রাজনীতির নির্মম অন্তরাল: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, চীনা ব্লু-প্রিন্ট ও মওলানা ভাসানী । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

আমাদের যে তালিম, তাতে মুরুব্বীদের মূল্যায়নের জন্য সামান্য সমালোচনা করাও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে; তাই নেতিবাচক সমালোচনা তো একেবারেই আমাদের তালিম বিরোধী। এই কারণে মন থেকে তো দূরে থাক, পারত পক্ষে আমরা ভাসানী হুজুরের নামে নেতিবাচক কিছু লিখতে চাই না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মাঝে মাঝে কিছু লোক না বুঝে, আর বঙ্গবন্ধু বিরোধীরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে হুজুরকে রাজনীতিতে এক অতিকায় ও প্রশ্নাতীত রূপ দিতে চায়। তারা ইতিহাস বিকৃত করে হুজুরকে বঙ্গবন্ধুর চেয়েও বড় ও ত্যাগী নেতা বানানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। ঠিক তখনই ঐতিহাসিক সত্যের খাতিরে কলম ধরাটা আমাদের জন্য এক প্রকার বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়ায়; আর সেই দায়বদ্ধতা থেকেই আজকের এই লেখা। লেখার শুরুতে মহান আল্লাহর দরবারে হুজুরের জন্য দোয়া করি, পাশাপাশি তাঁর বিভ্রান্তিকর লিগেসি এবং অন্ধ ভক্তদের জন্য গভীর করুণা পোষণ করি।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ফ্যাক্টরগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এটি সুস্পষ্ট হয় যে, এই নৃশংস ঘটনাটি আকস্মিক কোনো সামরিক অভ্যুত্থান ছিল না। বরং এটি ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, সৌদি আরব, গণচীন এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা খুনি খন্দকার মোশতাক চক্র ও ক্ষমতার লোভী মহলের একটি দীর্ঘমেয়াদী কূটপরিকল্পনা ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের নির্মম পরিণতি। একাত্তরের পরাজিত শক্তি এবং তাদের আন্তর্জাতিক প্রভুরা স্বাধীন বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক, সমাজতান্ত্রিক ও সার্বভৌম অগ্রযাত্রাকে মেনে নিতে পারেনি। ফলে, তারা সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতির ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ (Cold War) এবং অক্ষশক্তির মেরুকরণকে ব্যবহার করে বাঙালি জাতির পিতাকে সপরিবারে স্তব্ধ করে দেওয়ার ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করে।

৯ মার্চ ১৯৭১ - বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাকে ভাসানীর একাত্মতা

Table of Contents

মুক্তিযুদ্ধে চীনের বৈরী ভূমিকা ও স্বাধীন বাংলাদেশে তার ধারাবাহিকতা

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গণচীনের ভূমিকা ছিল সম্পূর্ণ বাংলাদেশ-বিরোধী। মাও সেতুং-এর চীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলেও, ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে ভারতের বিরোধিতা এবং পাকিস্তানের সাথে পরম মিত্রতার কারণে তারা নিঃশর্তভাবে পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে সমর্থন করেছিল। একাত্তরে ঢাকাসহ পুরো বাংলাদেশে যখন পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দালালেরা নির্মম গণহত্যা চালাচ্ছিল, তখন চীন পাকিস্তানকে বিপুল সমরাস্ত্র ও কৌশলগত গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে। শুধু তাই নয়, জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা ব্যবহারের হুমকি দিয়ে তারা বারবার বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চীনাপন্থী বামপন্থীদের একটি বড় অংশ সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে ‘নকশাল’ ও ‘শান্তিকমিটি’র ব্যানারে মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল; অন্য অংশটি ‘দ্বিমুখী যুদ্ধ’ বা দুই কুকুর (ভারত ও পাকিস্তান) তাড়ানোর তত্ত্ব দিয়ে প্রকারান্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা ও পাকিস্তান বাহিনীকে সহায়তায় লিপ্ত ছিল।

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। বাংলাদেশ তৎকালীন বিশ্ব বাস্তবতায় সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) ও ভারতের সাথে কৌশলগত ও পরম মিত্রতার সম্পর্ক বজায় রাখে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের বিজয় অর্জিত হলেও এদেশের বিরুদ্ধে চীনের বৈরী ও চক্রান্তমূলক নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং স্বাধীন বাংলাদেশে তা আরও সূক্ষ্ম ও বিস্তৃত রূপ নেয়। তৎকালীন আন্তর্জাতিক মেরুকরণে মার্কিন-চীন-পাকিস্তান অক্ষ গড়ে উঠেছিল। চীন কোনোভাবেই দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েত বলয়ের এবং ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারকে সহ্য করতে পারছিল না। ফলে, বঙ্গবন্ধু সরকারকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা করে একটি তাবেদার ও সুবিধাজনক শাসকগোষ্ঠীকে ঢাকার মসনদে বসানোই ছিল পেইচিং-এর মূল লক্ষ্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর খন্দকার মোশতাক ও পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি যেভাবে ঝটপট মার্কিন-চীন-সৌদি বলয়ে আবর্তিত হয়েছিল, তা-ই প্রমাণ করে যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পিছনে কোন আন্তর্জাতিক ক্রীড়নকেরা কলকাঠি নেড়েছিল।

টাঙ্গাইলের কাগমারিতে অনুষ্ঠিত আফ্রো-এশীয় সাংস্কৃতিক সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া - ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৭
টাঙ্গাইলের কাগমারিতে অনুষ্ঠিত আফ্রো-এশীয় সাংস্কৃতিক সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া – ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৭

মওলানা ভাসানী: স্বাধীন বাংলাদেশে চীনের ছায়া

স্বাধীন বাংলাদেশে চীনের এই ভূ-রাজনৈতিক চালের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও প্রভাবশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। হুজুর একসময় প্রগতিশীল ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা থাকলেও, স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চীনের রাষ্ট্রীয় ও কৌশলগত স্বার্থের সমান্তরালে চলতে শুরু করে। তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে চীন ও ভারতের মধ্যে তীব্র সীমান্ত দ্বন্দ্ব ও বৈরিতা ছিল, আর পাকিস্তানের সাথে ছিল চীনের গভীর মৈত্রী। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে ভারতের প্রত্যক্ষ সহায়তার কারণে চীন বঙ্গবন্ধু সরকারকে ভারতের ‘পুতুল সরকার’ হিসেবে প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। আর এই প্রচারণাকে মাঠপর্যায়ে জনপ্রিয় করার মূল দায়িত্বটি নিজের কাঁধে তুলে নেন মওলানা ভাসানী।

স্বাধীন বাংলাদেশে ভাসানীর রাজনীতির মূল ধারাই হয়ে উঠেছিল চীন ও পাকিস্তানের মনস্তাত্ত্বিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা। এই লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধু সরকারের তীব্র বিরোধিতা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূলনীতি ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র অবমাননা, উগ্র ভারত-বিরোধিতা, এবং পরোক্ষভাবে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক মনোভাব ছড়াতে শুরু করেন। একই সাথে তিনি পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের জন্য প্রকাশ্য দালালি করেন এবং একাত্তরের ঘাতক-দালাল ও রাজাকারদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের পথ সুগম করেন। ফলে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ত্বরান্বিত করার পেছনে চীনের আন্তর্জাতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ মাঠে ভাসানীর সৃষ্ট অস্থিরতা—একই সুতোয় গাঁথা ছিল।

লণ্ডনের ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সোর্স ও চীনের ভেটো রাজনীতি

বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত এবং মওলানা ভাসানীর সম্পৃক্ততার বিষয়টি একদম শুরু থেকেই বিশ্ব গণমাধ্যমে উঠে আসছিল। ১৯৭২ সালের ৪ঠা এপ্রিল লন্ডনের বিখ্যাত ‘দ্য গার্ডিয়ান’ (The Guardian) পত্রিকায় প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদনে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয় যে:

“মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA) এবং গণচীনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় মওলানা ভাসানী বাংলাদেশে একটি তীব্র সরকার-বিরোধী ও রাষ্ট্র-বিরোধী চক্রান্তের জাল বুনছেন।”

এই প্রতিবেদনের সত্যতা মেলে এর মাত্র কয়েক মাস পরেই, আন্তর্জাতিক মঞ্চে। ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসে স্বাধীন বাংলাদেশ যখন জাতিসংঘের সদস্যপদ পাওয়ার জন্য আবেদন করে, তখন ১৯৭২ সালের ২৫শে আগস্ট (নথি অনুযায়ী ২৪-২৫ আগস্টের মধ্যবর্তী অধিবেশন) জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে চীনের প্রতিনিধি হুয়াং হুয়া বাংলাদেশের সদস্যপদের বিরুদ্ধে তাঁর কুখ্যাত ‘ভেটো’ (Veto) ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। বিশ্বজুড়ে যেখানে চীনের এই ন্যাক্কারজনক ভূমিকার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানানো হচ্ছিল, সেখানে বাংলাদেশে চীনের সবচেয়ে বড় ভক্ত মওলানা ভাসানী তাঁর ‘চীনা চেয়ারম্যান’-এর এই বাঙালি-বিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করেন। যে ভাসানী সামান্য অজুহাতে কাগমারী বা সন্তোষে জ্বালাময়ী আন্দোলনের ডাক দিতেন, তিনি চীনের ভেটোর বিরুদ্ধে একটি মৃদু বিবৃতি দিয়েই নিজের দায় শেষ করেন। অথচ, দেশের অভ্যন্তরে তিনি প্রতিদিন সভা-সমাবেশ করে বঙ্গবন্ধু সরকারকে ‘ভারতের দাস’ আখ্যা দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে বিন্দুমাত্র ছাড় দেননি।

পিকিং-এর স্বীকৃতি আদায় ও ভুট্টোর সাথে গোপন মৈত্রী

চীনের সাথে মওলানা ভাসানীর অন্ধ আনুগত্য ও বোঝাপড়া কতটা গভীর ছিল, তা অনুধাবন করতে ১৯৭৩ সালের শুরুর দিকের একটি ঘটনার দিকে দৃষ্টিপাত করা যায়। ১৯৭৩ সালের ১১ই জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকারের নীতিমালার বিরোধিতা করে ন্যাপ ও অন্যান্য সমমনা দলগুলোর সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটি ২১শে জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করে। সেই সভায় মওলানা ভাসানী সরাসরি বঙ্গবন্ধুকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন:

“মুজিব, তুমি আমার সঙ্গে পিকিং চলো, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে গণচীনের স্বীকৃতি আদায় করে ছাড়বো।” (দৈনিক ইত্তেফাক, ২২শে জানুয়ারি, ১৯৭৩)

এই বক্তব্যের অন্তরালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর রাজনৈতিক চাল। চীন বাংলাদেশকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার পেছনে যে মওলানা ভাসানীর নিজস্ব রাজনৈতিক দরকষাকষি ও পেইচিং-এর গোপন এজেন্ডা জড়িত ছিল, তা এই প্রকাশ্য দাম্ভিক উক্তিতেই স্পষ্ট হয়ে যায়।

একই সাথে, একাত্তরের যুদ্ধে বাঙালিদের কাছে লজ্জাজনকভাবে পরাজিত হওয়া পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো স্বাধীন বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চিরশত্রুতে পরিণত হয়েছিলেন। একাত্তরের সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে ভুট্টো আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণভাবে নানা চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক জ্যোতি সেনগুপ্ত তাঁর বিখ্যাত আকর গ্রন্থ ‘History of Freedom Movement in Bangladesh (1947–1973)’-এ সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে দেখিয়েছেন যে, স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে কোণঠাসা করতে এই জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে মওলানা ভাসানীর একটি অত্যন্ত উষ্ণ ও নিয়মিত যোগাযোগ বজায় ছিল। বাংলাদেশে একাত্তরের পরাজিত শক্তি ও কট্টরপন্থীদের নিয়ে যে ‘মুসলিম বাংলা’ (Muslim Bangla) নামক আন্ডারগ্রাউন্ড মুভমেন্ট বা গোপন আন্দোলন গড়ে উঠছিল, তার পেছনে ভুট্টোর আর্থিক ও রাজনৈতিক মদদ ছিল, যা ভাসানীর প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতার সমান্তরালে কাজ করছিল।

কেবল রাজনৈতিক চক্রান্তই নয়, পাকিস্তানের স্বার্থে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক বাজার উন্মুক্ত করার জন্য মওলানা ভাসানী দালালি করতেও দ্বিধা করেননি। ১৯৭৩ সালের ১৪ই মে সন্তোষের এক গণসমাবেশে ভাসানী পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে এক অদ্ভুত আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন:

“মি. ভুট্টো, আপনি কেন আমাদের স্বীকৃতি দিচ্ছেন না? আপনি যদি স্বীকৃতি দেন, তাহলে আমাদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবেন। এই সে দিন পর্যন্ত এদেশ পাকিস্তানি মালপত্রের সবচেয়ে বড় বাজার ছিল এবং আবারও তাই হবে।” (দ্য স্টেটসম্যান, কলকাতা; ১৫ই মে, ১৯৭৩)

একাত্তরের দালাল ও ঘাতকদের প্রকাশ্য আশ্রয়দান

মওলানা ভাসানী স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচির আড়ালে একাত্তরের ঘাতক, আলবদর ও রাজাকারদের পুনর্বাসিত করার এক নিরাপদ চাদর বিছিয়ে দিয়েছিলেন। একাত্তরের মূল গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন মুখপত্র হিসেবে পরিচিত এবং লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘সংগ্রাম’ পত্রিকা সেসময় বাংলাদেশে ভাসানীর এই ‘মুসলিম বাংলা আন্দোলনের’ পক্ষে নিয়মিত ও ঘটা করে প্রচারণা চালাত। ভাসানী এই ধর্মান্ধ ও খুনি চক্রের প্রতি নিজের প্রকাশ্য সমর্থন ব্যক্ত করে বলেছিলেন:

“মুসলিম বাংলার জন্য যারা কাজ করছে, তাদের আমি দোয়া করি, আল্লাহর রহমতে তারা জয়যুক্ত হবে।” (দৈনিক গণকণ্ঠ; ১৫ই জুন, ১৯৭২—উল্লেখ্য, মূল টেক্সটে ভুলবশত ১৯৭১ সাল লেখা হয়েছিল, যা সংশোধন করে ১৯৭২ করা হলো)

এই উদ্দেশ্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে মওলানা ভাসানী ‘খোদাই খিদমতগার’ নামে (এই কাজটি করে তিনি খান আব্দুল গাফফার খানের সেই সংগঠনের নামটিও কলঙ্কিত করেছিলেন) একটি নতুন সামাজিক-ধর্মীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে একাত্তরের কুখ্যাত রাজাকার, আলবদর এবং তৎকালীন পাকিস্তানপন্থী ‘ইসলামী ছাত্র সংঘের’ (বর্তমান ছাত্রশিবিরের পূর্বসূরি) মাঠপর্যায়ের সশস্ত্র ক্যাডাররা আইনি হাত থেকে বাঁচতে রাতারাতি ন্যাপ ও ভাসানীর আশ্রয়ে ঢুকে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভাসানীর নেতৃত্বে যে ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি’ গঠিত হয়েছিল, তা কার্যত একাত্তরের দালাল, পাকিস্তানপন্থী বাঙালি আমলা, কট্টর ডানপন্থী এবং উগ্র চৈনিক বামপন্থী রাজনীতিকদের একমাত্র অভয়ারণ্যে পরিণত হয়।

দালাল আইন ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা প্রদান

স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তরের মূল যুদ্ধাপরাধী ও তাদের দেশীয় দোসরদের বিচারের ব্যাপারে কতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, তার সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক নজির হলো—স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায়, ১৯৭২ সালের ২৪শে জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু সরকার ‘বাংলাদেশ কোলাবোরেটর্স (স্পেশাল ট্রাইব্যুনালস) অর্ডার, ১৯৭২’ (দালাল আইন) জারি করেন।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, এই আইনের অধীনে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর স্থানীয় দোসর ও খুনিদের গ্রেপ্তার করা শুরু হয়, তখন মওলানা ভাসানী এই বিচারপ্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে সরাসরি মাঠে নামেন। কারণ, গ্রেপ্তারকৃত ঘাতকদের একটি বড় অংশই ছিল ভাসানীর ন্যাপের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মী। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভাসানীর ন্যাপের শীর্ষনেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়া (যিনি পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের আমলে প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদায় সিনিয়র মন্ত্রী হয়েছিলেন এবং ভাসানীর মৃত্যুর পর ন্যাপের সভাপতি হন)।

ভাসানী যুদ্ধাপরাধীদের এই দালাল আইন বাতিলের জন্য বঙ্গবন্ধু সরকারের ওপর তীব্র মানসিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেন। তিনি শুধু মৌখিক বিরোধিতাই করেননি, বরং ১৯৭৩ সালের ৩১শে জানুয়ারির মধ্যে দালাল আইন সম্পূর্ণ বাতিল করে গ্রেপ্তারকৃত সব রাজাকারকে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সরাসরি ‘আলটিমেটাম’ বা চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। খুনি ও গণহত্যাকারীদের বিচার রদ করার এই চক্রান্ত ইতিহাসে মওলানা ভাসানীর ভূমিকাকে এক স্থায়ী কালিমার মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।

ভারতবিরোধিতা ও রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা

মওলানা ভাসানী তাঁর সরল জীবনযাপন এবং ইসলামী ও খাটো ধুতি-কোর্তা পরিহিত বেশভূষার কারণে বাংলার গ্রামীণ ও সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ছিলেন। স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে তিনি এই ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাকে ব্যবহার করে তাঁর পরম পূজনীয় গণচীনের দুই প্রধান শত্রু—ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের (রাশিয়া) বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ছড়াতে শুরু করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের কথা পুরোপুরি অস্বীকার করে, যুদ্ধের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় ১৯৭২ সালের ২৫শে আগস্ট ভাসানী ভারতকে বাংলাদেশের “এক নম্বর শত্রু” বলে আখ্যায়িত করেন।

এর ঠিক দুই সপ্তাহ পর, ১৯৭২ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর, সন্তোষের এক জনসভায় তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ সরকারকে সরাসরি “ভারতের পুতুল সরকার” বা “দিল্লি-মস্কোর দাস” বলে প্রোপাগান্ডা চালানো শুরু করেন (দৈনিক গণকণ্ঠ; ৯ই সেপ্টেম্বর, ১৯৭২)। ১৯৭৩ সালের ৭ই মার্চ অনুষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ভাসানীর ন্যাপের মূল নির্বাচনী ইশতেহার ও এজেন্ডার ভিত্তিই ছিল উগ্র ভারতবিদ্বেষ। তাদের নির্বাচনী ওয়াদায় স্পষ্ট লেখা ছিল: “ভারতের গোলামীর জিঞ্জির ভেঙে বাংলাকে আজাদ করা হবে।” ১৯৭৩ সালের ১৪ই মে এক গণসমাবেশে ভাসানী বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতিকে আক্রমণ করে সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেন:

“আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বের ভুলনীতি অনুসরণ করার ফলে দেশের এই বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। …এই দুটি দেশ এ দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু। …বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অত্যধিক মূল্যের জন্য ভারত দায়ী। …বাংলাদেশ ভারতের গোলামে পরিণত হোক তা আমরা চাই না। …আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ যদি ভারতের ক্রীড়নক থাকার নীতি অব্যাহত রাখে, তাহলে আজ যারা পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগে বিচারাধীন রয়েছে (রাজাকার-আলবদর), তারাই একদিন ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগে এই আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচার করবে।” (দ্য স্টেটস ম্যান, কলকাতা; ১৫ই মে, ১৯৭৩)

হিন্দুবিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক বিষবাণী

ভারতবিরোধিতার সমান্তরালে মওলানা ভাসানীর ন্যাপ অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক অবস্থান নিতে শুরু করে। ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে সাধারণ নির্বাচনের ঠিক পরপরই ভাসানী ন্যাপের বিভিন্ন মিছিল ও সমাবেশ থেকে অত্যন্ত উস্কানিমূলক এবং জীবননাশী স্লোগান দেওয়া হতে থাকে। যার মধ্যে অন্যতম ছিল—“হরে কৃষ্ণ হরে রাম, মুজিববাদের অপর নাম” এবং সরাসরি উচ্ছেদকামী স্লোগান: “হিন্দুরা যদি বাঁচতে চাও, বাংলা ছেড়ে চলে যাও।” (সাপ্তাহিক একতা; ৬ই এপ্রিল, ১৯৭৩)

কেবল দলীয় কর্মীরাই নন, মওলানা ভাসানী নিজেও সংখ্যালঘু হিন্দুদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে প্রকাশ্য জনসভায় উগ্র বক্তব্য দেন। তিনি হিন্দুদের উদ্দেশ্যে পরিষ্কার ভাষায় বলেন:

“তারা যদি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে তাদের নিরাপত্তা এবং স্বার্থরক্ষার নিশ্চয়তা পাবে বলে ভেবে থাকে, তাহলে তাদের ভাগ্য (একাত্তরের) বিহারীদের মতো হবে। …জয় বাংলা অথবা আওয়ামী লীগ তোমাদের রক্ষা করতে পারবে না, তোমাদের ভাগ্য বিহারীদের মতোই হবে।” (দ্য স্টেটস ম্যান, কলকাতা; ১৫ই মে, ১৯৭৩)

‘মুসলিম বাংলা’ ও ‘জ্বেহাদ’ বুলেটিনের উস্কানি

ধীরে ধীরে মওলানা ভাসানীর কর্মকাণ্ড একাত্তরের পরাজিত উগ্র মুসলিম জাতীয়তাবাদীদের এজেন্ডার সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি “ধর্মনিরপেক্ষতা”র চরম বিরোধিতা করে ভাসানী দাবি করেন যে, বাংলাদেশের সংবিধান হতে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি পুরোপুরি বাদ দিয়ে কুরআন, সুন্নাহ ও হাদিসের ভিত্তিতে আইন রচনা করতে হবে (মর্নিং নিউজ; ৮ই অক্টোবর, ১৯৭২)। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন যে, খুব শীঘ্রই আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হবে এবং ঢাকার সরকারি বাড়িগুলোর ওপর ‘মুসলিম বাংলা’র পতাকা উড়বে।

১৯৭৩ সালের নির্বাচনে ভাসানীর দল একটি আসনও না পেয়ে সম্পূর্ণ ধসে পড়লে, তিনি রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ঢাকতে মুসলিম সেন্টিমেন্টের দুয়ো তুলে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর উস্কানি দিতে শুরু করেন। ১৯৭৩ সালের ২৪শে মার্চ মওলানা ভাসানী কর্তৃক নিজস্ব তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত ‘জ্বেহাদ’ নামক বিশেষ বুলেটিনে তিনি সরাসরি হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলিম সমাজকে পাল্টা আক্রমণের ডাক দিয়ে লেখেন:

“যে মুসলমান সমাজ এককালে বিশ্বের সেরা জাতি ছিল, দিল্লিতে সাতশ বছর জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের ন্যায়পরায়ণ বাদশা ছিল, আজ তাহারাই পথের কাঙাল হইয়া পড়িয়াছে। বিধর্মীরা কতিপয় হিন্দুস্থান সরকারের দালাল মুসলমানদের সহায়তায় রাস্তাঘাটে যেখানে সেখানে নিরপরাধ মুসলমানদিগকে অপমান, অপদস্ত ও মারপিট করিতেছে। …আমাদের ধর্মের বিধান ও আল্লাহর আদেশ- বিধর্মীরা যদি মুসলমানদের প্রতি অন্যায়ভাবে প্রথমে আক্রমণ না করে তাহা হইলে তাহাদের কখনও আক্রমণ করা যাইবে না। তাহাদের ধর্মের কোন প্রকার বিঘ্ন ঘটানোও যাইবে না। কিন্তু যদি তাহারা অন্যায়ভাবে মুসলমানদিগকে আক্রমণ করে, তাহা হইলে উহা কিছুতেই বরদাস্ত করিবে না, পাল্টা আক্রমণ করিয়া সমুচিত শাস্তির ব্যবস্থা করিতেই হইবে।… …আমি কঠিন রোগে আক্রান্ত হইয়া অনেকদিন ঢাকার পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলাম। বর্তমানে সন্তোষে ফিরিয়া আসিয়া জানিতে পারিলাম, টাঙ্গাইল জেলার এক শ্রেণীর ‘হিন্দুস্তানের দালালরা’ মুসলমানদের উপর নানাভাবে নির্যাতন চালাইতেছে। কিছু সংখ্যক উগ্রপন্থী হিন্দু আওয়ামী লীগ ইলেকশানে জয়লাভ করিবার পর হইতে মুসলমানদের উপর প্রকাশ্যভাবে নির্যাতনের স্টিম রোলার নির্বিবাদে চালাইয়া যাইতেছে। জানিতে পারিলাম, তাহারা একজন প্রবীণ মুসলমানের দাড়ি পর্যন্ত টানিয়া তুলিয়াছে।।”

 

এই উস্কানির পাশাপাশি ভাসানী ও তাঁর চৈনিক পৃষ্ঠপোষকদের নিজস্ব প্রোপাগান্ডা মেশিন হিসেবে পরিচিত ‘হক কথা’ এবং ‘হক বাণী’ পত্রিকা দুটির মাধ্যমে প্রতিদিন মনগড়া খবর ছাপা হতে থাকে। “বাংলাদেশ ভারতের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে”, “দেশে হিন্দুরাজ কায়েম হচ্ছে”, “মুসলমানরা চরমভাবে নিপীড়িত হচ্ছে” এবং “মুজিব সরকার ইসলাম-বিরোধী”—এই জাতীয় ধারাবাহিক মিথ্যাচার গ্রামীণ ধর্মপ্রাণ মুসলিম সমাজকে স্বাধীন রাষ্ট্র ও বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিল।

চীনাপন্থীদের সশস্ত্র রাজনীতি ও বঙ্গবন্ধুকে ‘খতম’-এর চক্রান্ত

গণচীনের অনুসারী বামপন্থী দলগুলো স্বাধীন বাংলাদেশকে অস্থির করতে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি করতে হেন কোনো জঘন্য কাজ নেই যা করেনি। নকশালপন্থী ও চৈনিক ভাবাদর্শের উগ্র গোষ্ঠীগুলো বঙ্গবন্ধুকে “জাতীয় দুশমন” আখ্যা দিয়ে তাকে সশরীরে ‘খতম’ করার প্রকাশ্য ঘোষণা দেয়। সিরাজ সিকদার (সর্বহারা পার্টি), আব্দুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা, আব্দুল মতিন, দেবেন শিকদার, শান্তি সেন এবং অমল সেনদের পরিচালিত চীনাপন্থী গ্রুপগুলো চোরাগোপ্তা হামলা, থানা লুট, পাটের গুদামে আগুন এবং লুণ্ঠনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকে দেউলিয়া ও অচল করার সশস্ত্র চক্রান্তে লিপ্ত ছিল। আর এই বৈপ্লবিক নৈরাজ্যের পেছনে এক অলিখিত মনস্তাত্ত্বিক ছাতা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মওলানা ভাসানী, যিনি সন্তোষে বসে ক্রমাগত এই সরকারকে উৎখাত করে ‘নতুন পতাকা ওড়াবার’ উস্কানিমূলক বাণী দিচ্ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতাচ্যুত করার এই চক্রান্তের আভাস ভাসানী ১৯৭২ সাল থেকেই দিয়ে আসছিলেন। ১৯৭২ সালের ২৪শে আগস্ট ‘দৈনিক বাংলা’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে মওলানা ভাসানী স্পষ্টভাবে হুমকি দিয়ে বলেন: ‘বাংলাদেশে প্রতিবিপ্লব আসন্ন।’ এর প্রমাণ মেলে পরবর্তীকালে খোদ জাসদ নেতাদের স্বীকারোক্তিতে। ১৯৮৮ সালের ১০ই নভেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে জাসদের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আ.স.ম. আবদুর রব প্রকাশ্য অধিবেশনে বলেন যে:

“১৯৭৩ সালে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে আমি গোপনে দেখা করেছিলাম এবং শেখ মুজিব সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে তাঁকে নেতৃত্বদানের অনুরোধ করেছিলাম। জবাবে ভাসানী হুজুর ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন—‘মুজিব বেঈমান, মীরজাফর; তাকে যে কোনো মূল্যে উৎখাত করতে হবে’।”

১৫ই আগস্টের খুনিদের সাথে ভাসানীর ঐতিহাসিক আঁতাত

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকারতম ভোরে সপরিবারে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এই নারকীয় ও পাশবিক হত্যাকাণ্ডের পর যখন পুরো দেশ স্তব্ধ ও শোকগ্রস্ত, তখন মওলানা ভাসানী খুনিদের পাশে এসে দাঁড়ান। মাত্র কয়েক দিনের মাথায়, অর্থাৎ ১৬ই আগস্ট, তিনি সন্তোষ থেকে অবৈধ রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদকে অভিনন্দন জানিয়ে আনুষ্ঠানিক তারবার্তা (টেলিগ্রাম) পাঠান, যা ১৭ই আগস্ট ১৯৭৫-এর দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা এবং দ্য বাংলাদেশ টাইমস-এর প্রথম পাতায় লিড নিউজ হিসেবে প্রকাশিত হয়।

পরবর্তীতে, ১৯৭৫ সালের ২৪শে আগস্ট ভাসানী খুনিদের গঠিত মোশতাক সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর মজলুম জননেতার প্যাডে পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেন। তিনি বেতার ও সংবাদমাধ্যমে দেশবাসীকে খুনি মোশতাক সরকারের প্রতি অনুগত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন—“মেহনতি মানুষ, বুদ্ধিজীবী, সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী এবং সামরিক-বেসামরিক নাগরিক নির্বিশেষে সকলে যেন এই সরকারের হাতকে শক্তিশালী করতে কঠোর পরিশ্রম করে।” (দৈনিক বাংলা; ২৫শে আগস্ট, ১৯৭৫)

১৫ই আগস্টের এই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর রক্তাক্ত নাটকের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম নেপথ্য কুশীলব ও বেনিফিশিয়ারি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। সামরিক শাসক জিয়াকে নিঃশর্ত ও বুকভরা সমর্থন দিয়েছিলেন মওলানা ভাসানী। জিয়াকে লেখা এক আবেগঘন চিঠিতে ভাসানী লিখেছিলেন:

“আল্লাহ পাকের দরবারে প্রার্থনা, তুমি যে বিরাট দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছ, তাহা পালন করিতে সক্ষম হও।”

এই ঐতিহাসিক তোষণ নীতির কথা স্বীকার করেছেন ভাসানীর নিজের দল ন্যাপেরই বর্তমান মহাসচিব এম. গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া। তিনি নিজের একটি কলামে অত্যন্ত গর্বের সাথে লিখেছেন:

“’৭৫–এর ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক সিপাহি জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে যে প্রতিরোধ সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল, মওলানা ভাসানী যদি সেদিন জিয়াউর রহমানকে সমর্থন না জানাতেন; তবে এ সংগ্রাম হয়তো তখন নিঃশেষ হয়ে যেত। …৭ নভেম্বর পরবর্তী শুধু জিয়াউর রহমানকে সমর্থন দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি, বরং জিয়ার সরকার এবং দেশের স্বাধীনতা–সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মওলানা ভাসানী বৃদ্ধ বয়সে ঘুরে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে। জনসভায় বক্তব্যের মাধ্যমে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জনগণকে সোচ্চার করেছেন। পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে করেছেন ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ। ৭ নভেম্বরের চেতনার সাথে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ও শহীদ জিয়াউর রহমান অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।” (দৈনিক সংগ্রাম)

 

প্রখ্যাত সাংবাদিক এ. এল. খতিব তাঁর বিখ্যাত অনুসন্ধানী আকর গ্রন্থ ‘Who Killed Mujib?’-এ সুনির্দিষ্ট নথিসহ দেখিয়েছেন কীভাবে ভাসানী নিজের রাজনৈতিক প্রভাবকে ব্যবহার করে খুনি চক্র ও জিয়াউর রহমানকে এক আন্তর্জাতিক বৈধতা এনে দিতে ঢাল হিসেবে কাজ করেছিলেন।

দ্য চায়না ফ্যাক্টর: এক সুতোয় গাঁথা কুৎসিত সত্য

মওলানা ভাসানীর এই রাজনৈতিক তৎপরতার মূল চালিকাশক্তি ছিল বেইজিং বা চীন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবমুক্তকৃত অতিগোপন তারবার্তা (Declassified Cables) বিশ্লেষণ করে প্রয়াত প্রখ্যাত সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান তাঁর “Indira called KGB to verify ‘Chinese’ hands in Bangabandhu killing” (প্রথম আলো ইংরেজি) শীর্ষক নিবন্ধে এক অকাট্য সত্য উন্মোচন করেছেন।

১৯৭৫ সালের ২১শে অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত দুই খুনি মেজর ফারুক ও রশিদ ঢাকাস্থ মার্কিন পলিটিক্যাল কাউন্সিলরের সাথে দেখা করে সামরিক সাহায্য চায়। এর ঠিক এক মাস পর, ১৯৭৫ সালের ২০শে নভেম্বর, খুনিরা যখন ভারত থেকে বাঁচতে আমেরিকার ভিসার জন্য ব্যাংককে অপেক্ষা করছিল, তখন মেজর ফারুক মার্কিন কর্মকর্তাদের স্পষ্ট জানায় যে—“ভারত যেন বাংলাদেশে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপ না করতে পারে, সেজন্য গণচীন অলরেডি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নিজেদের সৈন্য ও শক্তি বৃদ্ধি করে ভারতকে চাপে রেখেছে।”

এই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো—১৯৭৫ সালের ৩১শে আগস্ট, অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ঠিক দুই সপ্তাহ পর গণচীন স্বাধীন বাংলাদেশকে রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। অর্থাৎ, শেখ মুজিবুর রহমান জীবিত থাকা অবস্থায় যে চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি, বঙ্গবন্ধুর রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে তারা খুনি মোশতাক সরকারকে বুকে টেনে নেয়। আর স্বাধীন বাংলাদেশে চীনের প্রধানতম ভৃত্য হিসেবে মওলানা ভাসানী এই পথটিই সুগম করে দিয়েছিলেন।

সামগ্রিক মূল্যায়ন: ইতিহাসের নির্মম কাঠগড়া

চীনের প্রতি মওলানা ভাসানীর অন্ধ আনুগত্য ও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জেদ তাকে শেষ বয়সে এসে পুরোপুরি অন্ধ করে তুলেছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিপক্ষে থাকা, পাকিস্তানকে অস্ত্র দেওয়া এবং জাতিসংঘে বাঙালির বিরুদ্ধে ভেটো দেওয়া চীনের দালালি করতে গিয়ে ভাসানী স্বাধীন বাংলাদেশে যা করেছেন, তা এক কথায় রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। বঙ্গবন্ধু সরকারের নামে মিথ্যা অপপ্রচার, উগ্র ভারত-বিদ্বেষ, চরম দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িক বিষবাণী ছড়ানো, একাত্তরের খুনি-রাজাকারদের বিচারের বিরোধিতা করা (দালাল আইন বাতিলের আল্টিমেটাম) এবং শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর খুনি মোশতাক ও জিয়াউর রহমানের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা—এই কর্মকাণ্ডগুলো মওলানা ভাসানীকে ইতিহাসের পাতায় চিরকালের জন্য কলঙ্কিত করে রেখেছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে জেঁকে বসা পাকিস্তানপন্থী সামরিক শাসক, বঙ্গবন্ধুর খুনি এবং তাদের রাজনৈতিক সুবিধাভোগীরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মওলানা ভাসানীর একটি “ক্লিন ইমেজ” বা সাধু চেহারা আমজনতার সামনে দাঁড় করিয়েছিল, যাতে তাঁর আড়ালে বঙ্গবন্ধুর অবদানের ওপর কাদা ছেটানো যায়। কিন্তু ইতিহাসের অকাট্য দলিল ও বাস্তবের নিরিখে মওলানা ভাসানীকে অন্তত স্বাধীন বাংলাদেশের বন্ধু বলা চলে না। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরপরই বাংলাদেশকে চীনের তড়িঘড়ি স্বীকৃতি প্রদান, বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে ভাসানীর সাম্প্রদায়িক ও ধ্বংসাত্মক রাজনীতি এবং পরবর্তীতে খুনি জিয়া সরকারের সাথে তাঁর গভীর মৈত্রী প্রমাণ করে—বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাত তথা এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের মাঠ প্রস্তুতের পেছনে চীনের নীল নকশা ও মওলানা ভাসানীর ঐতিহাসিক দায় কতটা বিস্তৃত ও গভীর ছিল।

সহায়ক সূত্রসমূহ:

  • মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অবমুক্তকৃত দলিল (Declassified US State Department Documents): ১৯৭১ সালের স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়ে মার্কিন-চীন-পাকিস্তান অক্ষের গোপন যোগাযোগ এবং নিক্সন-কিসিঞ্জার-মাও সেতুং প্রশাসনের মধ্যকার নথিপত্র।
  • জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নথিপত্র (১৯৭১): একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধবিরতি জারি করা এবং পাকিস্তানের পক্ষে চীনের নিরাপত্তা পরিষদে অবস্থান নেওয়ার অফিশিয়াল রেকর্ড।
  • বই: ‘The Blood Telegram: Nixon, Kissinger, and a Forgotten Genocide’ — Gary J. Bass. (একাত্তরে মার্কিন ও চীনা ভূ-রাজনীতি বোঝার আকর গ্রন্থ)।
  • বই: ‘History of Freedom Movement in Bangladesh (1947–1973)’ — Jyoti Sen Gupta.
  • গোয়েন্দা রিপোর্ট: স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে মওলানা ভাসানীর সন্তোষের কার্যক্রম এবং ভাসানী ন্যাপের গতিবিধি নিয়ে তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (NSI) ও বিশেষ শাখার (SB) নথিপত্র।
  • লন্ডন প্রেস আর্কাইভ: The Guardian পত্রিকা, প্রকাশিত তারিখ: ০৪ এপ্রিল, ১৯৭২
  • জাতিসংঘ আর্কাইভ (UN Security Council Official Records): নিরাপত্তা পরিষদের ১৫৭৩তম অধিবেশন, তারিখ: ২৪-২৫ আগস্ট, ১৯৭২। বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রাপ্তির আবেদনের বিপরীতে চীনের স্থায়ী প্রতিনিধি হুয়াং হুয়া (Huang Hua) কর্তৃক ভেটো প্রদানের অফিশিয়াল মিনিটস ও হুয়াং হুয়া-র দেওয়া বক্তব্য।
  • সংবাদপত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, প্রকাশকাল: ২২ জানুয়ারি, ১৯৭৩ (পল্টনের জনসভার পরদিন প্রকাশিত লিড নিউজ)।
  • সংবাদপত্র: The Statesman (কলকাতা সংস্করণ), প্রকাশকাল: ১৫ মে, ১৯৭৩ (১৪ মে সন্তোষের সমাবেশে ভুট্টোর উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাসানীর বক্তব্যের কাভারেজ)।
  • বই: ‘History of Freedom Movement in Bangladesh (1947–1973)’ — Jyoti Sen Gupta.
  • সংবাদপত্র: দৈনিক গণকণ্ঠ, প্রকাশকাল: ১৫ জুন, ১৯৭২ (মুসলিম বাংলা আন্দোলন ও ঘাতকদের প্রতি ভাসানীর দোয়ার সংবাদ)।
  • লন্ডন প্রেস আর্কাইভ: যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন মুখপত্র সাপ্তাহিক/দৈনিক সংগ্রাম (লন্ডন ও ঢাকা সংস্করণ, ১৯৭২-৭৩)।
  • দলিল: মওলানা ভাসানী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘খোদাই খিদমতগার’ এবং ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি’র গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র (১৯৭৩)।
  • বাংলাদেশ গেজেট: ‘The Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) Order, 1972’ (President’s Order No. 8 of 1972), জারির তারিখ: ২৪ জানুয়ারি, ১৯৭২
  • ঐতিহাসিক আলটিমেটাম: ১৯৭৩ সালের জানুয়ারি মাসে ভাসানী ন্যাপ কর্তৃক সংবাদ সম্মেলন ও প্যামফ্লেট, যেখানে ৩১ জানুয়ারি, ১৯৭৩-এর মধ্যে দালাল আইন বাতিলের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছিল।
  • সংবাদপত্র: দৈনিক গণকণ্ঠ, প্রকাশকাল: ০৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৭২ (বঙ্গবন্ধু সরকারকে ‘ভারতের পুতুল’ বলার খবর)।
  • ইশতেহার: ১৯৭৩ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ-ভাসানী) কর্তৃক প্রকাশিত মূল নির্বাচনী ইশতেহার।
  • সংবাদপত্র: The Statesman (কলকাতা), প্রকাশকাল: ১৫ মে, ১৯৭৩
  • সংবাদপত্র: সাপ্তাহিক একতা (তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র), প্রকাশকাল: ০৬ এপ্রিল, ১৯৭৩ (ন্যাপের মিছিলে দেওয়া উগ্র সাম্প্রদায়িক স্লোগানের রিপোর্টিং)।
  • সংবাদপত্র: The Statesman (কলকাতা), প্রকাশকাল: ১৫ মে, ১৯৭৩
  • সংবাদপত্র: Morning News (ঢাকা), প্রকাশকাল: ০৮ অক্টোবর, ১৯৭২ (সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়ার দাবির খবর)।
  • মূল বুলেটিন: মওলানা ভাসানী নিজে সম্পাদনা ও সন্তোষ থেকে প্রকাশ করতেন সাপ্তাহিক ‘জ্বেহাদ’ বুলেটিন। প্রবন্ধের উদ্ধৃতিটি ২৪ মার্চ, ১৯৭৩-এ প্রকাশিত বিশেষ বুলেটিন থেকে নেওয়া।
  • সংবাদপত্র: ভাসানী ন্যাপের নিজস্ব প্রোপাগান্ডা পত্রিকা সাপ্তাহিক ‘হক কথা’ এবং ‘হক বাণী’ (১৯৭২-৭৪ সালের ফাইল)।
  • সংবাদপত্র: দৈনিক বাংলা, প্রকাশকাল: ২৪ আগস্ট, ১৯৭২ (মওলানা ভাসানীর বিশেষ সাক্ষাৎকার: ‘বাংলাদেশে প্রতিবিপ্লব আসন্ন’)।
  • জাতীয় সংসদের কার্যবিবরণী (Parliamentary Proceedings): ১০ নভেম্বর, ১৯৮৮; জাতীয় সংসদে জাসদ (রব) নেতা আ.স.ম. আবদুর রব-এর দেওয়া অফিশিয়াল বক্তব্য ও স্বীকারোক্তি।
  • সংবাদপত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা এবং The Bangladesh Times — প্রকাশকাল: ১৭ আগস্ট, ১৯৭৫ (খন্দকার মোশতাককে ১৬ আগস্ট পাঠানো ভাসানীর কুখ্যাত অভিনন্দন তারবার্তার খবর)।
  • সংবাদপত্র: দৈনিক বাংলা, প্রকাশকাল: ২৫ আগস্ট, ১৯৭৫ (২৪ আগস্ট মোশতাক সরকারকে ভাসানীর আনুষ্ঠানিক লিখিত সমর্থন প্রদানের খবর)।
  • চিঠি: ক্ষমতা দখলের পর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মওলানা ভাসানী কর্তৃক সন্তোষ থেকে পাঠানো মূল চিঠি (নভেম্বর, ১৯৭৫)।
  • নিবন্ধ: দৈনিক সংগ্রাম-এ প্রকাশিত ন্যাপ মহাসচিব এম. গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়ার কলাম।
  • বই: ‘Who Killed Mujib?’ — A. L. Khatib (অত্যন্ত বিখ্যাত অনুসন্ধানী রাজনৈতিক গ্রন্থ)।
  • মার্কিন সরকারের অবমুক্তকৃত তারবার্তা (Declassified US Embassy Cables – Dhaka to Washington): অক্টোবর ও নভেম্বর ১৯৭৫-এর ক্যাবল রেকর্ডস। (খুনি ফারুক ও রশিদের সাথে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টার এবং পলিটিক্যাল কাউন্সিলরের বৈঠকের গোপন মিনিটস)।
  • গবেষণামূলক নিবন্ধ: প্রখ্যাত সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান কর্তৃক দৈনিক প্রথম আলোতে (ইংরেজি সংস্করণ) প্রকাশিত বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: “Indira called KGB to verify ‘Chinese’ hands in Bangabandhu killing”
  • কূটনৈতিক রেকর্ড: গণচীন কর্তৃক খন্দকার মোশতাকের অবৈধ সরকারকে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদানের অফিশিয়াল রেকর্ড, তারিখ: ৩১ আগস্ট, ১৯৭৫