একাত্তরের ঘাতক-দালাল বাহিনী গঠন, মতাদর্শ ও তৎপরতার ঐতিহাসিক দলিল । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বাঙালি নিধনে নামলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তারা বুঝতে পারে, সম্পূর্ণ অচেনা একটি ভূখণ্ডে কেবল দূর দেশ থেকে আসা নিয়মিত সেনাবাহিনী দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা অসম্ভব। বিশেষ করে মে মাস থেকে যখন ট্রেইন্ড মুক্তিবাহিনী দেশজুড়ে গেরিলা আক্রমণ (Hit and Run Policy) তীব্রতর করতে শুরু করে, তখন পাকিস্তানি আর্মি স্থানীয় দোসরদের নিয়ে বিশেষ আধাসামরিক বাহিনী গঠনের কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেয়।

Table of Contents

একাত্তরের ঘাতক-দালাল বাহিনী গঠন, মতাদর্শ ও তৎপরতার ঐতিহাসিক দলিল

রাজাকার বাহিনীর ইতিহাস ও কর্মকাণ্ড

রাজাকার শব্দটির উৎপত্তি মূলত আরবি ‘রি’দাকার’ (স্বেচ্ছাসেবক) থেকে, যা পরে ফারসিতে ‘রেজাকার’ এবং উর্দু হয়ে আমাদের লোকমুখে ‘রাজাকার’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় হায়দরাবাদের নিজাম যখন ভারতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান, তখন ভারতীয় বাহিনীকে প্রাথমিকভাবে বাধা দেওয়ার জন্য ‘রাজাকার’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করা হয়েছিল। তবে বাঙালি জাতির ইতিহাসে এই শব্দটি এক চরম নৃশংসতা ও কলঙ্কের প্রতীক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা করার জন্য এই আধা-সামরিক বাহিনীটি গঠন করা হয়, যার সিংহভাগ সদস্যই ছিল বাঙালি এবং কিছু স্থানীয় উর্দুভাষী (বিহারী)।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান শাখার সহকারী আমির মাওলানা এ কে এম ইউসুফ এই বাহিনী গড়ে তোলেন। এদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিত পাকিস্তানি আর্মি। অন্যদিকে, রাজনৈতিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের পরিকল্পিতভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে ২২ এপ্রিল জামালপুরে ‘আলবদর’ বাহিনী গঠন করেন তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি মুহম্মদ আশরাফ হোসাইন। আলবদরের মূল লক্ষ্য যেখানে ছিল বুদ্ধিজীবী হত্যা, সেখানে রাজাকারের মূল কাজ ছিল সরাসরি মুক্তিযোদ্ধাদের মুখোমুখি হওয়া ও প্রতিরোধ করা।

গঠন ও শপথ গ্রহণ

১৯৭১ সালের মে মাসে খুলনার খানজাহান আলী সড়কের একটি আনসার ক্যাম্পে ৯৬ জন জামায়াত কর্মীকে নিয়ে প্রথম রাজাকার বাহিনী যাত্রা শুরু করে। এই বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে পবিত্র কুরআন ছুঁয়ে শপথ নিতে হতো। ১৯৭১ সালের ২১ জুনের ‘দৈনিক সংগ্রাম’ পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী তাদের শপথটি ছিল:

“I shall bear true allegiance to the constitution of Pakistan as framed by law and shall defend Pakistan, if necessary, with my life.” > (অর্থাৎ, “আমি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের সংবিধানের প্রতি সত্যিকারের আনুগত্য প্রদর্শন করব এবং প্রয়োজনে জীবন দিয়ে হলেও পাকিস্তানকে রক্ষা করব।”)

প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ও নিয়ন্ত্রণ

শুরুর দিকে রাজাকারদের নিয়ন্ত্রণ করত স্থানীয় ‘শান্তি কমিটি’ (যা জামায়াত ও সমমনা দলগুলোর সদস্যদের নিয়ে গঠিত এক ধরনের স্থানীয় প্রশাসন ছিল)। পরে ১৯৭১ সালের ১ জুন, জেনারেল টিক্কা খান ‘পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স-১৯৭১’ জারি করে বিলুপ্ত আনসার বাহিনীকে রাজাকারে রূপান্তর করেন। এর ফলে এটি পাকিস্তানের একটি আধা-সামরিক বাহিনীর স্বীকৃতি পায়, যদিও এর মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বে ছিল স্বাধীনতাবিরোধী বাঙালিরাই। এরপর গোলাম আযমসহ অন্যান্য জামাত নেতারা মুক্তিযোদ্ধাদের দমনে রাজাকারদের আরও বেশি ব্যবহারের তাগিদ দেন। অবশেষে ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক অধ্যাদেশে রাজাকারদের সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

যুদ্ধক্ষেত্রে রাজাকারদের হাতে সাধারণত হালকা আগ্নেয়াস্ত্র দেওয়া হতো। পাকিস্তানি সেনাদের তাবেদার বা সহযোগী হিসেবে এরা মূলত মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে থাকা সাধারণ মানুষের খোঁজখবর পাকিস্তানিদের কাছে পৌঁছে দিত। এর বাইরে পাকিস্তানি সেনাদের রসদ ও মালামাল বহন করা, গ্রামগঞ্জ থেকে জোর করে গরু-ছাগল ধরে আনা এবং পাকিস্তানি সৈন্যদের খুশি করতে বাঙালি নারীদের ধরে নিয়ে যাওয়ার মতো জঘন্য অপরাধে তারা লিপ্ত ছিল। নিজেদের আখের গোছাতে তারা নির্বিচারে লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ চালাত।

রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা কোরআন ছুঁয়ে শপথ নিচ্ছে
রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা কোরআন ছুঁয়ে শপথ নিচ্ছে

প্রশিক্ষণ ও বিলুপ্তি

রাজাকারদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ হতো ১৫ দিনের। ১৯৭১ সালের ১৪ জুলাই কুষ্টিয়ায় তাদের প্রথম ব্যাচের ট্রেনিং শেষ হয়। সেপ্টেম্বর মাসে এই বাহিনীর দেখভালের দায়িত্ব পান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ জামশেদ। এরপর ২৭ নভেম্বর সাভারে রাজাকার কোম্পানি কমান্ডারদের প্রথম ব্যাচের বিদায়ী কুচকাওয়াজে অভিবাদন নেন পাকিস্তানি পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক অধিনায়ক জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজি। শেষের দিকে এটি একটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তরের মর্যাদা পায়। তবে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের সাথে সাথেই রাজাকাররা আত্মগোপন করে এবং বাহিনীটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়।

দৈনিক সংগ্রাম ২১ জুন, ১৯৭১
দৈনিক সংগ্রাম ২১ জুন, ১৯৭১

এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মূলত চার ধরনের কোলাবোরেটর বা দালাল বাহিনী গড়ে তোলা হয়:

১. রাজাকার বাহিনী: মূলত আনসার ও সাধারণ অপরাধপ্রবণ মুসলিম লীগ ঘরানার লোকদের নিয়ে গঠিত লাঠিয়াল ও পাহারাদার বাহিনী।

২. মুজাহিদ বাহিনী: আধা-সামরিক কায়দায় রাইফেল ট্রেইন্ড ফোর্স।

৩. আল-বদর বাহিনী: তৎকালীন ‘ইসলামী ছাত্র সংঘ’ (বর্তমান ছাত্রশিবির)-এর ক্যাডারদের নিয়ে গঠিত উগ্র মতাদর্শিক কিলিং স্কোয়াড, যারা বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ছিল।

৪. আল-শামস বাহিনী: মুসলিম লীগ ও অন্যান্য ডানপন্থী ছাত্র-যুবকদের নিয়ে গঠিত আরেকটি উগ্রপন্থী সংগঠন।

তৎকালীন সময়ে পাকিস্তান সরকারের কঠোর সেন্সরশিপের মধ্যে প্রকাশিত ‘দৈনিক পাকিস্তান’ পত্রিকার পাতায় এই বাহিনীগুলোর গঠন, প্যারেড এবং মুক্তিযোদ্ধাদের (যাদের তৎকালীন প্রোপাগান্ডায় ‘দুষ্কৃতকারী’ বা ‘ভারতীয় চর’ বলা হতো) বিরুদ্ধে তাদের অভিযানের খবরগুলো অত্যন্ত গৌরবগাথা হিসেবে ছাপা হতো। আজ স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এই খবরগুলোই তাদের রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং যুদ্ধাপরাধের অকাট্য দলিল।

নিচে ১৯৭১ সালের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সংবাদপত্রে প্রকাশিত সেই মূল ধারার প্রতিবেদনগুলো অবিকৃতভাবে বিন্যস্ত করা হলো:

জুলাই ১৯৭১ – রাজাকার ও মুজাহিদ বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ

মে-জুন মাসে অধ্যাদেশ জারির পর জুলাই মাস নাগাদ পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যন্ত থানা পর্যায়েও রাজাকারদের প্রাতিষ্ঠানিক ট্রেনিং ও কুচকাওয়াজ শুরু হয়ে যায়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় শান্তি কমিটির (Peace Committee) নেতাদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে যুবকদের অস্ত্রধারী করা।

দলিল ১: ফুলপুরে রাজাকারদের ট্রেনিং সমাপ্ত

  • শিরোনাম: ফুলপুরে রাজাকারদের ট্রেনিং সমাপ্ত
  • সূত্র: দৈনিক পাকিস্তান
  • তারিখ: ১০ জুলাই, ১৯৭১

ঢাকা, ৯ই জুলাই (এপিপি): ফুলপুর থানা ট্রেনিং ও উন্নয়ন কেন্দ্রের মাঠে ১৬৯০ জন রাজাকার-এর এক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। এরা সকলেই সাত দিনের ট্রেনিং শেষ করেছেন। এই অনুষ্ঠানে ট্রেনিং প্রাপ্ত ব্যক্তিরা ছাড়াও শান্তি কমিটির সদস্য, ইউনিয়ন কাউন্সিলরসমূহের চেয়ারম্যান ও মেম্বারগণ এবং বিপুল সংখ্যক জনসাধারণ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে ১৬০ জন রাজাকারকে সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়। এছাড়া দু’জন রাজাকারকে তাঁদের কৃতিত্ব ও कर्तव्य নিষ্ঠার জন্য নগদ টাকা পুরষ্কার দেয়া হয়।

ফুলপুর থানা থেকে মোট সাড়ে ছ’শ রাজাকার মনোনীত করা হয় এবং এদের সকলকেই ট্রেনিং দেয়া হবে। কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানটি “پاکستان زندہ باد” (পাকিস্তান জিন্দাবাদ), “কায়েদে আযম জিন্দাবাদ” ও “পাকিস্তানের সংহতি জিন্দাবাদ” শ্লোগানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।

দলিল ২: কুষ্টিয়ায় মুজাহিদ ও রাজাকারদের যৌথ কুচকাওয়াজ

  • শিরোনাম: কুষ্টিয়ার মুজাহিদ ও রাজাকারদের কুচকাওয়াজ
  • সূত্র: দৈনিক পাকিস্তান
  • তারিখ: ১৬ জুলাই, ১৯৭১

কুষ্টিয়া, ১৫ই জুলাই (এপিপি): গতকাল সকালে স্থানীয় ইউনাইটেড স্কুল ময়দানে মুজাহিদ ও রাজাকারদের কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে পদস্থ সরকারী অফিসার ও গণ্য মান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ বহু সংখ্যক লোক উপস্থিত ছিলেন। জেলা কমিটির চেয়ারম্যান জনাব সাদ আহমদ দুই হাজার রাজাকারের অভিবাদন গ্রহণ করেন।

রাজাকারদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে জনাব সাদ আহমদ ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে মাতৃভূমি রক্ষার কাজে রাজাকাররা স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসায় তিনি তাদেরকে অভিনন্দন জানান। তিনি তাঁদের প্রতি সুদৃঢ়ভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং শত্রুদের ধ্বংস করার কাজে সশস্ত্র বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য আহবান জানান।

উৎসাহী রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যবৃন্দ এবং সমাবেশে যোগদানকারী জনতার একটা অংশ বিভিন্ন শ্লোগান সহকারে প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। তারা “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” প্রভৃতি শ্লোগান দেয়।

দলিল ৩: ইউনিয়ন পর্যায়ে শান্তি কমিটির মাধ্যমে রাজাকার নিয়োগ

  • শিরোনাম: ইসলামপুর শান্তি কমিটির সভায় রাজাকার বাহিনী গঠিত
  • সূত্র: দৈনিক পাকিস্তান
  • তারিখ: ২৭ জুলাই, ১৯৭১

গত রোববার ইসলামপুর ইউনিয়ন শান্তি কমিটির অফিসে এক জরুরী সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ইসলামপুর ইউনিয়ন শান্তি কমিটির আহবায়ক জনাব মোবারক হোসেন সভাপতিত্ব করেন।

ইসলামপুর ইউনিয়ন শান্তি কমিটির এক প্রেস রিলিজে বলা হয় যে, সভায় প্রত্যেকটি ইউনিটের ২৫ জন করে লোক নিয়ে একটি রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়। সভায় মহল্লার শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। সভায় পাকিস্তানের সংহতি ও ঐক্যের জন্য বিশেষ মোনাজাত করা হয়। পাকিস্তান বাহিনীর সময় মত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সভায় পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করা হয়।

আগস্ট-সেপ্টেম্বর ১৯৭১ – আল-বদর বাহিনীর আত্মপ্রকাশ ও দেশব্যাপী সশস্ত্র তৎপরতা

আগস্ট মাস নাগাদ রাজাকারদের সাধারণ পাহারাদারি ও প্যাসসিভ ডিউটি থেকে সরিয়ে সরাসরি কম্ব্যাট বা আক্রমণাত্মক অভিযানে ব্যবহার শুরু করে পাকিস্তানি আর্মি। একই সাথে সেপ্টেম্বর মাসে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ‘ইসলামী ছাত্র সংঘ’-এর ক্যাডারদের নিয়ে গঠিত হয় অত্যন্ত সুসংগঠিত ও দুর্ধর্ষ ঘাতক স্কোয়াড ‘আল-বদর’

দলিল ৪: ময়মনসিংহে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর রাজাকারদের আক্রমণ

  • শিরোনাম: রাজাকাররা, ৭০ জন দুষ্কৃতীকারীকে হত্যা করেছে
  • সূত্র: দৈনিক পাকিস্তান
  • তারিখ: ১০ আগস্ট, ১৯৭১

ঢাকা, ৯ই আগস্ট (এপিপি): রাজাকাররা ময়মনসিংহ জেলায় গত মাসে ৭০ জন রাষ্ট্র বিরোধী লোককে নিহত এবং বহুজনকে আহত করেছে। এছাড়া তারা বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ দখল করেছে। গতকাল সোমবার ঢাকায় এপিপি এ খবর পরিবেশন করেছে।

এখানে প্রাপ্ত বিস্তারিত খবরে প্রকাশ, দুষ্কৃতকারীরা গত ৪ঠা জুলাই শেরপুরের কাছে একটি গ্রামের সেতু ধ্বংস করার চেষ্টা করে। রাজকাররা তাঁদের বহুজনকে হতাহত করে সেতু ধ্বংস করার চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। “দুষ্কৃতকারীরা” ১৯টি লাশ, ১৩ খণ্ড টিএনটি, কয়েকটি হাতবোমা, ট্যাংক বিধ্বংসী মাইন এবং ভারতে তৈরী ১৯টি বিস্ফোরক টিউব ছেড়ে পালিয়ে গেছে।

শেরপুর থেকে ২০ মাইল দূরবর্তী একটি গ্রামে “দুষ্কৃতকারীদের” অবস্থানের খবর পেয়ে পরদিন রাজাকাররা উক্ত গ্রামে গিয়ে ২০ জন দুষ্কৃতকারীকে হত্যা করেছে এবং কিছু rifle, হাতবোমা এবং ৩০০ মন চাউল উদ্ধার করেছে।

১৩ ও ১৪ ই জুলাইয়ের রাতে রাজাকাররা যখন নিয়মিত টহলদারিতে নিয়োজিত, সেই সময় নকলা এলাকায় “দুষ্কৃতকারীদের” সাথে তাঁদের সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষে রাজাকাররা ৪ জন দুষ্কৃতকারীকে হত্যা করে। তারা দু’টো স্টেনগান, ৬ টি হাতবোমা, ৬০ রাউন্ড .৩০৩ রাইফেলের গুলি উদ্ধার করে।

দলিল ৫: রাজশাহীতে ধর্মীয় অনুষঙ্গে রাজাকারদের শপথ গ্রহণ

  • শিরোনাম: রাজশাহীতে রাজাকারদের কুচকাওয়াজ
  • সূত্র: দৈনিক পাকিস্তান
  • তারিখ: ১৬ আগস্ট, ১৯৭১

রাজশাহী, ১৫ই আগস্ট (ইউপিআই): ট্রেনিং সমাপ্তি শেষে রাজাকারদের দ্বিতীয় দলটি গত বৃহস্পতিবার এখানে তাদের কুচকাওয়াজে পাকিস্তান ও ইসলামের স্বার্থে তাদের জীবন উৎসর্গ করার শপথ গ্রহণ করে। সাহেব বাজার জামে মসজিদের ইমাম তাদের অভিবাদন গ্রহণ করেন। রাজাকারদের তাদের পবিত্র দায়িত্ব সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়। শান্তি কমিটির সদস্যবৃন্দ সহ অপরাপর নেতৃবৃন্দও উক্ত অনুষ্ঠানে ভাষণ দান করেন।

দলিল ৬: গফরগাঁওয়ে ‘আল-বদর’ বাহিনীর অফিশিয়াল আত্মপ্রকাশ

  • শিরোনাম: গফরগাঁয়ে আল-বদর বাহিনী গঠিত
  • সূত্র: দৈনিক পাকিস্তান
  • তারিখ: ৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

গফরগাঁও, ২রা সেপ্টেম্বর (নিজস্ব সংবাদদাতা): গতকাল বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে গফরগাঁয়ে আল-বদর বাহিনী গঠিত হয়েছে। এতদুপলক্ষে এখানে এক সভার আয়োজন করা হয়, এবং তাতে স্থানীয় শিক্ষক, ছাত্র, যুবক, রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যবর্গসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের লোক যোগদান করেন।

অনুষ্ঠানের সভাপতি মাওলানা আনিসুর রহমান মুর্শিদাবাদী বক্তৃতায় আল-বদর বাহিনীর আদর্শ ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেন এবং আল-বদর বাহিনীর দেশপ্রেমিক যুবকদের দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে আত্মনিয়োগ করতে বলেন। সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তৃতা করেন ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের ছাত্র সংঘের নেতা জনাব মহিউদ্দিন ও ময়মনসিংহ জেলার ইসলামী ছাত্র সংঘের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জনাব মুজিবুর রহমান।

 

নভেম্বর ১৯৭১ – আল-শামসের তাণ্ডব ও ‘বদর দিবস’-এর উগ্র সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ

নভেম্বর মাসে যখন চারদিক থেকে মুক্তিবাহিনী ঢাকার দিকে ধেয়ে আসছিল, তখন পাকিস্তানি আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকা সংবাদপত্রগুলোতে রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর কাল্পনিক ‘সাফল্যগাথা’ এবং উগ্র মনস্তাত্ত্বিক প্রোপাগান্ডা ছড়ানো চরম আকার ধারণ করে।

দলিল ৭: আল-শামস বাহিনীর ত্রিফলা অভিযান

  • শিরোনাম: আল-শামস বাহিনীর তৎপরতা
  • সূত্র: দৈনিক পাকিস্তান
  • তারিখ: ৩ নভেম্বর, ১৯৭১

গতকাল মঙ্গলবার রাজাকার সংস্থার স্বেচ্ছাবাহিনী “আল-শামস” ময়মনসিংহ, যশোর ও চট্টগ্রামে সাফল্যের সঙ্গে তিনটি অভিযান চালায়। আল-শামস রাজাকার সংস্থার একটি স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী। এরা সেনাবাহিনীর তদারকিতে ট্রেনিং গ্রহণ ও কাজ করেছে।

ময়মনসিংহে তারা কিশোরগঞ্জের দক্ষিণ-পূর্বে ভারতীয় চরদের একটি গোপন আড্ডায় আক্রমণ চালিয়ে স্টেনগান, ৯ টি রাইফেল এবং ৫ টি হাত বোমা উদ্ধার করে। এসব অস্ত্র উদ্ধার করার সময় তারা একদল ভারতীয় চরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং তাদের ৩ জনকে হত্যা করে। অন্যান্যরা পালিয়ে যায়।

চট্টগ্রাম থেকে এপিপির খবরে বলা হয়, দেশপ্রেমিক নাগরিকদের মাধ্যমে সন্ধান পেয়ে আল-শামস চট্টগ্রামের উত্তরে হাটহাজারীতে একটি বেসরকারি বাড়িতে হানা দিয়ে নাশকতামূলক প্রচুর বই পুস্তক উদ্ধার করে। তারা বাড়ীর মালিককে ও গ্রেফতার করে।

যশোর আল-শামস ঝিনাইদহের দক্ষিণ-পূর্বে আরেকটি পাড়ায় ভারতীয় চরদের সঙ্গে এক সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং তাদের ৪ জনকে হত্যা করে। এতে আল-শামস এর একজন সদস্যও আহত হয়। ভারতীয় চরদের আঘাত হানার পর আল-শামস ভারতীয় অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি ডিপোর সন্ধান লাভ করে। সেখান থেকে ১৩ টি রাইফেল, ২৪ টি শর্ট মাইন এবং ৬০ পাউন্ড বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করে।

দলিল ৮: দেশব্যাপী কোলাবোরেটরদের সম্মিলিত হামলা ও পুলিশি সহায়তা

  • শিরোনাম: রাজাকারদের সাফল্যজনক অভিযান
  • সূত্র: দৈনিক পাকিস্তান
  • তারিখ: ۵ নভেম্বর, ১৯৭১

পিরোজপুর, ৪ঠা নভেম্বর: মহকুমার নাজিরপুর থানার রাজাকাররা থানার পুলিশের সাহায্যে সাতকানিয়ায় একদল ভারতীয় চরের সঙ্গে সাহসিকতার সাথে লড়াই করে। সংঘর্ষে ৪ জন ভারতীয় চর নিহত হয়েছে এবং একজন ভারতে তৈরী একটি স্টেনগান, একটি রাইফেল ও দু’টো স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র সহ ধরা পরেছে বলে এক সরকারী হ্যান্ড আউটে প্রকাশ।

এপিপি পরিবেশিত খবরে প্রকাশ, রাজাকাররা দ্রুত অভিযান চালিয়ে বান্দরবন এলাকা থেকে ভারতীয় চরদের নির্মুল করেছে। তারা দুজন ভারতীয় চরকে হত্যা ও দুজনকে বন্দী করেছে। সিলেট থেকে প্রাপ্ত খবরে প্রকাশ, রাজাকারদের আল-শামস বাহিনী সুনামগঞ্জের উত্তর পশ্চিম এলাকায় টহল দেয়ার সময় দু’টো সন্দেহ জনক নৌকাকে চ্যালেঞ্জ করলে আরোহীরা তাদের প্রতি গুলি ছুড়তে শুরু করে। রাজাকাররা পাল্টা গুলি চালালে ৪ জন নিহত হয়।

ভৈরব বাজার থেকে প্রাপ্ত খবরে প্রকাশ আল-বদর বাহিনী ভৈরব বাজার থেকে ৩ মাইল উত্তর পূর্বে শিমুল কান্দিতে ভারতীয় চরদের গোপন আড্ডায় হানা দিয়ে ৬ টি রাইফেল, ৪ টি স্টেনগান, ৮ টি বেয়নেট ও গোলা বারুদ উদ্ধার করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে প্রাপ্ত অপর এক খবরে বলা হয়েছে যে, রাজাকাররা বিদ্যাকোটের কাছে ভারতীয় চরদের সাথে এক সংঘর্ষে ৩ জন কে হত্যা করেছে অপর ৫ জন অস্ত্রশস্ত্রসহ আত্মসমর্পন করেছে।

দলিল ৯: কুমিল্লা ও রাজশাহীতে যৌথ কোলাবোরেটর অপারেশন

  • শিরোনাম: আল-শামস ও আল-বদর বাহিনীর সাফল্যজনক অভিযান
  • সূত্র: দৈনিক পাকিস্তান
  • তারিখ: ৭ নভেম্বর, ১৯৭১

রাজাকারের আল-শামস ও আল-বদর বাহিনী গতকাল শনিবার কুমিল্লা ও রাজশাহী জেলায় দুটো সাফল্যজনক অভিযান পরিচালনা করে বলে এপিপির খবরে প্রকাশ। কুমিল্লা থেকে প্রাপ্ত খবরে প্রকাশ, আল-শামস ও রাজাকাররা জানতে পারে যে একদল ভারতীয় চর কুমিল্লা জেলার চাঁদপুরের দক্ষিণে অবস্থিত গুলসিয়া গ্রামের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ভারতীয় চররা গ্রামটিতে পৌঁছা মাত্র রাজাকাররা তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ৫ জনকে হত্যা করে।

রাজশাহী থেকে প্রাপ্ত অপর এক খবরে বলা হয় যে আল বদর-রাজাকাররা গতকাল নওগাঁর ১০ মাইল দক্ষিণে চৌধুরী ভবানীপুরের কাছে ভারতীয় চরদের একটি গোপন আড্ডায় হানা দেয়। তদের আগমনের খবর পেয়ে ভারতীয় চররা কার্তুজ ও বিস্ফোরক ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।

দলিল ১০: ঐতিহাসিক ‘বদর দিবস’ এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের উগ্র প্রোপাগান্ডা ও হুঙ্কার

(নোট: এই দলিলটি স্বাধীন বাংলাদেশে আল-বদর নেতাদের যুদ্ধাপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে একটি প্রধানতম অকাট্য রাষ্ট্রীয় প্রমাণ বা এক্সিবিট হিসেবে গণ্য করা হয়।)

  • শিরোনাম: বদর দিবস পালিত (পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও সংহতি রক্ষার দৃঢ় সংকল্প ঘোষণা)

  • সূত্র: দৈনিক পাকিস্তান

  • তারিখ: ৮ নভেম্বর, ১৯৭১

গতকাল রোববার বদর দিবস পালন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে গতকাল বিকেলে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে ঢাকা শহর ইসলামী ছাত্র সংঘের উদ্যোগে এক গণজমায়েত অনুষ্ঠিত হয়। এরপর এক মিছিল বেরোয়। গণজমায়েতে পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি জনাব আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এই বদর দিবস উপলক্ষে সংঘের পক্ষ থেকে একটি ৪-দফা ঘোষণা করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে—

(১) “দুনিয়ার বুকে হিন্দুস্তানের কোন মানচিত্রে আমরা বিশ্বাস করি না, যতদিন পর্যন্ত দুনিয়ার বুক থেকে হিন্দুস্তানের নাম মুছে না দেয়া যাবে ততদিন পর্যন্ত আমরা বিশ্রাম নেব না”।

লাইব্রেরীসমূহের প্রতি লক্ষ্য করে তিনি তার দ্বিতীয় দফা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন—

(২) “আগামী কাল থেকে হিন্দু লেখকদের কোন বই অথবা হিন্দুদের দালালী করে লেখা পুস্তকাদি লাইব্রেরীতে স্থান দিতে পারবেন না বা বিক্রি বা প্রচার করতে পারবেন না। যদি কেউ করেন তবে পাকিস্তানের অস্তিত্বে বিশ্বাসী স্বেচ্ছাসেবকরা জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেবে”।

 

জনাব মুজাহিদের বাকি দুটো ঘোষণা হলোঃ

(৩) পাকিস্তানের অস্তিত্বে বিশ্বাসী স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পর্কে বিরূপ প্রচার করা হচ্ছে। যারা এই অপপ্রচার করছে তাদের সম্পর্কে হুশিয়ার থাকুন এবং

(৪) বায়তুল মোকাদ্দাসকে উদ্ধারের সংগ্রাম চলবে।

জনাব মুজাহিদ এই ঘোষণাকে বাস্তবায়িত করার জন্য ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, জনতার প্রতি আহবান জানান। তিনি বলেন— “এই ঘোষণা বাস্তবায়িত করার জন্য শির উঁচু করে, বুকে কোরান নিয়ে মর্দে মুজাহিদের মতো এগিয়ে চলুন। প্রয়োজন হলে নয়াদিল্লী পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে আমরা বৃহত্তর পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করবো”।

জমায়েতে ঢাকা শহর ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি জনাব শামসুল হক সভাপতিত্ব করেন। বক্তৃতা দেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র সংঘের সাধারণ সম্পাদক জনাব মীর কাসেম আলী। তিনি বলেন যে, আজকে বদর দিবসের শপথ হলো— (ক) ভারতের আক্রমণ রুখে দাঁড়াবো, (খ) দুষ্কৃতিকারীদের খতম করবো, (গ) ইসলামী সমাজ কায়েম করবো।

সভার পর এক মিছিল বেরোয়। নওয়াবপুর রোড হয়ে বাহাদুরশাহ পার্কে গিয়ে তা শেষ হয়। মিছিলের কয়েকটি শ্লোগান ছিল: ১/ আমাদের রক্তে পাকিস্তান টিকবে। ২/ বীর মুজাহিদ অস্ত্র ধর, ভারতকে খতম কর। ৩/ মুজাহিদ এগিয়ে চল, কলিকাতা দখল কর। ৪/ ভারতের চরদের খতম কর ইত্যাদি।

দলিল ১১: নৌপথে ও সেতু পাহায়ায় রাজাকারের তাণ্ডব

  • শিরোনাম: সিলেট ও পাবনায় রাজাকার তৎপরতা
  • সূত্র: দৈনিক পাকিস্তান
  • তারিখ: ১৬ নভেম্বর, ১৯৭১

গতকাল সোমবার রাজাকাররা সিলেট ও পাবনায় ভারতীয় চর বহনকারী ৯টি নৌকা ডুবিয়ে দিয়েছে। ঢাকায় প্রাপ্ত এপিপি পরিবেশিত খবরে জানা গেছে, নৌকা যোগে প্রায় দুই শত ভারতীয় চর সিলেটের জাকিগঞ্জের নিকট পাকিস্তানী এলাকায় প্রবেশ করতে যাচ্ছে এই খবর জানতে পেয়ে ৫০ জন রাজাকার উক্ত এলাকায় গমন করে এবং ওৎ পেতে থাকে। নৌকাগুলো সীমান্তের এপাশে আসার সাথে সাথে রাজাকাররা তাদের উপর গুলিবর্ষণ করে। ৩টা নৌকা ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে।

রাজাকারদের গুলিতে পাবনা জেলার টিকোরির নিকট ভারতীয় চরবাহী আরও ৬টি নৌকা উল্টে পানিতে ডুবে গেছে। অপর এক খবরে জানা যায় যে গতকাল সোমবার রাজাকাররা রংপুর ও কুমিল্লা জেলায় একটি রেল সেতু ও একটি সড়কসেতু রক্ষা করেছে। রেল সেতুটি রংপুর জেলার গাইবান্ধার ২ মাইল দক্ষিণে ত্রিমোহনিতে অবস্থিত।

১৯৭১ – রাজাকার বাহিনীর দাপ্তরিক যোগাযোগ, সামরিক সিলেবাস ও আইনি কাঠামো

নভেম্বর ১৯৭১-এর মাঠপর্যায়ের অভিযানের পর, রাজাকারদের প্রাতিষ্ঠানিক ও দাপ্তরিক কাঠামোর দিকে নজর দিলে দেখা যায়—পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এই বাহিনীকে স্রেফ লাঠিয়াল হিসেবে নয়, বরং নিয়মিত সামরিক বাহিনীর একটি আইনি অনুঘটক হিসেবে গড়ে তুলেছিল। তাদের নিয়মিত বেতন-ভাতা, প্রশিক্ষণের জন্য কঠোর ও গোপন সিলেবাস এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার নামে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক শপথনামা জারি করা হয়েছিল।

দলিল ১২: যশোর সেনানিবাস থেকে রাজাকারদের বেতন নিয়মিতকরণের নির্দেশ

  • শিরোনাম: রাজাকারদের বেতন
  • সূত্র: দাপ্তরিক মেমো, এইচকিউ (হেড কোয়ার্টার) এএসএমএলএ যশোর
  • তারিখ: ৩০ আগস্ট, ১৯৭১

এইচকিউ (হেড কোয়ার্টার) এএসএমএলএ যশোর > প্রযত্নে: পাক এবিপিও, টেলিগ্রাম: মিল – ৯৪, এম১ ১৭/এ

৩০ আগস্ট, ১৯৭১

বরাবর: > ১. ডেপুটি কমিশনার, যশোর।

২. জেলা সভাপতি, শান্তি কমিটি, যশোর।

বিষয়: রাজাকারদের বেতন

অনুগ্রহ করে এটা নিশ্চিত করুন যে রাজাকারদের বেতন নিয়মিতভাবে দেওয়া হচ্ছে।

এসডি/- মোহাম্মদ আমিন > মেজর, এএসএমএলএ

তারিখ: ৭/৯/৭১

মেমো নং – ২২৪ (৮) > তথ্য এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কপিটি প্রেরণ করুন:

চেয়ারম্যান, নগর শান্তি কমিটি, যশোর।

এসডি/- > বরাবর- সভাপতি, জেলা শান্তি কমিটি, যশোর।

দলিল ১৩: টাঙ্গাইলে রাজাকারদের মোটিভেশনাল ট্রেনিংয়ের গতিবিধি আদেশ

  • শিরোনাম: জিলা রাজাকার প্রধানের নির্দেশ

  • সূত্র: অফিস আদেশ, টাঙ্গাইল রাজাকার সদরদপ্তর

  • তারিখ: ২ অক্টোবর, ১৯৭১

গতিবিধি আদেশ > এমভিআই মোঃ সেরাজুল ইসলামকে এতোদ্বারা জানানো হইতেছে যে তিনি যেন যথাশিঘ্রই তালতলা ক্যাম্পে রিপোর্ট করেন, যেখানে তাকে ক্যাম্পের সংঘটিত রাজাকারদের অনুপ্রেরণাদায়ক (Motivational) প্রশিক্ষণ প্রদান করিতে হইবে।

এই বিষয়টি টাঙ্গাইলের এ.এস.এম.এল.এ রাজ মোঃ হাবিবুল্লাহ বাহার এর অনুমোদনপ্রাপ্ত এবং এস/ও সেরাজুল ইসলামের নির্দেশিত।

এসডি/- অস্পষ্ট > ডিস্ট্রিক্ট অ্যাডজুটেন্ট অব রাজাকারস, টাঙ্গাইল।

মেমো নং: ৫১২ – (২)- রাজ, তারিখ: ২.১০.৭১

অনুলিপি অবগতির জন্য প্রেরিত হলো: …

দলিল ১৪: চুয়াডাঙ্গা সদরদপ্তরের গোপন নথি – নবম ডিভিশনের ট্রেনিং প্রোগ্রাম

  • শিরোনাম: রাজাকারদের প্রশিক্ষণ ও সিলেবাস সম্পর্কিত নবম ডিভিশন পূর্বাঞ্চলীয় কম্যান্ডের দলিল

  • শ্রেণীবিভাগ: গোপনীয় (RESTRICTED)

  • সূত্র: এইচকিউ এএসএমএলএ চুয়াডাঙ্গা

  • তারিখ: ২৮ অক্টোবর, ১৯৭১

এইচকিউ (হেডকোয়ার্টার) এএসএমএলএ চুয়াডাঙ্গা > তেল : ১৮৬, ২৮ অক্টোবর, ৭১

বরাবর: এইচকিউ (হেডকোয়ার্টার) ১৮ পাঞ্জাব, ওসি ‘বি’ কয়

বিষয়: সদ্যনিয়োগপ্রাপ্ত রাজাকারগণ

হেডকোয়ার্টার ৯ ডিভিশন আইটিআর নং – জি/১৫২৪২/টিআরজি (ট্রেইনিং) ২৩ অক্টোবর ‘৭১ এর কপি এবং ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়ার্টার এর আইটিআর নং ৪১৮/৪৮/জিএস (টি) অক্টোবর ৭১ এর কপি, এর সাথে সাধারণ নির্দেশনাবলি, সংক্ষিপ্ত পাঠপরিকল্পনা, বিস্তারিত পাঠপরিকল্পনা এবং ট্রেইনিং প্রোগ্রাম (Anx ‘এ’ ‘বি’ ‘সি’) রাজাকার ক্যাডারদের নির্দেশনার খাতিরে, এবং আপনার জ্ঞাতসারে প্রেরণ করা হলো এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হল।

 

এসডি/- মেজর > এএসএমএলএ, জয়েন-উল-মালুক

 

দলিল ১৫: নবম ডিভিশনের সেকশন কমান্ড প্রশিক্ষণের রূপরেখা

  • শিরোনাম: হেডকোয়ার্টার ৯ ডিভিশন আইটিআর নং – জি/১৫২৪২/টিআরজি

  • সূত্র: ইস্টার্ন কমান্ড সামরিক আর্কাইভ

  • তারিখ: ২৩ অক্টোবর, ১৯৭১

বিষয়: আমাদের জি/১৫২৪২ টিআরজি (ট্রেইনিং) ৬ অক্টোবর ‘৭১ তারিখের পত্রের অনুবৃত্তি

প্রশিক্ষনার্থী রাজাকার কমান্ড নিম্নোক্তভাবে সংঘটিত হবে:-

এ. সেকশন কমান্ড প্রশিক্ষণ: > (১) রাজাকার সম্বলিত প্রত্যেক ইউনিট তার এলাকায় সেকশন কমান্ডের চলাকালীন সময়ে ১০ দিনের জন্য ক্যাডারদের সংগঠিত করবে।

(২) সম্পূর্ণ সেকশন কমান্ডের জনবলের এক তৃতীয়াংশ একটি করে ক্যাডারের আওতায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হবে এমনভাবে যেন প্রত্যেক প্লাটুনের জন্য একজন সেকশন কমান্ড থাকে।

(৩) প্রথম সেকশন কমান্ড ক্যাডার যথাসম্ভব ২৫ অক্টোবর ১৯৭১ থেকে শুরু হবে।

(৪) সেকশন কমান্ড প্রশিক্ষণ এর পাঠপরিকল্পনা সংযুক্ত করে দেওয়া হলো।

ঢাকাস্থ ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়ার্টার এর আইটিআর নং ৪১৮/৪৮/জিএস (টি) অক্টোবর ৭১ এর কপি > বিষয়: সেকশন কমান্ড ক্যাডার – রাজাকারগণ।

আমাদের ১৯ অক্টোবর ৭১ তারিখস্থ সিগ জি – ৩৫১৩ এর ৩য় প্যারা সম্পর্কে।

১. উপরোক্ত ক্যাডারদের জন্য সাধারণ নির্দেশনা, সংক্ষিপ্ত পাঠপরিকল্পনা, বিস্তারিত পাঠপরিকল্পনা এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচী এখানে পাঠানো হলো।

২. প্রশিক্ষণ সংগঠিত হবে ইউনিট / এএসএমএলএ পর্যায়ে। এফেমেন কমান্ডদের অনুরোধ করা যাচ্ছে প্রশিক্ষণ কর্মসূচীর যথাযথ ব্যবহারের জন্য।

দলিল ১৬: ইস্টার্ন কমান্ডের ১০০ পিরিয়ডের রাজাকার ট্রেনিং কারিকুলাম (ব্লক সিলেবাস)

  • শিরোনাম: দপ্তরে ইস্টার্ন কোমান্ড রাজাকার সেকশন কমান্ডার্স ক্যাডার ব্লক পাঠ্যক্রম

  • সূত্র: এনেক্সচার ‘এ’ (Anx ‘A’) টু ইস্টার্ন কমান্ড আইটিআর ৪১৮/৪৮/জিএস ১৯ (টি)

  • তারিখ: ১৯ অক্টোবর, ১৯৭১

ক্রমিক নংবিষয়ের নাম (Subject)তত্ত্বীয় পিরিয়ড (Lecture/Demo)ব্যবহারিক পিরিয়ড (Practical/Ex.)মোট পিরিয়ড (Total)
ড্রিল (Drill)
অস্ত্র প্রশিক্ষণ (Weapon Training)১৪১৫
ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (Field Engineering)
ফিল্ড ক্রাফট (Field Craft)১৩১৯
ট্যাকটিকস (Tactics)২০২০৪০
নেতৃত্ব (Leadership)
প্রশাসন (Administration)
বিবিধ (Miscellaneous)
মোট১০০ পিরিয়ড

দলিল ১৭: প্রশিক্ষণের লক্ষ্য ও উৎস নির্দেশিকা (General Instructions)

  • শিরোনাম: RESTRICTED – দপ্তরে ইস্টার্ন কোমান্ড সেকশন কমান্ডার্স ক্যাডার রাজাকার

  • সূত্র: ঢাকা সেনানিবাস সদরদপ্তর (টেলিফোন: ২১২)

  • তারিখ: ১৯ অক্টোবর, ১৯৭১

উদ্দেশ্য (Aim): নির্বাচিত রাজাকারদের মধ্য থেকে সেকশন কমান্ডার (Sec Comds) তৈরি করে রাজাকারদের সামরিক দক্ষতা বৃদ্ধি করা।

অর্জিতব্য মানদণ্ড (Standard to be achieved): > ক. অনুপ্রাণিত (Motivated) প্রশিক্ষণ এবং নিজের সেকশনকে দক্ষতার সাথে চালনা ও নেতৃত্ব প্রদানে সক্ষম করা।

খ. মৌলিক সামরিক জ্ঞান অর্জন করা; যথা: ড্রিল, ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন প্লাটুনের অস্ত্র চালনা, ফিল্ড ক্রাফট, ক্যামোফ্লেজ ও ছদ্মবেশ ধারণ, অস্ত্র পরিচালনা, মাইন ও ববি ট্র্যাপ স্থাপন এবং তা নিষ্ক্রিয়করণ।

গ. লাইন্স অফ কমিউনিকেশন (LOC) বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা প্রতিরক্ষায় নিজের সেকশন মোতায়েন করা।

ঘ. রোড ব্লক (Road Block) স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা।

ঙ. নিখুঁতভাবে রেইড (Raid) বা আকস্মিক আক্রমণ এবং ওৎ পেতে থাকা (Ambush) বা অ্যামবুশ পরিচালনা করা।

চ. নৈশকালীন সামরিক অভিযানে (Night Operations) কাজ করতে সক্ষম হওয়া।

ছ. ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রদত্ত অন্য যেকোনো মিশন (MSN) বাস্তবায়নে স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ নেওয়া।

জ. স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, প্রাথমিক চিকিৎসা ও যুদ্ধক্ষেত্রের জরুরি সেবা জানা।

প্রশিক্ষণের সময়সীমা: > ক. এই ক্যাডারের জন্য মোট ১০ কার্যদিবস ব্যয় করা হবে।

খ. দৈনিক মোট ১০টি পিরিয়ড অনুষ্ঠিত হবে (দিনের বেলা ৪টি এবং রাতে ৪টি পিরিয়ড/নৈশকালীন প্রশিক্ষণ)। প্রতি পিরিয়ডের সময়কাল ৪৫ মিনিট।

সূত্র ও সামরিক নির্দেশিকা প্রকাশনা (Reference Books): > ক. ইনফ্যান্ট্রি ট্রেনিং ভলিউম-৪ (ইনফ্যান্ট্রি প্লাটুন, ১৯৬৯)

খ. ইনফ্যান্ট্রি ট্রেনিং ভলিউম-৪ (ফর নাইট অপারেশনস, ১৯৬৮)

গ. ড্রিলস অ্যান্ড সেরিমোনিস (১৯৭০)

ঘ. এসএএস, মাইনস এবং ববি ট্র্যাপস সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক সামরিক বুকলেট

ঙ. গেরিলা অ্যান্ড অ্যান্টি-গেরিলা ওয়ারফেয়ার (সেকশন ২, ১৯৬১)

চ. ফার্স্ট এইড ম্যানুয়াল

প্রেরক: > কর্নেল জেনারেল স্টাফ, ঢাকা সেনানিবাস

(মিয়া হাফিজ আহমেদ)

এইচকিউ ইস্টার্ন কমান্ড, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট।

দলিল ১৮: রাজাকার সেকশন কমান্ডারদের বিস্তারিত পাঠ্যসূচি (Detailed Syllabus)

  • শিরোনাম: হেড কোয়ার্টার ইস্টার্ন কমান্ড সেক্টর কমান্ড ক্যাডার- রাজাকারস ডিটেইল্ড সিলেবাস

  • সূত্র: সামরিক আর্কাইভ নথি ৪১৮/৪৮/জিএস

১. ড্রিল (Drill): > ক) অস্ত্রসহ ড্রিল (২ পিরিয়ড)

খ) হাত দিয়ে অস্ত্র চালনা ও কুচকাওয়াজ (২ পিরিয়ড)

গ) স্কোয়াড পরিচালনা (২ পিরিয়ড)

২. অস্ত্র ও নিশানা প্রশিক্ষণ (Weapon & Target Training): > ক) হোল্ডিং, আইমিং এন্ড ফায়ারিং অফ রাইফেল (৪ পিরিয়ড)

খ) হ্যান্ডলিং অফ স্টেনগান এন্ড এলএমজি (২ পিরিয়ড)

গ) স্ট্রিপিং এন্ড অ্যাসেম্বলিং (অস্ত্র খোলা ও জোড়া লাগানো) অফ রাইফেল, স্টেন ও এলএমজি (২ পিরিয়ড)

ঘ) প্রিপারেশন এন্ড রেঞ্জ ইয়ার্ড রুলস (১ পিরিয়ড)

ঙ) ফায়ারিং ডে (দিবাকালীন গুলি বর্ষণ অনুশীলন) (৪ পিরিয়ড)

চ) ফায়ারিং নাইট (নৈশকালীন গুলি বর্ষণ অনুশীলন) (৪ পিরিয়ড)

৩. ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (Field Engineering): > ক) পরিখা ও বাঙ্কার খনন (ট্রেঞ্চেস এন্ড ডাব্লিউপিএম পিটস, সিটিং এন্ড ডাইমেনশন্স) (২ পিরিয়ড)

খ) মাইন: প্রকারভেদ, স্থাপন, নিষ্ক্রিয়করণ এবং অপসারণ (২ পিরিয়ড)

গ) ববি ট্র্যাপস (বডি ট্রাপ্স): প্রকারভেদ, স্থাপন এবং নিষ্ক্রিয়করণ (২ পিরিয়ড)

৪. ফিল্ড ক্রাফট (Field Craft): > ক) ক্যামোফ্লেজ এন্ড কনসিলমেন্ট (ছদ্মবেশ ও আত্মগোপন) (২ পিরিয়ড)

খ) ভূমির কৌশলগত ব্যবহার এবং আড়াল নেওয়া (ইউজ অফ গ্রাউন্ড এন্ড কাভার) (২ পিরিয়ড)

গ) ফিল্ড সিগন্যালস (সংকেত আদান-প্রদান) (২ পিরিয়ড)

ঘ) সেকশন ফর্মেশন (৩ পিরিয়ড)

ঙ) দিন ও রাতে এককভাবে শত্রুর ওপর নজরদারি (ইন্ডিভিজুয়াল স্টকিং বাই ডে এন্ড নাইট) (৪ পিরিয়ড)

চ) অগ্রসর হওয়ার পথ নির্ধারণ এবং দিবাকালীন মুভমেন্ট (৪ পিরিয়ড)

৫. ট্যাকটিকস বা যুদ্ধকৌশল (Tactics): > ক) ইস্যু অফ ভার্বাল অর্ডারস (মৌখিক নির্দেশ প্রদান) (২ পিরিয়ড)

খ) পেট্রোলিং বা টহল দল (Patrols):

১. টহল দলের প্রকারভেদ (১ পিরিয়ড)

২. পেট্রোল লিডারের আদেশসমূহ (২ পিরিয়ড)

৩. রেসি পেট্রোল (Reconnaissance Patrol) পরিকল্পনা ও পরিচালনা (২ পিরিয়ড)

৪. ফাইটিং পেট্রোল (Fighting Patrol) পরিচালনা (২ পিরিয়ড)

৫. পেট্রোলিংয়ের ব্যবহারিক মহড়া (৪ পিরিয়ড)

গ) অ্যামবুশ বা ওৎ পাতা (Ambush):

১. স্থান নির্বাচন (২ পিরিয়ড)

২. বিভিন্ন দল গঠন ও তাদের দায়িত্ব বণ্টন (২ পিরিয়ড)

৩. প্ল্যানিং এন্ড অর্ডারস (২ পিরিয়ড)

৪. ফিল্ড এক্সারসাইজ রেইড (৪ পিরিয়ড)

ঘ) রেইড বা আচমকা হামলা (Raid):

১. পার্টিস এন্ড দেয়ার টাস্কস (২ পিরিয়ড)

২. প্ল্যানিং এন্ড অর্ডারস (২ পিরিয়ড)

৩. ফিল্ড এক্সারসাইজ রেইড (৪ পিরিয়ড)

ঙ) রোড ব্লক (Road Blocks):

১. বৈশিষ্ট্যসমূহ (১ পিরিয়ড)

২. ডিফেন্স অফ রোড ব্লক (১ পিরিয়ড)

৩. রোড ব্লক তৈরি ও লোকবল মোতায়েনের ব্যবহারিক মহড়া (২ পিরিয়ড)

চ) গেরিলা যুদ্ধ (GW): গেরিলা ও অ্যান্টি-গেরিলা অপারেশন পরিচিতি (১ পিরিয়ড)

ছ) প্রতিরক্ষা বা ডিফেন্স (Def):

১. ভূমির ব্যবহার এবং ফায়ার পরিকল্পনা (২ পিরিয়ড)

২. অল রাউন্ড ডিফেন্স, লিসেনিং পোস্ট এবং অ্যালার্ম সিস্টেম (২ পিরিয়ড)

৩. ছোট ব্রিজ বা স্থাপনার প্রতিরক্ষা নিশ্চিতকরণ (২ পিরিয়ড)

৪. সেন্ট্রি বা প্রহরীর দায়িত্ব (২ পিরিয়ড)

৫. প্রতিরক্ষার ব্যবহারিক মাঠ মহড়া (৪ পিরিয়ড)

৬. নেতৃত্ব (Leadership): নেতৃত্ব বিকাশের তত্ত্ব (১ পিরিয়ড)

৭. প্রশাসন (Adm): অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সরঞ্জামের যত্ন (২ পিরিয়ড); হাইজিন, স্যানিটেশন, প্রাথমিক চিকিৎসা ও যুদ্ধাহতদের অপসারণ (২ পিরিয়ড)

৮. বিবিধ (Misc): রাইফেল প্লাটুনের সাংগঠনিক কাঠামো (১ পিরিয়ড)

দলিল ১৯: জনৈক রাজাকারের পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের আইনি শপথনামা

  • শিরোনাম: তফসিল খ – শপথনামা (রুল ১৬)

  • সূত্র: এইচ কিউ এমএলএ জোন বি, আইটিআর নং ১২০০/৩ এমএল

  • তারিখ: ৩১ অক্টোবর, ১৯৭১

আমি আবুল কাশিম, পিতা: হাসান আলি মোল্লাহ, ঠিকানা— গ্রাম: মধুপুর, পোস্ট অফিস: বেঘটিয়া, জেলা: যশোর; শপথ করছি যে এই মুহূর্ত থেকে আমি আমার ধর্মীয় রীতিনীতির অনুসরণ করব এবং দেশ ও সমাজের সেবায় আমার জীবন উৎসর্গ করব। আমার অগ্রজদের দেয়া সব আইনসম্মত আদেশ পালন করব এবং সেসব বাস্তবায়ন করব। நான் আইন দ্বারা প্রণীত পাকিস্তানের সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকব এবং প্রয়োজনবোধে নিজের জীবন দিয়ে পাকিস্তানকে রক্ষা করব।

স্বাক্ষর/- আবুল কাসিম > ৩১ অক্টোবর, ১৯৭১

আমার উপস্থিতিতে এই শপথ নেয়া হয়েছে।

স্বাক্ষর: অস্পষ্ট > সহকারী কমান্ড্যান্ট, নড়াইল সাব-ডিভিশন, যশোর জেলা।

দলিল ২০: আর্মি ব্যাটেল স্কুল থেকে দেওয়া রাজাকারের দক্ষতা সনদপত্র

  • শিরোনাম: পূর্বাঞ্চল/ইস্টার্ন কমান্ড রাজাকারদের যুদ্ধ প্রশিক্ষণ স্কুল (দক্ষতা সনদপত্র)

  • সূত্র: আর্মি ব্যাটেল স্কুল ডক্যুমেন্ট

  • তারিখ: ১৭ নভেম্বর, ১৯৭১

এতদ্বারা প্রত্যয়ন করা যাচ্ছে যে, রাজাকার নং _____ নাম: রকিব উদ্দিন, পিতা: মৃত হাজী তুফাজ উদ্দিন মল্লাহ, পোস্ট অফিস: দৌলতপুর, সাব ডিভিশন: খুলনা সদর, জেলা: খুলনা; ০৩ নভেম্বর’৭১ থেকে ১৭ নভেম্বর ’৭১ পর্যন্ত সেনাবাহিনী যুদ্ধ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত “রাজাকার প্লাটুন কমান্ডার কোর্স”-এ অংশ নিয়েছেন।

১. সাধারণ মন্তব্য: অত্যন্ত উদ্দীপ্ত, পরিশ্রমী এবং ধার্মিক। ফেজ ওয়ান কমান্ডার হবার যোগ্য।

২. লক্ষ্য অর্জন: রাজাকার ফেজ ওয়ান কমান্ডার হবার যোগ্য।

৩. গার্ডিং (Guarding): মাঝামাঝি ধরণের।

ছাত্রের স্বাক্ষর/- রকিব উদ্দিন > স্বাক্ষরিত/- (নজর হুসাইন) > মেজর, আর্মি ব্যাটেল স্কুল।

দলিল ২১: জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয় থেকে ইস্যু করা সশস্ত্র রাজাকারের অফিশিয়াল পরিচয়পত্র

  • শিরোনাম: একজন রাজাকারের পরিচয়

  • সূত্র: ঢাকা ইনচার্জ কার্যালয়, রাজাকার ও মুজাহিদ, জামাত-ই-ইসলামি

  • ঠিকানা: ৯১/৯২, সিদ্দিকবাজার, ঢাকা

ইহা এই মর্মে প্রদান করা হলো যে, জনাব হারুন-উর-রশিদ খান, পিতা: আব্দুল আজিম খান, ৩৬, পুরান পল্টন লেন, ঢাকা-২; আমাদের একজন সক্রিয় কর্মী। সে একজন খাঁটি পাকিস্তানী এবং নির্ভরশীল। সে একজন প্রশিক্ষিত রাজাকার। তার নামে আত্মরক্ষার জন্য অ্যামুনিশনসহ রাইফেল নাম্বার ৭৭৬… ইস্যু করা হলো।

এস/ডি দায়িত্বে > ইনচার্জ, রাজাকার এবং মুজাহিদ, জামাত-ই-ইসলামি

৯১/৯২, সিদ্দিকবাজার, ঢাকা।

পাক দখলদার আমলে অবাঙালীদের ভূমিকা ও মনোভাব সম্পর্কিত কয়েকটি দলিল

এই পরিশিষ্টের দলিলগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং ঐতিহাসিক। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান রেলওয়ে জংশন পার্বতীপুরে অবাঙালি (বিহারী) জনগোষ্ঠী এবং পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কীভাবে একজোট হয়ে বাঙালি নিধন, লুণ্ঠন ও বসতবাড়ি অগ্নিসংযোগের তাণ্ডব চালিয়েছিল—তা এই রোজনামচায় উন্মোচিত হয়েছে। তৎকালীন পার্বতীপুর টাউন কমিটির চেয়ারম্যান ও স্বঘোষিত প্রশাসক কামারুজ্জামানের নিজস্ব ডায়েরি বা দিনলিপিই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

দলিল ২২: পার্বতীপুর টাউন কমিটির চেয়ারম্যান ও প্রশাসক কামারুজ্জামানের রোজনামচা (২৬ মার্চ – ১৭ মে, ১৯৭১)

২৬.৩.৭১

শাফায়েতের সাথে দেখা হলো। পার্বতীপুরের বর্তমান অবস্থা যেভাবে সে সামলেছে, তার জন্য প্রশংসা করলাম। সাথে সাথে তার অধীনস্থ লোকদের বিষয়েও তাকে সতর্ক করে দিয়ে বললাম এদের বেশি বিশ্বাস না করতে, কারণ শত হলেও এরা বাঙ্গালী। বলা যায় না সুযোগ পেলে এরা তার জীবনের জন্য হুমকি হতে পারে। শাফায়েত আমার কথায় হেসে ফেললো। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমাদের অস্ত্র জমা দেবো না, কারণ বাঙ্গালীরাও তাদের অস্ত্র জমা দেয়নি, যদিও আইনত ব্যাপারটা ঠিক নয়।

শহরের পূর্বদিকের নিকটবর্তী গ্রামগুলোতে প্রচুর বাঙ্গালীদের সমাগম দেখা যাচ্ছে। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কঠোর করা হয়েছে এবং চারিদিকে সতর্ক প্রহরা জারি আছে।

২৭.৩.৭১

সকাল এগারোটা থেকে শুরু করে প্রায় ১৫ ঘণ্টা আমেরিকান ক্যাম্প, উত্তর কর্মাঙ্গন (শহরের উত্তর দিক) এবং চৌকি কর্মাঙ্গনের (শহরের দক্ষিণ দিক) দিকে প্রচুর বাঙ্গালীদের সমাগম হয়েছে। বাঙ্গালীরা উত্তর কর্মাঙ্গনে আক্রমণ করেছিল। সম্পূর্ণ উত্তর কর্মাঙ্গনে আগুন দেয়া হয়েছে এবং যা কিছু ছিল সব লুটপাট করা হয়েছে। সন্ধ্যার দিকে বাঙ্গালীরা একজন ইমাম সহ চারজন লোককে হত্যা করেছে, এরা সব মসজিদে আত্মগোপন করেছিল। আগামীকাল সকাল পর্যন্ত শহরে কার্ফু জারি করা হয়েছে।

২৮.৩.৭১

সকাল প্রায় আটটার দিকে বাঙ্গালীরা চৌকি কর্মাঙ্গন আক্রমণ করেছিল, আমাদের একজন লোক মারা গেছেন। দুপুর প্রায় সাড়ে তিনটার দিকে লাখখানেকেরও বেশি বাঙ্গালীরা চারিদিক থেকে শহরে আক্রমণ চালিয়েছে। শহরের মধ্যে অবস্থানরত বাঙ্গালী পুলিশ এবং ইআরপি (EPR) সদস্যরা এদের সহযোগিতা করেছে। আমরা যখন আমাদের এলাকা থেকে বাঙ্গালীদের সাথে যুদ্ধ করছি, তখন এরা পেছন থেকে আমাদের উপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। আমাদের লোকজন যখন শহর থেকে বাঙ্গালীদের হটিয়ে দিয়ে ব্যারাকে ফিরছিল, তখন এদের রাইফেলের গুলিতে দুজন নিহত এবং আরও অনেকে আহত হন।

পিছু ধাওয়া করে তাড়িয়ে দেয়ার পর তাদের গ্রামগুলো আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমাদের প্রায় ৩০ জন লোক শহরের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হয়েছিল। আহতদের সবাইকে পার্বতীপুরের রেলওয়ের ডক্টর খুরশিদ বানু তার স্বামী এবং ছেলের সহযোগিতায় নিজের বাসায় একাই চিকিৎসা করেছেন। তার নৈতিকতাবোধ অত্যন্ত উঁচু পর্যায়ের। আমাদের প্রতিটি আহত লোককে তিনি খুব দ্রুততা, ধৈর্য এবং দক্ষতার সাথে চিকিৎসা করেছেন। আমাদের সাহসী আহত জওয়ানদের জন্য সেই একমাত্র চিকিৎসক ছিলেন।

২৯.৩.৭১

কর্নেল তারেক রাসুল দিনাজপুর থেকে সপরিবারে এসে পৌঁছলেন। তিনি আজ খুব সকালে এসেছেন এবং এর মধ্যে ঘটে যাওয়া দিনাজপুরের শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনা প্রবাহ ও বর্তমান টানটান উত্তেজনার কথা আমাদের কাছে বর্ণনা করলেন।

৩০.৩.৭১

কর্নেল টি রাসুল ও তার পরিবার এবং পার্বতীপুরে কর্মরত অবাঙ্গালী ইআরপি সদস্যগণ সৈয়দপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। যাবার সময়ে কর্নেল রাসুল আমাদের কিছু অস্ত্র এবং গোলাবারুদ দিয়ে গেছেন। কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী আমার স্ত্রী এবং সন্তানদের কর্নেল রাসুলের সাথে সৈয়দপুর পাঠিয়ে দেবার কথা বললেন। কিন্তু আমি এই প্রস্তাবে রাজি হইনি, কারণ এতে শহরের জনগণের মনোবল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

শহরের জনগণের নৈতিক মনোবল চাঙ্গা করতে সচেষ্ট হলাম আমি, কারণ অবাঙ্গালী ইআরপি সদস্যদের শহর ছেড়ে সৈয়দপুর চলে যেতে দেখে তারা মুষড়ে পড়েছিল। শহরের চারিদিকে শক্তিশালী ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়েছে। মিসেস বাচ্চা খান ও মতিউর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে সারারাত ধরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকি করা হলো।

১.৪.৭১

দুপুর প্রায় সাড়ে তিনটার দিকে মেজর শাফায়েত আমার বাসভবনে এসে দেখা করে বললেন তিনি ১৫.৩০ ঘণ্টা ব্যাপী কার্ফ্যু জারী করতে যাচ্ছেন। তিনি বললেন, এই সময়ে তার অধীনস্থ বাঙ্গালী সেনাদের তিনজন করে দলে ভাগ করে চৌকি দিতে পাঠাবেন, যাতে করে তখন আমরা এদের হত্যা করতে পারি।

আমি বললাম, এই কর্মসূচী এখনই শুরু করা উচিত, নইলে যদি বেশি দেরী হয়ে যায় আল্লাহ না করুন এরা আমাদেরকেই হত্যা করতে পারে। কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। এরপর সকাল নয়টার দিকে সে যখন তার ক্যাম্পে ফিরলো, তখন তার লোকেরা তাকে হত্যা করে। এই ঘটনার পরে মেজরের বাহিনীর লোকেরা পালিয়ে যায়। পার্বতীপুরের ও/সি ও ৯ জন কনস্টেবল রাইফেলসহ ১১ টায় পালিয়ে যায়।

বিকেল ৪ টায় আমি ও জনাব মতিউর রহমান জিআরপি আস/পার্বতীপুর আক্রান্ত হই। থানার বাঙ্গালী ফোর্স অল্প কিছু প্রতিরোধের পর আত্মসমর্পণ করে। তাদের কাছ থেকে ভালো অবস্থায় ৯টি রাইফেল, ২৮টি বোল্ট ছাড়া রাইফেল এবং ২০০টি .৩০৩ রাইফেলের গুলি উদ্ধার করা হয়। এটি সৈয়দপুরে কর্নেল শাফানিকে ফোনে জানানো হয়। সে বাঙ্গালী থানাকেও আটকের নির্দেশ দেন।

২.৪.৭১

বাঙ্গালী ইবিআর (EBR) গণকে তাদের পার্বতীপুরের হলদিবাড়ি কলোনির সহকর্মীদের সাথে যোগ দিতে বলা হয়। পার্বতীপুরের বাঙ্গালী পুলিশদেরকেও ইবিআরদের সাথে যোগ দিতে বলা হয়। এইভাবে আপেক্ষিক রূপে হলদিবাড়ি হয়ে উঠলো বাংলাদেশী ফোর্সের একটি শক্ত ঘাঁটি এবং আমাদের ক্ষতির একটি বড় উৎস, যেহেতু হলদিবাড়ি অংশে আমাদের সাথে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ হতো।

৩.৪.৭১ থেকে ৬.৪.৭১

টানটান পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। বারবার গোলাগুলি চলত। আমরা আমাদের শহর রক্ষার্থে ব্যস্ত ছিলাম। আমাদের থানা গত রাতে ঘেরাও হয়েছিল কিন্তু ওরা সফল হয়নি।

দুপুর ১২ টায় আমি, মিস বাচা খান, মতিউর রহমান আরও ৮ জন মুজাহিদ সহ থানা ঘেরাও করি। আমি মতিউর রহমানকে নিয়ে থানায় প্রবেশ করে ওসিকে বলি— “আমরা আপনার থানা ঘেরাও করে ফেলেছি, আপনি এখুনি সারেন্ডার করুন নাহলে আমরা আপনাকে ও আপনার লোকদের মেরে ফেলব।” ওসি সারেন্ডার করল। আমরা ভালো মানের ৪০টি রাইফেল ও থ্রি নট থ্রি রাইফেলের ৫০০টি গুলি কব্জা করে নিলাম। থানার কাছেই আমি আমার লোকদের পাঠালাম, যারা ২ জন বাঙ্গালীকে হত্যা ও ২৫টি গ্রাম জ্বালিয়ে ফেরত আসলো। এরপর সেই এলাকা কড়া পাহারায় রেখে আমরা ফেরত আসলাম।

০৭.০৪.১৯৭১

এটি আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল। ভোর ৫.৪০ এ শহরকে পূর্ব দিক থেকে আক্রমণ করা হলো। ২টি বোম্ব শেলের ভয়াবহ আওয়াজে আমার বাড়ি কেঁপে উঠল, যদিও তেমন একটা ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ভোর ৬টা থেকে বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষণ শুরু হলো। E.B.R., E.P.R. ও পুলিশ বাহিনীর সহযোগিতায় এক লাখ বাঙ্গালী শহরটিতে আক্রমণ করে। পূর্ব দিক থেকে আক্রমণ অনেক ভয়াবহ ছিল। তারা রকেট, ২ ইঞ্চি ও ৩ ইঞ্চি মর্টার, LMG, চাইনীজ অস্ত্র ও থ্রি নট থ্রি রাইফেল ব্যবহার করছিল। আমি সারা শহরের এক মোর্চা থেকে অন্য মোর্চায় যেতে লাগলাম আর যেখানে যেখানে জনবল বা অস্ত্রশস্ত্র দরকার তা সরবরাহ করলাম।

পূর্ব দিকের আক্রমণ জোরদার হতে থাকল ও একের পর এক রকেট শেল নিক্ষেপ করা হতে লাগল। যদিও আমরা আমাদের অস্ত্রশস্ত্র খুব সাবধানে ব্যবহার করছিলাম, কিন্তু ১২টার পর থেকে অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকল ও শত্রুপক্ষ ভারি রকেট ও মর্টার শেল নিক্ষেপ করতে লাগল। আমরা আস্তে আস্তে পিছু হটতে লাগলাম, আমরা বৃদ্ধ, মহিলা ও শিশুদের পূর্ব দিক থেকে সরাতে লাগলাম। আমরা আর্মিদেরকে সহযোগিতার জন্য ডাকলাম, যেহেতু তারা আসছিল না আর আমাদের অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। আমাদের অস্ত্রের মজুদ শেষ পর্যায়ে চলে গেছিল। বাচা খান ও তার সাথের লোকেরা তখনও লড়াই চালানোর চেষ্টা করছিল এবং খুব সাবধানে পিছু হটছিল।

কিন্তু শত্রুপক্ষ আমাদের কাবু করে পূর্ব দিকের মার্কেটে ঢুকে যেতে সক্ষম হয়। তারা সব দোকান লুট করে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। দুপুর দুইটায় তারা আমাদের কিছু রেল স্টেশনে ঢুকে পড়ে। কিন্তু আমরা আমাদের প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলাম, যাতে তারা শহরের আর কোনো অংশে আক্রমণ না চালাতে পারে। আমাদের লোকেরা লাঠি দিয়ে মার্কেট দখলকারীদের সাথে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। দুপুর ২.৩০ মিনিটে প্রথম দফা আর্মি এলো আমাদের সাহায্য করতে। এরমধ্যেই আমাদের ১০ জন লোক মারা গিয়েছিল ও ১০০ জন বোমা বিস্ফোরণে আহত হয়েছিল। তারা সবাই চিকিৎসার জন্য ডা. খুরশিদ বানুর বাসায় যাচ্ছিল, কারণ একমাত্র তিনিই ছিলেন যিনি আহতদের স্বেচ্ছায় সাহায্য করছিলেন আর পূর্ব দিকের বেশিরভাগ বাড়িই খালি করে দেয়া হচ্ছিল।

আর্মিরা পূর্ব দিক থেকে সব শত্রুদের সরিয়ে দিয়েছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ২য় দফা আর্মি এসে পড়ে। আর্মিদের শহরের চারিদিকে পাহারায় বসানো হয়। দুই ঘণ্টার মাঝেই তারা পুরো শহরকে শত্রুমুক্ত করে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। এই অপারেশনে তিনজন আর্মি মারাত্মকভাবে আহত হয়। তারা সবাই ডাক্তার বানুর কাছে ছুটে যায়। অপারেশন এর পর আমি, মেজর দুররানী, কেল্টেন চিমা ও ক্যাপ্টেন শারাফাত ডাক্তার বানুর বাসায় যাই। তাঁর বাংলোতে একশরও বেশি আহত মানুষ ছিল। দুইজন আর্মিকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছিল এবং তিনি তখন তৃতীয় জনকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি তাকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করার পরেও সেই আর্মি অফিসার মারা যায়। কর্নেল শফি এসেও উনার চিকিৎসা সেবার অনেক প্রশংসা করেন। সেই অফিসারেরা এক রাতের জন্য ডাক্তার বানুর বাড়িতে থাকেন ও বাকি সৈন্যরা তার বাড়ির পাশের জিন্নাহ ময়দানে থাকে।

আমি সবার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করছিলাম ও শহরের মানুষ কী দুর্ভোগে আছে তা বর্ণনা করছিলাম। হলদিবাড়িতে অপারেশন চলাকালে আর্মিরা কিছু গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। ই পি আর ও পুলিশ ফোর্স ২টি চাইনীজ রাইফেল জব্দ করে যার মধ্যে একটি মেজর দূররানী নিয়ে যান ও আরেকটি আমাদের সাথে থাকে। হলদি বাড়িতে যেসব আর্মি ছিল তারা তাদের দলের জন্য খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করে এবং আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আবার খতিয়ে দেখে তার পুনর্বিন্যাস করে।

বিত্তিপাড়া ও বাসুপাড়ায় অপারেশনের জন্য আর্মিদের পাশাপাশি ১০ জন মুজাহিদকেও পাঠানো হয়। শত্রুরা কিছুক্ষণের মধ্যেই পালিয়ে যায় এবং সেই এলাকায় আর্মিদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। রাতে হুগলীপাড়ায় একটি অপারেশন টিমকে পাঠানো হলেও সেখানে কোনো শত্রুর সন্ধান পাওয়া যায়নি। মেজর কুমার ও আমার নির্দেশে ১৫ জনের একটি দলকে নিয়ে কল্কাবাড়িতে অপারেশন চালানো হয়। কিছু শত্রুকে হত্যা করা হয় ও কিছু রাইফেল জব্দ করা হয়, যা পরে আমি আর্মিদেরকে দিয়ে দেই।

বাচা খান ও মেজর কুমারের নির্দেশে লোকজনকে ফুলবাড়ি ১ এর রেল লাইন ও টেলিফোন লাইন ঠিক করতে পাঠানো হয়। আমি আমার লোকজনদেরকে নিয়ে পূর্ব দিকের কিছু গ্রামে অপারেশন চালাই। রাব্বানী নামের আমার এক লোককে আমি মেজর কুমারের সাথে বেলেচান্দি গ্রামে অপারেশনে পাঠাই। আর আমি বাচা খানকে সাথে নিয়ে মেজর কুমারের অনুমতি নিয়ে হুগলিপাড়া অপারেশনে যাই।

আঞ্চলিক নানা রকম সমস্যার কারণে, আমি পার্বতীপুর এর এডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে নিযুক্ত হই। শহরের নিরাপত্তার দেখাশোনার জন্য মেজর কুমারই আমাকে এই পদে নিযুক্ত করেন। আমি অতি দ্রুত একটি মিটিং ডাকি এবং সরকারী ও আঞ্চলিক প্রধানদের প্রশাসনের সব নিয়মকানুন মেনে চলতে বলি ও কঠোর পরিশ্রম করতে বলি। লোকাল থানা, বাজার, দোকানপাট, রেল স্টেশন, রেফিউজি ক্যাম্প যা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সেগুলো আবার পুনর্বিন্যাস করা হয়।

স্টেশন মাস্টার মিস্টার মল্লিক, জনাব মুস্তফা (DME/PXC) ও সিগন্যাল ইন্সপেক্টর মিস্টার শেলটন এর সহায়তায় রেল লাইন স্থাপনার কাজ শুরু করা হয়। সবাই এখানে কঠোর পরিশ্রম করছিল, এখানে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হলো, যা এতদিন বন্ধ ছিল। ডাক্তার বানুকে চিকিৎসার দায়িত্ব দেয়া হলো; সকল আহত আর্মি, মুজাহিদ, পাঠান, রেফুজি এমনকি যারা পার্বতীপুর থেকে এখানে আহত হয়ে এসেছিল সবার স্বাস্থ্য সেবার দায়িত্ব ডাক্তার বানুকে দেয়া হলো।

মেজর জাওয়াদ, বাচা খান ও রাব্বানীর নেতৃত্বে বদরগঞ্জে অপারেশন চালিয়ে ৫০০ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। অনেক গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়। দুটি স্টেনগান জব্দ করে আর্মিদের হাতে তুলে দেয়া হয়। ৮২ জন হিন্দু বন্দিকে পার্বতীপুর নিয়ে আসা হয়। পরের দিন একই ভাবে ভবানীপুর ও খোলাহাটির ২৩টি গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়। কিছু ছাত্র ও নিরাপত্তা রক্ষীকে হত্যা করা হয়, একটি শটগান জব্দ করে আর্মিদের হাতে তুলে দেয়া হয়।

২৩ তারিখ বাচা খান, রাব্বানী ও মেজর জাওয়াদকে Kawgaon পাঠানো হয়। আমি লে. শহীদের সাথে ফুলবাড়ি যাই। ফুলবাড়ি থেকে আমরা দুই ওয়াগন অস্ত্র নিয়ে আসি। আমার একজন লোক লে. আকবরের হাতে নিহত হয়। সৈয়দপুর আর্মি হেড কোয়ার্টারের আদেশে বাচা খান ১৫ জন মুজাহিদকে রাত ১০ টায় সেখানে পাঠান। তাদের পাঠানো হয়েছিল আর্মিদের সাহায্য করার জন্য যারা রংপুর থেকে পার্বতীপুর যাওয়া রিলিফ ট্রেনগুলোকে পাহাড়া দিচ্ছিল এবং কিছু সংখ্যক ছিল খোলাহাটিতে যেখানে রেল লাইন উপড়ে ফেলা হয়েছিল ও শত্রুরা আক্রমণ করছিল। শত্রুরা কিছুক্ষণের মধ্যেই পালিয়ে যায় ও সে রাতেই ব্রীজ ও রেল লাইন মেরামত করা হয়। মিলিটারি দের খাবার সরবরাহ করা হয় ও খোলাহাটি থেকে ট্রেনে করে তাদের পার্বতীপুর ফেরত পাঠানো হয়।

২৪ এপ্রিল খবর পাওয়া গেল মন্মথপুর রাইস মিল থেকে বাঙ্গালীরা চাল চুরি করছে। সৈয়দপুর থেকে আদেশ পেয়ে সেখানে লোক পাঠিয়ে সব বাঙালিকে তাড়িয়ে দেয়া হয় এবং ৩০০ মণ চাল পার্বতীপুর নিয়ে আসা হয়। কর্নেল শাফি পার্বতীপুর থেকে সৈয়দপুর পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ কাজ শুরু করেন। এতে তিনি ৫০০ লোককে নিয়োগ দেন। আর্মিদের নির্দেশে চিরিরবন্দর থেকে ৬৭৫ মণ চাল আনা হয়। সিভিল ফোর্সকেও আর্মিদের অপারেশনে সাহায্য করার জন্য নিযুক্ত করা হয়। রাস্তাঘাট ও রেল লাইনের উন্নয়ন, পার্বতীপুর-সৈয়দপুর রাস্তা নির্মাণ, চিরিরবন্দর থেকে ৩৫০ মণ চাল, মন্মথপুর থেকে ২০০টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে আসা হয়। আর দুইটি রাইফেল আর্মিদের হাতে তুলে দেয়া হয়।

১ মে সকালবেলা আমরা পার্বতীপুর-সৈয়দপুর রাস্তার সংস্কার কাজে যাই এবং সারাদিন সেখানে থেকে কাজের অগ্রগতি দেখি। মেজর জাওয়াদ এর নেতৃত্বে আমি, আমার কিছু লোক ও বাচা খানকে নিয়ে চরকাই যাই চাল ও গম আনতে, কারণ সেখানে শত্রুরা জিনিসপত্র লুট করছিল। আমরা গুদাম থেকে ৯৯৪ বস্তা চাল ও গম নিয়ে পার্বতীপুর ফেরত আসি। পরের দুই দিন আমরা পার্বতীপুর-সৈয়দপুর রাস্তা সংস্কারের কাজ দেখা ও রেফুজিদের দেখাশোনা করার কাজে ব্যস্ত ছিলাম।

০৫.০৫.১৯৭১

আমি বাচা খানকে আমার কিছু লোকসহ চরকাই পাঠাই, সেখানে গিয়ে তারা শত্রুদের ধাওয়া করে ও ৩৬০ বস্তা গম ও ৪৮০ বস্তা চাল নিয়ে আসে। আমি আবারও রাস্তা সংস্কার দেখার কাজে ব্যস্ত হয়ে যাই।

০৬.০৫.১৯৭১ এবং ০৭.০৫.১৯৭১

আমি বাচা খানকে আমার কিছু লোকসহ চরকাই পাঠাই, সেখান থেকে তারা ৩৬০ বস্তা চাল ও ৭২০ বস্তা গম নিয়ে আসে। রাত ১১ টার দিকে শহরের পশ্চিম দিকে টর্চ লাইট হাতে কিছু লোককে ঘুরাঘুরি করতে দেখা যায়। খুরশেদ নামের আমাদের একজন নিরাপত্তা কর্মী রাইফেল নিয়ে সেসব শত্রুদের ধাওয়া করে ও নিরাপত্তা আরো জোরদার করে।

০৮.০৫.১৯৭১

পার্বতীপুর-সৈয়দপুর রাস্তা সংস্কারের কাজে শহর থেকে আরো শ্রমিক এনে লোকবল বাড়ানো হয়। এখানে আরো ১০০ জন লোক নিয়োগ পায় যার ফলে কাজের দ্রুত অগ্রগতি হয়। বাচা ঘন্কে আবারো কিছু লোকসহ চরকাই পাঠানো হয়, সন্ধ্যাবেলায় তারা ৭০০ বস্তা গম নিয়ে ফেরত আসে।

০৯.০৫.১৯ ১৯৭১

পরদিন বাজার পরিদর্শনে যাই; যেসব দোকানপাট খুলে দেয়া হয়েছে সেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য ঠিক আছে কিনা, শহরের আইন-কানুন ব্যবস্থা ও যেসব মুহাজিররা বাইরে থেকে এসেছে তাদের পুনর্বাসন ব্যবস্থা ঠিকঠাক হয়েছে কিনা সব দেখে আসি।

১১.০৫.১৯৭১

আমার লোকদের বাচা খানসহ চরকাই খাদ্য গুদামে পাঠাই, তারা সেখান থেকে ৮৪০ বস্তা গম নিয়ে ফেরত আসে। পার্বতীপুরের হাবীব ব্যাংক এবং ইউনাইটেড ব্যাংকের ব্যালেন্স ঠিকঠাক ছিল। পার্বতীপুরের ন্যাশনাল ব্যাংক ছিল বন্ধ। ম্যানেজার এবং ক্যাশিয়ার ছিল বাঙালি এবং তারা পালিয়ে গিয়েছিল। তাই এই ব্যাংকের ব্যালেন্স চেক করা সম্ভব হয়নি।

১৪টি রাইফেল এবং ৭০০ রাউন্ড গুলি দিয়ে চিরিরবন্দর পুলিশ স্টেশন খুলতে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। ইপিআরসিটি কোচ সার্ভিস এবং পিআইএ সার্ভিস কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ট্রেন সার্ভিসও চলাচলের ঘোষণা দিয়েছে। মেজর জেনারেল জাওয়াদের নির্দেশে সাইদপুর এয়ারপোর্টের জন্য ১৫ জন রাজমিস্ত্রী যোগাড় করা হয়েছে। বাচ্চার সাথে চরকাইয়ে আমার লোক পাঠানো হয়েছে যারা ৮৪০ ব্যাগ গম নিয়ে এসেছে। রাস্তা তৈরির কাজ তত্ত্বাবধান করতেও গিয়েছিলাম।

১৩.০৫.১৯ ১৯৭১

পার্বতীপুর-সৈয়দপুর রাস্তা পরিদর্শন করতে গিয়ে সৈয়দপুরের কর্নেল শফি এবং ব্রিগেডিয়ারের সাথে দেখা হলো। রাস্তাগুলোকে ঠিকঠাক করার ব্যাপারে আলোচনা হলো। কর্নেল শফি রাস্তা পরিদর্শন করে কাজের প্রশংসা করলেন। আমাকে কাজের গতি দ্বিগুণ করতে বললেন যাতে আসন্ন বর্ষা মৌসুমের আগেই কাজ শেষ করা যায়। পার্বতীপুরে হেঁটে ফিরে এলাম।

১৪.০৫.১৯৭১

১০ দিন আগে ২ জন বিহারী, একজন খাদ্য পরিদর্শক এবং অন্য একজন ব্যবসায়ীকে বাঙ্গালীরা খুন করেছে, যশোইহাটে এই খবর পেলাম। মেজর জাওয়াদের কাছে যশোইহাটে অপারেশনের নির্দেশ পেয়েছি। ১২.৪৫ এর দিকে বাচ্চা খান, মতিউর রহমান এবং আমার লোকজনসহ যশোইহাটের দিকে হেঁটে রওনা হয়েছি।

প্রায় তিনটার দিকে মন্মথপুরে দুইজন হিন্দুকে একটি গরুর গাড়ি পূর্ণ করে চাল এবং ধান ভারতের দিকে নিয়ে যাওয়া অবস্থায় আটক করলাম। হিন্দু দুইজনকে হত্যা করে পাশেই একটা মুসলিম এলাকায় সেই ধান ও চাল ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। বিকেল ৪.৪৫ এ নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে জায়গাটিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেললাম। প্রায় ২৫০ বাঙালিকে গ্রেপ্তার করা হয়, তাদের মধ্যে ৯ জনকে রেখে বাকিদের সতর্ক করে ছেড়ে দিই। ২টি ১২ বোর শটগান, একটি পাঁচ টাকার ভারতীয় নোট জব্দ করা হয়। পার্বতীপুরের মৌলভিদের কাছে বন্দুক দুটি হস্তান্তর করা হয়েছে।

এছাড়া এক বাঙালির বাড়ি থেকে এক বিধবা বিহারীকে উদ্ধার করেছি। এই বাঙালি সম্প্রতি তার স্বামীকে খুন করে। আরও একটি বাড়ি থেকে এক এতিম বিহারি মেয়েকে উদ্ধার করা হয়। বিধবাটিকে শরণার্থী শিবিরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এতিম মেয়েটিকে আমার বাড়িতে রেখে দিয়েছি। মেজর জাওয়াদের কাছে অপারেশন থেকে ফিরে সকল খুঁটিনাটি বিষয় ফোনে জানিয়েছি।

১৫.০৫.১৯ ১৯৭১

রাস্তা পরিদর্শন করতে গিয়ে ৩টার সময় তথ্য পেলাম খোলাহাটিতে রেললাইন উপড়ানো এবং রেলের সম্পত্তি বিনষ্টকারীদের ধরতে যাওয়া বাচ্চা খানকে শত্রুরা ঘিরে ফেলেছে। দ্রুত পার্বতীপুর ফিরে সৈয়দপুরের আর্মি হেডকোয়ার্টারে যোগাযোগ করে নিজের নেতৃত্বে আমার ২৫ জন জোয়ান এবং আর্মিসহ খোলাহাটির উদ্দেশ্যে রওনা দিই। প্রায় ৪টায় ওখানে পৌঁছাই। ততক্ষণে শত্রুরা দৌড়ানো শুরু করেছে। আমরা তাদের ঘিরে ফেলে অন্তত ২৫ জনকে হত্যা করেছি। একটি ১২ বোর শটগান এবং দুজন ইউনিফর্ম পরা শত্রুকে আটক করা হয়। রাত প্রায় ১০টায় আমরা পার্বতীপুরে ফিরে আসি। সাইদপুরে বিস্তারিত রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে। কর্নেল শফি বাচ্চা খানের উপরে রেগে আছেন অনুমতি ছাড়া খোলাহাটি যাওয়ার জন্য। খোলাহাটি থেকে আটক করা ২৭ জন বন্দীর ভেতর ৩ জনকে আটকে রেখে বাকিদের যথেষ্ট শাস্তি দিয়ে মেজর জাওয়াদের নির্দেশ ছেড়ে দেওয়া হয়।

১৬.০৫.১৯৭১

রাস্তা পরিদর্শন শেষে মেজর জাওয়াদ পার্বতীপুর আসেন। তিনি গতকালকের খোলাহাটির ঘটনা, স্থানীয় প্রশাসন এবং পার্বতীপুরের অন্যান্য দুশ্চিন্তার বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করেন এবং আমাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। তিনি খোলাহাটিতে অস্ত্রধারী শত্রুদের উপস্থিতিতে দুশ্চিন্তায় আছেন। তিনি চিরিরবন্দর পুলিশ স্টেশনের ওসিকে দিনাজপুরে বদলির জন্য আমাকে নির্দেশনা দেন। খোলাহাটির কয়েদিদের তার সাথে সাইদপুরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

রেললাইন দিয়ে পার্বতীপুর দুইদিকে ভাগ করা। গত ১৫ বছর একটা লেভেল ক্রসিংয়ের কাজ অগাহ্য হয়ে আসছিল অন্যদের আপত্তিতে। আজকে আমাদের নিজস্ব চেষ্টায় এবং মিস্টার শেলটন (সিগন্যাল ইনস্পেক্টর পি ই রেলওয়ে) এর ব্যক্তিগত চেষ্টায় দু সপ্তাহের ভিতরেই লেভেল ক্রসিংয়ের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। সন্ধ্যায় আমরা আলহাজ্ব মোহাম্মদকে দিয়ে এটি উদ্বোধন করাই এবং শহরের লোকজনের তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে ডঃ বানো লেভেল ক্রসিং দিয়ে প্রথম যান চালিয়েছেন।

১৭.০৫.১৯ ১৯৭১

রাস্তা পরিদর্শন করতে গিয়ে পার্বতীপুরে নতুন জয়েন করা ইপিসিএফ (EPCF)-এর নেয়ামতুল্লাহর সাথে সাক্ষাত হয়। দিনাজপুর, সান্তাহার এবং এরকম অনেক জায়গা থেকে স্রোতের মতো আসা শরণার্থীদের ত্রাণ বিতরণ এবং পুনর্বাসনের কাজ দেখছিলাম। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল বিধবা এবং এতিম। শরণার্থীদের সংখ্যা ইতিমধ্যেই আশংকাজনক। ২০০০ এর মতো চলে এসেছে এবং সৃষ্টিকর্তা জানেন আরও কত আসতেছে। তাদের বেশিরভাগই একসাথে সবকিছু হারিয়ে খুবই করুণ অবস্থায় আছে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি আমাকে যেন সাহস এবং শক্তি দেন যাতে এই সমস্ত লোকের জন্য মানুষের পক্ষে সম্ভব, এমন সবকিছু করতে পারি। তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং পার্বতীপুরের অন্য সকল বড় সমস্যাগুলো যেন আমার নেতৃত্বে সমাধান করতে পারি। আমি আমাদের সেনাবাহিনীর সার্বিক সাফল্যের জন্যেও প্রার্থনা করি যাতে তারা জাতীয় বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের জন্য উদাহরণ হতে পারে।

আল্লাহ্‌ এই শহর এবং নাগরিকদের রক্ষা করেছেন। খোদা না করুক এই শহর যদি শত্রুরা দখল করে নিত, তাহলে শুধু ৫০ হাজার মোহাজির গণহত্যার শিকার হতো তাই নয়, সমগ্র উত্তরবঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করতে আমাদের আর্মি ভয়ঙ্কর অসুবিধায় পড়তো। আল্লাহ্‌কে ধন্যবাদ জানাই। শহরের সাহসী লোকজনকে ধন্যবাদ জানাই এবং আমাদের আর্মিকে, যাদের চেষ্টায় শত্রুরা পরাজিত হয়েছে।

শত্রুর হাত থেকে শহরকে বাঁচাতে জনাব বাচা খান, আলহাজ্ব মোহাম্মদ, শোয়েব মোহাম্মদ, মতিয়ুর রহমান এবং মিস্টার ও মিসেস খুরশেদ বানু যে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তার প্রশংসা করার উপযুক্ত ভাষা আমার জানা নাই। এই মানুষেরা তাদের নিজেদের শহর বাঁচাতে অসাধ্য সাধন করেছে। একজন নারী হয়েও ডাক্তার বানু যা করেছেন, তা একজন পুরুষ মানুষ ঐ অবস্থায় করতে পারবেন কিনা সন্দেহ আছে। এরকম ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তিনি যে সাহসিকতার সাথে টাউনটি রক্ষা করেছেন, তার জন্য আমার পক্ষ থেকে এবং সমগ্র টাউনবাসীর পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে।

আমি সর্বসম্মতিক্রমে এই চার ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদকের জন্য সুপারিশ করছি।

এস ডি/- কামারুজ্জামান > টাউন প্রশাসক, পার্বতীপুর।

সাবেক এম পি এ ও চেয়ারম্যান, শহর কমিটি।

দলিল ২৩: পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ে বিভাগের অবাঙ্গালী কর্মকর্তাদের দুটো চিঠি

হতে: আরশাদ মাহমুদ

officer on Special Duty, চট্টগ্রাম

তারিখ: ২৯.০৪.১৯৭১

সুপ্রিয় …,

গতকালকের আপনার সাহায্যের জন্য আমি আপনার প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। আমি আশা করছি যে, অ্যান্টি করাপশন ডিপার্টমেন্ট থেকে কাগজপত্র পাওয়ামাত্রই আমি পশ্চিম পাকিস্তানের দিকে রওনা দিতে পারব।

আমাদের কথোপকথনে প্রায়শই স্টেটবিরোধী কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন মানুষের কথা উঠে এসেছে। গোপন বিষয় হলো, রেলওয়ে বোর্ডের অনেকেই এমনকি আমি ও সিনিয়র অফিসারেরাও জানে যে, ইঞ্জিনিয়ারিং রেলওয়ে বোর্ডের সদস্য জনাব আশফাক ও চিফ ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইয়াসিনের হত্যার প্রতিবাদের সময় জনাব শফি (প্রধান পরিকল্পনা অফিসার); নাসিরুদ্দিন আহমেদ (প্রধান কর্মী অফিসার); মাকবুল আহমেদ (বিভাগীয় সুপারিনটেন্ডেন্ট); তাহুর খান (সিভিল ডিফেন্স অফিসার); সিরাজুল হক (রেলওয়ে বিভাগের ডেপুটি সেক্রেটারি); কাফিল আহমেদ (বিভাগীয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার) এবং আতাউর রহমান স্পষ্টভাবে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িত ছিলেন। এই কর্মকর্তারা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগকে আর্থিক সহায়তা সহ আওয়ামী লীগকে আরো শক্তিশালী করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এর মধ্যে টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, বাঙালি সেনাদের আগাম পাসপোর্টের ব্যবস্থা করা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

সেনারা ইতোমধ্যে মিস্টার এবং মিসেস শাফি (প্রধান পরিকল্পনাকারী) এবং আতাউর রহমানকে জাহাজে করে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। এটা নিশ্চয়ই তাদের অন্যান্য অ্যাকশনের মতোই প্রাক-পরিকল্পনা। যাই হোক, এখন এইসব অফিসারদের অবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য পর্যাপ্ত সময় নেয়া দরকার। স্টেশনের অন্যান্য কর্মকর্তারা অবশ্যই এই জঘন্য ঘটনার সাথে যুক্ত আছে। শুধু তাই নয়, তারা এখনো বিভিন্ন তথ্য ও আলামত নষ্ট করায় ব্যতিব্যস্ত। কাজেই আমার মনে হয়েছে, বিষয়টি আপনাকে জানানো দরকার। মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষের এই আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করতে গেলে নষ্ট করে ফেলা আলামতগুলো পুনরুদ্ধার করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। এতে আন্দোলন আরও বেগবান হবে।

যাবার আগে বলে যাই, আপনার তালিকায় দুজন অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম না থাকায় অবাক হয়েছি। তারা হলেন— রেলওয়ে বিভাগের স্পেশাল ডিউটি অফিসার জনাব এম. এ. করিম (যার প্রতি আমার পিয়নের বোনকে ওপেন ফায়ার করে মেরে ফেলার অভিযোগ রয়েছে) এবং আরেকজন জনাব আর. এন. বাগচি (সিনিয়র কর্মী অফিসার, যার বিরুদ্ধে অফিসারেরাই পার্টিশনের সময় ভারতপন্থী কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ আনে)।

যেহেতু আমি একজন পাঞ্জাবী এবং আমার চাকরিখানা বদলির, সুতরাং এইসব ঘটনা আমাকে উৎপীড়িত করে না। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তা থেকে এবং কোনো ঘটনা ঘটার আগেই আপনি যেন সবকিছু ওয়াকিবহাল থাকেন, এই জন্য এইসব তথ্য জানানো আমার কর্তব্য বলে মনে হয়েছে।

শ্রদ্ধাসমেত,

আপনার অনুগত,

আরশাদ মাহমুদ

প্রোপাগান্ডা বনাম ইতিহাসের অমোঘ বিচার

১৯৭১ সালের ‘দৈনিক পাকিস্তান’ পত্রিকার এই কাটিংস ও প্রতিবেদনগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দুটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়:

১. তৎকালীন পাকিস্তানি মিডিয়া যাকে “ভারতীয় চর” বা “দুষ্কৃতকারী” বলে প্রচার করত, তারা আর কেউ নন—তারা ছিলেন আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মুক্তিকামী বাঙালি

২. আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ বা মীর কাসেম আলীদের মতো স্বাধীনতাবিরোধী কুচক্রীরা কীভাবে ধর্মের দোহাই দিয়ে বইপত্র পুড়িয়ে দেওয়ার এবং আস্ত একটি দেশকে জাতিগতভাবে নির্মূল করার প্রকাশ্য ঘোষণা দিচ্ছিল, তার প্রমাণ এই সরকারি নথিতেই রয়ে গেছে।

৩. পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের অবাঙ্গালী দোসররা কীভাবে সুপরিকল্পিতভাবে “হিন্দু”“বাঙালি” পরিচয় নিশ্চিত করে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে।

৪. সামান্য ধান-চাল বহনের দায়ে দুজনকে স্পট-ডেড হত্যা করা কিংবা নিরীহ গ্রামগুলোকে স্রেফ সন্দেহের বশে জ্বালিয়ে দেওয়ার পৈশাচিক ঘটনাগুলোকে তারা নিজেদের ডায়েরিতে পরম বীরত্ব ও গৌরবের সাথে লিপিবদ্ধ করে রাখত।

৫. এই তথাকথিত ‘শান্তি কমিটি’ ও ‘দালালরা’ নিজেদের আখের গোছাতে ও ক্ষমতার লোভে বিহারী ও পাকিস্তানিদের তল্পিবাহক হয়ে উঠেছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর এই সমস্ত দাপ্তরিক চিঠি, মেমো ও রোজনামচাই প্রমাণ করে যে, একাত্তরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম কোনো সাধারণ গৃহযুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার তথা দীর্ঘ ৯ মাসের একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রতিরোধ যুদ্ধ। আর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সেই নৃশংসতার স্বাক্ষর আজ ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলার কোনো সুযোগ নেই।

ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে এই আল-বদর ও রাজাকাররা যে উগ্র দম্ভোক্তি করেছিল, তার ঠিক এক মাস পরেই—১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে তাদের সেই সাধের ‘বৃহত্তর পাকিস্তান’ ধূলিসাৎ হয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে স্বাধীন-সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’। আর ইতিহাসের অমোঘ নিয়তিতেই পরবর্তীকালে এই নথিপত্রগুলোকে ভিত্তি করেই এদেশের মাটিতে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়।

যুদ্ধের শেষ দিনগুলো

যুদ্ধের শেষ দিকে যখন মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণে পাকিস্তানি সৈন্যরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং গ্রামাঞ্চলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়, তখন তারা ব্রিজ-কালভার্ট পাহারা দেওয়ার জন্য রাজাকারদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এর ফলে রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের সহজ নিশায় পরিণত হয়। পাকিস্তানিরা যখন পরাজয় নিশ্চিত জেনে শহরের দিকে পালিয়ে যাচ্ছিল, তখন তারা এই রাজাকারদের ভাগ্যর ওপর ছেড়ে ফেলে চলে যায়। জীবনের শেষ দিনগুলোতে রাজাকাররা মূলত এক চরম অসহায় ও ঘৃণিত দলে পরিণত হয়েছিল। জীবন বাঁচানোর তাগিদে তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাদের তোষামোদ করেছে, আর পাকিস্তানিরা ফেলে যাওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তাদের পরিণতি হয়েছে অত্যন্ত ভয়াবহ।

আরও দেখুন: