টেকনোলজি একুইজিশন স্কিল স্থানীয় সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রির চ্যালেঞ্জ । CIO সিরিজ

বাংলাদেশের স্থানীয় সফটওয়্যার ও আইটি সলিউশন বাজারে একটি গভীর কিন্তু প্রায় অদৃশ্য সমস্যা কাজ করে—ক্রেতা পক্ষের “টেকনোলজি একুইজিশন স্কিল”–এর ঘাটতি। আমরা সাধারণত সফটওয়্যার কোম্পানির সক্ষমতা, প্রোগ্রামারের দক্ষতা, কোডের মান বা ডেলিভারির সময়সীমা নিয়ে আলোচনা করি; কিন্তু খুব কমই প্রশ্ন করি, প্রযুক্তি কিনতে আসা প্রতিষ্ঠানটি নিজে কতটা প্রস্তুত। বাস্তবতা হলো, প্রযুক্তি সংগ্রহ নিজেই একটি বিশেষায়িত দক্ষতা। এটি কেবল অর্থ থাকা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকার বিষয় নয়; বরং এটি ব্যবসায়িক সমস্যা সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা, কাঠামোবদ্ধ রিকোয়ারমেন্ট তৈরি করা, বাজারে বিদ্যমান সমাধান সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা রাখা, ভেন্ডর নির্বাচন প্রক্রিয়া বোঝা, ঝুঁকি মূল্যায়ন করা এবং পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করার সমন্বিত সক্ষমতা।

আমাদের দেশে একটি বড় মানসিক বাধা হলো—যিনি অর্থ প্রদান করেন, তিনি স্বাভাবিকভাবেই নিজেকে অধিকতর জ্ঞানসম্পন্ন মনে করেন। এই মনস্তত্ত্ব অস্বাভাবিক নয়; আমরাও যখন ক্রেতার আসনে বসি, প্রায়ই একই প্রবণতায় আক্রান্ত হই। কিন্তু প্রযুক্তি সংগ্রহ এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে আর্থিক ক্ষমতা মানেই কৌশলগত দক্ষতা নয়। ক্রেতাকে সরাসরি বলা কঠিন যে প্রযুক্তি কেনার আগে প্রযুক্তি কেনার প্রক্রিয়াটি শিখে নেওয়া প্রয়োজন। ফলে শুরুতেই একটি অদৃশ্য টানাপোড়েন তৈরি হয়। রিকোয়ারমেন্ট ঠিকভাবে নির্ধারিত হয় না, ব্যবসায়িক লক্ষ্য পরিষ্কার থাকে না, প্রকল্প শুরু হওয়ার পর বারবার পরিবর্তন আসে, এবং এসব পরিবর্তনের যৌক্তিক সীমা বোঝানো হলে তা অনীহা বা অযোগ্যতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। সম্পর্কের অবনতি ঘটে, সময় ও বাজেট বাড়ে, আর প্রকল্পের ফলাফল উভয় পক্ষের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো মূল কার্যকারিতার চেয়ে বাহ্যিক উপস্থাপনার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি। সফটওয়্যারটি ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াকে কতটা দক্ষ করছে, ডেটা ব্যবস্থাপনাকে কতটা উন্নত করছে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কতটা সহজ করছে—এসবের চেয়ে অনেক সময় রঙ, লেআউট বা ড্যাশবোর্ডের চেহারা বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে প্রকৃত সমস্যার সমাধানের বদলে উপরিভাগে সময় ব্যয় হয়। প্রযুক্তি তখন কৌশলগত হাতিয়ার না হয়ে কসমেটিক উপাদানে পরিণত হয়।

এই পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন ঠিকই, কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের এবং তার পেছনের বিনিয়োগকারীদের। আইটি সলিউশন এমন কোনো পণ্য নয়, যা একবার ব্যর্থ হলে অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে। একটি কাস্টম সফটওয়্যার যদি কাঙ্ক্ষিত ফল না দেয়, তবে সেই বিনিয়োগ প্রায় সম্পূর্ণভাবে অপচয়ে পরিণত হয়। শুধু অর্থ নয়, সময়, মনোবল এবং ভবিষ্যতে প্রযুক্তি গ্রহণের আগ্রহ—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকেও দুর্বল করে।

এই বাস্তবতায় প্রযুক্তি কেনার আগে প্রযুক্তি সংগ্রহের দক্ষতা অর্জন অপরিহার্য। সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের উচিত কিছু সময় ব্যয় করে প্রযুক্তি প্রোকিউরমেন্টের মৌলিক কাঠামো বোঝা, রিকোয়ারমেন্ট ডকুমেন্টেশন শেখা, ভেন্ডর মূল্যায়নের মানদণ্ড তৈরি করা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার মৌলিক ধারণা অর্জন করা। প্রয়োজন হলে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ বা পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে। অল্প সময় ও সামান্য ব্যয় ভবিষ্যতের বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে।

সরকারি পর্যায়ে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেখানে ব্যবহৃত অর্থ জনগণের। যেসব কর্মকর্তা প্রযুক্তি ক্রয় বা প্রকল্প অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত, তাদের জন্য টেকনোলজি একুইজিশন বিষয়ে কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণ থাকা উচিত। নীতি-নির্ধারণী স্তরে সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রযুক্তি সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে পেশাদার কাঠামোর মধ্যে আনা গেলে প্রকল্প ব্যর্থতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। প্রযুক্তি কেনা একটি প্রশাসনিক কাজ নয়; এটি একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের সক্ষমতা নির্ধারণ করে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, আশি ও নব্বইয়ের দশকে বড় বড় প্রযুক্তি প্রকল্পে ব্যাপক ব্যর্থতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এই শিক্ষা পেয়েছে। অপর্যাপ্ত রিকোয়ারমেন্ট, দুর্বল ভেন্ডর নির্বাচন, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা—এসব কারণেই অসংখ্য প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছিল। পরে তারা প্রোকিউরমেন্ট স্ট্যান্ডার্ড, আইটি গভর্ন্যান্স কাঠামো এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া শক্তিশালী করে। আমাদের সামনে সেই অভিজ্ঞতার ইতিহাস রয়েছে। সব শিক্ষা নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নেওয়ার প্রয়োজন নেই; বারবার চাকা আবিষ্কার করারও অর্থ হয় না।

অতএব, স্থানীয় সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিকে শক্তিশালী করতে হলে কেবল ডেভেলপারদের নয়, ক্রেতাদেরও দক্ষ হতে হবে। টেকনোলজি একুইজিশন স্কিল ছাড়া প্রযুক্তি কেনা মানে অন্ধভাবে বিনিয়োগ করা। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে ডিজিটাল রূপান্তর চাই, তবে প্রযুক্তি সংগ্রহের সংস্কৃতি, দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব—এই তিনটিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।