সিনেমা প্যারাডাইসো (Cinema Paradiso)-র আলফ্রেডো চরিত্রটি পর্দায় যতবার ভেসে ওঠে, অবিকল আমার জালাল ভাইয়ের মুখটি সামনে এসে দাঁড়ায়। ছোটবেলার সেই দিনগুলোতে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল—জালাল ভাই পৃথিবীর সব পারেন!
লাঠিখেলা শেষে আমাকে কাঁধে তুলে নিয়ে অনায়াসে পাঁচ কিলোমিটার পথ হেঁটে বাড়ি ফেরা, নদী থেকে ডুব দিয়ে শামুক তুলে আনা কিংবা গাছের মগডাল থেকে পাখির বাসা পেড়ে আনা—সবই ছিল তাঁর বাঁ হাতের খেল।
মায়ের কড়া শাসন অগ্রাহ্য করে আমার সব আবদার—তা ন্যায় হোক কি অন্যায়—গোপনে পরম প্রশ্রয়ে মিটিয়েছেন তিনি। একসময় নিজের স্ত্রী-সন্তানকে ঘরে একা রেখে রাতের পর রাত আমাদের পাহারায় সজাগ থেকেছেন জালাল ভাই, সোনা ভাই, মুনা ভাই, ধোনা ভাই, পচা ভাই আর কাঁঠাল চাচারা। রক্তের সম্পর্কের বাইরেও যে নিঃস্বার্থ এক নিরাপত্তার চাদর থাকে, তাঁরাই ছিলেন তার জীবন্ত দলিল।
আহা, কী ইস্পাত-কঠিন পেশিবহুল শরীরটাই না ছিল আমার সেই জালাল ভাইয়ের!
সময়ের নিয়মে মানুষটি আজ বুড়ো হয়ে গেছেন। টানটান পেশিগুলো আজ বয়সের ভারে ঝুলে পড়েছে। গতবার যখন দেখা হলো, দেখলাম সামনের দুটো দাঁতও নেই। সময়ের এই ক্ষয় বড় নির্মম।
আমার ছেলে আরশান বড় হচ্ছে। শহুরে চার দেয়ালের মাঝে বড় হতে থাকা ওর দিকে তাকিয়ে কখনো কখনো অবাধ্য দীর্ঘশ্বাস নামে। আমি শংকিত হয়ে ভাবি—ওর শৈশবে তো কোনো ‘জালাল ভাই’ নেই! পরম নির্ভরতায় কাঁধে তুলে নেওয়ার মতো, শাসন ভেঙে গোপনে আবদার মেটানোর মতো কোনো রূপকথার পাহাড় আরশান কোনোদিন পাবে না। অবক্ষয়ের এই আধুনিকতায় আমাদের সন্তানেরা বড় একা।