বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী, সহযোগিতা ও শান্তি চুক্তি (১৯৭২) বা ইন্দিরা মুজিব চুক্তি বা ভারত-বাংলাদেশ ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তি। ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

১৯৭২ সালের ১৯শে মার্চ। ঢাকা সফরকালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদী একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ইতিহাসে এটি ‘বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী, সহযোগিতা ও শান্তি চুক্তি’ নামে পরিচিত হলেও, অনেকেই একে সহজ ভাষায় ‘ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি’ বলে থাকেন।

চুক্তিটি যদি ইংরেজিতে ডাউনলো করতে চান তবে : Bangladesh-India Friendship, Cooperation and Peace Treaty 1972 orThe Indira-Mujib Treaty 1972 থেকে নিয়ে নিন।

এই চুক্তিটি নিয়ে ওই সময়ে যে পরিমাণ নোংরা রাজনীতি আর অপপ্রচার হয়েছিল, তা ভাবলে আজও অবাক হতে হয়। পাকিস্তানের দোসর ও স্বাধীনতাবিরোধী চক্র প্রথম থেকেই একে ‘২৫ বছরের গোলামির চুক্তি’ হিসেবে সাধারণ মানুষের সামনে ব্র্যান্ডিং করতে থাকে। তারা এতটাই নিচে নেমেছিল যে, হাটে-বাজারে এমন গুজবও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল—এই চুক্তির মাধ্যমে নাকি আওয়ামী লীগ পুরো বাংলাদেশকে ভারতের কাছে ‘বিক্রি’ করে দিয়েছে!

এত বছর পর আজ এই চুক্তিটি কেন আমি পুনরায় জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন মনে করছি জানেন? কারণ, যারা বছরের পর বছর ধরে ওইসব সস্তা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে এসেছেন, কিন্তু এখন মন থেকে আসল সত্যটা জানতে চান—তাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য এই দালিলিক সত্যটি জানা খুবই জরুরি। নিজে পড়ুন, সত্য জানুন এবং অন্ধ রাজনীতির কুয়াশা থেকে বের হয়ে আসুন।

বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী, সহযোগিতা ও শান্তি চুক্তি (১৯৭২) বা ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি বা ভারত-বাংলাদেশ ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তি

চুক্তির প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্য

১৯৭২ সালের এই মৈত্রী চুক্তির ভূমিকাংশে চুক্তিটি সম্পাদনার গভীর প্রয়োজনীয়তা এবং আদর্শিক ভিত্তি বর্ণনা করা হয়েছে। এর মূল বিষয়গুলো নিচে সুবিন্যস্তভাবে তুলে ধরা হলো:

  • আদর্শিক ঐক্য: শান্তি, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের অভিন্ন আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এই আদর্শের বাস্তব রূপায়ণের লক্ষ্যে দুই দেশ অঙ্গীকারবদ্ধ হয়।
  • যৌথ ত্যাগ ও সংগ্রাম: একযোগে সংগ্রাম, রক্তদান এবং আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বন্ধুত্বের যে বন্ধন তৈরি হয়েছে, তাকে সুদৃঢ় করার মাধ্যমে একটি মুক্ত ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে চিরস্মরণীয় করে রাখা।
  • সৎ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক: উভয় রাষ্ট্রের সীমান্তকে চিরস্থায়ী শান্তি ও বন্ধুত্বের সীমান্তে রূপান্তর করা এবং সৌভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা।
  • পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ: নিরপেক্ষতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার পাশাপাশি আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করা।
  • শান্তি ও নিরাপত্তা: এশিয়া তথা বিশ্বের স্থায়ী শান্তির স্বার্থে এবং উভয় রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা রক্ষার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।
  • বৈশ্বিক দায়বদ্ধতা: আন্তর্জাতিক উত্তেজনা প্রশমন এবং উপনিবেশবাদ, বর্ণবৈষম্যবাদ ও সামন্তবাদের শেষ চিহ্নটুকু চূড়ান্তভাবে নির্মূল করার লক্ষে কাজ করা।
  • সহযোগিতার কূটনীতি: আজকের বিশ্বের আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলো বৈরিতা বা সংঘাতের মাধ্যমে নয়, বরং শুধুমাত্র সহযোগিতার মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব—এই দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এবং জাতিসংঘের সনদের নীতিমালা অনুসরণ করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ ও প্রজাতন্ত্রী ভারত এই মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাংলাদেশ এবং ভারত এই মর্মে অঙ্গীকারাবদ্ধ যে, উভয় দেশের জনগণের মধ্যে বিদ্যমান ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা চিরকাল অটুট থাকবে। উভয় দেশ সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিতে বিশ্বাসী।

চুক্তির প্রধান ১২টি ধারা:

ধারা ১:

স্বাক্ষরকারী পক্ষদ্বয় আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করছে যে, উভয় দেশের মধ্যে চিরস্থায়ী শান্তি ও বন্ধুত্ব বজায় থাকবে প্রতিটি পক্ষ একে অপরের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করবে এবং অন্য পক্ষের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকবে

ধারা ২:

স্বাক্ষরকারী পক্ষদ্বয় সকল প্রকার ঔপনিবেশিকতাবাদ ও বর্ণবাদের নিন্দা জানায় এবং তা চূড়ান্ত ও সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করার লক্ষে সচেষ্ট হওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে

ধারা ৩:

বিশ্ব উত্তেজনা প্রশমন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে জোটনিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতির ওপর উভয় পক্ষ তাদের বিশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করছে

ধারা ৪:

উভয় রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করে এমন প্রধান আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলোর বিষয়ে স্বাক্ষরকারী পক্ষদ্বয় নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করবে এবং পরস্পরের সাথে মতবিনিময় করবে

ধারা ৫:

স্বাক্ষরকারী পক্ষদ্বয় অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি ক্ষেত্রে তাদের পারস্পরিক লাভজনক ও সর্বাত্মক সহযোগিতা জোরদার ও সম্প্রসারিত করবে এছাড়া সমতা ও পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে বাণিজ্য, পরিবহন ও যোগাযোগ ক্ষেত্রেও তারা পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে

ধারা ৬:

উভয় পক্ষ বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী অববাহিকা উন্নয়ন এবং জলবিদ্যুৎ শক্তি ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে যৌথ সমীক্ষা ও যৌথ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে একমত পোষণ করছে

ধারা ৭:

উভয় পক্ষ শিল্প, সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা উৎসাহিত করবে

ধারা ৮:

বিদ্যমান মৈত্রী বন্ধন অনুযায়ী উভয় পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করছে যে, তারা অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত কোনো সামরিক জোটে প্রবেশ করবে না বা অংশগ্রহণ করবে না প্রতিটি পক্ষ অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের আগ্রাসন থেকে বিরত থাকবে এছাড়া কোনো পক্ষই তাদের ভূখণ্ড অন্য পক্ষের নিরাপত্তার ক্ষতি করতে পারে বা হুমকির সৃষ্টি করতে পারে—এমন কোনো কাজে ব্যবহার করতে দেবে না

ধারা ৯:

কোনো তৃতীয় পক্ষ অন্য কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হলে, স্বাক্ষরকারী পক্ষদ্বয় সেই তৃতীয় পক্ষকে কোনো প্রকার সহায়তা প্রদান করা থেকে বিরত থাকবে যদি কোনো এক পক্ষ আক্রান্ত হয় বা আক্রান্ত হওয়ার হুমকির সম্মুখীন হয়, তবে সেই হুমকি দূর করতে এবং নিজ নিজ দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্দেশ্যে উভয় পক্ষ অবিলম্বে পারস্পরিক আলোচনায় মিলিত হবে

ধারা ১০:

প্রতিটি পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করছে যে, তারা এক বা একাধিক রাষ্ট্রের সাথে এমন কোনো গোপন বা প্রকাশ্য অঙ্গীকারে আবদ্ধ হবে না যা বর্তমান চুক্তির সাথে অসংগতিপূর্ণ

ধারা ১১:

এই চুক্তিটি ২৫ বছর মেয়াদে স্বাক্ষরিত হলো এবং উভয় পক্ষের পারস্পরিক সম্মতিতে এটি পরবর্তীতে নবায়ন করা যেতে পারে

ধারা ১২:

এই চুক্তির কোনো ধারার ব্যাখ্যা নিয়ে কোনো মতপার্থক্য দেখা দিলে তা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমঝোতার ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা হবে

এই চুক্তির প্রভাব:

আসলে ঠান্ডা মাথায় ভাবলে বোঝা যায়, ১৯৭২ সালের এই বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তিটি ছিল একটা নবজাত রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে নেওয়া অত্যন্ত দূরদর্শী এক কূটনৈতিক পদক্ষেপ। এই চুক্তির সবচেয়ে বড় দিকটি ছিল—এর মাধ্যমে ভারত অফিশিয়ালি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং আমাদের সীমানার অখণ্ডতার প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা জানানোর অঙ্গীকার করেছিল। তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির জটিল প্রেক্ষাপটে একটা সদ্য স্বাধীন দেশের জন্য এটি ছিল এক বিশাল কূটনৈতিক বিজয়।

চুক্তির প্রতিটি ধারা যদি আপনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন, তবে স্পষ্ট বুঝতে পারবেন—এখানে দুই রাষ্ট্রকেই একদম সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। প্রায় প্রতিটি লাইনে ‘পারস্পরিক সুবিধা’ (Mutual Benefit) এবং ‘উভয় পক্ষের সম্মতি’ (Mutual Agreement)-র বিষয়টি একদম পানির মতো পরিষ্কার করে উল্লেখ করা আছে।

আইনি কাগজের ভাষা স্পষ্ট বলে দেয়, এটি কোনো একতরফা চাপিয়ে দেওয়া শর্ত ছিল না; বরং দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সমতার ভিত্তিতে গড়ে তোলা একটা নিখুঁত আইনি ফ্রেমওয়ার্ক ছিল। ফলে, যাঁরা এই চুক্তিকে কেবল ‘দাসত্ব’ বা ‘অসম চুক্তি’ বলে মাঠ গরম করার রাজনীতি করেছেন, তাঁরা মূলত চুক্তির মূল কাগজের চেয়ে নিজেদের রাজনৈতিক আবেগকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের মনে এক ধরণের অলীক ‘ভারত-ভীতি’ ঢুকিয়ে দিয়ে সস্তা ভোটব্যাংক ও জনমত তৈরি করাই ছিল এই অপব্যাখ্যার মূল উদ্দেশ্য।

হ্যাঁ, দীর্ঘমেয়াদে চুক্তির কিছু প্রায়োগিক সীমাবদ্ধতা বা অমীমাংসিত ইস্যু হয়তো ছিল (যা যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিতেই থাকতে পারে), কিন্তু এর ভেতরের মূল দর্শনটা ছিল দুটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে সমমর্যাদা আর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা। এটাকে যারা ‘বিক্রি হয়ে যাওয়া’ বলে প্রচার করেছিল, তারা মূলত দেশের মানুষকে বোকা বানাতে চেয়েছিল।

সোর্স (Source):

এই চুক্তির মূল পাঠটি বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল ও সরকারি নথিতে সংরক্ষিত আছে। এর প্রধান সোর্সগুলো হলো:

১. বাংলাদেশ গেজেট (১৯৭২)।

২. ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (MEA) আর্কাইভ।

৩. বই: ‘বাংলাদেশ: ডকুমেন্টস’ (বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত)।

৪. বই: ‘The Shadow of the Great Game’ (নরেন্দ্র সিং সারিলা, যদিও এটি বিভাজন নিয়ে, তবে চুক্তির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সেখানে আলোচিত হয়েছে)।

আরও দেখুন: