সঙ্গীতের ঘরানা কী বা কিভাবে তৈরি হয়?—এই নিয়ে সঙ্গীতবোদ্ধা ও গবেষকদের মধ্যে তাত্ত্বিক আলোচনার শেষ নেই। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অনেক পণ্ডিত এবং ওস্তাদদের মতে, কোনো একটি পরিবার যদি পরপর অন্তত তিন প্রজন্ম ধরে একই কাজ করতে থাকে এবং ওই তিন পুরুষের সমন্বিত কাজের মধ্য দিয়ে কাজটি করার কোনো স্বতন্ত্র শৈলী (Style) তৈরি করতে পারে, তবেই তাদের ঘরানা তৈরি হয়। এর অর্থ হলো—শুধু নতুন একটি শৈলী উদ্ভাবন করলেই হবে না; সেই উদ্ভাবিত শৈলীকে পরবর্তী দুটি প্রজন্মকে গুরু-শিষ্য পরম্পরার মাধ্যমে নিখুঁতভাবে শেখাতে হবে এবং তার চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে।

সঙ্গীতের ঘরানা কী বা কিভাবে তৈরি হয়?
এখানে ‘প্রজন্ম’ মানে কেবল রক্তের সম্পর্ক বা বংশপরম্পরা জরুরি নয়। সঙ্গীতশাস্ত্রে রক্তের সম্পর্কের বাইরেও যেকোনো একনিষ্ঠ ছাত্রকে—যিনি প্রাচীন গুরু-শিষ্য রীতিতে শিক্ষা নেন—তাকেও ওই পরিবারেরই সদস্য বা উত্তরসূরি ধরা হয়। যিনি এই ধরনের একটি দীর্ঘ পারিবারিক বা ঐতিহ্যবাহী শিক্ষায় সুশিক্ষিত ও দীক্ষিত হন, তাকে শাস্ত্রীয় পরিভাষায় “ঘরানা-দার” বা “ঘরানা-ওয়ালা” বলা হয়।
ঘরানার স্বরূপ ও বিকাশ
শুধুমাত্র উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতেই নয়, ‘ঘরানা’ মানে যেকোনো ধরনের সৃষ্টিশীল কাজের একটি স্বতন্ত্র ধারা হতে পারে। যেসব কাজ সৃজনশীল এবং যেখানে প্রতিনিয়ত ক্রমাগত উন্নয়নের সুযোগ থাকে, সেরকম সব ক্ষেত্রেই ঘরানা তৈরি হতে পারে। কেউ কেউ তার জীবদ্দশায় নিজের শ্রম ও মেধা দিয়ে একদম সম্পূর্ণ নতুন ও স্বতন্ত্র শৈলীর জন্ম দিয়ে যান। আবার অনেক সময় দেখা যায়, কোনো এক গুণী শিল্পী একাধিক ভিন্ন ভিন্ন শৈলীতে শিক্ষা নিয়েছেন এবং সেসবের সবচেয়ে সুন্দর ও নান্দনিক জিনিসগুলো মিলিয়ে নিজের একটি নতুন শৈলী তৈরি করেছেন—যা পরবর্তীতে নিরলস চর্চার মাধ্যমে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ঘরানা হয়ে উঠেছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ওই ঘরানার উত্তরসূরি শিল্পীরা সেই শৈলীকে আরও বেশি পরিশোধিত করেন এবং ঘরানাকে সুরের বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ করেন। কণ্ঠসঙ্গীতে যেরকম নানা ঘরানা আছে, একইভাবে ভারতীয় শাস্ত্রীয় বাদ্যযন্ত্রেরও (সেতার, সরোদ, তবলা) নামকরা বিভিন্ন বিশ্বখ্যাত ঘরানা রয়েছে।
ভারতবর্ষে অনেক নামী ও প্রাচীন সঙ্গীত ঘরানা রয়েছে। ডাগর ঘরানার মতো প্রাচীন ধ্রুপদ ঐতিহ্যবাহী পরিবার প্রায় ২০ প্রজন্ম ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে সঙ্গীতের সেবা করে আসছে। তবে কোনো ঘরানাকেই ছোট বা বড় বলা সমীচীন নয়। কোনো একটি অখ্যাত বা অপরিচিত ঘরানা কেবল একজন অতি গুণী শিল্পীর সুরের জাদুতে বিশ্ববিখ্যাত হতে পারে; আবার খুব নামী ও বিখ্যাত ঘরানায় দীর্ঘদিন যোগ্য কোনো গুণী শিল্পী না জন্মাবার কারণে তা কালের নিয়মে বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যেতে পারে।

ঘরানার নাম ও বিবর্তন
‘সেনিয়া’ (Senia) শব্দটি এসেছে হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতের অবিসংবাদিত সম্রাট মিঞা তানসেনের (Mian Tansen) নামের শেষ অংশ থেকে। সঙ্গীতজগতে তানসেনের অবদান এবং তাঁর সৃষ্টি করা সুরের ধারা এতটাই বিশাল ও শ্রদ্ধেয় ছিল যে, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বংশধর এবং তাঁর প্রত্যক্ষ শিষ্যরা নিজেদের সঙ্গীতকে অন্যদের থেকে আলাদা ও বিশুদ্ধ প্রমাণ করার জন্য তানসেনের নামের সাথে মিলিয়ে এই ঐতিহ্যের নাম রাখেন ‘সেনিয়া’। এটি কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক শহরের নাম নয়, বরং এটি ছিল তানসেনের পবিত্র সুর-রক্তের এক রাজকীয় স্মারক।
তানসেনের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার ও উত্তরসূরিরা মূলত দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত হয়ে সঙ্গীতচর্চা অব্যাহত রাখেন:
১. রবাবীয়া (Rababiya) ধারা: তানসেনের পুত্র বিলাসবর খাঁ এবং তানসেনের অন্যান্য পুত্রদের বংশধরেরা রবাব (Rabab) নামক বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন এবং ধ্রুপদ গাইতেন। বাদ্যযন্ত্রের নামানুসারে ইতিহাসে তাঁদের ধারাটির নাম হয় ‘রবাবীয়া’।
২. বিণকার (Binkar) ধারা: তানসেনের কন্যা সরস্বতী দেবী এবং তাঁর স্বামী ওস্তাদ মিছরী সিং (যিনি পরবর্তীতে ধর্মান্তরিত হয়ে ওস্তাদ নওবত খাঁ নাম নেন) প্রাচীন বীণা বা রুদ্রবীণা বাজাতেন। তাঁদের এই ধারাটির নাম হয় ‘বিণকার’।
এই দুই ধারার সঙ্গীতজ্ঞরাই নিজেদের তানসেনের আদি ও অকৃত্রিম ধারক-বাহক হিসেবে গর্বের সাথে “সেনিয়া ঘরানা” বা “সেনিয়া পরম্পরা” বলে পরিচয় দিতেন। বহু বছর ধরে সেনিয়া মানেই ছিল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আভিজাত্যের চূড়ান্ত প্রতীক।
রাজদরবার ও ভৌগোলিক আশ্রয়ে ঘরানার নতুন নামকরণ
আঠারো ও উনিশ শতকে ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বদলে যেতে শুরু করে। এ সময় মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর রাজা, মহারাজা ও নবাবদের দেশীয় রাজ্যগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তখন সঙ্গীতজ্ঞরা জীবিকা ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার খোঁজে বিভিন্ন রাজ্যের রাজদরবারে আশ্রয় নিতে শুরু করেন। এ সময় থেকেই ঘরানাগুলোর নামকরণে এক বড় রূপান্তর আসে। নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়—যে ওস্তাদ বা পন্ডিত যেই মহারাজার আশ্রয়ে থেকে সঙ্গীত সাধনা করতেন এবং শিষ্য তৈরি করতেন, সেই দরবার বা রাজ্যের নামানুসারেই সেই ঘরানার ভৌগোলিক নামকরণ হতো।
যেভাবে গড়ে ওঠে ঘরানা
কোনো একজন ওস্তাদ বা পণ্ডিত (একক বা যৌথভাবে) যখন কণ্ঠে বা যন্ত্রে সম্পূর্ণ নতুন একটি সঙ্গীত পদ্ধতি বা গায়নশৈলী (Style) আবিষ্কার করেন, তখন কেবল আবিষ্কার করলেই তা ঘরানা হয় না। প্রথমত, সেই উদ্ভাবককে নিজে সেই পদ্ধতিতে কঠোর সাধনা করে সার্থকতা প্রমাণ করতে হয়। এরপর সেই পদ্ধতিটি তিনি তাঁর শিষ্যদের শেখান। সেই প্রথম প্রজন্মের শিষ্যেরা যখন তাঁদের নিজস্ব মেধা দিয়ে তা ধারণ করে আবার পরবর্তী অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রজন্মের শিষ্যদের শেখান এবং সেই দ্বিতীয় প্রজন্ম যখন তৃতীয় প্রজন্মে তা সফলভাবে পৌঁছে দিতে পারে—একমাত্র তখনই সেই দীর্ঘস্থায়ী ও পরীক্ষিত শৈলীটিকে “ঘরানা”র আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া যায়।
বলা বাহুল্য, নতুন তৈরি করা কোনো সঙ্গীত পদ্ধতি বা স্টাইল যদি তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী এবং শোনার দিক থেকে আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় না হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই সেই ধারা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। যদি গায়কি বা বাজনায় জাদু না থাকে, তবে প্রথমত অনেক শিক্ষার্থী বা শিষ্য সেই ধারা শিখতে আগ্রহী হবে না। আর যদি একনিষ্ঠ শিষ্যই তৈরি না হয়, তবে সেই শিষ্যদের কাছে পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার্থীরাও শিখতে আসবে না। কোনো গায়কির প্রসার নির্ভর করে তার গুণগত মানের ওপর। একটি নতুন এবং জনপ্রিয় ধারার সার্থকতা তখনই প্রমাণিত হয়, যখন তা কেবল একজন ব্যক্তির একক প্রতিভা নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল গুরু-শিষ্য পরম্পরার মধ্য দিয়ে অন্তত তিনটি কঠিন প্রজন্মের পরীক্ষা পার করে টিকে থাকতে পারে।
তাই একটি নতুন সফল ধারা কেবল তিন প্রজন্মের সময়কাল পার করলেই ঘরানা হয় না, বরং সেই তিন প্রজন্ম জুড়ে মানুষের হৃদয়ে টিকে থাকার মতো সঙ্গীতশক্তি ও জনপ্রিয়তার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেই কেবল একটি স্বার্থক ঘরানা গড়ে ওঠে।
যেহেতু একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ঘরানা তৈরি হতে কয়েক প্রজন্ম সময় লেগে যায়, সেহেতু কোনো শিল্পী চাইলেই তার জীবদ্দশায় হুট করে একটি ঘরানা তৈরি করে নিজের নামে তার নামকরণ করে যেতে পারেন না। কেউ করলেও সেটা সমালোচনা হয় শ্রোতাদের কাছে স্বীকৃতি পাওয়া কঠিন। ভারতীয় উপমহাদেশে অনেক বড় বড় গায়কের ভাগ্য তার ঘরানা হয়নি, অথবা তিনি ঘরানার বাড় বাড়ান্ত দেখে যেতে পারেননি।
চলুন কটা উদাহরণ দেখি:
১. ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ সাহেব এবং ‘মাইহার-সেনিয়া’ ঘরানা
আলাউদ্দীন খাঁ সাহেব শুধু শতায়ু পাননি, তিনি পেয়েছিলেন এক অনন্য শিক্ষক সত্তা। তিনি নিজের ছেলেকে (ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ), মেয়েকে (অন্নপূর্ণা দেবী) এবং জামাতাকে (পণ্ডিত রবিশঙ্কর) এমনভাবে তৈরি করেছিলেন, যা সঙ্গীত ইতিহাসে বিরল। তিনি মাইহার রাজদরবারে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘মাইহার ব্যান্ড’ তৈরি করেছিলেন এবং প্রথাগত গোঁড়ামি ভেঙে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে শিষ্য তৈরি করেছিলেন। তাঁর ত্যাগ এবং একাডেমি চালানোর মতো মানসিকতাই মাইহারকে বিশ্ব দরবারে নিয়ে গেছে।
২. উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ এবং আগ্রা ঘরানা
আগ্রা ঘরানার ‘আফতাব-এ-মৌসিকী’ (সঙ্গীতের সূর্য) উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ সাহেবের ব্যক্তিত্ব ও গায়কি ছিল জাদুকরী। আপনি একদম ঠিক বলেছেন—তাঁর ‘প্যাকেজ’ সবার থাকে না। তাঁর কণ্ঠের গমক, বোলবান্ট এবং নোম-তোম আলাপ মানুষকে চুম্বকের মতো টানত। আগ্রা ঘরানা আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত থাকলেও, ফৈয়াজ খাঁ সাহেব সেই পরম্পরাকে জনপ্রিয়তার চূড়ান্তে নিয়ে যান। তাঁর পেছনে ছিল এক বিশাল পারিবারিক খাঁদান (বংশ) এবং তাঁর নিজস্ব রাজকীয় গায়কি।
৩. কিরানা ঘরানা: উস্তাদ আব্দুল করিম খাঁ ও উস্তাদ ওয়াহিদ খাঁ
কিরানা ঘরানার এই দুই স্তম্ভের ক্ষেত্রে আপনার বিশ্লেষণটি শতভাগ খাঁটি। তাঁরা শুধু নিজেরা গাননি, তাঁরা শিষ্য তৈরির এক বিশাল দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
উস্তাদ আব্দুল করিম খাঁ পুনেতে ‘আর্য সঙ্গীত বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
উস্তাদ ওয়াহিদ খাঁ তৈরি করেছিলেন পণ্ডিত সওয়াই গন্ধর্বের মতো কিংবদন্তিকে, যিনি পরবর্তীতে পণ্ডিত ভীমসেন জোশীকে তৈরি করেন। শিক্ষার্থীদের শেখানোর চাপ বা একাডেমি চালানোর যে মানসিক শক্তির কথা আপনি বলেছেন, সেটিই কিরানা ঘরানাকে ভারতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে দিয়েছিল।
৪. উস্তাদ আল্লাদিয়া খাঁ এবং জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা
আপনি যথার্থই উস্তাদ আল্লাদিয়া খাঁ সাহেবের নাম উল্লেখ করেছেন। কোলহাপুর রাজদরবারে আশ্রিত এই গুণী মানুষটি জয়পুর ঘরানার বক্র ও কঠিন তান-বিস্তারের গায়কি তৈরি করেছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি কেবল নিজের সন্তান নয়, বাইরের বহু গুণী শিক্ষার্থীকে (যেমন—কেশরবাঈ কেরকর, মোগুবাঈ কুর্দিকর) গান শিখিয়েছিলেন। সেই সুবাদেই তাঁর জীবদ্দশায় জয়পুর ঘরানা মার্গ সঙ্গীতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছিল।
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ইতিহাসে অনেক যুগান্তকারী গায়ক এসেছেন, যাঁদের গায়কি ছিল দুর্দান্ত, কিন্তু তাঁদের নামে কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ ঘরানা গড়ে ওঠেনি বা তাঁরা তার বিস্তার দেখে যেতে পারেননি। একটি ঘরানা কেবল সুরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না, তার পেছনে প্রয়োজন হয় নিঃস্বার্থ শিক্ষকতা, প্রাতিষ্ঠানিক মানসিকতা এবং নিজের সৃষ্ট শৈলীকে উদারভাবে বিলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা। আলাউদ্দীন খাঁ সাহেব বা আব্দুল করিম খাঁ সাহেবরা কেবল সাধক ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন দূরদর্শী স্থপতি। আর এ কারণেই তাঁরা জীবদ্দশায় নিজেদের নামের জয়জয়কার দেখে যেতে পেরেছিলেন।
ঘরানার ইতিহাস
ঘরানা সংস্কৃতির শেকড় অনেক প্রাচীন ও দীর্ঘ দিনের হলেও “ঘরানা” শব্দটি প্রাতিষ্ঠানিক ও দাফতরিকভাবে জনপ্রিয় হয়েছে মূলত উনিশ শতকে। এ সময়ে ভারতে ব্রিটিশ রাজের উত্থান ঘটে এবং বিভিন্ন দেশীয় রাজদরবারের পতন হতে শুরু করে। রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা হারানোর ফলে রাজদরবারের গায়কেরা রুজি-রোজগারের তাগিদে দরবার ছেড়ে বিভিন্ন বড় শহরে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। সাধারণ শ্রোতাদের মধ্যে নিজেদের গায়কির স্বতন্ত্রতা প্রমাণ করার জন্য এবং পরিচিতি বজায় রাখার স্বার্থেই তারা ঘরানার নামের ব্যবহার শুরু করেন। যে গুণী শিল্পী যেই রাজদরবারে আশ্রিত ছিলেন (বা যেই এলাকায় তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা), তিনি সেখানকার নাম অনুযায়ী ঘরানার নামের পরিচিতি শুরু করেন। এভাবেই গোয়ালিয়র, আগ্রা, পাতিয়ালা, কিরানার মতো আজকের পরিচিত বিভিন্ন বিখ্যাত ঘরানার জন্ম হয়েছে। তবে “ডাগরবাণী”র মতো কিছু প্রাচীন ঘরানা রয়েছে, যা রাজদরবার নয় বরং বিশুদ্ধ পারিবারিক পরিচয়েই টিকে রয়েছে।
ধ্রুপদ গায়নশৈলী ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের বহু যুগের প্রাচীন ধারা। অনেকগুলো পরিবার বহু যুগ ধরে কঠোর সাধনায় ধ্রুপদ সঙ্গীতকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এরা মূলত বিভিন্ন বড় প্রার্থনালায়, মন্দিরে এবং রাজদরবারে গান পরিবেশন করতেন। এরা আঠারো শতকে যে যেই রাজদরবারের সাথে যুক্ত ছিলেন, সেসব দরবারের নাম অনুযায়ী পরবর্তীতে ঘরানার নাম হয়েছে (যেমন- মথুরা, রামপুর, জয়পুর, বেনারস, বিষ্ণুপুর)। কিন্তু কালক্রমে মার্গ সঙ্গীতের আসরে ধ্রুপদের চেয়ে খেয়াল গান অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠায়, এই ধ্রুপদী পরিবারগুলো পরবর্তীতে বেশিরভাগই নিজেদেরকে খেয়াল রীতির দিকে নিয়ে গেছেন এবং খেয়াল ঘরানা হিসেবেই আজ বিপুল পরিচিতি পেয়েছেন।

আরও দেখুন:
