কম্বোডিয়ার সঙ্গীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

কম্বোডিয়ার সঙ্গীত ঐতিহ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ অধ্যায়। এর শিকড় মূলত খেমার সাম্রাজ্যের গৌরবময় ইতিহাসের সাথে যুক্ত। আঙ্কোর ভাটের মন্দিরের গায়ের খোদাই করা ভাস্কর্যগুলো প্রমাণ দেয় যে, হাজার বছর আগেও কম্বোডিয়ায় এক অত্যন্ত উন্নত সঙ্গীত সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল।

“অসুরের সুরলোকযাত্রা” সিরিজের এই পর্বে আমরা খেমারদের সঙ্গীত নিয়ে আলোচনা করবো।

কম্বোডিয়ার সঙ্গীত: খেমার আত্মার প্রতিধ্বনি

কম্বোডিয়ার সঙ্গীত প্রধানত ধর্মীয় আচার, রাজকীয় অনুষ্ঠান এবং লোকজ জীবনের কাহিনীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। এর সুরবিন্যাস পশ্চিমা সঙ্গীতের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং এটি মূলত ছন্দ ও যন্ত্রের শব্দের বিন্যাসের (Texture) ওপর নির্ভর করে।

১. পিনপিয়েট (Pinpeat): রাজকীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

কম্বোডিয়ার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রধান এবং প্রাচীনতম জনরা হলো ‘পিনপিয়েট’। এটি মূলত রাজদরবার এবং বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতে পবিত্র অনুষ্ঠান, প্রার্থনা এবং শাস্ত্রীয় নৃত্যের (যেমন: রয়্যাল ব্যালে) সাথে পরিবেশিত হয়।

  • গঠন ও বৈশিষ্ট্য: পিনপিয়েট হলো একটি অর্কেস্ট্রাল ফর্ম যেখানে মূলত ঘাতযন্ত্র (Percussion) এবং বায়ুচালিত (Wind) যন্ত্রের প্রাধান্য থাকে। এর সুর অত্যন্ত রাজকীয় এবং ছন্দময়।
  • বাদ্যযন্ত্র: এতে রোনিয়াত (Roneat – বাঁশের জাইলোফোন), কং ভং (Kong Vong – বৃত্তাকার গং), এবং স্কোর থম (Skor Thom – বিশাল ড্রাম) ব্যবহৃত হয়।

২. প্রধান সঙ্গীত জনরাসমূহ

কম্বোডিয়ায় পিনপিয়েট ছাড়াও আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রীয় ও লোকজ ধারা প্রচলিত:

  • মোহরি (Mohori): এটি রাজকীয় বিনোদনের জন্য ব্যবহৃত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। পিনপিয়েটের মতো এটি অতটা গম্ভীর বা ধর্মীয় নয়। মোহরি মূলত পিয়ানো বা ড্রামের বদলে তারযুক্ত যন্ত্রের (যেমন: ফিলা ও চ্যাপেই) ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা অনেক বেশি সুমধুর এবং লিরিক্যাল।
  • আরেয়াক (Areyak): এটি কম্বোডিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন সঙ্গীত ধারাগুলোর একটি, যা মূলত প্রেতাত্মা বা আধ্যাত্মিক শক্তির সাথে যোগাযোগের আচারে ব্যবহৃত হয়।
  • চ্যাপেই ডাং ভেং (Chapei Dang Veng): এটি ইউনেস্কো স্বীকৃত একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প। এখানে একজন গায়ক ‘চ্যাপেই’ (এক ধরণের লম্বা গলার লু্যট) বাজিয়ে ব্যঙ্গাত্মক বা শিক্ষামূলক কাহিনী গান। এটি অনেকটা আমাদের দেশের বাউল বা চারণ কবিদের গানের মতো।
  • ফ্ল্যাং কার (Phleng Kar): এটি কম্বোডিয়ার ঐতিহ্যবাহী বিয়ের সঙ্গীত। বিয়ের বিভিন্ন আচার পালনের সময় এই গানগুলো গাওয়া হয়।

৩. প্রধান বাদ্যযন্ত্রসমূহ

খেমার যন্ত্রগুলো মূলত প্রকৃতি থেকে সংগৃহীত উপাদান যেমন বাঁশ, কাঠ এবং চামড়া দিয়ে তৈরি:

  • রোনিয়াত এক (Roneat Ek): উচ্চ স্বরের জাইলোফোন যা পুরো সুরকে নেতৃত্ব দেয়।
  • চ্যাপেই ডাং ভেং (Chapei Dang Veng): দুই তারের লু্যট, যা কাহিনী বর্ণনায় ব্যবহৃত হয়।
  • ত্রো (Tro): এটি কোরীয় ‘হেগিউম’-এর মতো দুই তারের বেহালা জাতীয় যন্ত্র। এর সুর অত্যন্ত করুণ এবং গভীর।

৪. কারিগরি বৈশিষ্ট্য

কম্বোডিয়ার শাস্ত্রীয় সঙ্গীত মূলত পেন্টাটোনিক (পাঁচ স্বরের) বা হেপ্টাটোনিক (সাত স্বরের) স্কেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এখানে কোনো লিখিত স্বরলিপি থাকে না; শিষ্যরা ওস্তাদের কাছ থেকে শুনে শুনে বছরের পর বছর অনুশীলনের মাধ্যমে এই সুর আয়ত্ত করেন। এতে ‘ইম্প্রোভাইজেশন’-এর চেয়ে নির্দিষ্ট সুরের নিখুঁত পরিবেশনার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়।

SufiFaruq.com Logo 252x68 3 কম্বোডিয়ার সঙ্গীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

খেমার রুজ শাসনের সময় কম্বোডিয়ার অনেক শিল্পী ও সঙ্গীত সম্পদ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তবে বর্তমানে নতুন প্রজন্মের চেষ্টায় পিনপিয়েট ও চ্যাপেই-এর মতো প্রাচীন শিল্পগুলো আবারও বিশ্বমঞ্চে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। এই সঙ্গীত কেবল শব্দ নয়, এটি খেমার জাতির টিকে থাকার এক অবিনশ্বর প্রতীক।

আরও দেখুন: