উদ্যোক্তা উন্নয়ন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ে আমি সবচেয়ে বড় যে বাধাটি দেখেছি, তা কোনো আর্থিক সংকট বা নীতিমালার অভাব নয়—বরং সেটি হলো প্রবল সামাজিক চাপ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে পারিবারিক কাঠামো, কোথাও আমরা একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তা হওয়ার পাঠ দিই না। বরং আমাদের পুরো ব্যবস্থাটি গড়ে উঠেছে ভালো ‘কর্মী’ বা ‘চাকরিজীবী’ তৈরির কারিগর হিসেবে।

উদ্যোক্তা উন্নয়ন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ে আমি সবচেয়ে বড় যে বাধাটি দেখেছি, তা কোনো আর্থিক সংকট বা নীতিমালার অভাব নয়—বরং সেটি হলো প্রবল সামাজিক চাপ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে পারিবারিক কাঠামো, কোথাও আমরা একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তা হওয়ার পাঠ দিই না। বরং আমাদের পুরো ব্যবস্থাটি গড়ে উঠেছে ভালো ‘কর্মী’ বা ‘চাকরিজীবী’ তৈরির কারিগর হিসেবে।
মধ্যবিত্তের দৃষ্টিভঙ্গি ও ‘নিরাপদ’ ভবিষ্যতের মোহ
আমাদের সমাজের মজ্জায় মজ্জায় চাকরিজীবীর প্রতি এক ধরনের অন্ধ মোহ কাজ করে। একজন মধ্যবিত্ত বাবা যখন তার মেয়ে বা বোনের বিয়ের কথা ভাবেন, তখন তার প্রথম পছন্দ থাকে একজন সরকারি বা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির চাকরিজীবী। এমনকি খোদ ব্যবসায়ী পরিবারের অভিভাবকেরাও চান তাদের সন্তান যেন একটা ‘ভালো চাকরি’ করে।
এর পেছনের কারণ মূলত দুটি। প্রথমত, আমাদের নীতিমালার জটিলতা ও প্রশাসনিক দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যবসার অভিজ্ঞতা কখনোই সুখকর নয়। দ্বিতীয়ত, মধ্যবিত্তের ‘স্বপ্ন’ দেখার সাহস কমে গেছে। তারা অজানাকে জয় করার চেয়ে নিশ্চিত মাসিক বেতনকেই জীবনের সার্থকতা মনে করে।
সফলদের প্রতি সামাজিক ঈর্ষা ও দ্বিচারিতা
ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিদের আইকন বা ‘মডেল’ হিসেবে উপস্থাপন করার সংস্কৃতি আমরা এখনো গড়ে তুলতে পারিনি। এখানে সফল মানুষদের নিয়ে এক অদ্ভুত দ্বিচারিতা কাজ করে। আমার একটি অভিজ্ঞতা বলি—একবার আমার একটি প্রতিষ্ঠানে একজন তরুণ উদ্যোক্তাকে বক্তব্য দিতে ডেকেছিলাম। পরের দিন খবরের কাগজে তার ছবি দেখে স্থানীয় এক নেতা আমাকে শ্লেষের সাথে বলেছিলেন, ‘বড়লোক বড়লোক চাচাতো ভাই! আমাদের ডাকলে তো আর আমরা মাল (চাঁদা/সুবিধা) দিতে পারব না।’
আমরা বড় শিল্পপতিদের দূর থেকে শ্রদ্ধা করি বা তাদের ওপর নির্ভর করি ঠিকই, কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিজেদের তথাকথিত ‘নির্লোভ’ ইমেজ বজায় রাখতে প্রকাশ্যে তাদের সাথে খুব একটা সখ্যতা দেখাতে চাই না। অথচ সন্ধ্যার আড্ডায় তাদেরই স্তবগান করি। এই দ্বিচারিতা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করে।
‘সততা ও ব্যবসা’ নিয়ে নেতিবাচক সমষ্টিগত চিন্তা
আমাদের সমষ্টিগত চেতনার বড় একটি ক্ষত হলো এই ধারণা—“সৎভাবে ব্যবসা করা সম্ভব নয়।” বিশেষ করে সামরিক শাসনের দীর্ঘ ইতিহাস মানুষের মনে এই নেতিবাচক বিশ্বাসটি পোক্ত করে দিয়েছে। এর ফলে একজন তরুণ যখন উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখে, সমাজ প্রথমেই তাকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। এই কলঙ্ক তিলক বয়ে নিয়ে চলা একজন নতুন উদ্যোক্তার জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক।
উদ্যোগের বৃদ্ধি ও ‘দশানন’ হওয়ার ট্র্যাজেডি
একজন উদ্যোক্তার কাছে তার উদ্যোগটি নিজের সন্তানের মতো। সেটিকে পরম মমতায় বড় করতে গিয়ে তাকে নিজের অকাতর শ্রম ও সময় দিতে হয়। শুরুর দিকে সব সিদ্ধান্ত একা নিতে হয়, সব কাজ একা সামলাতে হয়। কিন্তু ব্যবসা যখন সফল হতে শুরু করে, তখন তার পরিধি ও জটিলতাও বাড়ে।
সাফল্যের প্রধান শর্তই হলো—নিরবিচ্ছিন্ন প্রবৃদ্ধি (Growth)। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি বড় নিষ্ঠুর; সে আরও বেশি সময় এবং যোগ্য নেতৃত্ব দাবি করে। এই পর্যায়ে এসে অনেক উদ্যোক্তাই এক ধরনের সংকটে পড়েন। বর্তমান যুগে কারো পক্ষেই ‘দশানন’ (দশ মাথা বিশিষ্ট) হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সমাজ ও পরিবারের অসহযোগিতা আর একাকী সব সামলানোর চাপে এক পর্যায়ে উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও আত্মিক জীবন তছনছ হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে হয় তাকে হার মানতে হয়, নয়তো ব্যবসার প্রবৃদ্ধিকে বলি দিতে হয়।
উত্তরণের পথ: ‘ম্যানেজমেন্ট রান বিজনেস’
এই সামাজিক ও ব্যক্তিগত চাপ থেকে মুক্তি পেতে এবং প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ব্যবস্থাপনা কৌশলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা জরুরি। একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে একটি শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা টিম বা ‘ম্যানেজমেন্ট টিম’ তৈরি করতে হবে।
এর মূল চাবিকাঠি হলো—ক্ষমতা ও দায়িত্বের বিকেন্দ্রীকরণ। এর ফলে:
- বিভিন্ন স্তরে দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে।
- প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।
- উদ্যোক্তা ব্যক্তিগত জীবনের জন্য সময় পান এবং নতুন নতুন উদ্ভাবনে মন দিতে পারেন।
এই মডেলটিকেই আধুনিক কর্পোরেট বিশ্বে Management Run Business বলা হয়। আমাদের দেশীয় উদ্যোক্তাদের এই মডেলটি গ্রহণ করতে হবে, যাতে তারা কেবল একজন ব্যবসায়ী হিসেবে নয়, বরং একজন সফল নেতৃত্বের কারিগর হিসেবে সমাজের নেতিবাচক চাপকে জয় করতে পারেন।
মনে রাখবেন: সমাজ আজ আপনাকে বাধা দিচ্ছে, কিন্তু কাল আপনার সাফল্য দেখে তারাই হাততালি দেবে। নিজের স্বপ্নের ওপর বিশ্বাস রাখা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা কৌশল গ্রহণ করাই হলো এই অসম লড়াইয়ে জেতার একমাত্র উপায়।
সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর
প্রধান নির্বাহী, বিজনেস ইনোভেশন এন্ড ইনকিউবেশন সেন্টার (বিআইআইসি)
আরও দেখুন:
