সংবিধান মানুষের সৃষ্টি। তাই একটি রাষ্ট্রের সংবিধান হেফাজত, ব্যাখ্যা ও বলবত করার জন্য একদল মানুষের প্রয়োজন হয়। এজন্যই সংবিধানে সেসব লোকের নিয়োগ, ক্ষমতা ও পরিচালনা বিধি সুস্পষ্টভাবে লিখে দেওয়া থাকে। কিন্তু পবিত্র কোরআন কোনো মানবীয় সংবিধান নয়; এটি মহান আল্লাহর কালাম। আর যা আল্লাহর সৃষ্টি, তার সুরক্ষার দায়ভারও একান্তই তাঁর।
![SufiFaruq.com Logo 252x68 2 কোরআন হেফাজত ও বলবত করা কি মানুষের দায়িত্ব? | ইসলাম ও মুসলিম সিরিজ 2 কোরআন হেফাজত বা বলবত করা কি মানুষের দায়িত্ব? [ ইসলাম ও মুসলিম ]](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2022/09/SufiFaruq.com-Logo-252x68-2.png)
কোরআন হেফাজত বা বলবত করা কি মানুষের দায়িত্ব? [ ইসলাম ও মুসলিম ]
১. সংরক্ষক যখন স্বয়ং আল্লাহ
আল্লাহ তাআলা কোরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:
“নিশ্চয়ই আমি কোরআন নাযিল করেছি এবং নিশ্চয়ই আমিই এর সংরক্ষক।” (সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৯)
এই আয়াতে আল্লাহ ‘নাহনু’ (আমরা) এবং ‘লা-হাফিজুন’ (অবশ্যই সংরক্ষণকারী) শব্দ ব্যবহার করে চর্তুস্তরীয় নিশ্চয়তা দিয়েছেন। তিনি মানুষের ওপর এই গুরুভার দেননি। যদি মানুষ কোরআন রক্ষার দায়িত্বে থাকতো, তবে পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলোর মতো এটিও মানুষের হীনস্বার্থ ও রাজনৈতিক কাটছাঁটের শিকার হতো। কিন্তু আল্লাহ তা মানুষের নাগালের বাইরে রেখেছেন।
২. কোরআন: একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুস্পষ্ট কিতাব
আল্লাহ যদি মানুষকে দিয়ে তাঁর কিতাব বলবত বা শাসন করতে চাইতেন, তবে তিনি কোরআনেই সেই ‘নিয়োগপ্রক্রিয়া’ বা ‘ক্ষমতার কাঠামো’ স্পষ্ট করে দিতেন। আল্লাহ নিজেই বলেছেন:
মুফাস্সাল (সুস্পষ্টভাবে বিস্তারিত): “আমি তোমাদের কাছে কিতাব নাযিল করেছি বিস্তারিতভাবে।” (সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১১৪)
মা ফাররাতনা (কিছুই বাদ দেওয়া হয়নি): “আমি এই কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দেইনি।” (সূরা আল-আনআম, আয়াত: ৩৮)
আহসানুত তাফসির (সেরা ব্যাখ্যা): “তারা আপনার কাছে কোনো সমস্যা নিয়ে আসলে আমি আপনাকে তার সঠিক সমাধান ও সুন্দরতম ব্যাখ্যা দান করি।” (সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৩৩)
অর্থাৎ, দ্বীন কায়েম বা কিতাব বলবত করার জন্য যদি কোনো ‘রাজনৈতিক দল’ বা ‘বিশেষ গোত্র’ প্রয়োজন হতো, তবে আল্লাহ তা নামাজ বা জাকাতের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে কোরআনে উল্লেখ করতেন। অথচ কোরআনে আল্লাহ কোথাও রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মাধ্যমে কোরআন বলবত করার নির্দেশ দেননি; বরং দিয়েছেন ব্যক্তিগত ও চারিত্রিক বিপ্লবের ডাক।
৩. প্রতিনিধিত্বের মোহ ও ক্ষমতার রাজনীতি
মানুষ স্বভাবগতভাবেই ক্ষমতালোভী। আর পবিত্রতার মুখোশে ক্ষমতা পাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ‘আল্লাহর প্রতিনিধি’ সাজা। ইতিহাসে দেখা গেছে, বিভিন্ন গোষ্ঠী ‘আল্লাহর আইন’ হেফাজতের নাম করে আসলে নিজেদের ‘রাজনৈতিক কর্তৃত্ব’ জাহির করতে চেয়েছে।
তারা দাবি করে—আল্লাহর দ্বীন আজ বিপন্ন, একে বাঁচাতে আমাদের ক্ষমতায় যাওয়া দরকার।
অথচ আল্লাহ বলছেন: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম।” (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৩)
যা পূর্ণাঙ্গ, তাকে রক্ষা করার সাধ্য বা প্রয়োজন মানুষের নেই। মানুষের দায়িত্ব কেবল তা ‘অনুসরণ’ করা, ‘হেফাজত’ করা নয়। দ্বীন রক্ষার নামে যখনই রাজনীতি ঢুকেছে, তখনই তৈরি হয়েছে ‘আসল ওলামা’ বনাম ‘নকল ওলামা’র দ্বন্দ্ব। এই প্রতিনিধিত্বের লড়াই বা ‘ফিতনা’ ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রক্তপাত ঘটিয়েছে।
৪. ধর্মের অবমাননা ও রাজনীতির কুৎসিত রূপ
ক্ষমতার রাজনীতি ধর্মের ইতিহাসকে সবচেয়ে বেশি কলঙ্কিত করেছে। ধর্মের নামে যারা রাজনীতি করে, তারা আসলে মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে নিজেদের হাতের পুতুল বানাতে চায়। তারা ভুলে যায় যে, দ্বীনের প্রচারক হিসেবে রাসুল (সা.)-কেও আল্লাহ বলেছিলেন:
“আপনার দায়িত্ব তো কেবল পৌঁছে দেওয়া, আর হিসাব নেওয়ার দায়িত্ব আমার।” (সূরা আর-রাদ, আয়াত: ৪০)
রাসুল (সা.)-কে যেখানে কেবল ‘সংবাদদাতা’ (মুবাশশির) ও ‘সতর্ককারী’ (নাযির) হিসেবে পাঠানো হয়েছিল, সেখানে আজকের সাধারণ মানুষ কীভাবে আল্লাহর দ্বীন বলবত করার ‘লাঠিয়াল’ হওয়ার স্পর্ধা দেখায়?

যারা প্রকৃতই ইসলামকে ভালোবাসেন, তারা দ্বীনের সাথে ক্ষমতার নোংরা রাজনীতি মেলাতে পারেন না। কোরআন নিজেই নিজের হেফাজতকারী। আমাদের দায়িত্ব কোরআনের ধারক হওয়া, রক্ষক হওয়ার মিথ্যা বড়াই করা নয়। রাজনীতির স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করা মানে আল্লাহর ‘সংরক্ষক’ সত্তাকে অস্বীকার করা। তাই ধর্ম থাকুক হৃদয়ে ও আমলের শুদ্ধতায়, ক্ষমতার গদিতে নয়।
আরও দেখুন:
