পেশা পরামর্শ সভা [ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর কর্মসূচি]

আজকের তরুণ সমাজকে স্রেফ ডিগ্রির গণ্ডি থেকে বের করে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর জন্য তৈরি করতে সম্পূর্ণ নিজস্ব ভাবনায় একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। তাঁর হাত ধরে যাত্রা শুরু করেছে — ‘পেশা পরামর্শ সভা’ নামের একটি ডাইনামিক প্ল্যাটফর্ম।

এটি কেবল কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার জায়গা নয়; বরং তরুণদের বাস্তবমুখী পেশাদারী দিক-নির্দেশনা দেওয়া এবং ভবিষ্যতের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির উপযোগী করে গড়ে তোলার একটি সমন্বিত লড়াই। তরুণরা যাতে প্রযুক্তির এই যুগে পিছিয়ে না পড়ে, সেজন্য এই প্রকল্পের আওতায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বেশ কিছু যুগোপযোগী ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও নিয়মিত পরিচালনা করা হচ্ছে।

Table of Contents

পেশা পরামর্শ সভা

 

সুফি ফারুক এর পেশা পরামর্শ - ধোকড়াকোল ডিগ্রি কলেজ ৩০-১০-২০১৭

 

সুফি ফারুক এর পেশা পরামর্শ সভা – কী?

সহজ কথায়, ‘পেশা পরামর্শ সভা’ (Career Counselling Project) হলো তরুণদের ভবিষ্যৎ চেনার এবং নিজের ক্যারিয়ার লাইফকে গুছিয়ে নেওয়ার একটি অনন্য দিক-নির্দেশনামূলক প্ল্যাটফর্ম।

এর মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের শুধু চেনা গণ্ডির মধ্যে আটকে না রেখে—বর্তমান ও আগামীর বৈশ্বিক অর্থনীতি, দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তি এবং নতুন নতুন পেশার ধরন সম্পর্কে একদম স্পষ্ট একটা ধারণা দেওয়া। এখান থেকে তরুণরা কেবল মুখস্থ বা তাত্ত্বিক শিক্ষা পায় না, বরং কর্মক্ষেত্রের রুক্ষ বাস্তবতায় টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পেশাদারী দক্ষতা অর্জনের সঠিক গাইডলাইন পায়। এর পাশাপাশি, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর তাঁর সীমিত ব্যক্তিগত সামর্থ্যের মধ্যেই যতটুকু সম্ভব, তরুণদের জন্য সম্পূর্ণ ফ্রি প্রশিক্ষণ বা স্কিল ডেভেলপমেন্টের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছেন।

 

পেশা পরামর্শ সভা

 

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর বলেন—

“আমাদের বেকার তারুণ্য সঠিক দিক-নির্দেশনা পেলে ভালো কিছু করতে পারে তার নজির বহুবার প্রমাণ হয়েছে। আমরা তাই এই শিক্ষিত তরুণ সমাজকে দেশের মূল্যবান সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে ‘পেশা ও পরামর্শ সভা’ সভার কার্যক্রম পরিচালনা করে চলেছি।”

সুফি ফারুক এর পেশা পরামর্শ - ধোকড়াকোল ডিগ্রি কলেজ ৩০-১০-২০১৭

পেশা ও পরামর্শ সভার প্রেক্ষাপট ও যাত্রার ইতিহাস

এই দারুণ উদ্যোগের বীজ কিন্তু একদিনে বপন হয়নি। এর শুরুটা হয়েছিল তখন, যখন সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর নিজে পুরোদমে চাকরি করছিলেন। করপোরেট দুনিয়ায় কাজ করতে গিয়ে তিনি খুব গভীরভাবে একটা বিষয় উপলব্ধি করেন—আমাদের দেশের একজন শিক্ষার্থী যদি পড়াশোনা করার সময়ই স্রেফ সঠিক লক্ষ্যটা ঠিক করে সেই অনুযায়ী নিজেকে তৈরি করতে পারে, তবে তাকে পাস করার পর আর বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে হন্যে হয়ে ঘুরতে হবে না।

তরুণদের প্রতি এই টান থেকেই তিনি নিজের অফিসের কাজ শেষে এবং ছুটির দিনগুলোতে চাকরিপ্রার্থী তরুণ-তরুণীদের ডেকে ক্যারিয়ার গড়ার নানা পরামর্শ দিতে শুরু করেন। পরবর্তীতে এই ব্যক্তিগত উদ্যোগটিকেই তিনি কুষ্টিয়ার কুমারখালী-খোকসা অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া তরুণদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ প্রজেক্ট হিসেবে চালু করেন। ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে, একদম গ্রামের সাধারণ তরুণদেরও কীভাবে বিশ্বমানের দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তোলা যায়—সেটাই ছিল এই যাত্রার মূল উদ্দেশ্য।

 

বাগুলাট ইউনিয়নের শেখ পাড়া গ্রামে সুফি ফারুক-এর পেশা পরামর্শ সভার ফ্রি দর্জি প্রশিক্ষণের আরও একটি ব্যাচ উদ্বোধন

 

পেশা ও পরামর্শ সভা কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

এই পুরো আয়োজনের উদ্দেশ্য কিন্তু স্রেফ কিছু গৎবাঁধা উপদেশ দেওয়া নয়; এর লক্ষ্য বেশ বহুমুখী এবং দূরদর্শী:

১. আগামীর বিশ্ব চেনা ও বদলে যাওয়া পেশার রোডম্যাপ

২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি যে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে, তার জন্য আমাদের তরুণদের মানসিকভাবে তৈরি করা এই প্রজেক্টের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আগামীর পৃথিবীতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) দাপটে কোন কোন নতুন পেশা তৈরি হবে, আর কোন কোন চেনা চাকরি চিরতরে হারিয়ে যাবে—সেই কঠিন বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জগুলো তরুণদের সামনে একদম সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়।

তবে সুফি ফারুক এখানে কেবল সমস্যার কথা বলেই হাত গুটিয়ে নেন না; বরং এই বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে কীভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখা যায় এবং নিজের ক্যারিয়ারকে সুরক্ষিত করা যায়, তার একটা স্পষ্ট ‘রোডম্যাপ’ বা পথচিত্র তরুণদের হাতে ধরিয়ে দেন। ফলে তরুণরা খুব সহজেই বুঝতে পারে, আগামীর সম্ভাবনার দরজা খুলতে তাদের ঠিক কোন পথে হাঁটতে হবে।

২. হুজুগহীন বাস্তবমুখী উদ্যোক্তা উন্নয়ন দর্শন

উদ্যোক্তা হওয়া বা স্টার্টআপ খোলার ক্ষেত্রে সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এক চরম বাস্তববাদী ও সততাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি লালন করেন। তিনি স্পষ্ট মনে করেন—স্রেফ হুজুগে পড়ে বা আবেগের বশে সবার উদ্যোক্তা হতে যাওয়া উচিত নয়। যাদের মধ্যে জন্মগত নেতৃত্বগুণ, দক্ষ ম্যানেজমেন্টের ক্ষমতা, তীব্র মানসিক চাপ সহ্য করার দেওয়াল আর ঝুঁকি নেওয়ার সাহস আছে—মূলত তাদেরই ব্যবসার মাঠে নামতে উৎসাহিত করা হয়।

আর যাদের এই গুণগুলো এখনো তৈরি হয়নি, তাদের তিনি শুরুতেই উদ্যোক্তা না হয়ে প্রথমে একজন দক্ষ ও সফল ‘পেশাজীবী’ বা চাকুরিজীবী হওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ, একটি সফল করপোরেট ক্যারিয়ারের বাস্তব অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে একটা টেকসই ও সফল ব্যবসা দাঁড় করানোর সবচেয়ে মজবুত ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

৩. প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও গ্লোবাল জব মার্কেট জয়

আগামী দিনের বিশ্ব অর্থনীতি চলবে সম্পূর্ণভাবে প্রযুক্তি আর জ্ঞানের জোরে। এই কঠোর বাস্তবতাকে মাথায় রেখে তরুণদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আইটি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির উপযোগী কারিগরি দক্ষতায় পারদর্শী করে তোলা এই কর্মসূচির অন্যতম মূল স্তম্ভ। বর্তমান ও ভবিষ্যতের বৈশ্বিক জব মার্কেটে ঠিক যে ধরণের ‘স্কিল’ বা মেধার চাহিদা সবচেয়ে বেশি, সেই অনুযায়ী এখানে গাইডলাইন ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়—যেন আমাদের গ্রামীণ তরুণরা কেবল স্থানীয় বাজারে নয়, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাতেও বুক ফুলিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারে।

৪. ‘জয় বাংলা’: একটি নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন বাস্তবায়ন

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকরের কাছে এই কর্মসূচির চূড়ান্ত সাফল্য কেবল কতজন চাকরি পেল সেই সংখ্যায় গোনা হয় না; বরং এর মূল লক্ষ্য একটি আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ করা। তিনি কুমারখালী-খোকসা অঞ্চলকে কেন্দ্র করে এমন একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতে চান, যারা কেবল শিক্ষিত আর দক্ষই হবে না—স্বভাবে হবে অত্যন্ত রুচিশীল, মার্জিত এবং মানবিক।

এই কর্মক্ষম, বিবেকবান ও আত্মমর্যাদাশীল প্রজন্মের জয়যাত্রাকেই সুফি ফারুক তাঁর ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক দর্শনের শ্রেষ্ঠ প্রতিফলন বলে মনে করেন। মূলত একটি স্বাবলম্বী জাতি গঠনের এই সামগ্রিক স্বপ্নটাকেই তিনি তাঁর নিজের জীবনের আসল ‘জয় বাংলা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন।

 

সুফি ফারুক এর পেশা পরামর্শ - ধোকড়াকোল ডিগ্রি কলেজ ৩০-১০-২০১৭

যেভাবে পরিচালিত হয় পেশা ও পরামর্শ সভা (কার্যপদ্ধতি):

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকরের এই ‘পেশা পরামর্শ সভা’-র পুরো অপারেশনাল প্রসেস বা কাজের ধরনটা অত্যন্ত পরিকল্পিত। একজন সাধারণ শিক্ষার্থীকে ধাপে ধাপে দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তোলার সেই ধারাবাহিক পদ্ধতিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. নিবন্ধন ও তথ্য সংগ্রহ: একদম তৃণমূলের মেধা অন্বেষণ

পেশা পরামর্শ সভার মূল কাজটাই শুরু হয় সরাসরি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর মাধ্যমে। এই প্রজেক্টের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন গ্রাম, পাড়া-মহল্লা আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে তরুণদের সাথে সরাসরি কথা বলেন। সেখানে ক্যারিয়ার নিয়ে প্রাথমিক আড্ডার পাশাপাশি আগ্রহীদের মাঝে নিবন্ধন ফরম বিতরণ করা হয়। এই ফরমগুলো থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী ডাটাবেজ তৈরি করা হয়—যা পরবর্তীতে প্রতিটি তরুণের ব্যক্তিগত প্রোফাইল অনুযায়ী সঠিক গাইডলাইন দিতে সাহায্য করে। এটি কেবল স্রেফ নাম-ঠিকানা সংগ্রহ নয়, বরং প্রান্তিক পর্যায়ের লুকিয়ে থাকা মেধা খুঁজে বের করার প্রথম ধাপ।

২. পরামর্শ সভার আয়োজন ও প্রাথমিক ক্যারিয়ার কোচিং

নিবন্ধিত তরুণ-তরুণীদের নিয়ে এরপর একটি নির্দিষ্ট তারিখে ‘পেশা পরামর্শ সভা’ বা ক্যারিয়ার কোচিং সেশনের আয়োজন করা হয়। এই ক্লাসে পেশা পরামর্শ সভার মূল ভাবনা ও জীবনের লক্ষ্য নিয়ে বিস্তারিত আড্ডা ও আলোচনা হয়। ক্যারিয়ারের সাথে জীবনের সম্পর্কের গভীরতা কতটুকু, তা এখানে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলা হয়। অংশগ্রহণকারীরা আগামীর বৈশ্বিক ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা, সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ এবং কীভাবে নিজেকে সামনের সারিতে রাখা যায়, তার একটা ক্রিস্টাল ক্লিয়ার বা পরিষ্কার ধারণা পায়। এছাড়া নিজের শক্তি ও দুর্বলতা চিনে কীভাবে নিজেকে নিজে মূল্যায়ন (Self-assessment) করতে হয়, সেই পাঠও দেওয়া হয় এখানে।

৩. ক্যারিয়ার অ্যাসেসমেন্ট: মেধা ও আগ্রহের নিখুঁত মেলবন্ধন

পরামর্শ সভার পরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো—অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিগত দক্ষতা ও আগ্রহ মেপে দেখা বা ‘ক্যারিয়ার অ্যাসেসমেন্ট’। প্রতিটি তরুণের মেধা ও ঝোঁক কিন্তু এক নয়; কেউ হয়তো প্রযুক্তিতে দারুণ, কেউ সৃজনশীল কাজে উস্তাদ, আবার কেউবা ম্যানেজমেন্টে পারদর্শী। এই ধাপে অভিজ্ঞ কাউন্সেলরদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক ও কারিগরি দক্ষতা যাচাই করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো—একজন তরুণকে তার ভেতরের সহজাত গুণের সাথে মিল রেখে সঠিক পেশা বেছে নিতে সাহায্য করা, যাতে সে কর্মজীবনে সহজে ও সর্বোচ্চ সফল হতে পারে।

৪. ফ্রি প্রশিক্ষণ ও স্কলারশিপ: দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে চূড়ান্ত বিনিয়োগ

অ্যাসেসমেন্ট বা যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর শুরু হয় আসল অ্যাকশন। যার ঠিক যে ধরণের কারিগরি বা পেশাদারী দক্ষতা দরকার, তাকে এই প্রজেক্টের নিজস্ব ‘ফ্রি কোর্স’গুলোতে (যেমন: কম্পিউটার, আইটি, দর্জি বা বিউটিশিয়ান প্রশিক্ষণ) সরাসরি যুক্ত করে দেওয়া হয়।

এর বাইরেও যদি কোনো অতি মেধাবী শিক্ষার্থীর উচ্চতর বা বিশেষায়িত কোনো প্রশিক্ষণের দরকার হয় এবং তার আর্থিক টানাপোড়েন থাকে, তবে সুফি ফারুক তাঁর এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন নামী প্রতিষ্ঠান থেকে সেই ট্রেনিং নেওয়ার জন্য স্কলারশিপ বা বৃত্তির ব্যবস্থা করে দেন। মূলত এই ধাপেই একজন সম্ভাবনাময় তরুণ প্রকৃত অর্থে বাজারের চাহিদাসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত হয়।

সুফি ফারুক এর পেশা পরামর্শ - ধোকড়াকোল ডিগ্রি কলেজ ৩০-১০-২০১৭

 

প্রধান সেবাসমূহ ও প্রশিক্ষণের বিষয়াবলী

‘পেশা পরামর্শ সভা’ কিন্তু স্রেফ কিছু গৎবাঁধা তথ্যের আদান-প্রদান নয়; এটি একজন তরুণকে শূন্য থেকে একজন পুরোদস্তুর পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তোলার একটি মনস্তাত্ত্বিক ও কারিগরি রূপান্তর প্রক্রিয়া। এর মূল সেবাকে আমরা ৫টি প্রধান ভাগে ভাগ করতে পারি:

১. পেশাদারিত্বের প্রাথমিক ও মৌলিক মানসিক প্রস্তুতি (Foundation & Motivation)

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন—সঠিক মানসিক প্রস্তুতি আর মোটিভেশন ছাড়া দুনিয়ার কোনো কারিগরি শিক্ষাই কাজে আসে না। তাই এই কর্মসূচির শুরুতেই একজন তরুণের মাইন্ডসেট এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে সে প্রতিদিন সকালে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে উঠে কাজে যাওয়ার বেসিক শৃঙ্খলা (Discipline) রপ্ত করতে পারে।

তাকে শেখানো হয় নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী সঠিক ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো না করে সময় দিতে এবং সেই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ অত্যন্ত মন দিয়ে গ্রহণ করতে। প্রশিক্ষণ চলাকালীন সময়েই ওই পেশার বাস্তব দুনিয়া সম্পর্কে আইডিয়া নিতে অভিজ্ঞ সিনিয়রদের সাথে নেটওয়ার্কিং করার ট্রিকস শেখানো হয়।

সবচেয়ে বড় কথা—ইন্টারভিউ বোর্ডে একবার-দুবার রিজেক্ট বা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ভেঙে না পড়ে বারবার চেষ্টা করার ধৈর্য এবং যেকোনো নেতিবাচক পরিবেশেও পজিটিভ থেকে সমস্যার বদলে সমাধানের দিকে নজর দেওয়ার ‘ক্যান-ডু’ (Can-do) মানসিকতা তৈরি করা হয় এখানে। এই অদম্য শেখার আগ্রহ আর প্রতিকূলতা জয়ের মানসিক দৃঢ়তা না থাকলে প্রফেশনাল লাইফে টেকাই সম্ভব নয়—এই রুক্ষ সত্যটিই সবার আগে তরুণদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

২. পেশা পরিচিতি ও ক্যারিয়ার ক্যাটালগ (Career Catalog)

মানসিক প্রস্তুতির পর দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হলো—নিজের যোগ্যতার সাথে মিল রেখে সঠিক পথটি চিনে নেওয়া। আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই জানে না কোন পেশার আসল কাজের ধরন কেমন বা সেখানে প্রমোশন ও ভবিষ্যৎ কেমন। এই ধোঁয়াশা দূর করতে ‘পেশা পরামর্শ সভা’র রয়েছে একটি চমৎকার ‘ক্যারিয়ার ক্যাটালগ’

এখানে বর্তমান যুগের সব ধরণের প্রথাগত ও আধুনিক পেশার কাজের পরিধি, প্রয়োজনীয় স্কিল এবং দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ নিয়ে একদম ক্রিস্টাল ক্লিয়ার বা স্বচ্ছ ধারণা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের এই ক্যাটালগটি ধরে ধরে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তারা নিজেদের ভালোলাগা আর মানসিক শক্তির সাথে মিলিয়ে একদম সঠিক গোল বা লক্ষ্যটি সেট করতে পারে।

৩. কর্মসংস্থান যোগ্যতা বা ইমপ্লয়েবিলিটি (Employability)

সঠিক ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার পর একজন তরুণকে সরাসরি চাকুরির বাজারের উপযোগী বা ‘ইমপ্লয়েবল’ করে তোলা হয়। এই ধাপে তাকে শেখানো হয় কীভাবে একটি আধুনিক ও ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডের জীবনবৃত্তান্ত (CV) তৈরি করতে হয়—যা এক নজরেই নিয়োগকর্তার নজর কাড়বে।

এর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি করপোরেট শিষ্টাচার (Corporate Etiquette) এবং পেশাদার আচরণের খুঁটিনাটি বিষয়ে নিবিড় গাইডলাইন দেওয়া হয়। এই স্তরের মূল উদ্দেশ্য হলো—একজন প্রার্থীকে ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে দাঁড়ানোর আগেই একজন স্মার্ট, আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল কর্মী হিসেবে তৈরি করা।

৪. কারিগরি প্রশিক্ষণ ও উচ্চতর শিক্ষা সহায়তা

দক্ষতা অর্জনের এই পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় হাতে-কলমে কারিগরি প্রশিক্ষণ। বর্তমান যুগের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন ফ্রি কম্পিউটার ও আইটি প্রশিক্ষণ, নারীদের স্বাবলম্বী করতে দর্জি প্রশিক্ষণ এবং প্রফেশনাল বিউটিশিয়ান কোর্স এখানে নিয়মিত পরিচালনা করা হয়।

তবে কেবল প্রাথমিক শিক্ষাতেই এই প্রজেক্ট থেমে থাকে না; যাদের আরও অ্যাডভান্সড বা উচ্চতর প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়, তাদের উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সঠিক দিক-নির্দেশনা ও রেফারেন্স দেওয়া হয়। মেধাবী ও কঠোর পরিশ্রমী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সম্ভব হলে বিভিন্ন নামী ইনস্টিটিউট থেকে উন্নত প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য স্কলারশিপ বা বৃত্তির ব্যবস্থাও করা হয়।

৫. বিশেষজ্ঞ মেন্টরশিপ ও এইচআরএম (HRM) প্রশিক্ষণ

প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি শেষে চূড়ান্ত পর্যায়ে বিভিন্ন খাতের সফল কর্পোরেট লিডার এবং অভিজ্ঞ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা (HRM) বিশেষজ্ঞরা সরাসরি মেন্টর হিসেবে তরুণদের গাইড করেন। তারা একদম প্র্যাক্টিক্যালি শেখান কীভাবে স্মার্টলি চাকুরি খুঁজতে হয়, অনলাইনে ও অফলাইনে আবেদনের আধুনিক পদ্ধতিগুলো কী এবং ইন্টারভিউ বোর্ডে কঠিন বা ট্রিকি পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও কীভাবে নিজের বেস্ট আউটপুট দিয়ে আসতে হয়। অভিজ্ঞ মেন্টরদের এই সরাসরি মেন্টরিং একজন নবীন চাকরিপ্রার্থীর জন্য পেশাদার জগতের এক অদৃশ্য চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে, যা তাকে হাজার হাজার প্রতিযোগীর ভিড়ে এক ঝটকায় আলাদা করে তোলে।

সুফি ফারুক এর পেশা পরামর্শ - ধোকড়াকোল ডিগ্রি কলেজ ৩০-১০-২০১৭

সাফল্য ও প্রভাব: রূপান্তরের এক অনন্য খতিয়ান

‘পেশা পরামর্শ সভা’ আজ আর কেবল কাগজের কলমে থাকা কোনো ছোটখাটো প্রজেক্ট নয়; এটি এখন কুষ্টিয়ার কুমারখালী-খোকসা অঞ্চলের একটি বিশাল সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। এই উদ্যোগের আসল সাফল্য ও প্রভাব কতটা গভীর, তা এর কয়েকটি দিক দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যায়:

১. বিশাল সুবিধাভোগী সংখ্যা ও মাঠপর্যায়ের গণজোয়ার

এই প্ল্যাটফর্মের সাফল্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে এর সুবিধাভোগীদের দিকে তাকালে। শুরুর দিন থেকে আজ পর্যন্ত কুষ্টিয়ার কুমারখালী-খোকসা অঞ্চল ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার ১৫,০০০-এরও বেশি তরুণ-তরুণী এবং গৃহিণী এই প্ল্যাটফর্ম থেকে সরাসরি ক্যারিয়ার গাইডলাইন, কাউন্সেলিং ও ফ্রি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এই বিপুল সংখ্যক মানুষ এখন আর স্রেফ সনাতন সনদের কাগুজে শিক্ষিত নন; বরং তাঁরা আধুনিক কর্মক্ষেত্রের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার মতো মানসিকভাবে প্রস্তুত এক একজন আত্মবিশ্বাসী যোদ্ধা। তৃণমূল পর্যায়ের এই ব্যাপক সাড়া প্রমাণ করে যে—একটু সঠিক ও বাস্তবমুখী দিক-নির্দেশনার জন্য আমাদের তরুণ সমাজ কতটা তৃষ্ণার্ত ছিল।

২. সরাসরি কর্মসংস্থান ও দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি

এই কর্মসূচির সবথেকে দৃশ্যমান এবং আনন্দের সাফল্য হলো এর মাধ্যমে তৈরি হওয়া হাজারো তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান। অসংখ্য তরুণ এখান থেকে সঠিক গাইডলাইন, মানসিক জোর এবং ফ্রি কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়ে বর্তমানে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সম্মানজনক পেশায় দাপটের সাথে কাজ করছেন।

উদাহরণস্বরূপ—এই প্রজেক্টের সফল প্রশিক্ষণার্থী রাকিবুল, জাহিদুল ও মানিক-এর মতো তরুণেরা আজ আর বেকারত্বের অভিশাপ ও হতাশা নিয়ে দিন পার করছেন না। তাঁরা দেশের কোনো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে ভালো পদে কাজ করছেন, অথবা ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি খাতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে নিয়েছেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তৈরি হওয়া দক্ষ পেশাজীবীরা আজ কেবল নিজেদের সংসার চালাচ্ছেন না, বরং দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে জাতীয় অর্থনীতিতেও অবদান রাখছেন।

৩. সুদূরপ্রসারী সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন

একটি তরুণ সমাজ যদি বেকারত্বের গ্লানি ঝেড়ে ফেলে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে, তবে পুরো এলাকার অর্থনৈতিক চেহারা বদলে যেতে বাধ্য। ‘পেশা পরামর্শ সভা’র হাত ধরে কুমারখালী-খোকসা অঞ্চলে ঠিক এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনটাই শুরু হয়েছে।

যে শিক্ষিত যুবকেরা একসময় দিশেহারা হয়ে চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়ে বা মোবাইল স্ক্রল করে কর্মহীন সময় পার করত, তাদের হাতে এখন ল্যাপটপ বা কারিগরি যন্ত্রপাতি। তারা ঘরে বসেই পরিবারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনছে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে দারিদ্র্য দূর হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক অপরাধ ও মাদকের মতো মরণব্যাধি এক ধাক্কায় কমে গেছে এবং এলাকায় একটা চমৎকার ‘পেশাদার বা প্রফেশনাল সংস্কৃতি’ গড়ে উঠেছে। প্রতিটি ঘরে অন্তত একজন করে দক্ষ উপার্জনক্ষম মানুষ তৈরি করার যে স্বপ্ন সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর দেখেছিলেন, তা আজ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে—যা পুরো এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মানকে বদলে দিচ্ছে।

খোকসা উপজেলার, রমানাথপুর গ্রামের রমানাথপুর স্কুল এন্ড কলেজে " সুফি ফারুক এর পেশা পরামর্শ সভা" অনুষ্ঠিত (০৩.১০.২০১৯)

আর্থিক যোগান ও দর্শন

‘পেশা পরামর্শ সভা’র সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক ও ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হলো এর আর্থিক স্বনির্ভরতা। কোনো প্রকার সরকারি অনুদান কিংবা বিদেশি এনজিওর ফান্ডিং ছাড়াই এই বিশাল কর্মযজ্ঞ দিনের পর দিন নীরবে পরিচালিত হচ্ছে একদল নিবেদিতপ্রাণ মানুষের ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।

এই প্রজেক্টের প্রধান আর্থিক জোগানদাতা হলেন স্বয়ং সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর, তাঁর সহধর্মিণী আজিজা আহমেদ পলা এবং তাঁদের একঝাঁক ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধব ও কয়েকটি সহযোগী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। এই উদ্যোগটি একটি দারুণ উদাহরণ যে—নিজের জন্মভূমি আর দেশের তরুণদের প্রতি যদি খাঁটি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা থাকে, তবে ব্যক্তিগত উদ্যোগেও সমাজে এত বড় একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। ২০২১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এটি সম্পূর্ণভাবে তাঁদের নিজস্ব পকেটের অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছে, যা এই প্রজেক্টকে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও আত্মনির্ভরশীল মডেলে পরিণত করেছে।

এই কর্মসূচির মূল দর্শনটাই হলো—দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে একটি স্বাবলম্বী ও মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানো জাতি গঠন করা। আর ঠিক এই কারণেই ‘পেশা পরামর্শ সভা’র প্রতিটি সেবা—মানসিক প্রস্তুতি থেকে শুরু করে কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং বিশেষজ্ঞদের মেন্টরশিপ—শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (Free) দেওয়া হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন—স্রেফ টাকার অভাবে যেন আমাদের কোনো তরুণের ভেতরের প্রতিভা বা সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট না হয়ে যায়। এই পুরো আয়োজনটি মূলত তাঁর পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ‘নিঃস্বার্থ উপহার’। প্রথাগত বাণিজ্যিক বা লাভ-ক্ষতির হিসেবের বাইরে গিয়ে কেবল একটি দক্ষ, কর্মক্ষম ও মর্যাদাবান নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার যে ব্রত তিনি নিয়েছেন, এই কর্মসূচির প্রতিটি পরতে পরতে সেই উদার ও মানবিক দর্শনেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

সুফি ফারুক এর পেশা পরামর্শ সভা'র ফ্রি কম্পিউটার প্রশিক্ষণের সফলতা। রাকিবুল ইসলাম, পিতা জনাব নিজাম উদ্দিন, শিলাইদহ ইউনিয়নের মাজগ্রাম।

বর্তমানের চ্যালেঞ্জ ও ‘ক্যারিয়ার ক্যাটালগ’: আগামীর পেশা ও প্রস্তুতি

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির অভাবনীয় প্রভাবে ক্যারিয়ারের চিরাচরিত ধরনগুলো খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে অনেক প্রথাগত চাকরি বিলুপ্ত হয়ে গেলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আর অটোমেশনের হাত ধরে তৈরি হচ্ছে অসংখ্য নতুন, আধুনিক ও অপ্রথাগত কর্মসংস্থান। সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এই পরিবর্তনকে কেবল একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেন না; বরং একে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য বিশ্বজয়ের এক অবারিত ‘সুযোগ’ হিসেবে গ্রহণ করার পরামর্শ দেন।

তাঁর স্পষ্ট কথা—ঠিক সময়ে নিজেকে প্রযুক্তিবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় আমাদের দেশের তরুণরাই সবার সামনে থাকবে। আর এই রূপান্তরের সাথে তরুণদের খাপ খাইয়ে নিতেই ‘পেশা পরামর্শ সভা’ তাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত ও কারিগরিভাবে দক্ষ করে তোলার কাজটা করে যাচ্ছে।

আমাদের তরুণ প্রজন্ম যেন কেবল বিসিএস বা গতানুগতিক চাকুরির মোহে অন্ধ হয়ে আটকে না থাকে, বরং আধুনিক বিশ্বের চাহিদাসম্পন্ন পেশাগুলোতেও নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখতে পারে—সেজন্য এই প্রকল্পের অধীনে তৈরি করা হয়েছে একটি সমৃদ্ধ ও তথ্যবহুল ‘ক্যারিয়ার ক্যাটালগ’ (Career Catalog)। এই ক্যাটালগের মাধ্যমে ‘লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং’, ‘ডেটা সায়েন্স’, ‘ব্লক চেইন’ কিংবা ‘ডিজিটাল মার্কেটিং’-এর মতো উচ্চ সম্ভাবনাময় ও আধুনিক পেশাগুলোর ওপর নিয়মিত বিস্তারিত ‘পেশা পরিচিতি’ ও গবেষণাধর্মী আর্টিকেল প্রকাশ করা হয়।

এখানে প্রতিটি পেশার আসল কাজের ধরন, কী কী স্কিল বা দক্ষতা প্রয়োজন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা কেমন—সে সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের একদম পরিষ্কার একটা ধারণা দেওয়া হয়। ফলে তারা খুব সহজেই নিজেদের মেধা আর বৈশ্বিক চাহিদার মেলবন্ধন ঘটিয়ে একটি যুগোপযোগী ক্যারিয়ার বেছে নিতে পারছে।

২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার যে জাতীয় লক্ষ্য রয়েছে, তার মূল চাবিকাঠিই হলো একটি ‘স্মার্ট ও দক্ষ মানবসম্পদ’। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ‘পেশা পরামর্শ সভা’ নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সেমিনার, বিশেষজ্ঞ টক-শো এবং নিবিড় কর্মশালার আয়োজন করে থাকে। এসব আয়োজনের মূল উদ্দেশ্যই হলো—গ্রাম ও মফস্বল পর্যায়ের সাধারণ তরুণদের বিশ্বমানের দক্ষতায় বলীয়ান করা। আগামীর জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির উপযোগী একজন দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য ঠিক কী ধরণের প্রস্তুতি নেওয়া দরকার, তা এই কর্মসূচির মাধ্যমে একদম হাতে-কলমে শেখানো হয়। মূলত একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করতেই এই কর্মসূচি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

প্রকল্প ” পেশা পরামর্শ সভা” – কী, কেন, কিভাবে?

ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা: স্মার্ট প্রজন্ম ও সমৃদ্ধ আগামীর রূপরেখা

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকরের এই ‘পেশা পরামর্শ সভা’ কেবল বর্তমানের কিছু কাজ নিয়েই মগ্ন নয়; বরং আগামীর একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য এর রয়েছে সুদূরপ্রসারী ও দারুণ কিছু কর্মপরিকল্পনা:

১. ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিজিটাল ল্যাব ও লার্নিং সেন্টার: বৈষম্যহীন এক বাতিঘর

সুফি ফারুকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রধানতম স্তম্ভ হলো—প্রযুক্তির সমস্ত আধুনিক সুবিধা প্রান্তিক পর্যায়ের প্রতিটি তরুণের হাতের মুঠোয় পৌঁছে দেওয়া। এই লক্ষ্য বাস্তবে রূপ দিতে তিনি কুমারখালী-খোকসা অঞ্চলের প্রতিটি ইউনিয়নে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ‘ডিজিটাল ল্যাব’ বা ‘লার্নিং সেন্টার’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছেন।

উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা ও একটু সহযোগিতা পেলে এই কেন্দ্রগুলো হবে গ্রামীণ তরুণদের জন্য প্রযুক্তিশিক্ষার একেকটি আসল বাতিঘর। যেখানে বসেই একজন সাধারণ শিক্ষার্থী বিশ্বমানের আইটি প্রশিক্ষণ নিতে পারবে এবং ফ্রিল্যান্সিং বা ডিজিটাল পেশার মাধ্যমে নিজের ও নিজের এলাকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। এটি মূলত শহর আর গ্রামের মধ্যকার ডিজিটাল বৈষম্য উপড়ে ফেলার একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

২. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মেন্টর নেটওয়ার্ক: ঘরে বসেই কর্পোরেট গাইডলাইন

দূরশিক্ষণ ও প্রযুক্তির দারুণ সমন্বয় ঘটিয়ে গ্রামের শিক্ষার্থীদের সরাসরি করপোরেট দুনিয়ার সাথে যুক্ত করাই এই পরিকল্পনার দ্বিতীয় বড় লক্ষ্য। সুফি ফারুক চান দেশের শীর্ষস্থানীয় করপোরেট ব্যক্তিত্ব, দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক (HR) এবং সফল উদ্যোক্তাদের নিয়ে একটি শক্তিশালী ‘মেন্টর প্যানেল’ তৈরি করতে।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই মেন্টররা সরাসরি প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সাথে যুক্ত হবেন এবং তাদের ক্যারিয়ারের খুঁটিনাটি ট্রিকস শিখিয়ে দেবেন। এর ফলে একজন গ্রামীণ শিক্ষার্থী নিজের ঘরে বসেই দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে সরাসরি শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পাবে—যা তাদের আত্মবিশ্বাস ও প্রফেশনালিজমকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

৩. সৃজনশীল স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা তহবিল: চাকরি খোঁজা নয়, চাকরি দেওয়া

এই কর্মসূচির চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো স্রেফ চাকুরিজীবী তৈরি করা নয়; বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী ‘উদ্যোক্তা’ বা লিডার তৈরি করা। যেসব প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণ অত্যন্ত সৃজনশীল এবং যাদের মধ্যে নতুন কোনো স্টার্টআপ বা ব্যবসা শুরু করার জেনুইন সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের জন্য একটি বিশেষ ‘উদ্যোক্তা তহবিল’ (Startup Fund) এবং ইনকিউবেশন সুবিধা তৈরি করার বড় পরিকল্পনা রয়েছে।

এই তহবিলের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় নতুন নতুন উদ্যোগে প্রাথমিক পুঁজি বা বিনিয়োগের সুযোগ করে দেওয়া হবে এবং অভিজ্ঞ মেন্টরদের মাধ্যমে তাদের ব্যবসায়িক মডেলটিকে টেকসই করার সঠিক গাইডলাইন দেওয়া হবে। এটি তরুণদের ঝুঁকি নেওয়ার সাহস জোগাবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের হাজারো দুয়ার খুলে দেবে।

সুফি ফারুক এর পেশা পরামর্শ সভা'র ফ্রি কম্পিউটার প্রশিক্ষণের সফলতা। মানিক শেখ, পিতা জনাব মো: শহিদুল ইসলাম, খোকসা উপজেলার শোমসপুর ইউনিয়নের বুজরুক মির্জাপুর গ্রাম।

 

অংশগ্রহণ করার প্রক্রিয়া ও যোগাযোগ: আপনার সাফল্যের পথে প্রথম পদক্ষেপ

আপনি যদি একজন শিক্ষার্থী, সদ্য পাস করা গ্র্যাজুয়েট কিংবা চাকুরির সন্ধানে থাকা একজন উদ্যমী তরুণ হন এবং ‘পেশা পরামর্শ সভা’র এই দারুণ সুযোগগুলো কাজে লাগাতে চান, তবে আপনার প্রথম কাজ হলো এই প্ল্যাটফর্মে নিজের নাম যুক্ত করা।

১. নিবন্ধন ও তথ্য সংগ্রহের সহজ নিয়ম

আমাদের নিবেদিতপ্রাণ প্রতিনিধিরা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাড়া-মহল্লা আর গ্রামে গিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ করছেন। আপনি তাদের কাছ থেকে সরাসরি ফরম নিয়ে পূরণ করতে পারেন। এছাড়া প্রযুক্তিবান্ধব এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে আমাদের নির্দিষ্ট অনলাইন পোর্টালে গিয়েও খুব সহজে ঘরে বসেই আবেদন করতে পারেন। আপনার সঠিক তথ্যটি আমাদের ডাটাবেজে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমেই মূলত আপনার ক্যারিয়ার গড়ার আসল যাত্রাটি শুরু হয়ে যাবে।

২. নিয়মিত আপডেট ও সরাসরি কানেকশন

পেশা পরামর্শ সভার পরবর্তী আয়োজন কবে, কোথায় এবং কোন বিষয়ের ওপর অনুষ্ঠিত হবে—তা জানতে আমাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখাটা জরুরি। সুফি ফারুক ইবনে আবুবকরের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ এবং ওয়েবসাইট হলো এই কর্মসূচির প্রধান তথ্যকেন্দ্র। এখানে নিয়মিত পরবর্তী সভার তারিখ, ভেন্যু এবং নতুন নতুন ফ্রি প্রশিক্ষণ কোর্সের ঘোষণা দেওয়া হয়। এছাড়া এই প্রজেক্টের নানা কার্যক্রম আর সফলতার গল্পগুলোও সেখানে শেয়ার করা হয়, যা আপনাকে সবসময় অনুপ্রাণিত রাখবে। তাই এই প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে যুক্ত থাকাই হলো সঠিক সময়ে সঠিক সুযোগটি লুফে নেওয়ার সবচেয়ে বুদ্ধিমান উপায়।

৩. নিঃশর্ত ও ১০০% ফ্রি সেবার নিশ্চয়তা

সবচেয়ে বড় এবং স্বস্তির বিষয় হলো—’পেশা পরামর্শ সভা’র কোনো ধাপেই কোনো ধরণের টাকা-পয়সার প্রয়োজন হয় না। নাম নিবন্ধন থেকে শুরু করে মানসিক প্রস্তুতি, ক্যারিয়ার ক্যাটালগ দেখা, কারিগরি প্রশিক্ষণ কিংবা নামী বিশেষজ্ঞদের মেন্টরশিপ—এর প্রতিটি সেবা শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (Free) দেওয়া হয়।

এটি সুফি ফারুক ইবনে আবুবকরের একটি নিঃস্বার্থ সামাজিক উদ্যোগ—যার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আপনাকে একজন যোগ্য, দক্ষ ও আত্মনির্ভরশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। তাই কোনো ধরণের দ্বিধা বা আর্থিক দুশ্চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে আপনি এই কর্মসূচিতে যোগ দিতে পারেন এবং আপনার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার পথে এগিয়ে যেতে পারেন।

 

সুফি ফারুক এর পেশা পরামর্শ সভা'র ফ্রি কম্পিউটার প্রশিক্ষণের সফলতা। জাহিদুল ইসলাম, পিতা জনাব সুরুজ আলী, খোকসা উপজেলার মির্জাপুর।

 

এবার চলুন যোগ দেই

পরিশেষে বলা যায়, ‘পেশা পরামর্শ সভা’ কেবল প্রচলিত বা গৎবাঁধা কোনো ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং নয়; এটি মূলত আমাদের তরুণদের বৈশ্বিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলার একটি পরিকল্পিত ও বাস্তবমুখী লড়াই। মানসিক প্রস্তুতি থেকে শুরু করে কারিগরি দক্ষতা এবং নামী বিশেষজ্ঞদের মেন্টরশিপের এই সমন্বিত রূপরেখা সত্যিই প্রশংসনীয়।

সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত এই উদ্যোগটি ২০৪১ সালের উন্নত ও জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ইতিমধ্যেই একটি দারুণ কার্যকর মডেল হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে। কুমারখালী-খোকসা অঞ্চলের ১৫,০০০-এরও বেশি তরুণ-তরুণীর সফল কর্মসংস্থান এবং তাঁদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে—সঠিক দিক-নির্দেশনা আর বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ দিতে পারলে বেকারত্ব দূর করা কোনো অসম্ভব কাজ নয়।

ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন এবং সম্ভাবনাময় তরুণদের জন্য উদ্যোক্তা তহবিল গঠনের যে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এই প্রজেক্টের রয়েছে, তা একে আরও টেকসই ও সুদূরপ্রসারী করে তুলবে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে একটি স্বাবলম্বী ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি গঠনে ‘পেশা পরামর্শ সভা’ সত্যিই এক দারুণ সময়োপযোগী ও অনন্য প্রচেষ্টার নাম।