আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেকগুলো বড় অর্জনের একটি হলো বাংলাদেশের মুসলিমদের মধ্য থেকে এই ‘জাত-পাত’ বা কাস্ট সিস্টেমের চিরতরে অবসান ঘটা।
শুনে হয়তো অবাক হচ্ছেন? ভাবছেন, মুসলিমদের মধ্যে আবার কাস্ট সিস্টেম কী? উঁচু-নিচু জাতের ভেদাভেদ তো শুধু হিন্দুদের সমস্যা!
ভুল ভাবছেন। এই সমস্যাটা আমাদেরও, এবং বেশ ভালোভাবেই আছে। আরবে কুরাইশ আর অ-কুরাইশদের মর্যাদা এক নয়, আরব আর অনারবদেরও এক চোখে দেখা হয় না। আর এই ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের সমাজ তো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ‘আশরাফ’ (উচ্চজাত), ‘আজলাফ’ (নিম্নজাত) আর ‘আরজাল’ (অন্ত্যজ)—এমন প্রায় ১৫০টিরও বেশি কাস্টে বিভক্ত। ভারতে এটা সরাসরি কাস্ট বা জাত হিসেবে চলে, আর পাকিস্তানে চলে ‘রক্ত, বংশ আর গোত্রের’ অহংকার দিয়ে। বিশ্বাস না হলে ভারত বা পাকিস্তানের যেকোনো সাধারণ মানুষের সাথে একটু মিশে দেখুন, তাদের পারিবারিক আড্ডায় বসুন; দেখবেন বিয়ে-শাদী বা সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই দেয়ালটা আজও কতটা পাকা।
এই ইন্টারনেটের যুগে এসেও তাদের এই জাতপ্রথার নগ্ন রূপটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে মেট্রোমোনিয়াল সাইটগুলোতে গেলে। ভারত বা পাকিস্তানের যেকোনো বড় মুসলিম ম্যাচমেকিং সাইটে ঢুকলেই দেখবেন, সেখানে পাত্র-পাত্রী খোঁজার জন্য ধর্মের পাশাপাশি ‘কাস্ট’ বা ‘সাব-কাস্ট’ ফিল্টার করার অপশন রাখা হয়েছে। সৈয়দ, শেখ, সিদ্দিকী বা মোঘলদের মতো তথাকথিত ‘আশরাফ’ বা অভিজাত পরিবারগুলো আজও নিজেদের বাইরে অন্য কোথাও বিয়ে করার কথা ভাবতেই পারে না। রক্তের এই তথাকথিত ‘পবিত্রতা’ রক্ষার অন্ধ অহংকার তাদের মজ্জায় মজ্জায় মিশে আছে।
ভারতে এই ভেতরের ক্ষতটাকে সম্প্রতি নতুন করে সামনে এনেছে ‘পাশমান্দা’ মুসলমানদের অধিকার আন্দোলন। ফার্সি এই ‘পাশমান্দা’ শব্দের অর্থ হলো ‘পেছনে ফেলে রাখা মানুষ’। ভারতীয় মুসলিমদের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসলে এই পাশমান্দা ভুক্ত, যারা মূলত যুগ যুগ আগে ধর্মান্তরিত হওয়া খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। অথচ দুঃখের বিষয় হলো, ভারতের মুসলিম সমাজের ধর্মীয় নেতৃত্ব, ক্ষমতা আর বিত্ত বৈভব সবসময় কুক্ষিগত করে রেখেছে ওই ১৫ শতাংশ ‘আশরাফ’ এলিটরা। এই পাশমান্দা আন্দোলন আজ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে—মুখে আমরা যতই ইসলামের সাম্যের কথা বলি না কেন, বাস্তব সমাজে তাদের আজও দলিতদের মতোই অবহেলা আর বঞ্চনা সহ্য করতে হচ্ছে।
পাকিস্তানের চিত্রটাও আলাদা কিছু নয়। ওখানে হয়তো সরাসরি ‘কাস্ট’ শব্দটা বলা হয় না, কিন্তু সেটা টিকে আছে ‘বিরাদারি’ বা গোত্রপ্রথার মোড়কে। রাজপুত, জাট, গুজ্জর বা সৈয়দ—এই বংশীয় পরিচয়গুলো সেখানে এতোটাই উগ্র যে, গ্রামীণ রাজনীতি থেকে শুরু করে বিয়ে-শাদী সবকিছুই এর ওপর নির্ভর করে। তথাকথিত নিচু জাতের কারও সাথে ভুল করেও পারিবারিক সম্পর্ক তৈরি হলে আজও সেখানে অনার কিলিং বা অনার-ক্রাইমের মতো নৃশংস ঘটনা ঘটে।
ধর্মগ্রন্থে সাম্যের সুন্দর বাণী থাকলেও, ভারত আর পাকিস্তানের মুসলিম সমাজ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এই জাতপ্রথার অন্ধকার থেকে বের হতে পারেনি। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আজ আমাদের বাংলাদেশের মুসলিম সমাজ যে বংশের বড়াই আর জাত-পাতের এই নোংরা মানসিকতা থেকে প্রায় পুরোপুরি মুক্ত হতে পেরেছে, সেটা আমাদের এক অনন্য এবং বিশাল সামাজিক অর্জন।

ইসলাম, বর্ণবাদ, কাস্ট-সিস্টেম, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ !
পাকিস্তান হবার পরে আমদের ইসলামিক রাষ্ট্রের প্রথম মোহভঙ্গ হয়েছিল যেসব কারণে, তার মধ্যে বর্ণবাদও ছিল। পাকিস্তান গঠন হবার পর থেকে যত দিন যাচ্ছিল, ততই তথাকথিত আশরাফ মুসলমানদের জন্য রিজার্ভ রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা, লাইসেন্স, পারমিট স্পষ্ট হচ্ছিল। “আশরাফ” মুহাজির হলেও তার গুরুত্ব আমাদের মতো “আত্রাফ” ভূমিপুত্রদের চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছিল। যে ধর্মের সমতা আর ন্যায্যতার লোভ দেখিয়ে পাকিস্তানে ডাকা হয়েছিল, সেই ধর্মের দোহাই দিয়েই হচ্ছিল বৈষম্য আর শোষণ।
ইসলামিক এস্টেট পাকিস্তান মানে দেখা গেল মূলত “আশরাফ” মুসলিমের দ্বারা “আত্রাফ” মুসলিমদের শোষণ। সেটা টিকিয়ে রাখতো মোল্লা আর আর্মি। এই ঘটনা বোঝার পর থেকেই বাঙ্গালি সেকুলার রাষ্ট্রবাদের দিকে গেছে, তারা বুঝতে পেরেছে রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের সংযোগ থাকলে ধর্মের নামে শোষণ চলবেই। তাই আমাদের সেকুলার রাষ্ট্রবাদের মুল কারণ মুসলমানদের থেকে হিন্দুদের রক্ষা করা না, বরং তথাকথিত অভিজাত মুসলিমদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা।
In 1902 in the “Imperial Gazetteer of India”, the following was written:
“…a Sayyid will marry a Shaikh’s daughter but will not give his daughter in return; and marriages between upper circle of soi-distant [sic] foreigners and the main body of Indian Muhammedans [sic] is generally reprobated..
বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মূলত “আত্রাফ বা আজলাফ” ও “আরজাল” বাঙ্গালি মুসলিমদের উত্থান হয়েছে। বাঙ্গালির মনোজগতে সেই পরিবর্তন সবচেয়ে ভালো বুঝেছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ। তারা সেই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে “আওয়ামী মুসলিম লীগ” থেকে “আওয়ামীলীগ” হয়েছে। সেই চেতনাকে ধারন করে আওয়ামীলীগ আত্রাফ মুসলিম বাঙ্গালির রাজনৈতিক ব্যনার হয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে যেসব “আশরাফ” মুসলিম আমাদের সাথে ছিলেন, তারা তথাকথিত শ্রেনীমর্যদা ত্যাগ করেই এসেছিলেন। ছয় দফার সময় আসতে আসতে বাঙ্গালির মনোজগৎ থেকে বর্ণবাদ বিতাড়িত হয়ে গিয়েছিল (ফখা চৌধুরীর মতো কিছু অতি আশরাফ ছাড়া)। বাঙ্গালি আত্মপরিচয়ে গর্বিত হয়েছিল, কনফিডেন্স ফিরে পেয়েছিল।
স্বাধীনতা সংগ্রামের ফলেই আজ ভারত-বাংলাদেশে-পাকিস্তানের মধ্যে তথাকথিত ছোট জাত থেকে কনভার্টেড (আমরা প্রায় সবাই) মুসলিমগন বাংলাদেশেই সবচেয়ে ভালো আছে, সবচেয়ে বেশি সমতা ও ন্যায্যতার সুবিধা ভোগ করছে। ইসলামের মুল স্পিরিট যদি সমতা আর ন্যায্যতা হয়, তবে বাংলাদেশ এখন এই তিনটি রাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইসলামিক রাষ্ট্র।
সুতরাং হিন্দুদের কাস্ট সিস্টেম নিয়ে হাসাহাসির কিছু নাই। ওই ময়লা একসময় আমাদের গায়েও ছিল (আমার কওমের ভাইদের গায়ে এখনো আছে)। সেই সাথে আসুন ভুলে না যাই যে সেখান থেকে আমাদের উত্তরণ হয়েছে কিভাবে, কোন পথে।
আর এই পথেই আমাদের বাংলাদেশের সংবিধানে এসেছে ধর্মনিরপেক্ষতা। যেসব কারণে আমরা স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছি, বা স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে আমাদের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তারই প্রতিফলন হয়েছে আমাদের সংবিধানের মূলনীতিতে। আমরা দেখেছি ধর্মের নামে কিভাবে শোষণ করা হয়। কিভাবে পরকালের কথা বলে ইহকালে হিসেবে কম দেয়া হয়। তাই আমাদের পিতৃপুরুষরা চান নি ভবিষ্যতে তাদের উত্তরপুরুষ দের এই ভোগান্তি হোক। তাই তারা দেই দরজা বন্ধ করতে চেয়েছেন “ধর্মনিরপেক্ষতা” দিয়ে।
সুতরাং বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্ম হীনতা মোটেই নয়, বরং ” ধর্মের নামে কোন শোষণ আমরা সইবো না”। ধর্মনিরপেক্ষতাকে বসানো হয়েছে পাহারাদার হিসেবে যেন ভবিষ্যতে কোন বকধার্মিক এসে ধর্মকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের মানুষকে শোষণ না করতে পারে।
এই ডকুমেন্টারিটিতে উঠে এসেছে ভারতে মুসলিম দের মধ্যে কাস্ট সিস্টেম এর বিভক্তি। ভারতে যারা তথাকথিত নিচু জাত, দেখুন তাদের বেদনা। এরা সবাই আমাদের মতো মানুষ। আমাদের মতোই তারা মহান আল্লাহ ও ইসলামে বিশ্বাস করে। ইসলাম যা শেখায় তাতে আমাদের সবার এক হবার কথা। কিন্তু হচ্ছে কি তাই? তথাকথিত আশরাফ আর আত্রাফদের মসজিদ আলাদা। এমনকি কবরস্থানও আলাদা। মসজিদে মেনে নিলেও বড়জোর কয়েক মিনিট।
এই ভিডিওটিতে বলা হয়েছে:
আপনারা নিশ্চয়ই নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকীকে চেনেন।
তিনি একবার বলেছিলেন, “আমার দাদী একটা ভিন্ন জাত থেকে এসেছিলেন, যাকে নিচু জাত বলা হতো। কিন্তু আজকেও (উচ্চজাতের) মানুষ আমাদের পুরোপুরি মেনে নেয়নি।”
তার নাতি হয়তো বলিউডের এক মস্ত বড় অভিনেতা হয়ে গেছেন, কিন্তু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি একটুও বদলায়নি।
এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মুসলিম মেট্রোমোনিয়াল (বিয়ের) ওয়েবসাইটের পেজ। এই পেজে আপনারা ‘জাত দিয়ে খোঁজার’ (Search by caste) একটি অপশন দেখতে পাবেন। যা আমাদের দেখায় যে, মুসলিম সমাজে সঙ্গী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও জাত জানাটা কতটা জরুরি।
এটি বিহারের মুজাফফরপুরের একটি মুসলিম মহল্লার রাস্তা। কিন্তু একটা রাস্তার মাঝখানে কেউ কেন দেয়াল তুলতে যাবে?
এই ছেলেটির নাম রাকেশ, সে মুম্বাইয়ের একটি বস্তিতে থাকে। মানুষ যখন তাকে নাম জিজ্ঞেস করতো, তার ভীষণ খারাপ লাগতো। কারণ সে দলিত (নিম্নবর্ণের হিন্দু) সম্প্রদায়ের ছিল। সে জাতপ্রথার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে একসময় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। আর এভাবেই রাকেশ হয়ে যায় ‘আলী’।
তবে আলী একাই নন। ২০২০ সালে তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটোরে ৪৩০ জনেরও বেশি দলিত মুসলিম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। (খবরের হেডলাইন: “কোয়েম্বাটোরে ৪৩০ জন দলিত এবং সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০০ দলিত ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।”)
তামিলনাড়ুর থেনি জেলায় বীরালক্ষ্মী নামের এক নারী ধর্ম বদলে হয়ে যান ‘রাহিমা’। একটি নিউজ ইন্টারভিউতে তিনি বলেছিলেন, তিনি জাতপ্রথার অত্যাচারে একদম অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলেন। তার এলাকায় ‘থেভার’ নামের একটি প্রভাবশালী উচ্চজাতের আধিপত্য ছিল, যারা তাদের খুব নির্যাতন করতো। একদিন সেই উচ্চজাতের লোকেরা তার স্বামীকে নির্মমভাবে মারধর করে। বীরালক্ষ্মী জানান, তার স্বামী যখন তাদের এক আত্মীয়কে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ফিরে এসে দেখেন প্রভাবশালী জাতের প্রায় ৩০ জন লোক তাদের সম্প্রদায়ের অন্য এক মানুষকে পেটাচ্ছে। তার স্বামী যখন এটি থামাতে যান, তখন ওই দল উল্টো তার স্বামীর ওপর হামলা করে। তারা তার মাথায় আঘাত করে এবং তিনি ১০ দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। আর এই কারণেই বীরালক্ষ্মী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন।
বিশ্বাস করা হয় যে, বিদায় হজের ভাষণে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছিলেন—ইসলামে কোনো আরবের ওপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কিংবা অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের বা কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। ইসলামে সবাই সমান।
কিন্তু এগুলো তো কেবল ট্রেইলার বা শুরু মাত্র। বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায়, ধর্ম পরিবর্তন করলেই মানুষের ভেতরের এই জাতপ্রথার মানসিকতা দূর হয়ে যায় না। কারণ আপনাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো জানেন না যে, মুসলিম সমাজেও এক ধরণের কাস্ট সিস্টেম বা জাতপ্রথা রয়েছে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এই সমস্যাটা নিয়ে কেউ কথা বলতে চায় না; না কোনো রাজনীতিবিদ, না কোনো নিউজ চ্যানেল। ‘দ্য কেরালা স্টোরি’ সিনেমাটি নিয়ে তো দেশজুড়ে কত আলোচনা হলো! (সংবাদ: “The Kerala Story সিনেমাটি একটি সন্ত্রাসী চক্রান্তের ওপর ভিত্তি করে তৈরি… স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও এখন এই সিনেমার প্রচার শুরু করেছেন…”)। কিন্তু সেইসব মানুষদের কী হবে, যারা জাতপ্রথার হাত থেকে বাঁচতে ধর্ম পরিবর্তন করেও আজ পর্যন্ত সেই একই বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন?
এই ভিডিওতে আমি ঠিক এই বিষয়টি নিয়েই কথা বলতে চাই। মুসলিম সমাজের কাস্ট সিস্টেম বা জাতপ্রথা আসলে কেমন? এবং এটি মুসলিম কমিউনিটির ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলছে? আমাদের সব সোর্স বা তথ্যসূত্র ডেসক্রিপশনে দেওয়া আছে, চাইলে আপনারা দেখে নিতে পারেন।
(সংবাদ: “হায়দরাবাদে বিজেপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠক শুরু হতে যাচ্ছে।”)
গত বছর হায়দরাবাদে বিজেপি একটি বড় হাই-প্রোফাইল মিটিং করেছিল। এই মিটিংয়ের উদ্দেশ্য ছিল আগামী রাজ্য নির্বাচনগুলোর জন্য কৌশল তৈরি করা। কিন্তু মিটিং শেষ হতেই মিডিয়া জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। (সংবাদ: “দলটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা মুসলিমদের সবচেয়ে অনগ্রসর অংশ—অর্থাৎ ‘পাশমান্দা’ মুসলমানদের কাছে পৌঁছাবে।”)
হঠাৎ করেই সবাই একটা শব্দ নিয়ে কথা বলতে শুরু করে—‘পাশমান্দা’। কারণ জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী মোদী নিজে তার দলকে নির্দেশ দিয়েছেন যাতে পাশমান্দা মুসলমানদের বিজেপির ভোটার বানানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এই শব্দটা শুনে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে যান। শুধু হিন্দুরা নন, খোদ মুসলমানরাও কনফিউজড হয়ে পড়েন। যেমন, দিল্লির বাসিন্দা আমির খানকে যখন পাশমান্দা নিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে তিনি জীবনে কোনোদিন ‘পাশমান্দা’ শব্দটাই শোনেননি!
এটা তো মাত্র একটা উদাহরণ। ওই মিটিংয়ের পর উত্তরপ্রদেশের বিজেপির সংখ্যালঘু মোর্চার প্রধান কুনওয়ার বাসিত আলীকে যখন এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনিও বলেন যে সবাই এই শব্দটা শুনে মাথা চুলকাচ্ছে!
তাহলে এই পাশমান্দা মানে কী? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদের আগে ভারতের মুসলিমদের কাস্ট সিস্টেমটা বুঝতে হবে।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরের ঘটনা, গুজরাটের গান্ধিধাম শহরে এক তরুণ সুন্দর একটা পাঠানি স্যুট পরে চা খাচ্ছিলেন। হঠাৎ বাইকে করে দুই ব্যক্তি এসে তার সাথে ঝগড়া শুরু করে। তারা ওই তরুণকে মারধর করে, তার কাপড় ছিঁড়ে ফেলে এবং গালিগালাজ করে। কেন? কারণ ওই তরুণটি তথাকথিত নিচু জাতের ছিলেন। আর ওই হামলাকারী দুজন ছিলেন ‘আশরাফ’ সম্প্রদায়ের, যাদের বিশ্বাস ছিল—একটি নিচু জাতের ছেলে কোনোভাবেই পাঠানি স্যুট পরতে পারে না!
আমরা ভারতীয় মুসলিমদের মূলত তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করতে পারি:
১. আশরাফ (Ashraf): ভারতীয় মুসলিম সমাজে এদের অবস্থান একদম চূড়ায় বা সবার ওপরে। অনেক গবেষক মনে করেন, আশরাফ সম্প্রদায় মূলত ভারতের মুসলিম বিজেতা বা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বংশধর। আশরাফদের মধ্যে আবার বেশ কিছু উপ-গ্রুপ আছে। যেমন:
সৈয়দ: যারা দাবি করেন তারা মহানবী (সা.)-এর পরিবার থেকে এসেছেন।
শেখ: যারা দাবি করেন তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবীদের বংশধর।
পাঠান: যারা মূলত আফগানিস্তান থেকে এসেছেন।
মোঘল: যারা মধ্য এশিয়া ও ইরান থেকে ভারতে এসেছিলেন।
মজার বিষয় হলো, আশরাফ সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা একসময় উচ্চবর্ণের হিন্দু ছিলেন এবং পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আপনারা হয়তো ভাবছেন, নিম্নবর্ণের হিন্দুরা তো জাতপ্রথার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মুসলমান হয়েছিলেন, কিন্তু উচ্চবর্ণের হিন্দুরা কেন ধর্ম পরিবর্তন করতে গেলেন?
যেমন এই ব্যক্তি হলেন ওস্তাদ আল্লাহদিয়া খান, একজন বিখ্যাত ভারতীয় ক্লাসিক্যাল সংগীতশিল্পী। মনে করা হয়, তিনিই ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ‘জয়পুর ঘরানা’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহদিয়া খানের পূর্বপুরুষরা ছিলেন উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ (আদ্য গৌড় ব্রাহ্মণ) সম্প্রদায়ের। একসময় দিল্লির অধীনে অনুপ শহর নামে একটি ছোট রাজ্য ছিল। সেই রাজ্যে একজন পুরোহিত-সংগীতশিল্পী ছিলেন, যিনি আল্লাহদিয়া খানের পূর্বপুরুষ। এক যুদ্ধের সময় দিল্লির সুলতান অনুপ শহরের রাজাকে বন্দী করেন। রাজাকে মুক্ত করতে আল্লাহদিয়া খানের সেই পূর্বপুরুষ দিল্লিতে গিয়ে সুলতানের দরবারে গান গেয়ে শোনান। সুলতান তার গানে মুগ্ধ হয়ে তাকে পুরস্কৃত করতে চান। পুরস্কার হিসেবে তিনি বন্দী রাজাকে মুক্ত করার অনুরোধ জানান। দিল্লির সুলতান রাজি হন, তবে একটি শর্তে—তাকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে হবে। এভাবেই আল্লাহদিয়া খানের পরিবার, যারা মূলত ব্রাহ্মণ ছিলেন, তারা মুসলমান হয়ে যান।
ইতিহাসে এমন ঘটনা বহুবার ঘটেছে। দিল্লির নিজামুদ্দিনে খান-ই-জাহান তেলঙ্গানির একটি মাজার আছে। তিনি অতীতে তেলঙ্গানার একজন উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ ছিলেন, যার নাম ছিল গন্নম নায়ক। কিন্তু ১৪শ শতাব্দীতে তিনি দিল্লিতে বন্দী হন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মালিক মকবুল নাম ধারণ করেন। এরপর তাকে বড় বড় পদ দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি ফিরোজ শাহ তুঘলকের সরকারের প্রধান উজির বা মন্ত্রী হন।
এই উচ্চবর্ণের হিন্দুরা যখন ইসলামে দীক্ষিত হন, তখন মুসলিম সমাজেও তাদের উচ্চ মর্যাদা বা ‘আশরাফ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। আজকের দিনে বেশিরভাগ আশরাফরাই সমাজের ধর্মীয় নেতা (উলামা), বড় জমিদার বা ব্যবসায়ী।
২. আজলাফ (Ajlaf): আশরাফদের ঠিক পরেই রয়েছে আজলাফ সম্প্রদায়। এরা মূলত তাঁতি, কৃষক বা ছোটখাটো ব্যবসার সাথে যুক্ত।
৩. আরজাল (Arzal): আজলাফদের নিচে রয়েছে আরজাল সম্প্রদায়। এরা হলেন সেইসব মুসলিম যাদের পূর্বপুরুষরা একসময় দলিত হিন্দু ছিলেন এবং কাস্ট সিস্টেমের বৈষম্য থেকে বাঁচতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। সমাজে আরজালদের পেশাকে খুব একটা সম্মান দেওয়া হয় না। যেমন—ধোপা, মুচি, নাপিত এবং কসাই।
হিন্দু ও মুসলিম সমাজের কাঠামো ভিন্ন, কিন্তু বিষয়টি সহজে বোঝার জন্য বলা যায়—মুসলিম সমাজের ‘আশরাফ’ হলো হিন্দু সমাজের ‘ব্রাহ্মণদের’ মতো, ‘আজলাফ’ হলো ‘বৈশ্য ও শূদ্রদের’ মতো এবং ‘আরজাল’ হলো ‘দলিতদের’ মতো। এই আজলাফ এবং আরজালদেরই যৌথভাবে বলা হয় ‘পাশমান্দা’।
১৯৯৮ সালে একজন সাবেক সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ আলী আনোয়ার আনসারী মুসলিম সমাজের এই বৈষম্য নিয়ে কথা বলার সময় প্রথম ‘পাশমান্দা মুসলিম’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তাই যখনই আপনারা ‘পাশমান্দা মুসলিম’ শব্দটা শুনবেন, এর অর্থ হলো মুসলিম সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অনগ্রসর অংশ, ঠিক যেমন দলিত বা আদিবাসী। পাশমান্দা আন্দোলনের কর্মীরা বলেন যে, ভারতের মোট মুসলিম জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশেরও বেশি মানুষ আসলে এই পাশমান্দা ভুক্ত।
এখন আপনাদের মনে হতে পারে এই কাস্ট সিস্টেমটা বোঝা খুব সহজ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, হিন্দু সমাজের মতোই মুসলিম সমাজের এই জাতপ্রথাও অত্যন্ত জটিল। ভারতের একেক রাজ্যে একেক রকম নিয়ম চলে।
যেমন কেরালা এবং তামিলনাড়ুতে এই উত্তর ভারতীয় আশরাফ-আজলাফ সিস্টেম পুরোপুরি কাজ করে না। অনেক গবেষক দাবি করেছেন যে তামিলনাড়ুর মুসলিমদের মধ্যে কাস্টের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য নেই। নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ম্যাটিসন মাইনস বলেন, তামিলনাড়ুর মুসলিমদের বিভাজনটা জাতের ভিত্তিতে নয়, বরং ক্লাসের (অর্থনৈতিক অবস্থা) ভিত্তিতে। যেমন আমাদের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালাম তামিলনাড়ুর মারাক্কায়ার (Marakkayar) সম্প্রদায় থেকে এসেছিলেন, যা সেখানে অত্যন্ত সম্মানিত। এই সম্প্রদায়টি উপকূলীয় অঞ্চলে থাকে এবং শত শত বছর ধরে ব্যবসার সাথে যুক্ত, তাই এদের টাকার কোনো অভাব নেই।
অন্যান্য গবেষকরা আবার বলেন, তামিলনাড়ুর বিভাজন জাত বা ক্লাস কোনোটার ওপরই নয়, বরং কে কোথা থেকে এসেছে তার ওপর ভিত্তি করে হয়। যেমন সবার ওপরে থাকে আরব্য মুসলিমরা, এরপর যারা তামিলনাড়ুর স্থানীয় বাসিন্দা থেকে মুসলিম হয়েছেন তারা এবং সবশেষে দাক্ষিণাত্য (Dakani) মুসলিমরা, যারা ভারতের অন্য অঞ্চল থেকে তামিলনাড়ুতে এসেছেন।
কেরালাতে আবার সম্পূর্ণ আলাদা ক্যাটাগরি রয়েছে। যেমন—থাঙ্গাল (Thangals), আরাবি, মালাবারি এবং ওসসান পুসালান (Ossan Pusalans)। থাঙ্গাল এবং আরাবিরা হলো উচ্চজাতের মুসলিম। কারণ বলা হয় থাঙ্গালরা মহানবী (সা.)-এর বংশধর এবং আরাবিরা আরবদের বংশধর। অন্যদিকে ওসসান ও পুসালান সম্প্রদায়, যারা মূলত নাপিত ও জেলে, তাদের অনগ্রসর বা নিচু জাত ধরা হয়।
আপনারা হয়তো ভাবছেন কেরালা, তামিলনাড়ু, উত্তরপ্রদেশ আর বিহারের মুসলিম সমাজের মধ্যে এত পার্থক্য কেন? এর কারণ হলো, ইসলাম ধর্মে কাস্ট সিস্টেমের কোনো স্থান নেই, তাই এর কোনো সুনির্দিষ্ট লিখিত নিয়মও নেই। উদাহরণস্বরূপ, কংগ্রেস নেতা ইউসুফ আহমদ আনসারি বলেছিলেন, “পাশমান্দা বলতে কোনো সম্প্রদায়ই নেই, আমি বিশ্বাসই করি না যে ইসলামে কোনো জাতপ্রথা থাকতে পারে।” কারণ ইসলামের মূল শিক্ষাই হলো সাম্য, জাত-পাত নয়।
ইসলামে জাতপ্রথা না থাকলেও, দুর্ভাগ্যবশত বাস্তব মুসলিম সমাজে এটা ভালোভাবেই টিকে আছে। মুসলিম সমাজের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, আপনি শুধু কারও পদবী (Surname) দেখে তার আসল জাত বুঝতে পারবেন না। কারণ অনেক কর্মজীবী বা নিম্নবর্গের পরিবার সমাজে সম্মান পাওয়ার জন্য তাদের পদবী পরিবর্তন করে আরবি পদবী গ্রহণ করেছে—যেমন আনসারী, সালমানী, কুরাইশী বা জুবাইরী। কারণ এগুলো অত্যন্ত সম্মানিত মুসলিম বংশের নাম। ‘খান’ পদবীর ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। মোঘল সম্রাটরা তাদের ভালো কাজের জন্য কর্মকর্তাদের ‘খান’ উপাধি দিতেন। ব্রিটিশরাও এই ঐতিহ্য ধরে রেখে মানুষকে ‘খান’, ‘খান বাহাদুর’ বা ‘খান সাহেব’ উপাধি দিতো। তাই কার আসল বংশ খান, আর কে উপাধি পেয়ে বা নিজে থেকে খান পদবী ব্যবহার করছে, তা বলা মুশকিল।
তবে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ভিন্নতা থাকলেও, সমাজবিজ্ঞানীরা এবং বিভিন্ন সরকারি কমিটি (যেমন ২০০৫ সালের সাচার কমিটি) মুসলিম সমাজকে বোঝার জন্য এই আশরাফ-আজলাফ-আরজাল বিভাজনটিকেই ব্যবহার করে থাকে। ইসলামে জাতপ্রথা নেই বলা হলেও, পাশমান্দা সম্প্রদায়ের মানুষরা আজও প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
আসুন সেই মুসলিম বিয়ের ওয়েবসাইটের পেজটি আরেকবার দেখি। এখানে ‘Search by Caste’ ফিচারটি দেখায় যে মুসলিম সমাজেও বিয়ের জন্য জাত জানাটা কতটা জরুরি। এই কারণেই আপনারা এখনো পেপারে এমন অনেক বিয়ের বিজ্ঞাপন পাবেন যেখানে নির্দিষ্ট জাতের পাত্র-পাত্রী চাওয়া হয়।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মার্কণ্ডেয় কাটজু একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছিলেন, যেখানে উত্তরপ্রদেশের বান্দা জেলার এক মুসলিম মেয়ে (যার পূর্বপুরুষ রাজপুত হিন্দু ছিল) এক দলিত হিন্দু ম্যাজিস্ট্রেটের প্রেমে পড়েন। ছেলেটি মেয়েটিকে বিয়ে করার জন্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু মেয়ের পরিবার ওই ম্যাজিস্ট্রেটকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে সে যদি বিয়ে করার চেষ্টা করে তবে তাকে মেরে ফেলা হবে। তারা বলেছিল—“তুমি ধর্ম বদলেছো ঠিকই, কিন্তু তোমার জাত তো বদলাতে পারোনি!” অর্থাৎ, আপনি ধর্ম বদলালেও সমাজ আপনাকে আপনার আগের জাত দিয়েই চিনবে।
বলিউডের নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকীও তার গ্রামের কথা বলতে গিয়ে আফসোস করেছিলেন যে, তিনি যতই সফল হোন না কেন, তার পরিবারকে আজও উচ্চজাতের লোকেরা পুরোপুরি গ্রহণ করেনি। এবং এই বৈষম্য শুধু বিয়ে বা গ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০১৯ সালের জুনে আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির (AMU) এক ছাত্রীর একটি ব্লগ নিয়ে মুসলিম সমাজে ব্যাপক তোলপাড় হয়েছিল। সেই ছাত্রীটি লিখেছিল, সে কলেজে পড়ার সময় কখনো কাউকে তার জাতের কথা বলেনি। কারণ তার এক শিডিউলড কাস্ট (তফসিলি জাত) থেকে আসা মুসলিম বান্ধবীকে উচ্চজাতের ছাত্র-ছাত্রীরা পুরোপুরি বর্জন বা এভয়েড করেছিল।
এবং এই জাতপ্রথা শুধু ছাত্রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, শিক্ষকরা পর্যন্ত ছাত্রদের জাত জিজ্ঞেস করতেন—”তোমার বাবা কী করেন? তার পদবী কী?” শিক্ষকরা মনে করতেন নিচু জাতের ছাত্ররা পড়াশোনায় সিরিয়াস হয় না। ছাত্র তো দূরের কথা, উচ্চজাতের প্রফেশনাল শিক্ষকরা নিচু জাতের সহকর্মী শিক্ষকদের সাথেও বৈষম্য করতেন। ওই ব্লগে আলিগড়ের প্রাক্তন ছাত্র আবদুল্লাহ মনসুর বলেছিলেন, কাস্ট সিস্টেমের বড় প্রমাণ হলো—আজ পর্যন্ত আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির কোনো ভাইস-চ্যান্সেলর কোনো ব্যাকওয়ার্ড বা অনগ্রসর মুসলিম গ্রুপ থেকে হননি।
অনেক সময় এই বৈষম্য চরম আকার ধারণ করে অস্পৃশ্যতায় রূপ নেয়। বিহারের মুজাফফরপুরের এই ছবিটা আবার দেখুন, যেখানে রাস্তার মাঝখানে আস্ত একটা দেয়াল তুলে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ এই মহল্লায় দুটি সম্প্রদায় থাকে—উচ্চজাতের শেখ এবং নিম্নজাতের আনসারী। এক রাতে এক আনসারী পরিবারে ধুমধাম করে বিয়ে হচ্ছিল। শেখদের এটা সহ্য হয়নি যে একজন আনসারী হয়ে সে কীভাবে শেখদের মতো রাজকীয় স্টাইলে বিয়ে করে! এই নিয়ে দুই পক্ষে মারামারি হয় এবং শেখরা রাস্তার মাঝখানে দেয়াল তুলে দেয়।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক দলিত মুসলিমদের উচ্চজাতের মুসলিমদের বিয়েতে দাওয়াত দেওয়া হয় না। দিলেও আলাদা বসিয়ে শেষে খেতে দেওয়া হয়, এমনকি তাদের থালা-বাসনও আলাদা রাখা হয়। মধ্যপ্রদেশ ও বিহারের অনেক এলাকায় এদের কবরস্থান পর্যন্ত আলাদা! এমনকি কেরালাতেও, ৩১ বছর বয়সী শিহাবের দুটি বড় হেয়ার সেলুন আছে, সে ভালো আয় করে। কিন্তু সে জানায়, এলাকার অনেক মৌলানা বা ইমাম আজও তার বাড়িতে খাবার খেতে চান না, কারণ শিহাব ‘ওসসান’ (নাপিত) কাস্টের ছেলে। টাকা থাকলেও তার জাতের পরিচয় ঢাকা যায় না।
রাজনৈতিকভাবেও পাশমান্দা মুসলিমদের অবস্থা করুণ। ২০০৪ সালে বিহারে যখন কিছু অনগ্রসর মুসলিম নেতা বিজেপিতে যোগ দেন, তখন সাংবাদিকরা স্থানীয় পাশমান্দা মুসলিমদের জিজ্ঞেস করলে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। রাজনীতিবিদ আলী আনোয়ার বলেন, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কোনো সংস্থাতেই অনগ্রসর মুসলিমদের সঠিক প্রতিনিধিত্ব নেই, সেখানে আশরাফ মুসলিমদেরই দাপট। গত ৫০ বছরের লোকসভা নির্বাচনের ডেটা দেখলে দেখা যায়—আশরাফ মুসলিমদের জনসংখ্যা মাত্র ২.১% হলেও তারা ৪.৫% সিট পেয়েছে। অন্যদিকে পাশমান্দা মুসলিমদের জনসংখ্যা ১১.৪% হওয়া সত্ত্বেও তারা মাত্র ০.৮% সিট পেয়েছে।
এই কারণেই পাশমান্দা কর্মীরা এখন ‘শিডিউলড কাস্ট’ (SC) বা দলিত স্ট্যাটাসের দাবি তুলছেন। ১৯৯০ সালে তারা ওবিসি (OBC) স্ট্যাটাস পেলেও এসসি স্ট্যাটাস পাননি, কারণ ১৯৫政策 অনুযায়ী কেবল হিন্দুরাই এসসি সুবিধা পাবে। ওবিসি-র কারণে তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিছুটা ছাড় পেলেও কোনো রাজনৈতিক আসন সংরক্ষণ বা প্রতিনিধিত্ব পান না।
ইতিহাসবিদরা বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর যখন আরবের কুরাইশ উপজাতিরা ইসলামে আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে, তখন থেকেই এই বিভাজনের সূচনা। এরপর ৭ম শতাব্দীতে ইসলাম যখন পারস্যে (ইরান) প্রবেশ করে, তখন প্রাচীন ইরানি সমাজের চার স্তরের কঠোর সামাজিক শ্রেণীবিভাগ মুসলিম সমাজের সাথে মিশে যায়। পরবর্তীতে ১৩শ শতাব্দীতে দিল্লির সুলতানদের মাধ্যমে যখন উত্তর ভারতে ইসলাম ছড়াতে শুরু করে, তখন নিম্নবর্ণের হিন্দুরা সাম্যের টানে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করলেও সমাজ তাদের আগের নিচু চোখেই দেখতে থাকে। সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ কেবল জাতের কারণে ৩৩ জন নিচু জাতের মুসলিমকে চাকরি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। আকবরও বংশমর্যাদা দেখে বিচার করতেন। এমনকি আলিগড়ের প্রতিষ্ঠাতা স্যার সৈয়দ আহমদ খানও নিম্নবর্ণের মুসলিমদের ‘low born’ বা নিচু জাতের বলে সম্বোধন করেছিলেন। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের যে ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট দেওয়া হতো, তাতে লেখা থাকতো ছাত্রটি কোনো ‘অভিজাত’ বা উচ্চ বংশের কি না। ২০০৫ সালের সাচার কমিটির রিপোর্টও প্রমাণ করেছে যে মুসলিম সমাজ কতটা বৈষম্যমূলক।
অধ্যাপক শফিউল্লাহ আনিস ঠিকই বলেছিলেন—”দুটো ইসলাম আছে। একটা থাকে আসমানে, আর অন্যটা জমিনে। আসমানের ইসলামে কোনো বৈষম্য নেই, কিন্তু জমিনের বাস্তব ইসলামটা কুসংস্কার আর বৈষম্যে ভরা।”
তাই আমাদের মানতে হবে যে সমস্যাটা সমাজে আছে। যেকোনো সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ হলো সেটাকে স্বীকার করা। মুসলিম সমাজ যেদিন এই সমস্যাটা মন থেকে স্বীকার করবে, সেদিনই এর সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।
আরও দেখুন:
