জাপানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

জাপানি রাজ দরবারের সঙ্গীত বা জাপানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বিশ্ব সঙ্গীতের ইতিহাসে এক অনন্য ও প্রাচীনতম ধারা। যেখানে পশ্চিমা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ‘হারমনি’ বা স্বরসঙ্গতি প্রধান, জাপানি সঙ্গীতে সেখানে প্রাধান্য পায় ‘টিমব্রা’ (Timbral quality) এবং সুরের মধ্যকার শূন্যতা বা নির্জনতা, যাকে জাপানি ভাষায় বলা হয় ‘মা’ (Ma)

“অসুরের সুরলোকযাত্রা” সিরিজের এই বিশেষ পর্বে আমরা জাপানি রাজ দরবারের প্রাচীন সঙ্গীত নিয়ে আলোচনা করবো।

জাপানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত: রাজ দরবারের প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিকতা

জাপানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে বৌদ্ধ ধর্মতত্ত্ব, শিন্তো আচার এবং প্রাচীন চীনা ও ভারতীয় সঙ্গীতের প্রভাবে। এর সুর অত্যন্ত ধীর, গম্ভীর এবং এটি শ্রোতাকে এক ধরণের ধ্যানমগ্ন অবস্থায় নিয়ে যায়।

১. গাগাকু (Gagaku): বিশ্বের প্রাচীনতম জীবন্ত অর্কেস্ট্রা

জাপানি রাজ দরবারের সঙ্গীতের প্রধান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জনরা হলো ‘গাগাকু’। এর আক্ষরিক অর্থ হলো ‘মার্জিত সঙ্গীত’। এটি ৭ম শতাব্দী থেকে আজ পর্যন্ত জাপানি রাজ দরবারে (Imperial Court) নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিবেশিত হয়ে আসছে।

গাগাকু-কে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:

  • কাঙ্গেন (Kangen): এটি কেবল বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে গঠিত পরিবেশনা (Instrumental)। এতে বায়ুচালিত, তারযুক্ত এবং ঘাতযন্ত্রের ব্যবহার থাকে।
  • বুগাকু (Bugaku): যখন সঙ্গীতের সাথে রাজকীয় নাচ বা নৃত্য পরিবেশিত হয়।
  • উৎসামাই (Uta-mai): গাওয়ার সাথে নাচের সমন্বয়, যা মূলত জাপানের স্থানীয় লোকজ সুরের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

২. জাপানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রধান বাদ্যযন্ত্র

জাপানি সঙ্গীতে ব্যবহৃত যন্ত্রগুলো অত্যন্ত প্রতীকী এবং প্রাকৃতিক শব্দের অনুসারী:

  • শো (Sho): এটি একটি ছোট মুখ-অর্গান (Mouth organ), যার ১৭টি বাঁশের পাইপ থাকে। এটি দেখতে অনেকটা ডানামেলা ফিনিক্স পাখির মতো এবং এর সুরকে বলা হয় ‘স্বর্গের আলো’।
  • হিচিরিকি (Hichiriki): এটি একটি ছোট বাঁশি জাতীয় যন্ত্র যার শব্দ অত্যন্ত তীব্র ও বিলাপের মতো। এটি পৃথিবীর মানুষের কণ্ঠস্বরের প্রতিনিধিত্ব করে।
  • কোতো (Koto): জাপানের জাতীয় বাদ্যযন্ত্র। এটি ১৩টি তারবিশিষ্ট একটি অনুভূমিক যন্ত্র, যার সুর অত্যন্ত লিরিক্যাল।
  • বিওয়া (Biwa): এক ধরণের চার বা পাঁচ তারের লু্যট (Lute), যা সাধারণত কাহিনী বর্ণনা বা বীরগাথা গাওয়ার সময় বাজানো হয়।

৩. গানের প্রধান জনরাসমূহ (Vocal Genres)

জাপানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে কেবল যন্ত্র নয়, কণ্ঠস্বরেরও বিভিন্ন ধ্রুপদী ধারা রয়েছে:

  • শোমীয়ো (Shōmyō): এটি জাপানি বৌদ্ধ সংগীতের একটি প্রাচীন রূপ। এটি মূলত বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের সমবেত মন্ত্রপাঠ বা স্তোত্রগান। এতে কোনো বাদ্যযন্ত্র থাকে না, কেবল কণ্ঠস্বরের ওঠানামা (Melismatic style) দিয়ে এক ধরণের আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করা হয়।
  • জোরুরি (Jōruri): এটি মূলত পুতুলনাচ (Bunraku) বা নাটকের সাথে পরিবেশিত কাহিনীমূলক গান। এতে শামিসেন (Shamisen – তিন তারের যন্ত্র) বাজিয়ে অত্যন্ত উচ্চস্বরে আবেগপ্রবণ কাহিনী গাওয়া হয়।
  • নোহগাকু (Nōgaku): এটি বিশ্ববিখ্যাত ‘নোহ’ (Noh) নাটকের সঙ্গীত। এতে গায়কদল (Jiutai) এবং বাঁশি ও ড্রামের একটি দল (Hayashi) সম্মিলিতভাবে কাজ করে। এর সুর অত্যন্ত মন্থর এবং প্রতীকী।

৪. কারিগরি বৈশিষ্ট্য: হারমনি নয়, হেটেরোফোনি

জাপানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে বড় কারিগরি বিশেষত্ব হলো এটি পশ্চিমা সঙ্গীতের মতো ‘হারমোনিক’ নয়, বরং ‘হেটেরোফোনিক’ (Heterophonic)

এখানে সব যন্ত্র মূলত একই মেলডি বা সুর বাজায়, কিন্তু প্রতিটি যন্ত্র তার নিজস্ব ঢঙে বা টাইমিংয়ে সামান্য পরিবর্তন করে সেই সুরটি উপস্থাপন করে। এতে একটি সুরের অনেকগুলো ‘ছায়া’ তৈরি হয়, যা সুরের টেক্সচারকে অত্যন্ত গভীর ও রহস্যময় করে তোলে।

৫. জো-হা-কিউ (Jo-ha-kyū) কাঠামো

পশ্চিমা ৪-মুভমেন্টের বদলে জাপানি সঙ্গীতের প্রগতি চলে ‘জো-হা-কিউ’ নিয়মে:

  • জো (Jo): অত্যন্ত ধীর ও ছন্দহীন সূচনা।
  • হা (Ha): গতি কিছুটা বাড়ে এবং সুরের বিকাশ ঘটে।
  • কিউ (Kyū): দ্রুত গতিতে সমাপ্তি।

 

জাপানি রাজ দরবারের সঙ্গীত কেবল বিনোদন নয়, এটি একটি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আচারের অংশ। এর সুরের মাঝখানের নীরবতা বা শূন্যস্থানগুলো শ্রোতাকে নিজের অন্তরের মধ্যে দেখতে সাহায্য করে। আধুনিক জাপানি পপ বা ইলেকট্রনিক মিউজিকের যুগেও এই প্রাচীন ‘গাগাকু’ বা ‘শোমীয়ো’ এখনও জাপানি সংস্কৃতির আভিজাত্যকে ধরে রেখেছে।