বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা: বিশ্বজুড়ে আলোড়ন, ঘাবড়ে যায় পাকিস্তানী জান্তারা । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগটি ছিল বিশ্বজুড়ে এক চরম যুদ্ধমুখর ও বৈপ্লবিক সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর পৃথিবীতে উপনিবেশবাদের পতন ঘটছিল এবং এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার বুকে মুক্তিকামী মানুষের সশস্ত্র সংগ্রাম তীব্র আকার ধারণ করেছিল। একদিকে সমাজতান্ত্রিক ব্লকের অধীনে ভিয়েতনাম বা কিউবার মতো দেশে কমিউনিস্টদের সশস্ত্র বিপ্লব চলছিল, অন্যদিকে জাতিগত ও আঞ্চলিক মুক্তির জন্য বিশ্বের বেশ কয়েকটি রণাঙ্গনে তীব্র গেরিলা যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল।

তবে, এই বিশ্বজনীন বৈপ্লবিক আবহের মধ্যেও বাঙালি জাতির মুক্তির সংগ্রাম ছিল অন্য সবার থেকে গুণগত ও আদর্শিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনন্য। আমাদের স্বাধীনতার এই যুদ্ধ কোনো চোরাগোপ্তা হামলা, উগ্র বিচ্ছিন্নতাবাদ বা অগণতান্ত্রিক উপায়ে চাপিয়ে দেওয়া কোনো সহিংসতা ছিল না; বরং এটি ছিল সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এবং সুনির্দিষ্ট গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান।

১৯৭০ সালে পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম ও একমাত্র অবাধ ও সাধারণ জাতীয় নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রত্যক্ষ সমর্থন, আইনি বৈধতা ও অংশগ্রহণে এই যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। বাঙালির এই লড়াই ছিল একটি সার্বভৌম আইনসংগত ম্যান্ডেটের পিঠে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রশক্তির অন্যায্য আক্রমণের বিরুদ্ধে বৈধ আত্মরক্ষা। বিশ্বের ইতিহাসে খুব কম স্বাধীন রাষ্ট্রই এভাবে শতভাগ গণতান্ত্রিক বৈধতা নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পেরেছে। দেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি বাঙালি জাতির দীর্ঘকালের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামের চূড়ান্ত ও যৌক্তিক পরিণতিই হলো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা- বিশ্বজুড়ে আলোড়ন, ঘাবড়ে যায় পাকিস্তানী জান্তারা

Table of Contents

বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা: বিশ্বজুড়ে আলোড়ন, ঘাবড়ে যায় পাকিস্তানী জান্তারা

 

The Script বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা: বিশ্বজুড়ে আলোড়ন, ঘাবড়ে যায় পাকিস্তানী জান্তারা । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

 

অধ্যায় ১: মনন প্রস্তুতকরণ: ছয় দফা থেকে গণআন্দোলনের একক নিয়ন্ত্রণ

বাঙালির এই নিয়মতান্ত্রিক বিপ্লবের মূল কারিগর ছিলেন এক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মহানায়ক—শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি হুট করে কোনো যুদ্ধের ডাক দেননি; বরং অত্যন্ত ধীরলয়ে, সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ অনুযায়ী বাঙালি জাতিকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের রাজপথ থেকে মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়ের মাধ্যমে তিনি যে অধিকার চেতনার সূচনা করেন, সেটাকে তিনি ধাপে ধাপে স্বায়ত্তশাসনের স্বাধিকার আন্দোলনে রূপান্তর করেন।

দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে বাঙালির মনস্তত্ত্ব ও রাজনৈতিক অধিকারের জমিন প্রস্তুত করার পর, ১৯৬৬ সালে তিনি ঘোষণা করেন ‘বাঙালির বাঁচার দাবি’ ঐতিহাসিক ছয় দফা। এই ছয় দফা কেবল স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল না, এটি ছিল প্রকারান্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার এক অলিখিত ব্লু-প্রিন্ট। জনগণের তুমুল অংশগ্রহণ ও স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে এই ছয় দফাকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যেতে থাকেন নেতা।

পাকিস্তানি শোষক গোষ্ঠী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের বহুমুখী রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মতো রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা, বছরের পর বছর কারাবরণ ও নির্মম জেল-জুলুম মোকাবিলা করে ১৯৭১ সালের নির্বাচনে তিনি জনগণের একচ্ছত্র ম্যান্ডেট ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেন। এরপর ১৯৭১ সালের শুরু থেকেই তিনি তাঁর গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দেন। পাকিস্তানি জান্তা যখন ৩ মার্চের জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত করে দিল, তখন সাত কোটি বাঙালির প্রত্যেকে ক্ষোভে-বিক্ষোভে পরিণত হলো একেকটি জীবন্ত ‘আদমবোমায়’।

মার্চের শুরু থেকেই দেশের বেসামরিক প্রশাসন, ব্যাংক, আদালত ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার একক নিয়ন্ত্রণ চলে আসে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকে প্রতিটি দিন নতুন নতুন ডিক্রি ও নির্দেশনা দিয়ে তিনি একদিকে অহিংস আন্দোলন বজায় রাখেন, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধের জন্য জাতিকে সামরিকভাবে গড়ে তোলেন। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদাররা যখন বর্বর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন বঙ্গবন্ধু কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত না নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শোষণের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার সেই মহোত্তম ক্ষণ থেকেই আমরা বিশ্বের বুকে এক বীরের জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করি।

The New York Times বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা: বিশ্বজুড়ে আলোড়ন, ঘাবড়ে যায় পাকিস্তানী জান্তারা । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

অধ্যায় ২: ২৫ মার্চের ক্রান্তিলগ্ন: ধানমন্ডির ৩২ নম্বর এবং আত্মগোপনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। সকাল থেকেই ঢাকার বাতাস ছিল ভারী ও রহস্যময়। রাজনৈতিক আলোচনার আড়ালে পাকিস্তানি জান্তারা যে আসলে গণহত্যার নীল নকশা চূড়ান্ত করে ফেলেছে, তা স্পষ্ট হতে শুরু করে। এদিন বিকেলেই কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই, সাধারণ পোশাকে (সাদা পোশাকে) অত্যন্ত গোপনে ঢাকা ছেড়ে পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে পালিয়ে যায় পাকিস্তানি স্বৈরাচার জেনারেল ইয়াহিয়া খান। সন্ধ্যার পর থেকেই পুরো ঢাকা শহর এক থমথমে ও ভুতুড়ে নগরীতে পরিণত হয়।

তৎকালীন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ’ (The Rape of Bangladesh)-এ সেদিনের সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তের ব্যাপারে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, রাত সাড়ে আটটার দিকে এক রিকশাচালক দ্রুতপায়ে প্যাডেল চালিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডে শেখ মুজিবের বাড়ির সামনে এসে থামে। মূলত ঢাকা সেনানিবাস (ক্যান্টনমেন্ট) থেকে এক বাঙালি সৈনিকের জরুরি ও গোপন বার্তা বহন করে জীবন বাজি রেখে এত পথ রিকশা চালিয়ে এসেছে সে। সে বঙ্গবন্ধুকে অত্যন্ত জরুরি বার্তা দিয়ে জানায়, “আজ রাতে আপনার বাড়িতে সেনাবাহিনী হামলা করবে এবং পুরো ঢাকা শহরে বড় ক্র্যাকডাউন হবে।”

এদিকে রাত বাড়ার সাথে সাথে বিভিন্ন কৌশলগত জায়গা থেকে পাকিস্তানি সেনাদের ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ব্যারাক থেকে বের হওয়ার খবর আসতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর রোডের বাসভবনের ল্যান্ডফোনে একের পর এক ফোন আসছিল। পরিস্থিতি যখন সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও নিশ্চিত, তখন বঙ্গবন্ধু তাঁর সিনিয়র সহকর্মীদের (যাঁরা পরবর্তীতে মুজিবনগর সরকার গঠন করেছিলেন) অবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়ে এবং নিরাপদ দূরত্বে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

সে সময় আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের তরুণ ও প্রভাবশালী নেতারা বঙ্গবন্ধুকেও আত্মগোপনে যাওয়ার জন্য বা ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য তীব্র মানসিক চাপ দিতে থাকেন। নেতারা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হলে আন্দোলন নেতৃত্বহীন হয়ে পড়বে। কিন্তু হিমালয়সম দৃঢ়চেতা বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত শান্তভাবে তাদের সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে বললেন:

‘আমি কোথাও যাব না। আমি যদি আত্মগোপন করি, তাহলে ওরা আমাকে খোঁজার বাহানায় পুরো ঢাকা শহরকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে। তারা তন্ন তন্ন করে তল্লাশি করবে। বহু বাড়ি-ঘর ধ্বংস হবে এবং লাখ লাখ নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটবে। আমি আমার জনগণকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ফেলে পালিয়ে যেতে পারি না।’

পরবর্তীতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান ও কসাই হিসেবে কুখ্যাত লে. জেনারেল টিক্কা খানের এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের বক্তব্য বঙ্গবন্ধুর এই রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও আশঙ্কার সাথে হুবহু মিলে যায়। টিক্কা খান নিজের স্বীকারোক্তিতে স্পষ্টভাবে বলেছে, সেই রাতে শেখ মুজিবকে জীবিত বা অক্ষত অবস্থায় গ্রেফতার করা না গেলে তারা ঢাকাকে একটি জ্বলন্ত শ্মশানে পরিণত করত এবং প্রতিটা ঘরে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়া হতো।

অন্যদের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের মৌলিক পার্থক্য এবং পর্বতপ্রমাণ গুণাবলি এখানেই প্রকাশ পায়। সেই ভয়াল রাতে, কোনো আবেগ বা ভীরুতার বশবর্তী না হয়ে, অত্যন্ত সময়োপযোগী, নিখুঁত ও দুর্দান্ত সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি জানতেন, একটি স্বাধীন দেশের নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান নেতা হিসেবে তাঁর এভাবে আত্মগোপনে যাওয়া বা ভারতের আশ্রয় নেওয়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আন্দোলনকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বা ‘বেআইনি’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ দেবে। এছাড়াও তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, দীর্ঘ দেড় যুগে একটি জাতিকে যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে যা যা করা দরকার, তা তিনি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করে ফেলেছেন।

এসব রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির মধ্যেই তিনি খবর পেলেন যে, পিলখানায় ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস)-কে অতর্কিতে নিরস্ত্র (ডিজআর্ম) করা শুরু হয়েছে এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স পাকিস্তানি সেনাদের মূল আক্রমণের প্রথম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। কৌশলগত কারণে, আক্রান্ত হওয়ার আগে নিজে থেকে আক্রমণের ঘোষণা দিয়ে বা ভারতের সাহায্য চেয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশকে নিয়ে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদের’ ধুয়া তোলার কোনো সুযোগ তিনি পাকিস্তানিদের দেননি। কিন্তু যখনই রাজারবাগ ও পিলখানায় প্রথম গুলির শব্দ শোনা গেল এবং আক্রান্ত হওয়ার খবর এলো, বঙ্গবন্ধু আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। পুরো মার্চ মাসজুড়ে দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষকে যেভাবে তিনি প্রস্তুত করে তুলেছিলেন, সেই শক্তির ওপর ভরসা করে পাকিস্তানি কর্তৃক আক্রমণের খবর পাওয়া মাত্রই চূড়ান্তভাবে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ডাক দিলেন। হাজার বছরের বাঙালি ইতিহাসের এই মহেন্দ্রক্ষণে বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকাকে বাইপাস করে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করলেন।

এই মোক্ষম ও চূড়ান্ত সময়ের জন্যই তিনি বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছিলেন, প্রতীক্ষায় ছিল সাড়ে সাত কোটি শোষিত বাঙালি। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে, ইপিআর-এর ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বিশেষ গোপন ফ্রিকোয়েন্সিতে বঙ্গবন্ধুর স্বকণ্ঠে ঘোষিত হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার অমর বাণী। এর পরপরই, টেলিগ্রাফ ও ওয়্যারলেসের সেই বার্তা বিভিন্ন কেন্দ্রে টুকে নিয়ে হ্যান্ডবিল আকারে বিলি করা হলো দেশের প্রতিটি অঞ্চলে। সাথে সাথে তোলপাড় শুরু হয়ে গেলো আন্তর্জাতিক বিশ্বের কূটনৈতিক ও গণমাধ্যম মহলে। পাকিস্তানি সামরিক জান্তাদের অপারেশন সার্চলাইটের সারপ্রাইজ এলিমেন্ট বা চমক দেওয়ার ক্ষমতা আর কিছুই থাকলো না। এমনকি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিমণ্ডলেও বঙ্গবন্ধু এবং বাঙালি জাতিকে নিয়ে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী’ বলে অপপ্রচারের পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে গেলো।

The New York Times report বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা: বিশ্বজুড়ে আলোড়ন, ঘাবড়ে যায় পাকিস্তানী জান্তারা । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

অধ্যায় ৩: ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণা (সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিল ও সম্প্রচারের বিকল্প ব্যবস্থা)

পাকিস্তানি জান্তারা ২৫ মার্চ রাতে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা বা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করার পরপরই, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে (২৫ মার্চ রাত ১২টার পর) বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরবর্তীতে এই ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণাটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে (১৫০(২) অনুচ্ছেদ) মূল ইংরেজিসহ এর বাংলা অনুবাদ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে সংরক্ষিত স্বাধীনতার সেই মূল ঘোষণাটি হলো:

“ইহাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে, যে যেখানে আছ, যাহার যাহা কিছু আছে, তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও, সর্বশক্তি দিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করো। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও। — শেখ মুজিবুর রহমান, ২৬ মার্চ ১৯৭১”

এই অমোঘ ঘোষণাটি পিলখানা থেকে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে দেশজুড়ে সম্প্রচার করার পেছনে রয়েছে এক রোমাঞ্চকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর এই চূড়ান্ত বার্তাটি পিলখানার সিগন্যাল কোরের বাঙালি অফিসারদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ব্যক্তি সুবাদার মেজর শওকত আলী বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে (রাত আনুমানিক ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে) ওয়্যারলেসে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্বলিত এই খবরটি বিভিন্ন স্টেশনে পাস করার সময় পাকিস্তানি সেনারা পিলখানা আক্রমণ করে এবং সুবাদার মেজর শওকত আলীকে হাতেনাতে ধরে ফেলে। পরবর্তীতে পাকিস্তানি বাহিনী এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করে।

তবে দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু কেবল একটি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে বসে ছিলেন না; পাকিস্তানিরা যদি পিলখানা দখল করে নেয়, সেই আশঙ্কা থেকে একাধিক বিকল্প ব্যবস্থা আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। এই গোপন ও কৌশলগত প্রস্তুতি সম্পর্কে প্রখ্যাত আইনজীবী এবং সংবিধান প্রণেতা ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম তাঁর ‘একাত্তরের মার্চ: যেন এক অনন্ত যাত্রা’ শীর্ষক স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধে অত্যন্ত নিখুঁত ও চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেছেন।

ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামের বিবরণ অনুযায়ী, মার্চের মাঝামাঝি সময়েই বঙ্গবন্ধুর সরাসরি নির্দেশে ইস্টার্ন টেলিকমিউনিকেশনের প্রকৌশলী এ. কে. এম. নুরুল হক খুলনা থেকে একটি পরিত্যক্ত ও শক্তিশালী সরকারি ট্রান্সমিটার অত্যন্ত গোপনে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন। সরকারি রেজিস্ট্রার বা লগ-বুকে এই ট্রান্সমিটারটির কোনো হিসাব বা এন্ট্রি লেখা ছিল না, যাতে পাকিস্তানি গোয়েন্দারা এর হদিস না পায়। প্রকৌশলী এ. কে. এম. নুরুল হক ঢাকার একটি নিরাপদ গোপন আস্তানায় এই লজিস্টিক সাপোর্ট তৈরি করে ট্রান্সমিটারটিকে সচল ও প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। এবং ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে ঠিক কখন, কীভাবে বার্তাটি বাতাসে ছড়িয়ে দিতে হবে, সে সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ অবগত ও মানসিকভাবে তৈরি ছিলেন।

২৫ মার্চ মধ্যরাতে যখন ঢাকার বুকে পাকিস্তানি ট্যাংকগুলোর গর্জন শোনা যায়, তখন প্রকৌশলী নুরুল হক ফোন করেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে। সেই ঐতিহাসিক রাতে ফোনটি ধরেন বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত ও অবৈতনিক সহকারী হাজী গোলাম মোর্শেদ। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ গলায় প্রকৌশলী নুরুল হক জানান, “বঙ্গবন্ধুকে বলেন, মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছি, এখন মেশিন কী করব?” বঙ্গবন্ধু তখন পাশেই সোফায় বসা ছিলেন এবং গোলাম মোর্শেদের মাধ্যমে ফোনের বার্তাটি শোনামাত্রই তিনি অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন: “তাকে বলো, মেশিন ভেঙে ফেলে পালিয়ে যেতে।” অর্থাৎ, বার্তা পাঠানোর লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার পর নিজের ও সহকর্মীদের জীবন বাঁচাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করার নির্দেশ দিতেও বঙ্গবন্ধু দ্বিধা করেননি।

সেই ভয়াল রাতে ওয়্যারলেস ও রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে ইংরেজিতে স্বাধীনতার যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তার বিশ্বস্ততা ও কার্যকারিতা নিয়ে বহির্বিশ্বের সাংবাদিক ও রাষ্ট্রপ্রধানরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দিয়েছেন। ব্রিটেনের তৎকালীন বিখ্যাত পত্রিকা ‘দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ’-এর নির্ভীক সাংবাদিক ডেভিড লোশাক (যিনি একাত্তরের যুদ্ধের ওপর ‘Pakistan Crisis’ নামে বিখ্যাত বই লিখেছিলেন) তাঁর প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন,

“…টেলিগ্রাফ ও রেডিও তরঙ্গে একটি শব্দ শোনা যাচ্ছিল, যদিও সিগন্যাল খুব ক্ষীণ ছিল। খুব সম্ভবত, পাকিস্তানিরা যেন মাঝপথে জ্যাম করতে না পারে, সেজন্য ঘোষণাটি আগেই রেকর্ড করে রাখা হয়েছিল এবং আক্রমণের পর তা ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।”

একইভাবে তৎকালীন ব্রিটেনের রক্ষণশীল দলের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার ঐতিহাসিক গুরুত্ব মূল্যায়ন করে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন:

“১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। ইউরোপের বাঘা বাঘা জেনারেলরা মনে করেন, শেখ মুজিব এখন পাকিস্তানি জান্তাদের হাতে জীবিত থাকুন বা না থাকুন, তারা (পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা) আর কখনোই সাড়ে সাত কোটি বাঙালি জাতিকে যুদ্ধক্ষেত্রে সম্পূর্ণ পরাজিত বা দমন করতে সমর্থ হবে না।”

The Windsor Star বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা: বিশ্বজুড়ে আলোড়ন, ঘাবড়ে যায় পাকিস্তানী জান্তারা । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

অধ্যায় ৪: বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে পাকিস্তানি জেনারেল ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে যারা ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করে, তাদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে স্বয়ং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর শীর্ষ জেনারেল এবং সেনা কর্মকর্তারা তাদের ডায়েরি, বই ও সাক্ষাৎকারে ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা স্বকর্ণে শোনার সত্যতা স্বীকার করে গেছেন।

ক) ‘বেলুচিস্তানের কসাই’ লে. জেনারেল টিক্কার জবানবন্দি

১৯৭১ সালের ৬ মার্চ পাকিস্তানের তৎকালীন একনায়ক জেনারেল ইয়াহিয়া খান লে. জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব দেয়। এর আগে ১৯৭০ সালে বেলুচিস্তানে নির্বিচারে বিমান হামলা ও গণহত্যা চালিয়ে সে ‘বেলুচিস্তানের কসাই’ হিসেবে কুখ্যাত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক বাঙালি নিধনযজ্ঞের মূল নির্দেশাতা ও ব্লু-প্রিন্ট মাস্টার ছিল এই টিক্কা খান। যুদ্ধের পর সে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান এবং পরবর্তীতে পাঞ্জাবের গভর্নর নিযুক্ত হয়।

পাঞ্জাবের গভর্নর থাকাকালীন সময়ে লাহোরের সরকারি গভর্নর হাউজের দোতলায় বসে সার্ক সম্মেলনের একটি অনুষ্ঠান শেষে প্রখ্যাত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয় টিক্কা খান। সেখানে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের গণহত্যা এবং বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারি প্রসঙ্গে তাকে সরাসরি প্রশ্ন করা হলে, টিক্কা খান অত্যন্ত অকপটে স্বীকার করে যে, সেই রাতে সে নিজে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা রেডিওর তরঙ্গে শুনেছিল।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার ব্যাপারে টিক্কা খান তাঁর ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে বলেছে:

“২৫ মার্চ মধ্যরাতে অপারেশন শুরু হওয়ার পরপরই আমার কো-অর্ডিনেশন অফিসার একটি তিন ব্যান্ডের রেডিও নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটতে ছুটতে আমার রুমে এসে বলেছিল—’স্যার, শুনুন! শেখ সাহেব পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করছেন।’ এবং আমি নিজেও রেডিওর একটি বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সিতে সেই স্বাধীনতার ঘোষণা লাইভ শুনি। শেখ সাহেবের গম্ভীর কণ্ঠ আমি খুব ভালো করেই চিনতাম, তা ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। ওই ঘোষণা শোনার পর শেখ সাহেবকে গ্রেফতার করা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প খোলা ছিল না।”

সাক্ষাৎকারে টিক্কা খানকে আরেকটি প্রশ্ন করা হয়েছিল—”সেই রাতে শেখ মুজিবুর রহমান যদি অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের মতো আত্মগোপনে চলে যেতেন, তবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর করণীয় কী হতো?” এর জবাবে টিক্কা খান বাঙালির ওপর তাদের নৃশংসতার ভয়াবহ পরিকল্পনা ফাঁস করে দিয়ে বলে:

“আমি খুব ভালো করেই জানতাম, শেখ মুজিবের মতো আপসহীন নেতা তাঁর নিজের দেশের মানুষকে গোলার মুখে ফেলে রেখে নিজে কোথাও পালাবেন না। তবে শেখ মুজিব যদি আত্মগোপন করতেন, তাহলে তাঁকে গ্রেফতার করার জন্য আমি পুরো ঢাকার প্রতিটি কোণায় কোণায়, প্রতিটি বাড়ি-ঘরে এবং প্রতিটি বস্তিতে তন্ন তন্ন করে তল্লাশি চালাতাম এবং পুরো ঢাকাকে ধ্বংস করে দিতাম। অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করার ব্যাপারে আমার বিশেষ কোনো মাথাব্যথা ছিল না, তারা কে কোথায় পালালো তা নিয়ে আমরা ভাবিনি। এই কারণেই তাজউদ্দীন বা অন্যরা খুব সহজেই ঢাকার বাইরে চলে যেতে পেরেছিল।”

টিক্কা খান তাঁর সাক্ষাৎকারে একাত্তরে এদেশের কিছু কুলাঙ্গার ও জামায়াত নেতাদের দেশদ্রোহিতার কথাও উল্লেখ করে বলে,

“যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও পূর্ব-পাকিস্তানের অনেক রাজনৈতিক নেতা আমাদের সাথে ছিলেন এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় আমাদের সাহায্য করেছিলেন। গোলাম আযমসহ (তৎকালীন জামায়াতের আমির) অনেকে এখনো মনে করেন না যে ১৯৭১ সালে আমরা বাঙালি নিধন করে কোনো ভুল করেছিলাম।”

খ) সিদ্দিক সালিকের ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থের অকাট্য প্রমাণ

২৫ মার্চ রাতে টিক্কা খানের অপারেশন সার্চলাইটের পাশাপাশি নিয়াজি এবং রাও ফরমান আলী খানরা (নিয়াজির সামরিক উপদেষ্টা) আগে থেকেই ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। পুরো সময়টায় তাদের সাথে ছায়ার মতো ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা (PRO) মেজর সিদ্দিক সালিক। পরবর্তীতে তিনি যুদ্ধের সেই দিনগুলোর ডায়েরি ও ভেতরের সত্য ঘটনা নিয়ে ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ (Witness to Surrender) নামে একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আকর গ্রন্থ লেখেন।

মেজর সিদ্দিক সালিক তাঁর গ্রন্থে ২৫ মার্চ মধ্যরাতের নারকীয় হামলা এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের সুনির্দিষ্ট সময় ও তরঙ্গের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন:

“সেনানিবাস থেকে নির্ধারিত সময়ের কিছুটা আগেই, অর্থাৎ রাত প্রায় সাড়ে ১১টা থেকেই পাকিস্তানি সামরিক বহর শহর অভিমুখে রওনা দেয়। বেতার, টেলিভিশন কেন্দ্র, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার বাহানায় তারা আগেই পজিশন নিয়ে নেয়। রাত সাড়ে এগারোটার পর যেন হঠাৎ করেই ইচ্ছাকৃতভাবে নরকের সমস্ত দরজাগুলো ঢাকার বুকে খুলে দেওয়া হলো। চারদিকে তখন শুধু কামানের গর্জন আর আগুনের লেলিহান শিখা। পাকিস্তানি হানাদাররা ঢাকার ঘুমন্ত মানুষের ওপর হামলে পড়ার ঠিক পরপরই, পাকিস্তানের সরকারি বেতারের তরঙ্গের খুব কাছাকাছি একটি তরঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষীণ কিন্তু স্পষ্ট শব্দ শোনা যায়। শব্দ শুনে মনে হলো এটি একটি আগে থেকে রেকর্ডকৃত বাণী। সেই বাণীতে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ঘোষণা করেছেন।”

এভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ভেতরের কর্মকর্তাদের নিজস্ব লিখিত ইতিহাস ও জবানবন্দিই প্রমাণ করে যে, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতাই ছিল বাংলাদেশের একমাত্র এবং আইনসংগত মূল ঘোষণা।

The Bankok Post বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা: বিশ্বজুড়ে আলোড়ন, ঘাবড়ে যায় পাকিস্তানী জান্তারা । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

অধ্যায় ৫: ২৬ ও ২৭ মার্চের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা

২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার সাথে সাথেই বিশ্ব গণমাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। পাকিস্তানি সামরিক জান্তারা পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র সেন্সরশিপ আরোপ করে বিদেশি সাংবাদিকদের ঢাকা থেকে বের করে দিলেও, আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার খবর বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেয়। গবেষক অব্রনীল যাত্রীর সংকলন “Bangabandhu’s declaration of independence through the world media”-এর তথ্য অনুযায়ী, সেই দিনগুলোতে বিশ্বের ৯টি দেশের ৯০টিরও বেশি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার খবর লিড নিউজ বা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছিল।

Declaration of Bangladeshs independence বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা: বিশ্বজুড়ে আলোড়ন, ঘাবড়ে যায় পাকিস্তানী জান্তারা । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সেই ঐতিহাসিক ঐতিহাসিক দলিলগুলো নিচে দেওয়া হলো:

ক) দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস (The New York Times) – যুক্তরাষ্ট্র

আমেরিকার এই প্রভাবশালী দৈনিকটি ১৯৭১ সালের ২৭শে মার্চ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার খবর ছাপে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়:

“আজ পাকিস্তান রেডিওতে ঘোষণা করা হয়েছে যে, পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর অঞ্চলকে স্বাধীন ঘোষণা করার এবং বেশ কয়েকটি শহরে বিদ্রোহ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই গ্রেফতার করা হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের এই ৫১ বছর বয়সী নেতাকে তখন গ্রেফতার করা হয় যখন পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত সেনাবাহিনী পূর্ব অংশের ওপর পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিল।”

(The Pakistan radio announced today that Sheikh Mujibur Rahman, the nationalist Leader of East Pakistan, had been arrested only hours after he had proclaimed his region independent and after open rebellion was reported in several cities in the East… The 51-years-old leader of the Awami League, the dominant party in the East, was arrested as the West Pakistan-dominated army sought to reassert control in the East.)

খ) দ্য ডেইলি টাইমস (The Daily Times)

১৯৭১ সালের ২৭শে মার্চের সংখ্যায় এই পত্রিকাটিতে বাঙালির বীরোচিত প্রতিরোধ এবং বঙ্গবন্ধুর অমোঘ বাণীটি হুবহু উদ্ধৃত করা হয়। তারা লেখে:

“বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বীকৃত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বীরোচিতভাবে সাড়া দিয়েছেন এবং জনগণকে প্রতিরোধের ডাক দিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। বাঙালি রেজিমেন্টের অধিকাংশ সদস্যই যে তাঁর নির্দেশ মেনে চলবেন, তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। গ্রেফতার হওয়ার ঠিক কিছুক্ষণ আগে মুজিব তাঁর জনগণের উদ্দেশ্যে একটি ঘোষণা জারি করেছিলেন, যেখানে তিনি তাদের জানান: ‘তোমরা আজ এক স্বাধীন দেশের নাগরিক। আজ পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যায় মেতে উঠেছে। আমাদের সংগ্রাম অত্যন্ত ফলপ্রসূ, বিজয় আমাদের নিশ্চিত। আল্লাহ আমাদের সহায়। বিশ্ব জনমত আমাদের পক্ষে। জয় বাংলা, বাংলার জয়।'”

(Sheikh Mujibur Rahman, the Acknowledged leader of Bengali nationalism responded heroically to the Pakistan Army’s Intervention with a call for resistance and Declaration of Independence. There is a good evidence that most members of the Bengali regiments will accept his orders. Shortly before his arrest Mujib had issued a proclamation to his people, which informed them: You are citizens of a free country. Today the West Pakistan’s Military is engaged in genocide in Bangladesh. Our struggle is most rewarding, certain is victory. Allah is with us. The world public opinion is with us. Joy Bangla victory of Bengal.)

গ) দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমস (The Financial Times) – ব্রিটেন

ব্রিটিশ এই বিশ্ববিখ্যাত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দৈনিকটি ২৭শে মার্চের সংখ্যায় সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী শিরোনাম দিয়ে খবর প্রকাশ করে। তারা জানায়:

“পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর সেখানে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।”

(Civil war after East Pakistan declares independence.)

ঘ) দ্য প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (PTI) – ভারত

ভারতের রাষ্ট্রীয় ও শীর্ষস্থানীয় এই সংবাদ সংস্থাটি ২৬শে মার্চ সকালের বুলেটিনেই বিশ্বকে প্রথম এই বার্তাটি দেয়। তারা জানায়:

“শেখ মুজিবুর রহমান আজ রাতে পূর্ব পাখিজস্তানকে একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন। পূর্ব পাকিস্তানের কাছাকাছি একটি গোপন বা বিশেষ বেতার বার্তার মাধ্যমে এই ঘোষণাটি শোনা গেছে।”

(Sheikh Mujibur Rahman tonight proclaimed East Pakistan the Sovereign independent people’s Republic of Bangladesh, according to a clandestine radio report monitored near the East Pakistan.)

ঙ) দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian) – ব্রিটেন

ব্রিটেনের অন্যতম প্রধান এই জাতীয় দৈনিকটি ২৭শে মার্চ বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের খবরের সাথে তাঁর স্বাধীনতার অমোঘ বাণীটি প্রকাশ করে লেখে:

“গ্রেফতার হওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে মুজিব তাঁর দেশের মানুষের উদ্দেশ্যে একটি স্বাধীনতার ঘোষণা জারি করেন। সেখানে তিনি তাঁর জনগণকে জানান: ‘আজ থেকে তোমরা এক স্বাধীন দেশের নাগরিক।'”

(Shortly before his arrest, Mujib had issued a proclamation to his people, which informed them: you are citizens of a free country.)

চ) দ্য স্টেটসম্যান (The Statesman) – ভারত

দিল্লির প্রভাবশালী এই ইংরেজি দৈনিকটি ২৭শে মার্চ তাদের প্রধান শিরোনাম বা লিড হেডিংয়ে লেখে:

“বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে: পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্র্যাকডাউনের জবাবে এই পদক্ষেপ নিয়েছেন রহমান।”

(Bangladesh declares freedom: Rahman’s step follow’s Army crackdown.)

ছ) বিবিসি (BBC), এনডিপি (NDP) ও ইউআইএন (UNI)

ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি (BBC), এনডিপি এবং ভারতের পিটিআই (PTI) ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ রাত ৯টা ৭ মিনিটে তাদের বিশেষ বৈশ্বিক বুলেটিনে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার অডিও ট্র্যাকিং ও এর রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে সংবাদ প্রচার করে। এর আগে ২৬শে মার্চ রাত ৮টা ২১ মিনিটে ইউনাইটেড নিউজ অব ইন্ডিয়ার (UNI) ফ্ল্যাশ নিউজে বলা হয়েছিল: “স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে শেখ মুজিব আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।”

The age বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা: বিশ্বজুড়ে আলোড়ন, ঘাবড়ে যায় পাকিস্তানী জান্তারা । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

অধ্যায় ৬: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা দলিলের গোপন স্পট রিপোর্ট

স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে সমস্ত বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে দেয় তৎকালীন পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব গোয়েন্দা নথি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন প্রশাসন পাকিস্তানের পক্ষে থাকলেও, তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কিন্তু মাঠপর্যায়ের সত্য রিপোর্টটিই ওয়াশিংটনে পাঠাচ্ছিল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা—ডিআইএ (Defense Intelligence Agency)-এর একটি অতি গোপনীয় স্পট রিপোর্টে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার কথা পরিষ্কারভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। ‘ডিআইএ স্পট রিপোর্ট নং ৪৩’-এর ১ নম্বর অনুচ্ছেদে মার্কিন গোয়েন্দারা সরাসরি লিখেছে:

“আজ শেখ মুজিবুর রহমান এই দুই অংশী দেশের পূর্ব অংশকে একটি ‘সার্বভৌম স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ হিসেবে ঘোষণা করার পর পাকিস্তান এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে পতিত হয়েছে।”

(Pakistan was thrust into civil war today when Sk. Mujibur Rahman proclaimed the East wing of the two part country to be ”The sovereign independent people’s Republic of Bangladesh.”)

হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের টেবিলে রাখা এই মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টটিই প্রমাণ করে যে, ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরেই বিশ্ব পরাশক্তিগুলো সুনির্দিষ্টভাবে জেনে গিয়েছিল যে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির জন্ম হয়ে গেছে।

The Evening Times বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা: বিশ্বজুড়ে আলোড়ন, ঘাবড়ে যায় পাকিস্তানী জান্তারা । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

অধ্যায় ৭: অয়্যারলেসে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্প্রচার ও চট্টগ্রামের সলিমপুর স্টেশন

বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক বার্তাটি ঢাকা থেকে বাতাস চিড়ে কীভাবে প্রথম মাঠপর্যায়ে পৌঁছাল, তার এক জীবন্ত সাক্ষী হলেন চট্টগ্রামের সলিমপুর অয়্যারলেস স্টেশনের তৎকালীন কর্তব্যরত প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল কাদের। তাঁর দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, ২৬শে মার্চ ভোররাতে ঢাকার তেজগাঁও অয়্যারলেস স্টেশনের মেজবাহ উদ্দিন সাহেবের সঙ্গে তাঁর বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সিতে যোগাযোগ স্থাপন হয়।

ফোনে অত্যন্ত উত্তেজিত ও কম্পিত কণ্ঠে মেজবাহ সাহেব জানান, “বঙ্গবন্ধুর স্বকণ্ঠে দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণার একটি অত্যন্ত জরুরি বার্তা আমার কাছে পৌঁছেছে। আপনি দ্রুত এটি লিখে নিন।” প্রকৌশলী আবদুল কাদের অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ডায়েরির পাতায় বার্তাটি লিখে নেন।

মেজবাহ উদ্দিন সাহেব আরও জানিয়েছিলেন যে, তিনি ঢাকার স্টেশনটি পাকিস্তানি সেনারা অবরুদ্ধ করার ঠিক আগ মুহূর্তে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে অয়্যারলেস স্টেশনের ভিএইচএফ (VHF) নেটওয়ার্কের সার্ভিস চ্যানেল এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় ব্যবহৃত মেরিটাইম মোবাইলে বার্তাটি প্রেরণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে অবস্থানকারী বিদেশি জাহাজ—যেমন এম ভি সালভিস্তা (MV Salvista), এম ভি মিনি লা ট্রিয়া (MV Mini La Tria), এবং এম ভি ভি ভি গিরি (MV VV Giri) সহ বেশ কয়েকটি জাহাজের অয়্যারলেস অপারেটররা এই বার্তাটি রিসিভ করে। এই বিদেশি জাহাজগুলোর শক্তিশালী ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে বার্তাটি তৎক্ষণাৎ সিঙ্গাপুর, হংকং এবং লন্ডনের আন্তর্জাতিক মেরিটাইম স্টেশনে রিলে করা হয়, যার ফলে বিশ্বব্যাপী এই খবরটি আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

The New York Times 2 বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা: বিশ্বজুড়ে আলোড়ন, ঘাবড়ে যায় পাকিস্তানী জান্তারা । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

অধ্যায় ৮: স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র এবং কণ্ঠের রূপান্তর

বঙ্গবন্ধুর দেওয়া এই স্বাধীনতার মূল লিখিত রূপটি (হ্যান্ডবিল আকারে যা বিলি করা হয়েছিল) পরবর্তীতে চট্টগ্রামের কালুরঘাট অস্থায়ী ‘স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র’ থেকে দেশের মানুষের মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য বারবার পাঠ করা হয়।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা ও সংগঠক বেলাল মোহাম্মদ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ২৬শে মার্চ বিকেলে চট্টগ্রামের ডা. আনোয়ার আলীর কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা সংবলিত যে হ্যান্ডবিলটি তারা পেয়েছিলেন, সেটিই কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে একে একে বিভিন্ন সংগঠকের কণ্ঠে বারবার প্রচারিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাঁর এই অমোঘ আদেশকে বৈধতা দিতে এবং যুদ্ধরত জনতাকে দিকনির্দেশনা দিতে পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসাররা (যাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান) বঙ্গবন্ধুর পক্ষে এই একই ঘোষণাপত্রটি রেডিওতে পাঠ করেন। কণ্ঠ যাঁরই হোক না কেন, ঘোষণার মূল আইনসংগত উৎস এবং সুনির্দিষ্ট ম্যান্ডেটটি ছিল কেবল এবং কেবলমাত্র জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের।

 

অয়্যারলেসে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্প্রচার

চট্টগ্রামের সলিমপুর অয়্যারলেস স্টেশনের ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুল কাদের জানান, ২৬ মার্চ ভোরে ঢাকার মেজবাহ সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তিনি জানান, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণাটির একটি বার্তা তার কাছে পৌঁছেছে। তিনি ঘোষণাটি বললে আমি দ্রুত তা লিখে নিলাম। এছাড়াও মেজবাহ উদ্দিন সাহেব আরো জানান, তিনি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে অয়্যারলেস স্টেশনের ভিএইচএফ নেটওয়ার্কের সার্ভিস চ্যানেল ও মেরিটাইম মোবাইলে বার্তাটি প্রেরণে সক্ষম হয়েছেন। বার্তাটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে অবস্থানকারী বিদেশি জাহাজ এম ভি সালভিস্তা, এম ভি মিনি লা ট্রিয়া, এম ভি ভি ভি গিরিসহ আরো বেশ কয়েকটি জাহাজের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পরে বিভিন্ন কণ্ঠে পাঠ করা হয়

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সিতে সম্প্রচারের পর, সেটি দ্রুত কপি করে বিভিন্ন অঞ্চলে হ্যান্ডবিল আকারে বিতরণ করেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণার বার্তাটি স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে কয়েকদিন ধরে পাঠ করেন একাধিক ব্যক্তি। এ ব্যাপারে তৎকালীন সময়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক বেলাল মোহাম্মদ লিখেছেন, ডাক্তার আনোয়ার আলীর কাছ থেকে পাওয়া বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের হ্যান্ডবিলটিও বারবার প্রচারিত হয়েছিল আমাদের বিভিন্ন জনের কণ্ঠে।

 

আরও দেখুন: