ইসলামপন্থিদের জন্য প্রথমে শরিয়াহ আইন চাই । ইসলাম ও মুসলিম সিরিজ

বাংলাদেশে যারা ইসলামকে পুঁজি করে রাজনীতি করেন, তাদের শেষ গন্তব্য বা চূড়ান্ত লক্ষ্যটা কিন্তু একদম পরিষ্কার—শরিয়াহ আইনের প্রবর্তন আর কোরানের শাসন কায়েম করা। কাগজে-কলমে এটাই তাদের রাজনীতির আসল ভিত্তি। এখন কেউ যদি মুখে ইসলামের বুলি আওড়ান অথচ শরিয়াহর বাস্তবায়ন না চান, তবে তাদের রাজনীতিকে ‘ইসলামী রাজনীতি’ না বলে ‘ইসলামের নামে ভণ্ডামি’ বলাই ভালো। কারণ, শরিয়াহ ছাড়া ইসলামী রাষ্ট্র বা শাসনের কথা বলা স্রেফ একটা ফাঁকা রাজনৈতিক কৌশল।

কিন্তু এই রাজনীতির সমীকরণটা বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, ভেতরে কিন্তু ততটাই রহস্যে ঘেরা। উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে পাকিস্তানের জন্ম থেকে শুরু করে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের গত ৫০ বছরের ইতিহাস ঘাঁটলে একটা খটকা খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইসলামপন্থিরা শরিয়াহর জন্য আন্দোলন করলেন, বড় বড় সভা-সমাবেশ করলেন, এমনকি রক্তক্ষয়ী সংঘাতও করলেন; কিন্তু আজ পর্যন্ত এই শরিয়াহ আইনের সুনির্দিষ্ট কোনো খসড়া বা রূপরেখা জনগণের সামনে আনলেন না। তারা দিনরাত ‘কোরানের আইন’ আর ‘আল্লাহর শাসন’ বলে রাজপথ উত্তপ্ত করে ফেলেন ঠিকই, কিন্তু সেই আইনগুলো আসলে দেখতে কেমন হবে, তার কোনো বিস্তারিত আইনি ব্লুপ্রিন্ট তারা দেয় না।

অথচ পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে এই ইসলামপন্থিদের সামনে শরিয়াহ বাস্তবায়নের সুযোগ কিন্তু বেশ কয়েকবার এসেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো সবসময় ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ নীতি মেনে চলেছে। শরিয়াহর নামকাওয়াস্তে দু-একটা ধারা যুক্ত করলেও, পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহ আইন করার উদ্যোগ কেউই নেয়নি। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী যখন বিএনপির সাথে জোট বেঁধে সরকারে ছিল, তাদের মন্ত্রী ছিল, তখনও কিন্তু তারা শরিয়াহ আইন করার কোনো চেষ্টা করেনি, এমনকি কোনো ইসলামী শাসনতন্ত্রের রূপরেখাও দেশের মানুষকে দেখায়নি।

পাকিস্তানের স্বৈরশাসক জিয়াউল হক নিজেকে ‘আমিরুল মুমিনিন’ ঘোষণা দিয়ে কিছু শরিয়াহ আইন করার চেষ্টা করেছিলেন। যেমন—আংশিক হুদুদ অধ্যাদেশ, ব্লাস্ফেমী বা ধর্ম অবমাননা আইন, আহমদিয়া বিরোধী অর্ডিন্যান্স, জাকাত-রিবা ও এহতেরাম-ই-রমজান আইন চালু করা, ফেডারেল শরীয়ত কোর্ট গঠন, পাঠ্যক্রমে ইসলামিয়াত বাধ্যতামূলক করা, অফিসে নামাজের বিরতি এবং নারী সংবাদপাঠিকাদের মাথায় ওড়না পরা বাধ্যতামূলক করা ইত্যাদি। আমাদের দেশেও জিয়াউর রহমান ও এরশাদ সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ যুক্ত করা বা ‘রাষ্ট্রধর্ম’ ঘোষণার মতো দু-একটি প্রতীকী কাজ করেছেন মাত্র, এর বেশি কিছু নয়।

একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন—যে ব্যবস্থার জন্য তাদের এত বছরের সংগ্রাম, সেই জিনিসটাই তারা কখনো মানুষের কাছে খোলাসা করে না! আমাদের দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলাগুলো শরিয়াহ কোর্টে কীভাবে নিষ্পত্তি হবে? দ্বিতীয় বিয়ে করতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগবে কি না? স্ত্রীকে তালাক দিলে তিন মাসের খোরপোশ ছাড়া আর কোনো সামাজিক বা আর্থিক নিরাপত্তা থাকবে কি না, ধর্ষনের অপরাধের কি বিচার হবে —এই সাধারণ বিষয়গুলোও তারা মানুষকে স্পষ্ট করে জানায় না। শরিয়াহ যদি সমাজ ও মানুষের জন্য এতই মঙ্গলের হয়, মানুষ যদি তা এতই পছন্দ করে, তবে সেটা আগে থেকে পরিষ্কার করে বলতে অসুবিধা কোথায়? আপনি ক্ষমতায় গিয়ে আসলে কী করতে চান, সেটা যদি ভোটারদের নাই জানান, তবে মানুষ আপনাকে কেন এবং কিসের ভিত্তিতে সমর্থন করবে?

দুর্ভাগ্যজনক হলো, আপনি তাদের যতই প্রশ্ন করুন না কেন—তারা কোনোদিন এর সদুত্তর দেয়নি এবং ভবিষ্যতেও দেবে না। কিন্তু সাধারণ নাগরিক ও ভোটার হিসেবে এই রূপরেখাটি না জানলে আমরা তাদের সমর্থন করবো কিভাবে?

তবে আপনি যখনই শরিয়াহর সুনির্দিষ্ট ব্লুপ্রিন্ট বা লিখিত খসড়া চেয়ে তাদের বেশি চেপে ধরবেন, তখনই তারা চট করে একটা চেনা ডায়ালগ দেবে—“সবকিছু কোরান-হাদিস অনুযায়ী করা হবে।” দেখতে খুব ধার্মিক মনে হলেও, এটি আসলে তাদের আরেকটি চরম চতুর ও প্রতারণামূলক কৌশল। কেন জানেন? কারণ, বর্তমানে পৃথিবীর যে ক’টি দেশে শরিয়াহ আইন চালু আছে (যেমন: সৌদি আরব, ইরান, আফগানিস্তান কিংবা সুদান)—তারা সবাই কিন্তু দাবি করে যে তাদের আইন কোরান আর হাদিস থেকেই নেওয়া হয়েছে। অথচ এই দেশগুলোর একটার শরিয়াহ আইনের সাথে আরেকটার কোনো মিল নেই! সৌদি আরবের ব্যাংকিং ব্যবস্থা বা নারীর গাড়ি চালানোর অধিকারের সাথে আফগানিস্তানের তালেবানদের শরিয়াহ আইনের আকাশ-পাতাল তফাত। এমনকি খোদ ইসলামের চার প্রধান মাজহাবের (হানাফি, শাফি, মালিকি ও হাম্বলি) আইনি ব্যাখ্যাও অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন।

কাজেই, শুধু মুখে ‘কোরান-হাদিস’ বলে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আপনি কোরান ও হাদিসের কোন ব্যাখ্যা, কোন মাজহাব বা কোন ফিকহকে সামনে রেখে আইন বানাবেন, সেটা তো আমাদের জানা জরুরি। আপনি কি সৌদি মডেল চান, ইরান মডেল চান, নাকি আফগান মডেল চান—তা জনগণকে স্পষ্ট করে বুকলেট আকারে দেখাতে হবে। এই ধোঁয়াশা রেখে স্রেফ একটা পবিত্র আবেগকে পুঁজি করে অন্ধের মতো সমর্থন চাওয়া আর মানুষকে বোকা বানানো একই কথা।

শরিয়াহ আইন

রূপরেখা না থাকার মনস্তত্ত্ব: ভীতি নাকি অবিশ্বাস?

জনগণের মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে—যে আইনের জন্য এত ত্যাগ, এত জিহাদ, তার রূপরেখা কেন আড়ালে রাখা হয়? এর পেছনে মূলত দুটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত কারণ থাকতে পারে।

প্রথমত, রূপরেখা দেখে জনগণের ভড়কে যাওয়ার ভয়:

ইসলামপন্থি নেতৃত্ব সম্ভবত মনে করেন, এ দেশের মানুষ ধর্মের প্রতি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ এবং ‘ইসলামী শাসন’ শব্দটির প্রতি তাদের একধরনের মনস্তাত্ত্বিক আনুগত্য রয়েছে। কিন্তু শরিয়াহ আইনের খুঁটিনাটি বিষয়, যেমন—অপরাধের আধুনিক দণ্ডবিধি, কর ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কাঠামো, নারীর অধিকার কিংবা ভিন্নমতাবলম্বীদের নাগরিক অধিকারের সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যাখ্যা যখন হুবহু সামনে আসবে, তখন সাধারণ মুসলিম জনতা হয়তো আধুনিক জীবনের বাস্তবতার সাথে এর দূরত্ব দেখে ভড়কে যেতে পারে। ফলে যে আবেগ পুঁজি করে রাজনীতি চলছে, তাতে ভাটা পড়ার আশঙ্কা থাকে।

দ্বিতীয়ত, জনগণের প্রজ্ঞা ও সক্ষমতার ওপর অবিশ্বাস:

আরেকটি কারণ হতে পারে যে, ইসলামপন্থি দলগুলো মনে করে শরিয়াহ আইনের মতো ঐশ্বরিক ও জটিল শাস্ত্রীয় আইন বোঝার মতো গভীরতা বা যোগ্যতা সাধারণ জনগণের নেই। এটি কেবল আলেম সমাজ বা শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের বোঝার বিষয়।

কিন্তু যুক্তি বলে, যে আইন সাধারণ মানুষের ওপর প্রয়োগ করা হবে, তা না বুঝে বা তার রূপরেখা না জেনে সেই আইনের জন্য জীবন বাজি রেখে লড়াই বা ‘যদ্দজেহাদ’ করা একধরনের অন্ধ অনুকরণ। না বুঝে কোনো ব্যবস্থার জন্য লড়াই করা যেমন অযৌক্তিক, তেমনি রূপরেখা ছাড়া কোনো দাবি তোলাও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব।

শরিয়াহ আইন

প্রস্তাবনা: পরীক্ষামূলক এবং ঐচ্ছিক শরিয়াহ আইনের প্রবর্তন

এই জটিলতা এবং ধোঁয়াশা দূর করার জন্য একটি যুগান্তকারী এবং শান্তিপূর্ণ সমাধান হতে পারে—এ দেশে যারা শরিয়াহ আইন চান, প্রথমে তাদের ওপরই এই আইনের পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন হোক। এটি আমাদের বর্তমান আইনি কাঠামোর মধ্যেই করা সম্ভব এবং এর জন্য কোনো রাষ্ট্রীয় বিপ্লব বা সংবিধানের আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশে যেভাবে মুসলিম পারিবারিক আইন বা হিন্দু পারিবারিক আইন প্রচলিত রয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষ তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়ে নিজস্ব ধর্মীয় বিধিমালা মেনে চলেন, ঠিক একইভাবে শরিয়াহ আইনের একটি বিশেষ সংস্করণ তৈরি করা যেতে পারে।

যেহেতু আমাদের দেশে ইসলামপন্থিদের মধ্যে চিন্তাভাবনা ও ব্যাখ্যার ভিন্নতা রয়েছে, তাই একক কোনো আইন চাপিয়ে না দিয়ে দলভিত্তিক আইন হতে পারে। যেমন:

  • জামায়াতে ইসলামীর অনুসারীদের জন্য তৈরি হতে পারে “জামায়াতে ইসলামী শরিয়াহ আইন”
  • হেফাজতে ইসলামের অনুসারীদের জন্য হতে পারে “হেফাজতে ইসলামী শরিয়াহ আইন”

এই আইনগুলোর খসড়া, নীতিমালা, প্রবিধান এবং বাস্তবায়ন ম্যানুয়াল বা নির্দেশিকা সম্পূর্ণভাবে তৈরি করবে সেইসব দলের নিজস্ব শরিয়াহ কাউন্সিল বা বিশেষজ্ঞ বোর্ড। রাষ্ট্র কেবল তাদের তৈরি করা সেই আইনি রূপরেখাকে একটি বিশেষায়িত আইন হিসেবে সংসদে পাস করে দেবে।

এরপর, দেশের যেসব নাগরিক বা কর্মী নিজেদের ওই নির্দিষ্ট ধারার শরিয়াহ আইনের অধীন করতে চান, তারা আদালতে গিয়ে একটি আইনি হলফনামা বা এফিডেভিটের মাধ্যমে স্বেচ্ছায় সেই শরিয়াহ আইনের আওতায় নিজেদের সমর্পণ করবেন। যারা এই এফিডেভিট করবেন, তাদের মধ্যকার যেকোনো অপরাধ, দেওয়ানি বিরোধ বা পারস্পরিক ডিসপিউটের বিচার দেশের প্রচলিত দণ্ডবিধির (Penal Code) পরিবর্তে তাদের নিজেদের পছন্দ করা শরিয়াহ আইনের অধীনে বিশেষ কোর্টে অনুষ্ঠিত হবে। আর দেশের যে যেসব মানুষ এই শরিয়াহ ব্যবস্থায় সাবস্ক্রাইব করবেন না, তারা দেশের সাধারণ ও প্রচলিত আইনেই বিচার পাবেন।

শরিয়াহ আইন

ব্যবস্থার ফলাফল: স্বচ্ছতা ও সত্যের মুখোমুখি হওয়া

যদি এই ঐচ্ছিক বা সাবস্ক্রিপশন-ভিত্তিক শরিয়াহ আইন ব্যবস্থা চালু করা হয়, তবে দেশের মানুষের সামনে খুব দ্রুত দুটি বিষয় স্ফটিকের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে:

১. শরিয়াহ আইনের বাস্তব রূপটি আসলে কেমন:

এতদিন ধরে যে আইনটিকে কেবল বক্তৃতার মঞ্চে একটি তাত্ত্বিক ও অলৌকিক সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হতো, তা এবার একটি সুনির্দিষ্ট আইনি সংহিতা (Legal Code) হিসেবে মানুষের চোখের সামনে দৃশ্যমান হবে। জামায়াতের শরিয়াহ কাউন্সিলে ব্যাংকিং, অর্থনীতি বা সাক্ষ্য আইন কেমন, আর হেফাজতের কাউন্সিলে জেনার শাস্তি, চুরি বা নারীর উত্তরাধিকারের ব্যাখ্যা কেমন—তা বইয়ের পাতায় এবং আদালতের রায়ে পরিষ্কার ধরা পড়বে। ফলে শরিয়াহ নিয়ে সাধারণ মানুষের ভেতরের অলীক কল্পনা বা অমূলক ভীতি—উভয়েরই অবসান ঘটবে।

২. শরিয়াহর অধীনে প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রাপ্তির বাস্তবতা:

এই আইনের অধীনে যখন বিচারকার্য শুরু হবে, তখন মানুষ সরাসরি দেখতে পাবে যে এই আদালতগুলো প্রচলিত আদালতের চেয়ে দ্রুত, দুর্নীতিমুক্ত এবং মানবিক উপায়ে সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে পারছে কি না। যদি দেখা যায় যে এই বিশেষ আদালতে কোনো পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই ভুক্তভোগীরা দ্রুত ও নিখুঁত ন্যায়বিচারের স্বাদ পাচ্ছেন, তবে তা হবে এই আইনের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন।

শরিয়াহ আইন

রক্তপাতহীন রূপান্তর: যুদ্ধের পরিবর্তে দৃষ্টান্তের রাজনীতি

আমাদের দেশের ইসলামপন্থিরা সাধারণত ভাবেন—একদিন রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করবেন কিংবা একটা বড়সড় বিপ্লব ঘটিয়ে একঝটকায় দেশের পুরো ১৮ কোটি মানুষের ওপর শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দেবেন। কিন্তু ইতিহাস আমাদের অন্য কথা বলে। জোর করে বা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো আইন সমাজ কোনোদিন সহজে গ্রহণ করে না; বরং তা সমাজে চরম বিভেদ, তীব্র অস্থিতিশীলতা, এমনকি গৃহযুদ্ধ আর রক্তক্ষয় ডেকে আনে। আফগানিস্তান বা ইরানের মতো দেশগুলোর দিকে তাকালে এই জোরজবরদস্তির পরিণতি স্পষ্ট দেখা যায়।

এখানে একটা মজার ব্যাপার আছে। ইসলামপন্থিরা নিজেরাই কিন্তু কথায় কথায় বলেন—বর্তমানে পৃথিবীর কোনো দেশেই নাকি ‘আসল’ বা ‘সঠিক’ শরিয়াহ আইন চালু নেই। তার মানে, আমাদের সামনে এমন কোনো জীবন্ত আদর্শ মডেল নেই, যা দেখে সাধারণ মানুষ একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। কোনো ব্যবস্থার বাস্তব কার্যকারিতা না দেখে, শুধু তাত্ত্বিক কথার ওপর ভরসা করে মানুষ কেন নিজের জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তন করতে রাজি হবে? কিন্তু যদি চোখের সামনে একটা সফল ও কার্যকর মডেল থাকে, তবে মানুষের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়াটা অনেক সহজ হয়ে যায়।

ঠিক এই জায়গাতেই আমার প্রস্তাবিত মডেলটি একটি যুগান্তকারী সমাধান হতে পারে। এটি সফল হলে দেশে কোনো যুদ্ধ-জেহাদ, রাজপথের সহিংসতা বা রক্তপাতের বিন্দুমাত্র প্রয়োজন হবে না। ইসলামপন্থি দলগুলো যদি তাদের নিজস্ব শরিয়াহ আদালতের মাধ্যমে সমাজে একটা অনুকরণীয়, ইনসাফপূর্ণ এবং দুর্নীতিমুক্ত সুশাসনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে, তবে দেশের সাধারণ মানুষ এমনিতেই মুগ্ধ হবে।

প্রচলিত আদালতের দীর্ঘসূত্রতা আর দুর্নীতিতে অতিষ্ঠ মানুষ যখন দেখবে শরিয়াহ আদালতে সত্যি সত্যিই বিনা পয়সায় এবং দ্রুত সঠিক বিচার পাওয়া যাচ্ছে, তখন তারা কোনো চাপ ছাড়াই, সম্পূর্ণ নিজেদের ইচ্ছায় আদালতে গিয়ে এফিডেভিট করবে। এভাবে দলে দলে মানুষ স্বেচ্ছায় এই শরিয়াহ আইনের ছত্রছায়ায় চলে আসবে। কোনো অস্ত্রের জোর লাগবে না, কোনো রক্তক্ষয় হবে না—স্রেফ ভালো কাজের দৃষ্টান্ত দিয়েই একটি স্বতঃস্ফূর্ত এবং শান্তিপূর্ণ সামাজিক রূপান্তর ঘটে যাবে।

শরিয়াহ আইন

ইসলামপন্থিদের জন্য সহজে জয়ের সুযোগ

আমার এই প্রস্তাবটি মূলত এ দেশের ইসলামী রাজনীতিকদের জন্য একটি বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক ‘লিটমাস টেস্ট’ বা অগ্নিপরীক্ষা। যদি তারা এই চমৎকার এবং শান্তিপূর্ণ প্রস্তাবে রাজি না হন, তবে তা দিনের আলোর মতো প্রমাণ করবে যে—তাদের আসল উদ্দেশ্য কোনো ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ করা নয়; বরং ধর্মের আবেগকে পুঁজি করে স্রেফ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করাই তাদের মূল লক্ষ্য।

আর তারা যদি সত্যিই সৎ হন এবং এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে চান, তবে তাদের জন্য এটা একটা বিশাল সুযোগ। তারা অবিলম্বে তাদের কাঙ্ক্ষিত শরিয়াহর রূপরেখা প্রস্তুত করে জনগণের সামনে নিয়ে আসুক। ইবাদত, মুয়ামালাত (দেওয়ানি আইন), মুনাকাহাত (পারিবারিক আইন) এবং উকুবাত (ফৌজদারি দণ্ডবিধি) সংক্রান্ত আমাদের দেশের প্রচলিত প্রতিটি সেক্যুলার আইনের বিপরীতে তাদের শরিয়াহ খসড়া কেমন হবে, তা টেবিল বুক আকারে প্রকাশ করুক।

আদালতে ‘আল-বাইয়্যিনাহ’ বা সাক্ষ্য-প্রমাণের ক্ষেত্রে—শাহাদাহ (মৌখিক সাক্ষ্য), ইকরার (স্বীকারোক্তি) এবং ইয়ামিন (কসম)-এর আইনি আওতা ও সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করুক। একই সাথে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে ‘কারাইন’ বা পারিপার্শ্বিক প্রমাণ (যেমন: ডিএনএ টেস্ট, সিসিটিভি ফুটেজ বা ডিজিটাল ফরেনসিক) কোন অপরাধের ক্ষেত্রে কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করুক। এক কথায়—আইনের উৎস, আইনের অবয়ব এবং এর বাস্তব প্রয়োগ পদ্ধতি লিখিতভাবে ও দালিলিকভাবে স্পষ্ট করতে হবে।

আপনারা যদি এই রূপরেখাটি জনগণের সামনে এনে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেন, তবেই কেবল এ দেশে ইসলামের নামে রাজনীতি করার নৈতিক অধিকার আপনাদের থাকবে। আর যদি তা না পারেন, তবে ধর্মের নাম ভাঙিয়ে সাধারণ মানুষকে বোকা বানানোর এই রাজনৈতিক প্রতারণা আপনাদের অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত।

 

শরিয়াহ আইন

 

ভণ্ডামির অবসান ও বাস্তবতার সূচনা

একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বহুত্ববাদ এবং মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সম্মান জানানোর জন্য এটি একটি অনন্য ও চমৎকার উপায় হতে পারে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে একদিকে যেমন প্রগতিশীল বা ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিকদের ওপর জোর করে কোনো ধর্মীয় আইন চাপিয়ে দেওয়া হবে না, অন্যদিকে ইসলামপন্থিদের ‘ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার’ দীর্ঘদিনের লালিত আকাঙ্ক্ষাও পূরণ হবে। এতে করে রাষ্ট্রের ভেতরে কোনো পক্ষই নিজেকে বঞ্চিত বা বৈষম্যের শিকার মনে করবে না।

সর্বোপরি, এই একটি সাহসী পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে ‘ইসলামের নামে ভণ্ডামি’ চিরতরে বন্ধ হবে। শরিয়াহ আইন কি আসলেই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর ও বাস্তবসম্মত, নাকি এটি কেবলই জনতাকে উত্তেজিত করার একটা রাজনৈতিক স্লোগান—তা কোনো রাজপথের মারামারি, ভাঙচুর বা অন্তহীন তাত্ত্বিক বিতর্ক ছাড়াই সম্পূর্ণ আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় আদালতের কাঠগড়ায় প্রমাণিত হয়ে যাবে।

তাই আজ সময় এসেছে সজোরে দাবি তোলার—ইসলামপন্থিদের শরিয়াহর আকাঙ্ক্ষা যদি সত্যিই আন্তরিক ও সত্য হয়ে থাকে, তবে তা প্রথমে তাদের নিজেদের জীবন, নিজেদের অনুসারী এবং তাদের নিজেদের আদালতের মাধ্যমেই শুরু হোক।

আমার কাছে এই পুরো ফ্রেমওয়ার্কটির ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের একটি পূর্ণাঙ্গ ও বাস্তবসম্মত সমাধান রয়েছে। এই ব্যবস্থার আইনি বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে যদি কারো কোনো প্রশ্ন, সংশয় বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাকে লিখে জানান; আমি এই লেখার পরবর্তী সংস্করণে সেই বিষয়গুলোর বিশদ ব্যাখ্যা যুক্ত করে দেব।

আরও দেখুন: