কুষ্টিয়ার পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে একটি আইডিয়া (খসড়া)

আমরা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী কুষ্টিয়াতে জন্মেছি। ঘর হতে দু-পা ফেললেই পেয়েছি সাঁইজির লালন শাহের মাজার, রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহের কুঠিবাড়ি, আমলডাঙ্গার নীলকুঠি, কাঙাল হরিনাথ ও মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা, ভেড়ামারা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, গড়াই ব্রিজ, মোহিনী মিল, সোনাবন্ধুর মাজার, জর্জবাড়ি—আরও কত কী!

আসলে সিন্ধু দেখার পর যেমন মানুষের শিশির বিন্দুর কথা মনে থাকে না, ঠিক তেমনি কুষ্টিয়ার গণ্ডির বাইরে যাওয়ার পর (বিশেষ করে চড়া পয়সা খরচ করে অন্য জায়গার পর্যটন দেখার পর) আমার বারবার মনে হয়েছে—কী অমূল্য রতন আমরা ঘরের কোণে হেলায় ফেলে নষ্ট করছি! তাই অনেকদিন থেকেই সহকর্মীদের সাথে আলাপ করছিলাম যে আমাদের কুষ্টিয়া নিয়ে কী করা যেতে পারে। আমাদের সামর্থ্য হয়তো স্বল্প, কিন্তু সাধ অনেক। আর সবকিছুর জন্য কেবল ‘সরকারি সাহায্যের’ দোহাই দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকাকে আমি এক ধরণের ভণ্ডামি মনে করি। তাই আমাদের নিজেদের যা আছে, তা-ই নিয়ে কাজ করার একটি বাস্তবমুখী পরিকল্পনার খসড়া তৈরি করলাম।

কুষ্টিয়ার পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে একটি আইডিয়া (খসড়া)

কুষ্টিয়ার উৎসব ও পর্যটনের বর্তমান চালচিত্র

একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, কুষ্টিয়াতে বছরজুড়ে মেলা আর উৎসবের কোনো কমতি নেই:

  • লালন স্মরণোৎসব: প্রতি বছর দোল পূর্ণিমায় ছেঁউড়িয়ার লালন একাডেমীতে বসে বাউলদের মহাসম্মেলন।
  • লালন তিরোধান দিবস: লালন শাহের মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন ও বিশাল লালন মেলা।
  • রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী: শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে রবীন্দ্র জন্মোৎসব ও গ্রামীণ মেলা।
  • মীর মশাররফ হোসেনের জন্মবার্ষিকী: লাহিনীপাড়ায় মীর মশাররফের জন্মজয়ন্তী ও গ্রামীণ মেলা।
  • হজরত সোলায়মান চিশতীর ওরশ: বাৎসরিক ওরশ ও গ্রামীণ উৎসব।
  • রথযাত্রা ও কালীপূজার মেলা: শহরের প্রধান সড়কে দিনব্যাপী রথযাত্রা এবং খোকসার বিখ্যাত কালী মন্দিরের ঐতিহ্যবাহী মেলা।
  • আড়ং মেলা: চৈত্র সংক্রান্তিতে আমলাপাড়া (পূর্ণবাবুর ঘাট), কুমারখালির সাঁওতা, বাগুলাট ও মিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে গ্রামীণ মেলা।

সমস্যা যেখানে, সম্ভাবনা সেখানে

উল্লেখিত প্রতিটি উপলক্ষে প্রতি বছর কুষ্টিয়াতে লাখো মানুষের সমাগম হয়। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা অতিথির সংখ্যা এত বেশি থাকে যে অনেকেই শেষ মুহূর্তে আবাসিক হোটেল না পেয়ে রাস্তায় বা উৎসব প্রাঙ্গণে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়ে দেন। প্রতি বছর পর্যটক বাড়ছে, আর অব্যাবস্থাপনার কারণে তাঁদের ভোগান্তিও বাড়ছে।

সবচেয়ে বড় আফসোসের বিষয় হলো—বিশেষ উপলক্ষে আসা অতিথিরা ওই নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান শেষেই কুষ্টিয়া থেকে ফিরে যান। তাঁরা কুষ্টিয়ার অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলো না দেখেই চলে যান। একে তো স্থানগুলো সম্পর্কে জানার কোনো ভালো গাইডলাইন নেই, তার ওপর সহজে যাতায়াতের কোনো সুব্যবস্থা নেই। অথচ একটু সুপরিকল্পিত চেষ্টা করলেই দর্শনার্থীদের মনে আমাদের ঐতিহাসিক স্থানগুলো নিয়ে তুমুল আগ্রহ তৈরি করা সম্ভব; আর খুব সহজ একটি ‘ট্যুর প্যাকেজ’ দিয়ে কুষ্টিয়ার আয় ও সুনাম—দুটোই এক ধাক্কায় বাড়িয়ে দেওয়া যায়।

আমার পরিকল্পনা: বাইক ট্যুর ও লাইট-অ্যান্ড-সাউন্ড শো

এই বিষয়ে আমার একটি স্বপ্নের পরিকল্পনা আগ্রহীদের সাথে শেয়ার করতে চাই। আপনাদের সামান্য সহযোগিতা আর ইতিবাচক মনোভাব পেলে এটি আলোর মুখ দেখবে:

১. ডিজিটাল স্টোরিটেলিং (Light and Sound Show): কুষ্টিয়ার প্রতিটি দর্শনীয় স্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমরা একটি আকর্ষণীয় ‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো’ (বা অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন) তৈরি করব।

২. লোকাল ট্রেইন্ড গাইড গ্রুপ: যেসব তরুণ বা যুবকদের নিজস্ব মোটর বাইক আছে এবং ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবে কাজ করার ইচ্ছা আছে, তাঁদের নিয়ে একটি গ্রুপ তৈরি করা হবে। তাঁদের কুষ্টিয়ার ইতিহাস, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও পেশাদার আচরণের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

৩. উৎসব প্রাঙ্গণে ক্যাম্পেইন: আগামী লালন উৎসবে বা যেকোনো বড় মেলায়, উৎসব প্রাঙ্গণের একটি ভালো জায়গায় সন্ধ্যার পর আমাদের তৈরি করা ওই লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো-টি প্রজেক্টরের মাধ্যমে প্রজেক্ট করা হবে। আমি নিশ্চিত, কুষ্টিয়ার রূপ-রস-ইতিহাসের ওই চমৎকার শো দেখার পর কোনো পর্যটক আমাদের দর্শনীয় স্থানগুলো না দেখে ফিরে যেতে পারবেন না।

৪. অন-স্পট প্যাকেজ রেজিস্ট্রেশন: ওই স্টল বা বুথ থেকেই আগ্রহী পর্যটকদের জন্য স্পট ও প্যাকেজ ভিত্তিক নিবন্ধনের ব্যবস্থা থাকবে। উদাহরণস্বরূপ—কেউ মাত্র ৫০০ টাকার বিনিময়ে কুষ্টিয়ার ৭টি প্রধান দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে পারবেন।

৫. স্মারক ও ট্যুর কুপন: নিবন্ধনের পর পর্যটকরা কুষ্টিয়ার দর্শনীয় স্থানগুলোর ওপর একটি তথ্যসমৃদ্ধ অ্যালবাম এবং একটি আকর্ষণীয় ট্যুরিস্ট কুপন পাবেন, যা তাঁরা স্যুভেনির বা স্মারক হিসেবে সাথে নিয়ে যেতে পারবেন।

৬. বাইক রাইড ও গাইড: এরপর আমাদের গাইড গ্রুপের সদস্যরা নিবন্ধিত প্যাকেজ অনুযায়ী পর্যটকদের নিজেদের বাইকে করে পরম যত্নে সব জায়গা ঘুরিয়ে দেখাবেন এবং ইতিহাস বুঝিয়ে বলবেন। ট্যুর শেষে পর্যটককে মূল স্টলে নিরাপদে পৌঁছে দিয়ে গাইড তাঁর পারিশ্রমিক বা টাকাটা সংগ্রহ করে নেবেন।

আগামীর অর্থনৈতিক রূপরেখা (ট্যুরিজম ইকোনমি)

শুরুর দিকে উৎসবের সময় দিয়ে ট্রায়াল শুরু হলেও, ক্রমশ বিষয়টি কুষ্টিয়াতে নিয়মিত রূপ নিতে পারে। এমন একটা সময় আসতে পারে, যখন কুষ্টিয়ার প্রতিটি বাড়ির বাড়তি ঘরটি পর্যটকদের জন্য একেকটি ‘হোমস্টে’ বা গেস্ট হাউজ হয়ে উঠবে। মোটর বাইক নিয়ে ঘুরে বেড়ানো আমাদের বেকার ছেলেটি হয়ে উঠতে পারে একজন সফল, আত্মবিশ্বাসী ট্যুরিস্ট গাইড। ট্যুরিস্টদের কেন্দ্র করে হোটেল, গেস্ট হাউজ, রেস্তোরাঁ, ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের দোকান, স্থানীয় স্যুভেনির শপ—সব মিলিয়ে কুষ্টিয়াতে তৈরি হতে পারে সম্পূর্ণ নতুন একটি ‘ট্যুরিজম-কেন্দ্রিক অর্থনীতি’

সফল করতে যা যা প্রয়োজন:

  • একটি চমৎকার ও প্রফেশনাল লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো বা ভিডিও কন্টেন্ট তৈরি।
  • সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুরো আইডিয়াটির জোরদার প্রচারণা।
  • উৎসব উদযাপন কমিটির আন্তরিক সহযোগিতা।
  • জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের প্রশাসনিক সম্পৃক্ততা।
  • ট্যুরিস্ট গাইড হতে ইচ্ছুক তরুণদের সঠিক মূল্যায়ন ও উন্নত প্রশিক্ষণ।
  • এলাকার সাধারণ মানুষের ইতিবাচক মনোভাব।

বর্তমান অবস্থা ও আমাদের আহ্বান

এই বিষয়ে ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসনের সাথে প্রাথমিক কথা বলে বেশ ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। কুষ্টিয়ার কোনো সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা তরুণ উদ্যোক্তা সংগঠন যদি এই আইডিয়াটি নিয়ে মাঠে নামতে চান, তবে আমরা তাঁদের সব ধরণের লজিস্টিক ও টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিতে প্রস্তুত আছি। আর যদি কেউ এগিয়ে নাও আসে, তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই—আমাদের ‘প্রযুক্তিতে কুষ্টিয়া’ টিমের পক্ষ থেকেই আমরা এই রূপান্তরের পুরো দায়িত্ব ও উদ্যোগটি লুফে নেব, ইনশাআল্লাহ।

এই স্বপ্নের প্রজেক্টটি সফল করতে এখন আপনাদের মূল্যবান মতামত, পরামর্শ ও আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। চলুন, আমাদের কুষ্টিয়াকে আমরাই বদলে দিই!

ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশায়,

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

প্রযুক্তিতে কুষ্টিয়া

Leave a Comment