হিন্দুস্থানি ম্যানেজমেন্ট এপ্রোচ । উদ্যোগ, উদ্যোক্তা এবং লিডারশীপ । পেশা পরামর্শ সভা

আমরা যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করে বের হই, তারা মূলত গ্রিক-বিবলিকাল ফিলসফি বা পশ্চিমা লিনিয়ার ম্যানেজমেন্ট স্টাইল পড়ে বড় হয়েছি। সেখানে ম্যানেজমেন্ট মানেই ছিল এফিশিয়েন্সি, স্ট্রাকচার আর স্ট্যাটিসটিকস। শুরুর দিকে প্রাচ্যের বা অন্য কোনো দর্শনের ম্যানেজমেন্ট স্টাইল শুনলে কিছুটা অসংলগ্ন বা অবৈজ্ঞানিক মনে হতো। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক কর্পোরেট জগতে যে পটপরিবর্তন হচ্ছে, তা আমাদের বাধ্য করছে প্রাচ্যের দর্শন, বিশেষ করে ‘হিন্দুস্থানি’ এবং ‘চাইনিজ’ অ্যাপ্রোচ নিয়ে নতুন করে ভাবতে।

পিটার সেঞ্জ (Peter M. Senge) তাঁর বিখ্যাত বই ‘The Fifth Discipline’-এ প্রাচ্যের ব্যবস্থাপনা দর্শন, বিশেষ করে ভারতীয় ও চীনা সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত শক্তি নিয়ে অত্যন্ত দূরদর্শী আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন:

“My intuition is they will move somewhat together in very distinctive ways. But I think the thing is that China and India together have a common heritage. They both are deeply rooted in a sense of the wholeness of life. In the West, we have lost that. We have become experts in fragmenting the world, in thinking about the parts and losing the whole. My belief is that the re-emergence of China and India in the world is not just an economic event, but a cultural event that has the potential to bring back a way of thinking about the world as a whole, which is the essence of systems thinking.”

তার মানে বিশ্ব অর্থনীতিতে চীন ও ভারতের উত্থান কেবল জিডিপি বা বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধির বিষয় নয়, বরং এটি একটি গভীর সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ। পশ্চিমা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা চিন্তাধারা যেখানে পৃথিবীকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করে বিশ্লেষণ করে (Fragmenting), সেখানে ভারতীয় ও চীনা দর্শন জগতকে একটি অখণ্ড সত্তা বা ‘Wholeness’ হিসেবে দেখে। সেঞ্জ মনে করেন, এই অখণ্ড জীবনবোধই হলো ‘সিস্টেমস থিংকিং’ (Systems Thinking)-এর মূল নির্যাস, যা পশ্চিমা বিশ্ব অনেকটা হারিয়ে ফেলেছে। তাঁর মতে, ভারত ও চীন তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা বজায় রেখেও জীবন ও জগতকে সামগ্রিকভাবে দেখার এই সাধারণ উত্তরাধিকারের মাধ্যমে বিশ্ব ব্যবস্থাপনায় এক নতুন মাত্রা যোগ করবে, যা আধুনিক কর্পোরেট জগতের জটিল সমস্যা সমাধানে অপরিহার্য।

কেন হিন্দুস্থানি নেতৃত্বই এখন বিশ্বসেরা?

একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, মাইক্রোসফট (সত্য নাদেলা), গুগল (সুন্দর পিচাই), অ্যাডোবি (শান্তনু নারায়ণ), স্ট্যারবাকস (লক্ষ্মণ নরসিংহ) থেকে শুরু করে আইবিএম—সব জায়গার শীর্ষ নেতৃত্বে এখন ভারতীয় বা হিন্দুস্থানিদের জয়জয়কার। ইন্দ্রা নুই পেপসিকোর মতো দানবীয় কোম্পানিতে প্রায় এক যুগ দাপটের সাথে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এর পেছনে শুধু তাদের মেধা নেই, আছে তাদের সাংস্কৃতিক ডিএনএ। তারা কর্পোরেট কালচারের মধ্যেও তাদের শেকড়কে ধারণ করেন। ইন্দ্রা নুইয়ের মতো সফল নেত্রীও দিনশেষে ঘর ও সংসার সামলান, মায়ের হুকুম মেনে চলেন—যা পশ্চিমা ‘ইন্ডিভিজুয়ালিজম’ দর্শনের চেয়ে একদম আলাদা। এই যে আবেগ, পরিবার এবং কর্তব্যের মেলবন্ধন, এটাই হিন্দুস্থানি ম্যানেজমেন্টের শক্তির জায়গা।

দেবদূত পট্টনায়েকের - বিজনেস সূত্র
দেবদূত পট্টনায়েকের – বিজনেস সূত্র

দেবদূত পট্টনায়েক ও বিজনেস সূত্র: উদ্যোগ যখন যজ্ঞ

সম্প্রতি দেবদূত পট্টনায়েকের ‘বিজনেস সূত্র’ বইটি এই আদি দর্শনকে আধুনিক বিজনেসের সাথে দারুণভাবে যুক্ত করেছে। তিনি উদ্যোগ, উদ্যোক্তা এবং লিডারশিপকে হিন্দুস্থানি মিথলজির ‘কন্টেক্সট’-এ ফ্রেমবন্দি করেছেন। আগে আমরা কেবল শ্রীরাম বা শ্রীকৃষ্ণের কথা শুনতাম, কিন্তু পট্টনায়েক এই যাত্রাকে শুরু করেছেন ‘পরশুরাম’ থেকে এবং শেষ করেছেন ‘বুদ্ধ’ (কিংবা ‘কালকি’) অবতারের দর্শনে।

এখানে একটি প্রতিষ্ঠানকে দেখা হয় একটি ‘রাজ্য’ হিসেবে, আর উদ্যোক্তা হলেন সেই রাজ্যের ‘রাজা’। প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনের যাত্রাকে তুলনা করা হয়েছে ‘কাল’ বা সময়ের সাথে। এই দর্শনে ব্যবসা স্রেফ মুনাফা নয়, ব্যবসা হলো একটি ‘যজ্ঞ’

  • যজ্ঞের বিভাজন: বিনিয়োগ হলো এখানে ‘আহুতি’, এক্সটারনাল স্টেকহোল্ডাররা হলেন ‘দেবতা’, ম্যানেজমেন্ট টিম হলো ‘ঋত্বিকগণ’, আর প্রধান নির্বাহী বা উদ্যোক্তা হলেন ‘ব্রহ্মা’।
  • নীতি ও ধর্ম: প্রতিষ্ঠানের মূল আদর্শ বা প্রিন্সিপাল হলো ‘ধর্ম’, আর সেই ধর্মকে সুরক্ষা দেওয়ার কৌশল হলো ‘রুলস’।

অবতার ও অর্গানাইজেশনাল লাইফ সাইকেল

উদ্যোক্তার ভূমিকা সময়ের সাথে সাথে কীভাবে বিবর্তিত হবে, তা শ্রীবিষ্ণুর অবতারতত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যদিও মৎস্য, কূর্ম বা বরাহ অবতারের খণ্ড খণ্ড আলোচনা আসে, তবে একটি অর্গানাইজেশনের মূল জীবনচক্র শুরু হয় পরশুরাম থেকে।

১. শুরুর পর্যায় (পরশুরাম রোল): একটি নতুন উদ্যোগের শুরুতে উদ্যোক্তাকে হতে হয় পরশুরামের মতো। অত্যন্ত কঠোর, নিয়মনিষ্ঠ এবং লক্ষ্যভেদী। এ সময় ‘ধর্ম’ বা প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপনে কোনো আপস চলে না। তাকে হতে হয় ‘সলো ফাইটার’।

২. স্থায়িত্বের পর্যায় (শ্রীরাম রোল): প্রতিষ্ঠান যখন দাঁড়িয়ে যায় এবং একটি শৃঙ্খলায় আসে, তখন নেতার ভূমিকা হয় শ্রীরামের মতো। ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম’ হিসেবে তিনি নিজে নিয়ম মেনে চলেন এবং উদাহরণ তৈরির মাধ্যমে নেতৃত্ব দেন (Lead by Example)। এখানে সিস্টেমই শেষ কথা।

৩. বিস্তৃতি ও জটিলতার পর্যায় (শ্রীকৃষ্ণ রোল): যখন প্রতিষ্ঠান ম্যাচিউর হয়, পাবলিক শেয়ারহোল্ডার বা রেগুলেটরদের চাপ বাড়ে এবং সিস্টেমের ভেতরে জটিলতা বা দুর্নীতির বীজ প্রবেশ করে, তখন নেতার রোল হয় শ্রীকৃষ্ণের মতো। এখানে নেতা আর সম্মুখ সমরের যোদ্ধা নন, বরং তিনি একজন ‘মেন্টর’ বা ‘কোচ’। তিনি নিজে অস্ত্র ধরেন না (অপারেশনাল কাজ করেন না), বরং নতুন লিডারশিপ (অর্জুনদের) তৈরি করেন। তার কাজ হলো দূর থেকে রণকৌশল ঠিক করে দেওয়া এবং ধীরে ধীরে নিজেকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলা, যাতে তার অনুপস্থিতিতেও ‘ধর্ম’ বা প্রতিষ্ঠান অটুট থাকে।

পশ্চিমা ম্যানেজমেন্ট যেখানে মানুষকে ‘রিসোর্স’ বা যন্ত্রের অংশ মনে করে, হিন্দুস্থানি অ্যাপ্রোচ সেখানে মানুষকে তার বিশ্বাস, আবেগ এবং দায়িত্ববোধসহ গ্রহণ করে। এটি কেবল সংখ্যাতত্ত্বের লাভ-ক্ষতি নয়, বরং কর্ম এবং ফলের এক মহাজাগতিক ভারসাম্য। এই দর্শন আমাদের শেখায় যে, একজন সফল উদ্যোক্তা কেবল একটি কোম্পানির মালিক নন, তিনি একটি বৃহত্তর দর্শনের রক্ষক।

বিষয়টি অত্যন্ত গভীর এবং ইন্টারেস্টিং। আধুনিক পেশাদার জীবনে এই প্রাচীন সূত্রের প্রয়োগ নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে।

খুবই ইন্টারেস্টিং। কখনও সময় পেলে বিস্তারিত লিখব ….

 

আরও দেখুন: