বিগত এক দশকে বাংলাদেশের যে জেলাগুলো উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া তাদের মধ্যে অন্যতম। তিতাস নদীর তীরে অবস্থিত এই জেলাটি এখন কেবল শিল্প-সংস্কৃতির রাজধানী নয়, বরং আধুনিক অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক কেন্দ্রবিন্দু। সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণে জেলাটি এখন একটি টেকসই উন্নয়নের পথে ধাবমান।
১. অবকাঠামো ও যোগাযোগ: উন্নয়নের মহাসড়কে ব্রাহ্মণবাড়িয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভৌগোলিক গুরুত্ব বিবেচনায় যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়ক: ঢাকা-সিলেট ও চট্টগ্রাম-সিলেট মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে জেলাটির প্রধান সড়কগুলো প্রশস্ত ও চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে। গ্রামীণ সড়কগুলোর আধুনিকায়নে প্রান্তিক পর্যায়ের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়েছে।
সেতু ও কালভার্ট: নবীনগর-শিবপুর-রাধিকা সড়ক এবং তিতাস নদীর ওপর নির্মিত একাধিক সেতু দুর্গম এলাকাগুলোকে জেলা শহরের সাথে সরাসরি যুক্ত করেছে।
শতভাগ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: প্রাকৃতিক গ্যাসের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে জেলাটির প্রতিটি ঘরে এখন বিদ্যুতের আলো পৌঁছেছে। সোলার হোম সিস্টেমের মাধ্যমে দুর্গম চরাঞ্চলেও উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে।
২. শিক্ষা ও মানবসম্পদ: মেধার বৈশ্বিক বিকাশ
শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা প্রসারে জেলাটি অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানিক উন্নয়ন: নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের পাশাপাশি পুরাতন সরকারি কলেজ ও উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও আইসিটি ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে।
কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষা: চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জেলাজুড়ে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (TTC) ও ভোকেশনাল সেন্টারগুলোর মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা হচ্ছে।
সামাজিক সুরক্ষা: মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে উপবৃত্তি এবং শিক্ষা সহায়তা কার্যক্রম দ্বিগুণ করা হয়েছে।
৩. স্বাস্থ্যসেবা: দ্বারে দ্বারে আধুনিক চিকিৎসা
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবকাঠামো ও সেবার মান কয়েক গুণ বেড়েছে।
হাসপাতালের আধুনিকায়ন: জেলা সদর হাসপাতালকে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও আইসিইউ সুবিধাসহ শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।
কমিউনিটি ক্লিনিক: মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্ভাবনী মডেল ‘কমিউনিটি ক্লিনিক’-এর মাধ্যমে একদম গ্রাম পর্যায়ে মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং বিনামূল্যে ঔষধ নিশ্চিত করা হয়েছে।
৪. কৃষি ও শিল্পের বিপ্লব: সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত
ব্রাহ্মণবাড়িয়া এখন আর কেবল কৃষিনির্ভর নয়, এটি শিল্পায়নের নতুন কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।
আধুনিক কৃষি: তিতাসের অববাহিকায় আধুনিক সেচ ব্যবস্থা ও উন্নত বীজের ব্যবহারে ফসল উৎপাদন কয়েক গুণ বেড়েছে। মাশরুম চাষ, ফল বাগান এবং মৎস্য চাষে জেলাটি এখন উদ্বৃত্ত উৎপাদনকারী।
SME ও শিল্পায়ন: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসারে উদ্যোক্তাদের ঋণ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। আশুগঞ্জ বন্দর এবং সরাইলের বিসিক শিল্পনগরী জেলার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে।
বিনিয়োগ আকর্ষণ: গ্যাস সমৃদ্ধ অঞ্চল হওয়ায় ভারী শিল্পের বড় বিনিয়োগ এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ামুখী।
৫. ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও জনগণের অংশগ্রহণ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উন্নয়নের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আধুনিকতার সাথে ঐতিহ্যের সমন্বয়।
সাংস্কৃতিক সুরক্ষা: ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-এর স্মৃতিধন্য এই জেলার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো সংস্কার এবং শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা সরকারিভাবে করা হচ্ছে।
জনভাগীদারিত্ব: প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয় জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের মডেল তৈরি করা হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আজ এক আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সুপরিকল্পিত অবকাঠামো, আধুনিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার জেলাটির মানুষের জীবনযাত্রার মানকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হবে স্মার্ট বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জেলা।
প্রতিবেদনটি আপনাদের প্রচারের বা রেফারেন্সে কাজে লাগতে পারে বলে আপলোড করে রাখলাম।
