কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার ১ নং কয়া ইউনিয়নের একটি ঐতিহ্যবাহী ও বর্ধিষ্ণু গ্রাম হলো ছোটলক্ষীকোল। নদী বিধৌত এই গ্রামটি তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, উর্বর কৃষিজমি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য অত্র অঞ্চলে পরিচিত। গ্রামটি মূলত গড়াই নদীর অববাহিকায় অবস্থিত হওয়ায় এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে নদীর প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট।
ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা
ছোটলক্ষীকোল গ্রামটি কয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। গুগল ম্যাপ ও স্থানীয় মানচিত্র অনুযায়ী, গ্রামের উত্তর দিকে কয়া ও রাধাগ্রাম, দক্ষিণ দিকে গড়াই নদী ও যদুবয়রা ইউনিয়ন, পূর্ব দিকে সুলতানপুর এবং পশ্চিম দিকে বেড়ীবাড়ী গ্রাম অবস্থিত। গ্রামের অধিকাংশ ভূমি সমতল হলেও নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলো কিছুটা ঢালু এবং পলিমাটি সমৃদ্ধ। গ্রামের ভেতর দিয়ে অসংখ্য ছোট-বড় মেঠো পথ এবং বাঁশঝাড়ের সারি গ্রামটিকে এক অপরূপ রূপ দান করেছে।
জনসংখ্যা ও জনমিতি
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং সর্বশেষ আদমশুমারির তথ্যমতে, ছোটলক্ষীকোল গ্রামের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩,৬০০ জন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ১,৮৫০ জন এবং মহিলার সংখ্যা ১,৭৫০ জন। নারী-পুরুষের অনুপাত প্রায় ১০০:৯৫। গ্রামে মোট খানা বা পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৮২০টি। ধর্মীয় গঠনে গ্রামটিতে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু পরিবার দীর্ঘকাল ধরে অত্যন্ত শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করে আসছে।
শিক্ষা ও সংস্কৃতি
গ্রামে শিক্ষার হার প্রায় ৫৯.৫%, যা জাতীয় গড়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শিক্ষার প্রসারে এখানে ছোটলক্ষীকোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীরা নিকটস্থ কয়া মহাবিদ্যালয় ও কুমারখালী উপজেলা সদরের বিভিন্ন নামকরা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। BANBEIS এবং যশোর শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কারিগরি ও উচ্চশিক্ষার প্রতি ঝোঁক দিন দিন বাড়ছে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দিক থেকে গ্রামটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ; বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব ও গ্রামীণ মেলা এখানে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়।
ভূমি ব্যবহার ও কৃষি ব্যবস্থা
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ল্যান্ড জোনিং ডাটাবেজ অনুযায়ী, গ্রামের মোট ভূমির প্রায় ৮০% কৃষি জমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গড়াই নদীর পলিমাটি সমৃদ্ধ হওয়ায় এখানে ধান, পাট, গম, পিঁয়াজ ও রসুনের ফলন অত্যন্ত ভালো হয়। এছাড়াও শীতকালীন সবজি চাষে ছোটলক্ষীকোল গ্রামের কৃষকরা বেশ দক্ষ। গ্রামের প্রায় ৭০% পরিবার সরাসরি কৃষিকাজের সাথে যুক্ত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক কৃষক বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মৎস্য চাষ ও গবাদি পশুর খামার স্থাপনে আগ্রহী হচ্ছেন।
অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা
LGED এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ছোটলক্ষীকোল গ্রামের প্রধান সড়কগুলো পাকা এবং উপজেলা সদরের সাথে সংযুক্ত। গ্রামের অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের জন্য হেরিংবোন বন্ড (HBB) ও কাঁচা রাস্তা রয়েছে। গড়াই নদীর শাখা খালের ওপর কয়েকটি কালভার্ট ও সংযোগ ব্রিজ রয়েছে যা বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশন ও চলাচলে সহায়তা করে। গ্রামে শতভাগ বিদ্যুতায়ন সম্পন্ন হয়েছে এবং অধিকাংশ বাড়িতে স্যানিটেশন সুবিধা বিদ্যমান। ঘরবাড়ির ধরনে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে; বর্তমানে গ্রামের প্রায় ৪৫% ঘর পাকা ও আধা-পাকা।
ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান
গ্রামে ৩টি জামে মসজিদ ও ১টি প্রাচীন মন্দির রয়েছে। মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক জমায়েতের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দান রয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবগুলো স্থানীয় মন্দির ও পূজা মণ্ডপে পালন করেন। গ্রামের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় একটি কবরস্থান ও শ্মশান ঘাট সংরক্ষিত আছে। এছাড়া গ্রামে ছোট একটি বাজার বা মোড় রয়েছে যা স্থানীয় মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
প্রশাসন ও স্থানীয় নেতৃত্ব
ছোটলক্ষীকোল গ্রামটি ১ নং কয়া ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। ইউনিয়ন পরিষদের ডাটাবেজ অনুযায়ী, গ্রামের মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ২,১০০ জন। গ্রামটিতে স্থানীয় নেতৃত্ব হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য (মেম্বার) এবং গ্রাম পুলিশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিরা ‘মাতব্বর’ বা অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প যেমন—রাস্তা মেরামত, বৃক্ষরোপণ এবং ভিজিডি/ভিজিএফ কার্যক্রম এই গ্রামে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
পেশা ও অর্থনীতি
গ্রামের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি হলেও বৈচিত্র্যময় পেশার মানুষ এখানে বাস করেন। কৃষকদের পাশাপাশি গ্রামে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং রাজমিস্ত্রি রয়েছেন। যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় অনেক মানুষ কুমারখালী ও কুষ্টিয়া শহরে চাকরি বা ব্যবসা করেন। এছাড়াও এই গ্রামের একটি বৃহৎ অংশ প্রবাসে কর্মরত থেকে দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে অবদান রাখছেন। গ্রামীণ নারীরা হাঁস-মুরগি পালন ও হস্তশিল্পের মাধ্যমে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলছেন।
আরও দেখুন:
