বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কিংবা পড়াশোনা শেষ করে একজন তরুণের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়—”আমি কোন চাকরিতে যাব?” অনেক সময় আমরা স্রেফ স্রোতে গা ভাসিয়ে দেই। বন্ধু বিসিএস দিচ্ছে বলে আমাকেও দিতে হবে, কিংবা অমুক ভাই অমুক কর্পোরেট হাউসে ভালো আছেন বলে আমাকেও সেখানে যেতে হবে—এই ‘অন্ধ অনুকরণ’ ক্যারিয়ারের জন্য সবচেয়ে বড় অন্তরায়। মনে রাখবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত অন্তত ডজনখানেক ভিন্ন ভিন্ন কাজের ক্ষেত্র আছে। কিন্তু প্রতিটি কাজের ধরন, প্রয়োজনীয় দক্ষতা, কাজের পরিবেশ এবং জীবনযাত্রার মান এক নয়। তাই যেকোনো চাকরিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে একটি ‘সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য’ বা ‘টার্গেট’ ঠিক করা অপরিহার্য। সুফি ফারুকের ভাষায়, “যে নাবিক জানে না সে কোথায় যাবে, কোনো বাতাসই তার অনুকূলে থাকে না।”
চাকরির লক্ষ্য নির্ধারণ: সফল ক্যারিয়ারের প্রথম ও প্রধান ধাপ
সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর-এর ‘পেশা পরামর্শ সভা’ কর্মসূচির বিশেষ গাইডলাইন
আপনার সাবজেক্ট এবং কাজের বিচিত্র জগৎ
আপনি যদি মনে করেন আপনার পঠিত বিষয়টি কেবল একটি নির্দিষ্ট ধরণের চাকরির জন্য, তবে আপনি ভুল ভাবছেন। বর্তমান বিশ্ব এখন মাল্টিডিসিপ্লিনারি। একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিধারী যেমন প্রোডাকশনে কাজ করতে পারেন, তেমনি তিনি সাপ্লাই চেইন বা টেকনিক্যাল সেলসেও ক্যারিয়ার গড়তে পারেন। একইভাবে একজন মানবিক বা ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থীও বিচিত্র সব সেক্টরে নিজের জায়গা করে নিতে পারেন।
- ভিন্ন ভিন্ন দক্ষতা: একেকটি কাজের জন্য একেক ধরনের মানসিক ও কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন হয়। কেউ ডেস্কে বসে কাজ করতে পছন্দ করেন, কেউ আবার মাঠে বা ট্রাভেলিংয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
- জীবনযাত্রার ধরণ: আপনার পছন্দের কাজটি কি আপনাকে ছুটির দিনে পরিবারকে সময় দেওয়ার সুযোগ দেবে? সেখানে কি প্রচুর ট্যুর বা ট্রাভেলের প্রয়োজন হয়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা আপনার টার্গেট নির্ধারণের অংশ।
পেশা ও ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা:
টার্গেট স্থির করার আগে সেই পেশাটি এবং সংশ্লিষ্ট ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে আপনার ধারণা হতে হবে স্বচ্ছ কাঁচের মতো। কেবল বাইরে থেকে চাকচিক্য দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে আত্মঘাতী। আপনাকে গভীরে গিয়ে জানতে হবে:
১. মূল কাজ (Core Responsibilities): ওই পদে প্রতিদিন আপনাকে ঠিক কী কী কাজ করতে হবে?
২. দক্ষতার চাহিদা (Skill Mapping): সেই কাজের জন্য বর্তমান বাজারে কী কী টেকনিক্যাল এবং সফট স্কিল (যেমন—যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণ) প্রয়োজন?
৩. কাজের চাপ (Workload): সেখানে কি প্রতিদিন ৯টা-৫টা ডিউটি, নাকি কাজের চাপে অনেক সময় গভীর রাত পর্যন্ত অফিসে থাকতে হতে পারে?
৪. ভবিষ্যৎ ও প্রমোশন: ওই ইন্ডাস্ট্রির আগামী ১০ বছরের ভবিষ্যৎ কী? সেখানে প্রমোশন বা ক্যারিয়ার গ্রোথ কেমন? অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা (বোনাস, স্বাস্থ্য বীমা ইত্যাদি) কী কী?
সিনিয়রদের অভিজ্ঞতা: এক অমূল্য সম্পদ:
বই পড়ে বা ইন্টারনেট ঘেঁটে যা জানা যায় না, তা জানা যায় ওই পেশায় কর্মরত একজন মানুষের সাথে কথা বলে। আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বলে, আপনি যদি কোনো সিনিয়র পেশাজীবীর কাছে বিনয়ের সাথে পরামর্শ চান, তিনি অত্যন্ত খুশি মনে আপনাকে সাহায্য করবেন।
নেটওয়ার্কিং: আপনার পরিচিত বৃত্তের মধ্যে খুঁজুন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই, আত্মীয় বা বন্ধুদের মাধ্যমে এমন কারো সাথে পরিচয় গড়ে তুলুন যিনি আপনার টার্গেট করা সেক্টরে কাজ করছেন।
সরাসরি আলাপ: তাঁকে জিজ্ঞেস করুন—এই কাজের চ্যালেঞ্জগুলো কী কী? নতুনদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা কোনটি? তিনি যদি আজ নতুন করে শুরু করতেন, তবে কোন বিষয়টি আগে শিখতেন? এই ‘রিয়েলিটি চেক’ আপনাকে কাল্পনিক জগত থেকে বাস্তব জগতের কঠিন কিন্তু সত্য তথ্যের মুখোমুখি করবে।
অনলাইন রিসোর্স ও ডকুমেন্টেশন:
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে যেকোনো ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে অনেক রিপোর্ট, শ্বেতপত্র (White paper) এবং ডকুমেন্ট অনলাইনে পাওয়া যায়। লিঙ্কডইন (LinkedIn), গ্লাসডোর (Glassdoor) কিংবা বিভিন্ন প্রফেশনাল ফোরাম থেকে আপনি ওই পেশার বেতন কাঠামো এবং কোম্পানি কালচার সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন। সংশ্লিষ্ট ইন্ডাস্ট্রির বার্ষিক রিপোর্টগুলো পড়ুন। এটি আপনাকে ইন্টারভিউ বোর্ডে অন্যদের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে রাখবে, কারণ আপনার কথায় তখন তথ্যের গভীরতা থাকবে।
ঠাণ্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত:
মনে রাখবেন—যখন হাতে চাকরি থাকে না, তখন আমরা মরিয়া হয়ে যেকোনো একটা কাজ লুফে নিতে চাই। তখন মনে হয়, “যেকোনো একটা হলেই হলো, পরে দেখা যাবে।” কিন্তু চাকরি পাওয়ার কয়েক মাস পরেই যখন আপনি আপনার ব্যক্তিত্ব বা পছন্দের সাথে কাজের মিল খুঁজে পাবেন না, তখন ওই অসুবিধাগুলো আপনার গায়ে লাগতে শুরু করবে। কাজের প্রতি আপনার অনীহা তৈরি হবে এবং আপনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়বেন।
- নিজেকে চেনা: আপনি কি খুব সুশৃঙ্খল এবং রুটিন মাফিক কাজ পছন্দ করেন? নাকি আপনি প্রতিমুহূর্তে নতুন চ্যালেঞ্জ ও সৃজনশীলতা খোঁজেন?
- দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা: আজকের ছোট একটি ভুল সিদ্ধান্ত আপনার ক্যারিয়ারের ৫-১০ বছর নষ্ট করে দিতে পারে। তাই তাড়াহুড়ো না করে, খুব ঠাণ্ডা মাথায় সব তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিন।
তৈরি হও, জয় করো
লক্ষ্যহীনভাবে ছোটা মানে শক্তির অপচয়। সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর-এর ‘পেশা পরামর্শ সভা’ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো—আপনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। যখন আপনার টার্গেট ঠিক থাকবে, তখন আপনার প্রস্তুতি হবে সুশৃঙ্খল। আপনি জানবেন আপনাকে কোন কোর্সটি করতে হবে, কোন দক্ষতাটি বাড়াতে হবে এবং কার সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে।
নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন এবং সঠিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আপনার ক্যারিয়ারের টার্গেট সেট করুন। মনে রাখবেন, সঠিক লক্ষ্যই অর্ধেক সাফল্য। আজই সিদ্ধান্ত নিন, নিজেকে তৈরি করুন এবং আপনার স্বপ্নের ক্যারিয়ার জয় করুন।

Comments are closed.