মূল্য যখন একজোড়া জুতো, একটু পেট্রোল বা একটা সস্তা ঘড়ির চেয়েও কমে যায়, তখন মানচিত্রের রেখা বদলে গেলেও সেই সমাজের আত্মা চিরকালের জন্য পঙ্গু হয়ে পড়ে।

‘সিয়াহ হাশিয়ে’ (গল্পের বাংলা অনুবাদ)

মূল: সাআদাত হাসান মান্টো

(১) ভুল শোধরানো

দাঙ্গাবাজরা যখন ঘরবাড়ি পুড়িয়ে লোকজনকে ধরে ধরে মারছিল, তখন এক যুবক চিৎকার করে উঠল, “আরে, ওকে মারছ কেন? ও তো আমাদের লোক!”

ভিড়ের ভেতর থেকে একজন হাত থেকে ছুরিটা নামিয়ে নিয়ে লজ্জিত গলায় বলল, “আহা, আগে বলবি তো! অনর্থক লোকটার ওপর খাঁটুনিটা গেল!”

(২) বিশেষ মেহেরবানি

একজনকে মাটিতে ফেলে কয়েকজন মিলে একটা ভোঁতা ছুরি দিয়ে তার গলা কাটার চেষ্টা করছিল। লোকটা কষ্টে কাতরাতে কাতরাতে বলল, “ভাই, একটা ধারালো ছুরি দিয়ে কাটুন না, বড় কষ্ট হচ্ছে!”

ঘাতকটা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিল, “চুপ কর! আমাদের কাছে এত সময় নেই যে তোর জন্য বাজার থেকে নতুন ছুরি কিনে আনব।”

(৩) সমাজসেবা

উত্তেজিত জনতা শহরের বিখ্যাত দাতব্য কর্মী স্যার গঙ্গারামের ব্রোঞ্জের মূর্তির সামনে জড়ো হলো। তারা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মূর্তিটা ভাঙার চেষ্টা করল, তারপর গলায় পুরানো জুতোর মালা পরিয়ে দিল।

ঠিক সেই সময় পুলিশ এসে গুলি চালাল। ভিড়ের মাঝখান থেকে এক দাঙ্গাবাজ গুলিতে আহত হয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল।

বাকিরা চিৎকার করে উঠল, “তাড়াতাড়ি কর! ওকে গঙ্গারাম হাসপাতালে নিয়ে চল, নইলে রক্তক্ষরণে মরে যাবে!”

(৪) জুতোর হিসেব

লুটপাট শেষে দুজন দাঙ্গাবাজ একটা পোড়া দোকানের ভেতর বসে মালপত্র ভাগাভাগি করছিল।

একজন বলল, “তুই পাঁচটা ঘড়ি আর এই কম্বলটা নে, আমি এই সোনার হাতঘড়িটা নিচ্ছি।”

অন্যজন আপত্তি জানিয়ে বলল, “না, এটা অন্যায়। লোকটাকে খুন করার সময় আমি ওর দুটো পা চেপে ধরেছিলাম, আর তুই শুধু গলায় পা দিয়েছিলি। কষ্ট আমারই বেশি হয়েছে!”

(৫) পেট্রোলের দাম

দাঙ্গাবাজরা এক যুবককে ধরে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে মারার আয়োজন করছিল।

হঠাৎ একজন চিৎকার করে উঠল, “থাম থাম! পেট্রোলের দাম যে হারে বেড়েছে, এত পেট্রোল নষ্ট করছিস কেন? তারচেয়ে এক কাজ কর, একটা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে জামায় আগুন ধরে দে, বাকিটা এমনিতেই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।”

(৬) সতর্কতা

এক কসাই পাশের মহল্লায় গিয়ে এক ব্যক্তিকে ধরে ছুরি উঁচিয়ে ধরল।

লোকটি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমাকে মারবেন না, আমি তো কোনো অন্যায় করিনি!”

কসাই গম্ভীর হয়ে বলল, “অন্যায় করিসনি তাতে আমার কী? কিন্তু সাবধান, গলাটা সোজা রাখ, আমার ছুরির ধার যেন নষ্ট না হয়!”

শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।