রাগ ঝিঁঝিট (বা ঝিনঝটি) শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং শ্রুতিমধুর রাগ। এটি মূলত চপল এবং চঞ্চল প্রকৃতির রাগ হলেও এর মধ্যে এক ধরণের গভীর করুণা ও ভক্তির রস বিদ্যমান।
রাগ ঝিনঝটি বা রাগ ঝিঁঝিট
রাগ ঝিঁঝিট: পরিচয় ও বিশেষত্ব
রাগ ঝিঁঝিট (Jhinjhoti) খাম্বাজ ঠাটের অন্তর্গত একটি রাগ। এর চলন অত্যন্ত সাবলীল এবং এটি মূলত উপ-শাস্ত্রীয় সংগীত যেমন— ঠুমরি, দাদরা এবং ভজন গায়নে প্রচুর ব্যবহৃত হয়। লোকসংগীতের সুরের সাথে এই রাগের এক গভীর যোগসূত্র রয়েছে। রবীন্দ্রসংগীতেও ঝিঁঝিট রাগের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এই রাগটি মধ্যম ও পঞ্চম স্বরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। এর বিশেষত্ব হলো এটি উচ্চ স্বরে (তার সপ্তকে) খুব বেশি সময় অবস্থান করে না, বরং মন্ত্র ও মধ্য সপ্তকেই এর সৌন্দর্য বেশি ফুটে ওঠে।
ইতিহাসগতভাবে, ঝিঁঝিট একটি প্রাচীন রাগ। কথিত আছে যে, সুফি সাধক ও সংগীতজ্ঞরা এই রাগকে আধ্যাত্মিক সংযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন। এর স্বর বিন্যাস এতটাই সহজ যে সাধারণ শ্রোতারাও এর সুরের আবেদন সহজেই অনুভব করতে পারেন।
রাগের শাস্ত্র
রাগ ঝিঁঝিট-এর শাস্ত্রীয় রূপ ও নিয়মাবলী নিচে দেওয়া হলো:
- ঠাট: খাম্বাজ।
- জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৫টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: সা রে ম প ধ সা (কিংবা স র ম প ধ সঁ)।
- অবরোহ: সঁ নি ধ প ম গ রে সা (এখানে ‘নি’ কোমল)।
- বাদী স্বর: গান্ধার (গ)।
- সমবাদী স্বর: নিষাদ (নি)।
- বর্জিত স্বর: আরোহে ‘গান্ধার’ (গ) ও ‘নিষাদ’ (নি) বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: অবরোহে সাতটি স্বরই ব্যবহৃত হয়। ‘নিষাদ’ স্বরটি কোমল (নি) এবং বাকি সব স্বর শুদ্ধ।
- সময়: রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে ১২টা)।
- প্রকৃতি: চপল ও মধুর।
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
ঝিঁঝিট রাগের সাথে মিল রয়েছে বা সুরের মিল পাওয়া যায় এমন কিছু রাগের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
- রাগ খাম্বাজ: এই রাগের ঠাট ও স্বরের সাথে ঝিঁঝিট-এর গভীর মিল রয়েছে, তবে আরোহ-অবরোহের চলন ভিন্ন।
- রাগ তিলক কামোদ: ঝিঁঝিট ও তিলক কামোদ উভয় রাগেই শুদ্ধ স্বরের প্রাধান্য থাকে এবং চলনে কিছুটা সাদৃশ্য পাওয়া যায়।
- রাগ দেশ: অবরোহে কোমল নিষাদের ব্যবহারের কারণে ঝিঁঝিঁটের সাথে রাগের দেশের কিছুটা আংশিক মিল অনুভূত হয়।
- রাগ কাফি: কিছু কিছু ক্ষেত্রে স-রে-ম-প চলনের কারণে এই রাগের ছায়া দেখা যায়, তবে ঠাট ভিন্ন।
রাগ ঝিঁঝিট তার সরলতা এবং মাধুর্যের কারণে সংগীত শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। এটি এমন একটি রাগ যা খুব জটিল অলংকারের চেয়েও মিড় ও তানের সহজ কাজ দিয়ে শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। ভক্তি ও শৃঙ্গার রসের সংমিশ্রণে ঝিঁঝিট আজীবন বাংলা ও ভারতীয় উপ-মহাদেশের সংগীতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে।
তথ্যসূত্র (Sources)
এই নিবন্ধের তথ্যগুলো নিম্নলিখিত প্রামাণ্য উৎস থেকে যাচাই করা হয়েছে:
১. রাগ শাস্ত্র – পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে।
২. সংগীত তত্ত্ব (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড) – প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী।
৩. যশোর শিক্ষা বোর্ড ও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-এর সংগীত পাঠ্যক্রম।
৪. বিষ্ণুপুর ঘরানার শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রামাণ্য দলিল।
আরও দেখুন: