আজ থেকে অর্ধশতক আগে, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের কালরাত্রিতে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা—শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা—তখন বিদেশে অবস্থান করায় অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান। প্রবাসে থাকা অবস্থায় এই দুই বোন কীভাবে তাঁদের পিতা, মাতা, ভাই ও স্বজনদের মৃত্যুর নির্মম খবর পেয়েছিলেন, তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং নিখুঁত ঐতিহাসিক বিবরণী লিখে গেছেন পরমাণু বিজ্ঞানী এবং শেখ হাসিনার স্বামী প্রয়াত ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত আত্মজৈবনিক গ্রন্থ “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ”-এ এই ট্র্যাজিক অধ্যায়ের প্রতিটি মুহূর্তের বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট দিনটি ছিল শুক্রবার। ভোর ছয়টার দিকে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে তৎকালীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের সরকারি বাসভবনে ড. ওয়াজেদ মিয়ার ঘুম ভাঙে। সানাউল হকের স্ত্রী তাঁকে ডেকে তোলেন এবং জানান যে, পশ্চিম জার্মানির বন (Bonn) শহর থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী টেলিফোনে অত্যন্ত জরুরি ও উৎকণ্ঠিত অবস্থায় কথা বলতে চাচ্ছেন।
হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর সেই জরুরি ফোন ও ব্রাসেলসের থমথমে পরিবেশ
টেলিফোনে কথা বলার জন্য ড. ওয়াজেদ মিয়া প্রথমে তাঁর স্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিচে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু দুই-এক মিনিট পরেই শেখ হাসিনা ওপরে ফিরে এসে স্বামীকে জানান যে, রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী মূলত ওয়াজেদ মিয়ার সাথেই সরাসরি কথা বলতে চান। ড. ওয়াজেদ মিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে তখন ভীষণ চিন্তিত, ফ্যাকাশে এবং উৎকণ্ঠিত দেখাচ্ছিল।
ফোনের রিসিভার ধরার জন্য ড. ওয়াজেদ মিয়া দ্রুত নিচে নেমে আসেন। তিনি দেখতে পান, ব্রাসেলসের চাটুকার ও সুবিধাবাদী রাষ্ট্রদূত সানাউল হক অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় মাথা নিচু করে ড্রইংরুমে পায়চারি করছেন। ওয়াজেদ মিয়া ফোনের রিসিভার কানে তুলতেই অপর প্রান্ত থেকে জার্মানির রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী অত্যন্ত গম্ভীর ও কম্পিত কণ্ঠে বলেন:
“আজ ভোরে বাংলাদেশে ক্যু-দে-টা (Coup d’état) হয়ে গেছে। আপনারা আর প্যারিস যাবেন না। রেহানা ও হাসিনাকে এখনই এই মারাত্মক কথাটি জানাবেন না। এক্ষুনি আপনারা ব্রাসেলস ছেড়ে আমার এখানে বনে (জার্মানি) চলে আসুন।”
উল্লেখ্য, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ওইদিনই (১৫ই আগস্ট) শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা এবং সন্তানদের নিয়ে ড. ওয়াজেদ মিয়ার ব্রাসেলস থেকে ফ্রান্সে বেড়ানোর উদ্দেশ্যে প্যারিস যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই একটি ফোন কল নিমেষেই সব ওলটপালট করে দেয়।
দুই বোনের কান্না এবং ব্রাসেলস ত্যাগ
টেলিফোনে কথা শেষ করে ড. ওয়াজেদ মিয়া যখন ওপরে নিজের ঘরে যান, তখন শেখ হাসিনা অশ্রুসজল চোখে জানতে চান রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর কী কথা হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ওয়াজেদ মিয়া স্ত্রীকে বলেন যে, রাষ্ট্রদূত চৌধুরী তাঁদের প্যারিস যাত্রা বাতিল করে সেদিনই জরুরি ভিত্তিতে জার্মানির বনে ফিরে যেতে বলেছেন।
কিন্তু শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা—দুজনই তাৎক্ষণিকভাবে কাঁদতে কাঁদতে বলেন যে, নিশ্চয়ই দেশে কোনো বড় দুঃসংবাদ আছে যা ওয়াজেদ মিয়া তাঁদের কাছ থেকে লুকাতে চাচ্ছেন। তাঁরা সাফ জানিয়ে দেন, প্যারিস যাত্রা বাতিল করার আসল কারণ পরিষ্কারভাবে না বললে তাঁরা সেই বাসা ছেড়ে এক পা-ও নড়বেন না।
পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে ড. ওয়াজেদ মিয়া আংশিক সত্য প্রকাশ করে বলেন যে, বাংলাদেশে একটি মারাত্মক রাজনৈতিক দুর্ঘটনা বা ঘটনা ঘটে গেছে, যার কারণে এই মুহূর্তে তাঁদের প্যারিস যাওয়া কোনোভাবেই যুক্তিসংগত হবে না। এ কথা শোনার সাথে সাথে দুই বোন চরম অশঙ্কা ও বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁদের গগনবিদারী কান্নার আওয়াজে শিশু সন্তান জয়েরও ঘুম ভেঙে যায়। এরপর সকাল সাড়ে দশটার দিকে তাঁরা অত্যন্ত ভারী মন নিয়ে ব্রাসেলস ছেড়ে জার্মানির বনের উদ্দেশ্যে সড়কপথে রওনা হন।
বনে পৌঁছানো এবং ফ্রাঙ্কফুর্টের সেই আবেগঘন মুহূর্ত
বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ড. ওয়াজেদ মিয়া, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পশ্চিম জার্মানির বনে তৎকালীন বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর সরকারি বাসভবনে গিয়ে পৌঁছান। সেখানে এক আবেগঘন ও থমথমে পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
ঠিক সেইদিনই বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন যুগোশ্লাভিয়ায় রাষ্ট্রীয় সফর শেষে বাংলাদেশে ফেরার পথে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে যাত্রাবিরতি করেছিলেন। দেশে সামরিক অভ্যুত্থানের খবর পেয়ে তিনিও দ্রুত রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর বাসায় এসে আশ্রয় নেন। ড. কামাল হোসেন, রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী এবং তাঁর স্ত্রী—এই তিন জন মিলে গাড়ি থেকে নামা মাত্রই কান্নায় ভেঙে পড়া শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে ধরাধরি করে সান্ত্বনা দিতে দিতে বাসার ভেতরে নিয়ে যান।
এরপর ড্রইংরুমে বসে ড. কামাল হোসেন, হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী এবং ড. ওয়াজেদ মিয়া চরম উৎকণ্ঠিত অবস্থায় বিবিসি (BBC), ভয়েস অব আমেরিকা (VOA) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক রেডিও স্টেশন থেকে বাংলাদেশের ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করতে থাকেন।
সত্যের মুখোমুখি: ড. ওয়াজেদ মিয়ার কাছে নির্মম সত্য প্রকাশ
রেডিওর খবরের মাঝে এক ফাঁকে ড. ওয়াজেদ মিয়া রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীকে ঘরের বাইরে নির্জনে নিয়ে যান এবং ঢাকার প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান। শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা সম্পূর্ণ নিরাপদ স্থানে না পৌঁছানো পর্যন্ত তাঁদের কাছে কিছুই প্রকাশ করা হবে না—এই শর্তে রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী অত্যন্ত ভারী গলায় ওয়াজেদ মিয়াকে বলেন:
“বিবিসি-এর একটি ভাষ্য ও রিপোর্ট অনুসারে, শেখ রাসেল এবং বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছাড়া বঙ্গবন্ধুর পরিবারের আর কেউ বেঁচে নেই। অন্যদিকে, ঢাকাস্থ ব্রিটিশ মিশন কর্তৃক প্রচারিত আরেকটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বিবরণীতে বলা হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কেউই আর জীবিত নেই।”
এই নির্মম সত্য জানার পর হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী—যিনি পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে জাতীয় সংসদের স্পিকার হয়েছিলেন—ড. ওয়াজেদ মিয়াকে পরামর্শ দেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁদের জীবন রক্ষার্থে একমাত্র প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়াটাই সবচেয়ে নিরাপদ হবে।
ড. কামাল হোসেনের ঐতিহাসিক ওয়াদা
পরদিন অর্থাৎ ১৬ই আগস্ট, ড. কামাল হোসেন পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির লক্ষ্যে লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার জন্য বন বিমানবন্দরে যান। বিমানবন্দর থেকে বিদায় নেওয়ার ঠিক প্রাক-মুহূর্তে ড. ওয়াজেদ মিয়া ড. কামাল হোসেনের হাত শক্ত করে ধরে একটি বিশেষ অনুরোধ করেন।
ওয়াজেদ মিয়া বলেন, “খন্দকার মোশতাক আহমদ খুব সম্ভবত আপনাকে তাঁর অবৈধ সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাখার চেষ্টা করবেন। অনুগ্রহ করে আমার কাছে ওয়াদা করুন যে, আপনি কোনো অবস্থাতেই খুনি খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে আপোষ করে তাঁর মন্ত্রিপরিষদে যোগ দেবেন না।”
ড. কামাল হোসেন তখন ড. ওয়াজেদ মিয়ার হাত ধরে যে উত্তর দিয়েছিলেন, তা ইতিহাসের এক অনন্য সততার দলিল। তিনি বলেছিলেন:
“ড. ওয়াজেদ, প্রয়োজন হলে আমি বিদেশেই মৃত্যুবরণ করতে রাজি আছি। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই খুনি খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে এ ব্যাপারে আপোষ করে আমি দেশে ফিরব না।”
ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের বাসভবন এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন
১৬ই আগস্ট রাত ১১টার দিকে রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী এবং তাঁর স্ত্রী অত্যন্ত গোপনে ড. ওয়াজেদ মিয়াকে সাথে নিয়ে বাইরে যান। উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে ওয়াজেদ মিয়াকে ভারতীয় দূতাবাসের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। নির্ধারিত স্থানে সেই কর্মকর্তার সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দেওয়ার পর হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী দম্পতি সেখান থেকে চলে যান।
এরপর ভারতীয় দূতাবাসের ওই কর্মকর্তা ড. ওয়াজেদ মিয়াকে সরাসরি ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে নিয়ে যান। তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত হিসেবে কর্মরত ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কূটনীতিবিদ এম. কে. রাষ্ট্রীয় (মূল টেক্সটে মুসলমান সাংবাদিক উল্লেখ ছিল, যা মূলত তাঁর দীর্ঘ কূটনৈতিক ক্যারিয়ারের একটি অংশ)।
আলোচনার এক পর্যায়ে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ড. ওয়াজেদ মিয়াকে বলেন যে, ভারত সরকারের কাছে তাঁরা ঠিক কী ধরনের সাহায্য চান, তা যেন একটি কাগজে লিখে দেওয়া হয়। এই বলে রাষ্ট্রদূত একটি সাদা কাগজ ও কলম এগিয়ে দেন। সেই ঐতিহাসিক ও চরম সংকটের মুহূর্তে টেবিলের ওপর বসে ড. ওয়াজেদ মিয়া যা লিখেছিলেন, তা ছিল মূলত দুই বোন ও সন্তানদের জীবন বাঁচানোর আকুল আবেদন:
“শ্যালিকা রেহানা, স্ত্রী হাসিনা, শিশু ছেলে জয়, শিশু মেয়ে পুতুল এবং আমার নিজের কেবলমাত্র ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং প্রাণ রক্ষার জন্য ভারত সরকারের নিকট রাজনৈতিক আশ্রয় কামনা করছি।”
উল্লেখ্য, সেই কঠিন সময়ে ওয়াজেদ মিয়া, শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানার হাতে কোনো টাকা-পয়সা ছিল না। শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা দুজনেই দেশ থেকে আসার সময় মাত্র ২৫ ডলার সাথে নিয়ে এসেছিলেন। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে দূরদর্শী কূটনীতিবিদ হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ওয়াজেদ মিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তাঁদের কোনো জরুরি টাকা লাগবে কি-না। শেখ হাসিনার সাথে পরামর্শ করে ওয়াজেদ মিয়া জানান যে, আপতত হাজার খানেক জার্মান মুদ্রা (ডিউশ মার্ক) হলেই তাঁরা কোনোমতে চলতে পারবেন, যা হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা করে দেন।
কার্লসরুয়ে শহরে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি ও ভারতের সবুজ সংকেত
আশ্রয়ের আবেদনপত্রটি জমা দেওয়ার পর, ১৮ই আগস্ট ড. ওয়াজেদ মিয়া, শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা বন শহর থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কার্লসরুয়ে (Karlsruhe) শহরে যান। সেখানে মূলত ড. ওয়াজেদ মিয়ার বৈজ্ঞানিক গবেষণা সংক্রান্ত কিছু জরুরি নথিপত্র ও বইপত্র ছিল, যা উদ্ধার করা এবং প্রবাস জীবনের পরবর্তী অনিশ্চিত অধ্যায়ের জন্য কিছু প্রাতিষ্ঠানিক কাজ সম্পন্ন করা আবশ্যক ছিল।
সেখানে থাকা অবস্থাতেই ভারত সরকারের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া আসে। ২৩শে আগস্ট সকালে ভারতীয় দূতাবাসের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কার্লসরুয়েতে ড. ওয়াজেদ মিয়াকে টেলিফোন করে জানান যে, ভারতীয় দূতাবাসের একজন ফার্স্ট সেক্রেটারি (প্রথম সচিব) সরাসরি তাঁদের সাথে এসে দেখা করবেন।
সেদিন দুপুর দুইটার দিকে ওই ফার্স্ট সেক্রেটারি ওয়াজেদ মিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে জানান যে, পরের দিন অর্থাৎ ২৪শে আগস্ট সকাল নয়টায় তাঁদের কার্লসরুয়ে থেকে সরাসরি ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হবে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের কঠোরভাবে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল যেন এই যাত্রার এবং তাঁদের গন্তব্যের বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়।
ছদ্মনামে দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে আগমন
পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারতীয় দূতাবাসের ওই কর্মকর্তা ২৪শে আগস্ট তাঁদের ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরে নিয়ে যান। নিরাপত্তার স্বার্থে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে সম্পূর্ণ ছদ্মনামে (কারো কারো মতে তাঁদের টিকিট বুকিংয়ে ‘মি. ও মিসেস টি. কে. দাস’ বা অনুরুপ নাম ব্যবহার করা হয়েছিল) তাঁদের বোর্ডিং করানো হয়।
২৫শে আগস্ট সকাল সাড়ে আটটার দিকে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানটি নতুন দিল্লির পালাম (বর্তমানে ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমান থেকে নামার পর দিল্লির নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক মহলের সবুজ সংকেতের জন্য তাঁদের বিমানবন্দরেই প্রায় চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
দুপুরের দিকে ভারত সরকারের দুই জন বিশেষ কর্মকর্তা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিমানবন্দর থেকে তাঁদের গাড়িতে তুলে নেন এবং নতুন দিল্লির ‘ডিফেন্স কলোনি’র একটি সুরক্ষিত ও নিরাপদ বাসায় নিয়ে যান। ওই ফ্ল্যাটটিতে ছিল একটি ড্রইং-কাম-ডাইনিং রুম এবং দুটি শয়নকক্ষ—যার প্রত্যেকটির সাথে একটি করে বাথরুম ছিল। ভারতের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তাঁদের কঠোরভাবে তিনটি পরামর্শ দিয়েছিলেন:
১. কোনো অবস্থাতেই অনুমতি ছাড়া এই বাড়ির বাইরে যাওয়া যাবে না।
২. স্থানীয় বা আশেপাশের কারো কাছে নিজেদের আসল পরিচয় দেওয়া যাবে না।
৩. দিল্লির বা ভারতের অন্য কোথাও বসবাসরত কোনো পরিচিত ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ রাখা যাবে না।
উল্লেখ্য, সে সময় ভারতে ইন্দিরা গান্ধী সরকার কর্তৃক ঘোষিত ‘অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা’ (Internal Emergency) চলছিল। কঠোর সেন্সরশিপের কারণে বাংলাদেশ সম্পর্কে তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য বা বিস্তারিত খবরাখবর ভারতের পত্রপত্রিকায় ছাপা হচ্ছিল না। ফলে, ঢাকার ভেতরের প্রকৃত রাজনৈতিক পরিস্থিতি, খুনিদের অবস্থান এবং বিশ্ব রাজনীতির প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ওয়াজেদ মিয়া ও বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা সম্পূর্ণ অন্ধকারেই ছিলেন। এভাবেই অত্যন্ত উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে তাঁদের প্রথম দুই সপ্তাহ কেটে যায়।
ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সেই ঐতিহাসিক ও অশ্রুসজল সাক্ষাৎ
দিল্লিতে পৌঁছানোর প্রায় দুই সপ্তাহ পর, সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে, ভারত সরকারের একজন যুগ্ম-সচিব (Joint Secretary) ডিফেন্স কলোনির বাসায় এসে শেখ হাসিনা এবং ড. ওয়াজেদ মিয়াকে জানান যে, এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারের জন্য তাঁদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে।
সেদিন রাত আটটায় ভারতীয় কর্মকর্তাদের কড়া সুরক্ষায় ড. ওয়াজেদ মিয়া এবং শেখ হাসিনা ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ১ নম্বর সফদারজং রোডের সরকারি বাসভবনে গিয়ে পৌঁছান। সেখানে একটি কক্ষে তাঁদের বসানো হয়। প্রায় দশ মিনিট পর ভারতের শক্তিশালী ও দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কক্ষে প্রবেশ করেন এবং পরম মমতায় শেখ হাসিনার পাশে গিয়ে বসেন।
কুশল বিনিময়ের পর ইন্দিরা গান্ধী ড. ওয়াজেদ মিয়ার কাছে সরাসরি জানতে চান যে, ১৫ই আগস্টের সেই কালরাত্রির ঘটনা সম্পর্কে তাঁরা পুরোপুরি এবং বিস্তারিত অবগত রয়েছেন কি-না। জবাবে ড. ওয়াজেদ মিয়া জার্মানির রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশিদ চৌধুরীর বরাত দিয়ে ‘রয়টার্স’ (Reuters) পরিবেশিত এবং ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাই কমিশন কর্তৃক প্রচারিত দুটো আলাদা ভাষ্যের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছিল।
তখন ইন্দিরা গান্ধী সেখানে উপস্থিত তাঁর এক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে (কারো মতে তিনি ছিলেন ‘র’ বা RAW-এর তৎকালীন প্রধান পি. এন. ব্যানার্জী বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা) ১৫ই আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে ভারত সরকারের কাছে থাকা সর্বশেষ ও নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্যটি প্রকাশ করতে বলেন।
ওই কর্মকর্তা তখন মাথা নিচু করে অত্যন্ত করুণ স্বরে ইন্দিরা গান্ধী ও শেখ হাসিনাকে জানান যে:
“ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের আর কেউই বেঁচে নেই। রাসেল, সুলতানা কামাল, রোজী মুজিবসহ সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।”
ইন্দিরা গান্ধীর সেই অমর সান্ত্বনা বাণী
এই নির্মম ও চূড়ান্ত সত্যটি শোনার সাথে সাথে শেখ হাসিনা সমস্ত বাঁধ ভেঙে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তখন প্রোটোকল ভেঙে নিজে শেখ হাসিনাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং এক জন মায়ের মতো পরম মমতায় সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
শেখ হাসিনাকে শান্ত করার সময় ইন্দিরা গান্ধী যে ঐতিহাসিক ও জীবনমুখী কথাগুলো বলেছিলেন, তা ড. ওয়াজেদ মিয়া তাঁর বইয়ে হুবহু এভাবে বর্ণনা করেছেন:
“মা হাসিনা, তুমি আজ যা হারিয়েছ, তা এই পৃথিবীর কোনো কিছু দিয়েই আর কোনোদিন পূরণ করা যাবে না। কিন্তু ভেঙে পড়লে চলবে না, তোমার একটি শিশু ছেলে (জয়) ও একটি শিশু মেয়ে (পুতুল) রয়েছে। এখন থেকে তোমার এই ছেলেকেই তোমার আব্বা (বঙ্গবন্ধু) এবং মেয়েকে তোমার মা (বেগম মুজিব) হিসেবে ভাবতে হবে।”
ইন্দিরা গান্ধী আরও যোগ করে বলেছিলেন:
“এ ছাড়াও তোমার ছোট বোন রেহানা ও তোমার স্বামী ওয়াজেদ রয়েছে তোমার সঙ্গে। এখন তোমার এই নিষ্পাপ ছেলে-মেয়ে ও ছোট বোনকে মানুষ করার সম্পূর্ণ ভার তোমাকেই নিতে হবে। অতএব, দেশের মানুষের স্বার্থে এবং পরিবারের স্বার্থে এখন তোমার কোনো অবস্থাতেই ভেঙে পড়লে চলবে না। শক্ত হও।”
১৯৭৫ সালের সেই চরম সংকটের দিনে ইন্দিরা গান্ধীর এই মায়ের মতো আশ্রয় এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতাই মূলত প্রবাসে থাকা বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে মানসিকভাবে টিকে থাকার শক্তি জুগিয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীর ওই মেয়াদে (১৯৭৬ সালের ডিসেম্বর বা ১৯৭৭ সালের নির্বাচন পর্যন্ত) ক্ষমতাকালে এটাই ছিল শেখ হাসিনা এবং ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর একমাত্র এবং ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ। এরপর দীর্ঘ ছয় বছর দিল্লির পান্ডারা রোডের একটি ফ্ল্যাটে ছদ্মনামে কাটাতে হয় এই পরিবারটিকে, যার অবসান ঘটে ১৯৮১ সালের ১৭ই মে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে।
তথ্যসূত্র:
- “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ” — ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া (বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস লিমিটেড, ১৯৯৩)।
- “পান্ডারা রোডে ছিটকে পড়া দিনগুলি” — দিল্লির প্রবাস জীবন নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্মৃতিকথা ও আর্কাইভাল নথি।
- “The Assassination of Sheikh Mujibur Rahman: Declassified Intelligence Reports of India & US” (১৯৭৫ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর ফাইল)।
আরও দেখুন:
