২০০৮ সাল। বাংলাদেশে তখনো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। সেই সুযোগে আল-বদর কমান্ডার ও চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের পুত্র হাসান ইকবাল ওয়ামি তৎকালীন জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ‘সামহোয়্যারইন ব্লগ’-এ এক ঔদ্ধত্যপূর্ণ পোস্টে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চরম অবমাননা ও গালিগালাজ করেছিল। বাঙালি জাতির ক্ষত নিয়ে উপহাস করে সে দম্ভোক্তি করেছিল— “পারলে ট্রাইব্যুনাল করে কামারুজ্জামানের ফাঁসি দিস!!!”
ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। ওয়ামির সেই দম্ভোক্তিকে চূর্ণ করে আজ বাংলাদেশ তার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দায়মুক্তি ঘটিয়েছে। সেই প্রেক্ষিতেই এই চিঠি—

প্রিয় ওয়ামি,
তোমার সেই ঔদ্ধত্যপূর্ণ চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশ গ্রহণ করেছিল। হ্যাঁ, এদেশের মাটিতেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। সেই ট্রাইব্যুনালে তোমার পিতা—একাত্তরের কুখ্যাত খুনি, আল-বদর বাহিনীর প্রধান সংগঠক ও সোহাগপুর বিধবা পল্লীর মূল কারিগর কামারুজ্জামানের প্রতিটি মানবতাবিরোধী অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার হয়েছে। আদালত তাকে ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। তোমাদের শেষ মরিয়া চেষ্টা, সেই ‘রিভিউ আবেদন’ও দেশের সর্বোচ্চ আদালত খারিজ করে দিয়ে ফাঁসির রায় বহাল রেখেছেন এবং তা যথাযোগ্য আইনি প্রক্রিয়ায় কার্যকর করা হয়েছে।
সভ্য মানুষ হিসেবে আমরা কোনো সাধারণ মানুষের মৃত্যু আনন্দ নিয়ে কামনা করি না। কিন্তু বৃহত্তর মানবতা, কোটি বাঙালির অশ্রু এবং তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্তের সাথে হওয়া চরম অবিচারের বিপরীতে দাঁড়িয়ে—ন্যায্যতার স্বার্থে তোমার পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বাবার ফাঁসি এদেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষ কামনা করেছিল। এই রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আজ এক কলঙ্ক তিলক থেকে মুক্ত হয়েছে।
একটি কথা আজীবন মনে রেখো—তোমাদের মতো চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী ও রাজাকারের সন্তানদের এই স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে কোনো প্রকার দম্ভোক্তি বা উঁচু আওয়াজে কথা বলা মানায় না। এদেশের রাজনীতিতে মাথা তুলে দাঁড়ানোর কিংবা নেতৃত্ব দেওয়ার ন্যূনতম নৈতিক অধিকারও তোমাদের নেই।
যদি এই লাল-সবুজের পতাকার দেশে তোমাদের বসবাস করতে হয়, তবে হৃদয়ে ন্যূনতম অনুশোচনা নিয়ে এই শর্তগুলো মেনে চলতে হবে:
- প্রথমত, নিঃশর্তভাবে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করতে হবে।
- দ্বিতীয়ত, আমাদের স্বাধীনতার মূল চেতনা ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক আদর্শকে মেনে নিতে হবে।
- তৃতীয়ত, এই স্বাধীন ভূখণ্ডের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর অবিসংবাদিত নেতৃত্বকে বিনম্র শ্রদ্ধায় মেনে নিতে হবে।
আজ থেকে নিজের সন্তানদের সেই প্রকৃত সত্য ও দেশপ্রেমের আদর্শে বড় করে তোলো। অতীতের রক্তক্ষয়ী পাপের উত্তরাধিকার হিসেবে, তোমাদের আগত অন্তত দুটি প্রজন্ম যেন এই বাংলাদেশে কোনো প্রকার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা চিন্তাও না করে।
আর যদি এখনো তোমাদের ধমনীতে সেই একাত্তরের পরাজিত পেয়ারে পাকিস্তানের ভূত সওয়ার হয়ে থাকে, তবে এদেশের আলো-বাতাস ত্যাগ করে তোমাদের প্রিয় পিতৃভূমি পাকিস্তানে ফিরে যাও। সেখানে গিয়ে রাজনীতি করো, জঙ্গিপনা করো কিংবা যা ইচ্ছে তা-ই করো; বাংলাদেশ আর কখনো তোমাদের দিকে ফিরেও তাকাবে না। কিন্তু এদেশের মাটিতে থেকে এদেশের অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ করার দিন চিরতরে শেষ হয়ে গেছে।
ইতিহাসের জয় সুনিশ্চিত, রাজাকারের পতনও অনিবার্য!
আরও দেখুন:
