কেন “পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার ইজরাইল” ! । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

১৯৪৭ সালের ভারতবিভাগ কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক দুর্ঘটনা বা কেবলই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল না; বরং এটি ছিল ব্রিটিশ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এক সুপরিকল্পিত ‘Geo-strategic’ মাস্টারপ্ল্যান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিধ্বস্ত ব্রিটেন যখন তাদের উপনিবেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছিল, তখন তাদের প্রধান দুশ্চিন্তা ছিল জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের অ-সাম্রাজ্যবাদী এবং সমাজতান্ত্রিক ঝোঁক। ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকদের কাছে স্পষ্ট ছিল যে, একটি ঐক্যবদ্ধ ভারত কখনোই দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রিটিশ বা পশ্চিমা সামরিক স্বার্থের তল্পিবাহক হবে না।

জওহরলাল নেহেরুর প্রথম কেবিনেট
জওহরলাল নেহেরুর প্রথম কেবিনেট

এই কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা থেকেই জন্ম নেয় পাকিস্তানের ধারণা। ব্রিটিশ জেনারেল স্যার ওলাফ ক্যারো, যিনি উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের শেষ গভর্নর ছিলেন, তিনি ১৯৪৬ সালে লর্ড ওয়েভেলকে লেখা এক চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের দক্ষিণমুখী সম্প্রসারণ রোধে আফগানিস্তান নয়, বরং ভারতকে ভেঙে একটি অনুগত ‘Islamic Block’ তৈরি করা প্রয়োজন। ১৯৪৫ সালের মে মাসে ব্রিটিশ ‘Chiefs of Staff’ কমিটির একটি গোপন রিপোর্টে (Top Secret Report No. PHP 15/45) স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে, ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য “Keystone of the strategic arch of the Indian Ocean”। তারা জানত, করাচি বন্দর এবং উত্তর-পশ্চিমের বিমানঘাঁটিগুলো ছাড়া পারস্য উপসাগরের তেলের খনি এবং ভারত মহাসাগরের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা অসম্ভব।

স্যার ওলাফ ক্যারো, ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের গভর্নর
স্যার ওলাফ ক্যারো, ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের গভর্নর

ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেনের সহকারী নরেন্দ্র সিং সরিলা তাঁর ‘The Shadow of the Great Game’ বইতে দেখিয়েছেন যে, উইনস্টন চার্চিল এবং তৎকালীন ভারত সচিব লর্ড লিনলিথগো ১৯৪০-এর দশকের শুরু থেকেই মুসলিম লীগকে ইন্ধন দিচ্ছিলেন যাতে ভারতকে খণ্ডিত রাখা যায়। ব্রিটিশ সামরিক পরিকল্পনায় পাকিস্তান ছিল একটি ‘Outpost’ বা বাফার স্টেট। এমনকি কাশ্মীর সমস্যাটিকেও জিইয়ে রাখা হয়েছিল ব্রিটিশ সামরিক স্বার্থে; কারণ কাশ্মীরের গিলগিট-বালটিস্তান অঞ্চলটি সরাসরি সোভিয়েত ও চীন সীমান্তের কাছে কৌশলগত নজরদারির সুযোগ করে দেয়। ১৯৪৭ সালের মে মাসে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা তাদের এক নথিতে উল্লেখ করেছিল যে, পাকিস্তান ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অংশ হিসেবে থাকলে সেখানে পশ্চিমা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা সহজ হবে, যা নেহেরুর ভারতে সম্ভব নয়।

ব্রিটিশদের এই কৌশলের মশাল পরবর্তীতে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে যায়। ১৯৫০-এর দশকে যখন স্নায়ুযুদ্ধ তুঙ্গে, তখন আমেরিকা পাকিস্তানকে তাদের ‘Northern Tier’ বা সোভিয়েত-বিরোধী উত্তর সারির প্রধান খুঁটি হিসেবে গ্রহণ করে। ১৯৫৪ সালে ‘Mutual Defense Assistance Agreement’ স্বাক্ষরের পর পাকিস্তান কেবল দক্ষিণ এশিয়ার একটি রাষ্ট্র থাকেনি, বরং এটি হয়ে ওঠে আমেরিকার একটি ‘Satellite State’। ১৯৫৪ সালে SEATO এবং ১৯৫৫ সালে বাগদাদ প্যাক্ট (পরবর্তীতে CENTO) গঠনের মাধ্যমে পাকিস্তানকে সরাসরি পশ্চিমের সামরিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হয়। এর বিনিময়ে পাকিস্তান পেয়েছিল বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র এবং অর্থনৈতিক সাহায্য, যা সরাসরি ভারতের Non-aligned Movement এবং সমাজতান্ত্রিক নীতির বিরুদ্ধে একটি ব্যালেন্স তৈরি করেছিল।

পাকিস্তানের এই কৃত্রিম সৃষ্টির সাথে ইজরাইল রাষ্ট্রের জন্মের যে ঐতিহাসিক মিল রয়েছে, তা কেবল কাকতালীয় নয়। ইজরাইলের প্রথম প্রেসিডেন্ট চেইম ওয়েইজম্যান ১৯৩১ সালেই শওকত আলীর সাথে সাক্ষাতে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের সাদৃশ্য নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে দেখা যায়, ইজরাইল যেমন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থের এক অবিচ্ছেদ্য ‘Unsinkable Aircraft Carrier’ হিসেবে কাজ করেছে, পাকিস্তানকেও ঠিক সেভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের একটি সামরিক চৌকি হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে।

তাই পাকিস্তানের জন্ম ছিল একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রজেক্ট। এর উদ্দেশ্য ছিল ভারতের উদীয়মান জাতীয়তাবাদকে বাধাগ্রস্ত করা এবং এশিয়ায় কমিউনিস্ট প্রভাব রুখে দেওয়া। এই ভূ-রাজনৈতিক জালিয়াতির ফলেই পাকিস্তানে দীর্ঘমেয়াদী সামরিক শাসন এবং কৃত্রিম অস্থিতিশীলতার বীজ বপন করা হয়েছিল, যার মাশুল এই অঞ্চলটি আজও দিচ্ছে।

আর্চিবল্ড ওয়েভেল, ভারতের ভাইসরয়
আর্চিবল্ড ওয়েভেল, ভারতের ভাইসরয়

পাকিস্তানের নেতৃত্বের দুর্বলতা, সেনাবাহিনীর উত্থান ও “এক্সটার্নাল এনিমি”

পাকিস্তানের স্বাধীনতার ঊষালগ্নেই রাষ্ট্রটি এক অপূরণীয় নেতৃত্বের সংকটে নিমজ্জিত হয়। ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ সালে, দেশভাগের মাত্র এক বছরের মাথায় প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু ছিল একটি বড় ধাক্কা। টিউবারকুলোসিস ও লাং ক্যান্সারে জীর্ণ জিন্নাহর শেষ দিনগুলোতে তাঁর ওজন মাত্র ৭০ পাউন্ডে নেমে এসেছিল। জিন্নাহ দেশের একটি আদর্শিক কাঠামো দিলেও রাষ্ট্র পরিচালনার সুনির্দিষ্ট কোনো ‘Roadmap’ বা দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক পরিকল্পনা রেখে যেতে পারেননি। এই শূন্যতা আরও ঘনীভূত হয় ১৬ অক্টোবর ১৯৫১ সালে, যখন রাওয়ালপিন্ডির কোম্পানি বাগে প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকে জনসমক্ষে গুলি করে হত্যা করা হয়। লিয়াকত আলী খানের এই হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাজনীতি এক ভয়াবহ নেতৃত্বহীনতার মুখে পড়ে। পরবর্তী নেতারা যেমন খাজা নাজিমুদ্দিন বা মুহাম্মদ আলী বগুড়া ছিলেন তুলনামূলক দুর্বল এবং ব্যুরোক্র্যাসির ওপর নির্ভরশীল।

এই নেতৃত্বহীনতার সমান্তরালে পাকিস্তান এক ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি ছিল। পার্টিশনের পর প্রায় ৮০ লক্ষেরও বেশি শরণার্থী পুনর্বাসনের চ্যালেঞ্জ এবং ভঙ্গুর অর্থনীতি সামাল দেওয়ার মতো দূরদর্শী ভিশন ওই সময়ের রাজনীতিবিদদের ছিল না। ফলে প্রশাসনিক কাঠামোটি ধীরে ধীরে সিভিল ও মিলিটারি ব্যুরোক্র্যাসির হাতে চলে যায়। ১৯৫৬ সালে প্রথম সংবিধান প্রণীত হলেও তা রাজনৈতিক কোন্দল ও ষড়যন্ত্রের কারণে কার্যকর হতে পারেনি। এই অস্থিতিশীলতার চূড়ান্ত সুযোগ গ্রহণ করে সেনাবাহিনী। ২৭ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তানের প্রথম সফল সামরিক অভ্যুত্থান বা ‘Military Coup’ ঘটান। এর মাধ্যমেই পাকিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী ‘Martial Law’ সংস্কৃতির সূচনা হয় এবং সেনাবাহিনী দেশের রাজনীতির প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।

সেনাবাহিনীর এই উত্থান কেবল ১৯৫৮ সালেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি একটি চক্রাকার ধারায় পরিণত হয়:

  • ১৯৬৯ সালে গণ-আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খানকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান।
  • ১৯৭৭ সালের ৫ জুলাই জেনারেল জিয়া-উল-হক ‘Operation Fair Play’-র মাধ্যমে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করেন।
  • ১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর জেনারেল পারভেজ মুশাররফ প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন।

পাকিস্তানের গত সাত দশকের ইতিহাসে সেনাবাহিনী প্রায় ৩৩ বছর সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু এই ‘Military-centric’ রাষ্ট্র ব্যবস্থার মূলে ছিল জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলোর চূড়ান্ত অবহেলা। শরণার্থী পুনর্বাসন বা অর্থনৈতিক উন্নয়নের বদলে রাষ্ট্র ক্রমাগত যুদ্ধের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে পাকিস্তানের ফেডারেল বাজেটের প্রায় ৫০-৫৫ শতাংশ ব্যয় হতো প্রতিরক্ষা খাতে। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর এই ব্যয় আরও আকাশচুম্বী হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর বদলে রাষ্ট্রের সমস্ত সম্পদ ব্যয় করা হয় সামরিক শক্তির পেছনে।

জনগণের এই বঞ্চনা ও ক্ষোভকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য ‘External Enemy’ (ভারত) বা বহিরাগত শত্রুর জুজু দেখানো এবং জাতীয়তাবাদী আবেগ জাগিয়ে রাখা ছিল সামরিক জান্তার প্রধান কৌশল। এভাবেই নেতৃত্বের দুর্বলতা পাকিস্তানকে একটি জটিল ‘Mullah-Military’ ফ্রেমওয়ার্কের দিকে ঠেলে দেয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই ব্যর্থতাই সেনাবাহিনীকে “National Savior” বা জাতীয় রক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের এই অভ্যন্তরীণ সামরিকায়ন দেশটিকে সেই মূল উদ্দেশ্যেই স্থির রাখে, যা পশ্চিমা শক্তিগুলো চেয়েছিল—একটি অস্থিতিশীল কিন্তু সামরিকভাবে শক্তিশালী ‘Buffer State’।

জিন্নাহ ও নেহেরুর সাথে লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন, ভারতের শেষ ভাইসরয়
জিন্নাহ ও নেহেরুর সাথে লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন, ভারতের শেষ ভাইসরয়

মোল্লা-মিলিটারি ফ্রেমওয়ার্ক: টিকিয়ে রাখার জন্য “ইসলামীকরণ”

১৯৭৭ সালের ৫ জুলাই ‘Operation Fair Play’-র মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর জেনারেল মুহাম্মদ জিয়া-উল-হক উপলব্ধি করেছিলেন যে, নিছক সামরিক শক্তি দিয়ে পাকিস্তানের সচেতন নাগরিক সমাজকে দীর্ঘকাল দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয়। নিজের শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী এবং বৈধ করতে তিনি বেছে নেন ‘ইসলামীকরণ’ (Islamization)-এর পথ। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তাঁর শাসনামলে সেনাবাহিনী ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যে যে অটুট কৌশলগত জোট গড়ে ওঠে, ইতিহাসে তাই ‘Mullah-Military Framework’ নামে পরিচিত।

জিয়া ১৯৭৯ সাল থেকে একের পর এক কঠোর আইন জারি করেন। এর মধ্যে সবচাইতে আলোচিত ছিল ‘Hudood Ordinance’, যার মাধ্যমে চুরির জন্য অঙ্গহানি বা ব্যভিচারের জন্য পাথর ছুড়ে মারার মতো মধ্যযুগীয় শাস্তি প্রবর্তন করা হয়। ১৯৮০ সালে ‘Zakat and Ushr Ordinance’ প্রবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সরাসরি ধর্মীয় হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করা হয়। এমনকি বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থার ওপর নজরদারির জন্য ‘Federal Shariat Court’ গঠন করা হয়। শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘Islamiyat’ ও ‘Pakistan Studies’ বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক বিশেষ ধরণের উগ্র জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করা হয়।

এই ফ্রেমওয়ার্কের সবচাইতে শক্তিশালী স্তম্ভ ছিল মাদ্রাসা নেটওয়ার্কের অভাবনীয় বিস্তার। ১৯৭১ সালে যেখানে মাদ্রাসার সংখ্যা ছিল মাত্র ৯০০, সেখানে জিয়ার আমলে তা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে প্রায় ১২,০০০ নতুন মাদ্রাসা চালু হয়। আফগান জিহাদকে কেন্দ্র করে আসা ‘Saudi-American’ অর্থায়ন এবং জাকাত ফান্ডের মাধ্যমে পরিচালিত এই মাদ্রাসাগুলো মূলত দেওবন্দি মতাদর্শ প্রচার করত। মাদ্রাসা ডিগ্রিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমমান দেওয়ার মাধ্যমে ধর্মীয় মৌলবাদীদের আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীতে প্রবেশের পথ প্রশস্ত করে দেওয়া হয়।

১৯৮১ সালে The Economist-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেনারেল জিয়া এই আদর্শিক অবস্থানের মূল ভিত্তি ব্যাখ্যা করেছিলেন:

“Pakistan is, like Israel, an ideological state. Take out Judaism from Israel and it will fall like a house of cards. Take out Islam from Pakistan and make it a secular state; it would collapse.”

এই উক্তিটি প্রমাণ করে যে, জিয়া পাকিস্তানকে দক্ষিণ এশিয়ায় ইজরাইলের মতো একটি ধর্মীয় ‘Outpost’ হিসেবেই দেখেছিলেন। এই জোটকে টিকিয়ে রাখার জন্য একটি স্থায়ী ও ‘Existential’ বা অস্তিত্ব রক্ষাকারী শত্রুর প্রয়োজন ছিল। আর সেই শত্রু হিসেবে ভারতকে বেছে নেওয়া হয়। স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে ভারতকে “হিন্দু শত্রু” এবং “মুসলিম-বিদ্বেষী ষড়যন্ত্রকারী” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কাশ্মীরকে ‘অসমাপ্ত দেশভাগের ক্ষত’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে জাতীয়তাবাদের প্রধান অস্ত্র বানানো হয়। সেনাবাহিনীর ডকট্রিন থেকে শুরু করে গণমাধ্যম—সবখানেই এই বার্তা প্রচার করা হয় যে, “ভারত যতদিন আছে, পাকিস্তানের অস্তিত্ব বিপন্ন”।

এই ‘Permanent War State’ বা স্থায়ী যুদ্ধাবস্থার ফলে জনগণের মৌলিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তির দাবিগুলো সুকৌশলে চাপা দেওয়া হয়। যখনই দেশে সুশাসন বা গণতন্ত্রের দাবি উঠেছে, তখনই সেনা-মোল্লা জোট “শত্রু সীমান্তে” স্লোগান দিয়ে জনমতের দিক পরিবর্তন করেছে। জিয়ার শাসনামলে বাজেটের প্রায় ২৩-২৭ শতাংশ ব্যয় হতো সরাসরি প্রতিরক্ষা খাতে। আফগান যুদ্ধ থেকে আসা পশ্চিমা অর্থায়নে অর্থনীতি সাময়িকভাবে চাঙ্গা থাকলেও জনগণের মৌলিক উন্নয়নের পরিবর্তে সেনাবাহিনীকে আধুনিকায়নে বেশি ব্যয় করা হয়।

পরিশেষে বলা যায়, এই ‘Mullah-Military’ ফ্রেমওয়ার্ক গণতন্ত্রের পরিপন্থী। কারণ গণতন্ত্রে প্রশ্ন করার অধিকার থাকে, আর এই ফ্রেমওয়ার্ক চলে অন্ধ বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে। বাহ্যিক শত্রু (ভারত)-কে সামনে রেখে জনগণকে একটি অলীক ভয়ের মধ্যে রাখা এবং সুশাসন ও উন্নয়নের দাবিকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে চিহ্নিত করাই ছিল এই জোটের মূল সাফল্য। জিয়ার মৃত্যুর পরেও এই কাঠামো ভাঙা সম্ভব হয়নি, যা আজও পাকিস্তানকে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

 

১৯১৪ সালের ব্রিটিশ ভারতের মানচিত্র
১৯১৪ সালের ব্রিটিশ ভারতের মানচিত্র

 

বৈশ্বিক রাজনীতির ‘Frontline State’: পশ্চিমাদের প্রক্সি ও ভাড়াটে যুদ্ধ

১৯৮০-এর দশক থেকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র ও সামরিক নীতি মূলত একটি ‘Rentier State’ বা ভাড়াটিয়া রাষ্ট্রের চরিত্রে অবতীর্ণ হয়। এই প্রক্রিয়ার দুটি প্রধান অধ্যায় রয়েছে যা পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে:

সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ: ‘Holy Warrior’ নির্মাণের কারখানা (১৯৮০-এর দশক)

সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন আফগানিস্তান আক্রমণ করে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরব পাকিস্তানকে তাদের প্রধান রণক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেয়। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা CIA এবং সৌদি অর্থায়নে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ISI হয়ে ওঠে এই প্রক্সি যুদ্ধের মূল পরিচালক।

  • মুজাহিদীন প্রশিক্ষণ: পাকিস্তানের মাটি ব্যবহার করে হাজার হাজার মুজাহিদীনকে প্রশিক্ষণ ও আধুনিক অস্ত্র (যেমন: স্টিঙ্গার মিসাইল) দেওয়া হয়।

  • আর্থিক সুবিধা: এই যুদ্ধের বিনিময়ে পাকিস্তান বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা পায়। কিন্তু এর চড়া মাশুল দিতে হয় ‘কালাশনিকভ কালচার’ এবং মাদক চোরাচালানের বিস্তারের মাধ্যমে, যা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করে দেয়।

৯/১১ পরবর্তী ‘War on Terror’ ও ‘Double Game’ (২০০১-২০১০)

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন আফগানিস্তানে আক্রমণ চালায়, তখন পাকিস্তান আবারও নিজেকে ‘Frontline State’ হিসেবে ঘোষণা করে। তৎকালীন জেনারেল পারভেজ মুশাররফ মার্কিন চাপে এই যুদ্ধে মিত্র হিসেবে যোগ দিলেও পাকিস্তান এক বিতর্কিত ‘Double Game’ নীতি গ্রহণ করে।

  • একদিকে তারা আমেরিকার কাছ থেকে ‘Coalition Support Fund’ হিসেবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার গ্রহণ করছিল।

  • অন্যদিকে, নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার্থে আফগান তালিবান এবং হাক্কানি নেটওয়ার্ককে নিরাপদ আশ্রয় (Safe Havens) প্রদান করছিল যাতে ভবিষ্যতে আফগানিস্তানে ভারতের প্রভাব ঠেকানো যায়। এই দ্বিমুখী নীতির ফলে পাকিস্তান একদিকে পশ্চিমা সমর্থন পেয়েছে, আবার অন্যদিকে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

ইজরাইলের সাথে কৌশলগত সাদৃশ্য: পশ্চিমা ‘Outpost’

পাকিস্তানের এই ভূমিকাটি মধ্যপ্রাচ্যে ইজরাইলের ভূমিকার সাথে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। ইজরাইল যেমন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও পশ্চিমা স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের অতন্দ্র প্রহরী, পাকিস্তানও ঠিক সেভাবেই দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় পশ্চিমের একটি স্থায়ী সামরিক আউটপোস্ট হিসেবে কাজ করেছে।

  • Strategic Depth: ইজরাইল তার নিরাপত্তার জন্য যেমন প্রতিবেশী অঞ্চলে প্রভাব বজায় রাখে, পাকিস্তানও তার সামরিক ডকট্রিনে আফগানিস্তানকে ‘Strategic Depth’ হিসেবে বিবেচনা করে।

  • Dependence on Aid: উভয় রাষ্ট্রই তাদের বিশাল সামরিক বাজেট এবং টিকে থাকার জন্য মূলত মার্কিন অর্থায়ন ও আধুনিক সমরাস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখার চেয়ে একটি কার্যকর ‘Military Satellite’ হিসেবে দেখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছে।

পাকিস্তানের এই ‘ভাড়াটে’ বা প্রক্সি যুদ্ধের করণে রাষ্ট্রটির সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পশ্চিমা ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো যখনই কোনো আঞ্চলিক সংকটে পড়েছে, তারা পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে অর্থ ও অস্ত্রের বিনিময়ে ব্যবহার করেছে। এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের সেনাশাসকরা লাভবান হলেও সাধারণ জনগণ হারিয়েছে তাদের গণতন্ত্র, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ। এভাবেই পাকিস্তান তার সৃষ্টির আদি লক্ষ্য—পশ্চিমা স্বার্থের একটি বাফার স্টেট—হিসেবে নিজেকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত রেখেছে।

সিয়াটো, SEATO ভূক্ত দেশসমূহ
সিয়াটো, SEATO ভূক্ত দেশসমূহ

 

পাকিস্তান ও ইজরাইল: এক সমান্তরাল ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

পাকিস্তান ও ইজরাইল—উভয় রাষ্ট্রই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বব্যবস্থায় পশ্চিমা শক্তির বিশেষ প্রয়োজনে এবং ধর্মের মোড়কে তৈরি করা হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক (যেমন ফয়সাল দেবজী) এদেরকে “Ideological States” হিসেবে অভিহিত করেছেন। জেনারেল জিয়া-উল-হক ১৯৮১ সালে নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, পাকিস্তান ও ইজরাইলের অস্তিত্বের ভিত্তি একই—ধর্ম।

নিচে এই দুই রাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক, আইডিওলজিক্যাল ও কাঠামোগত সাদৃশ্যের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:

বিষয়পাকিস্তান (Islamic Homeland)ইজরাইল (Jewish Homeland)
সৃষ্টির ভিত্তিTwo-Nation Theory: ১৯৪৭ সালে মুসলিমদের জন্য আলাদা আবাসভূমি হিসেবে সৃষ্টি।Zionism: ১৯৪৮ সালে ইহুদিদের জন্য আলাদা আবাসভূমি হিসেবে সৃষ্টি।
পশ্চিমা সামরিক সাহায্য১৯৫১-২০১১ পর্যন্ত প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলার মার্কিন সাহায্য। SEATOCENTO জোটের মাধ্যমে কোল্ড ওয়ার ও ‘War on Terror’-এর গুরুত্বপূর্ণ মিত্র।মার্কিন ইতিহাসের বৃহত্তম সাহায্যপ্রাপ্ত দেশ (৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি)। বর্তমানে বার্ষিক প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলার Military Aid পায়।
সেনা-রাজনীতিMullah-Military Alliance: সেনাবাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপ; ৩৩ বছর সামরিক শাসন। রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সেনাপ্রভাব চূড়ান্ত।IDF-centric Society: শক্তিশালী সেনাবাহিনী (IDF), তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। সামরিক শক্তি জাতীয় নীতি নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা রাখে।
স্থায়ী শত্রু ও জাতীয়তাবাদভারতকে “Existential Threat” বা অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখিয়ে জাতীয়তাবাদী আবেগ ও কাশ্মীর ইস্যুকে জিইয়ে রাখা।আরব দেশসমূহ ও ইরানকে স্থায়ী শত্রু হিসেবে গণ্য করে নিয়মিত সামরিক সংঘাত ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই বজায় রাখা।
প্রক্সি রোলআফগান জিহাদ ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে Proxy Warfare এবং পশ্চিমা স্বার্থে ‘Frontline State’ হিসেবে ভূমিকা।মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থের প্রধান স্ট্র্যাটেজিক অ্যালাই; বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রক্সি ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের প্রধান কেন্দ্র।
আইনি সাদৃশ্য১৯৪৭-এর দেশভাগের পর প্রবর্তিত “Evacuee Property Law”ফিলিস্তিনিদের সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় পাকিস্তানের উক্ত আইনকে মডেল হিসেবে ব্যবহার।

অতিরিক্ত সাদৃশ্যের ক্ষেত্রসমূহ:

  • ধর্মীয় আইডিওলজির আবশ্যকতা: জিয়া-উল-হকের মতে, ইহুদি ধর্ম ছাড়া যেমন ইজরাইল তাসের ঘরের মতো ধসে পড়বে, ঠিক তেমনি ইসলাম ব্যতীত পাকিস্তানের অস্তিত্ব অসম্ভব। এই ‘Ideology’ ব্যবহার করেই উভয় রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত রাখা হয়েছে।
  • পশ্চিমা স্বার্থের সুরক্ষা: পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েত-চীন-ভারত বিরোধী ‘Buffer State’ এবং ইজরাইল মধ্যপ্রাচ্যে আরব-সোভিয়েত প্রভাব রুখতে ‘Strategic Outpost’ হিসেবে কাজ করেছে।
  • সহিংসতা ও শরণার্থী সংকট: উভয় রাষ্ট্রের সূচনালগ্নেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সহিংসতা এবং বিশাল শরণার্থী সংকটের (প্রায় ৮০ লক্ষ বনাম ১০ লক্ষাধিক) করুণ ইতিহাস রয়েছে।

 

১৯৪৯ সালে হ্যারি ট্রুম্যান উত্তর আটলান্টিক চুক্তিতে (North Atlantic Treaty) স্বাক্ষর করছেন
১৯৪৯ সালে হ্যারি ট্রুম্যান উত্তর আটলান্টিক চুক্তিতে (North Atlantic Treaty) স্বাক্ষর করছেন

ভূ-রাজনীতির দাবার ঘুঁটি: পাকিস্তান ও ইজরাইল মডেল এবং বাংলাদেশের অবস্থান

কৃত্রিম রাষ্ট্র ও পশ্চিমা স্বার্থের ‘প্রক্সি’

পাকিস্তান ও ইজরাইল—উভয় রাষ্ট্রই বিশ্বমানচিত্রে কোনো স্বাভাবিক ঐতিহাসিক বিবর্তনের ফল নয়; বরং এগুলো সুনির্দিষ্ট পশ্চিমা (বিশেষ করে মার্কিন) স্বার্থ রক্ষার জন্য তৈরি করা ‘Strategic Projects’। ইজরাইল যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যকে সার্বক্ষণিক উত্তপ্ত রেখে ওই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ব্যবহৃত হয়, পাকিস্তানও ঠিক সেভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষা করতে আঞ্চলিক অশান্তি জিইয়ে রাখে।

গত সাত দশকের ইতিহাস সাক্ষী, এই দুটি রাষ্ট্র বারবার অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে জড়িয়ে সাধারণ বেসামরিক মানুষের রক্তে হাত রঞ্জিত করেছে। এই যুদ্ধের উন্মাদনায় লাভবান হয় কেবল সামরিক আমলাতন্ত্র এবং ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী (মোল্লাতন্ত্র)। আর প্রতিটি কামানের গোলার বিনিময়ে পিষ্ট হয় সাধারণ মানুষের স্বপ্ন ও উন্নয়ন।

বাংলাদেশে ‘পাকিস্তান ধারা’র রাজনীতি ও তার নেপথ্য দর্শন

আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যারা পাকিস্তান রাষ্ট্র এবং তার আদর্শিক ধারাকে সমর্থন করে, তাদের অবস্থান গভীরভবে পর্যবেক্ষণ করলে একটি সত্য বেরিয়ে আসে—তারা আসলে পরোক্ষভাবে পশ্চিমাদের তাবেদার। তাদের এই রাজনীতির মূলে রয়েছে গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধিতা। তারা সবসময় ‘Theocracy’ (ধর্মতন্ত্র) এবং ‘Gunpower’ (বন্দুকের নলের ক্ষমতা) পছন্দ করে, কারণ এই কাঠামোর মধ্যেই সামন্ততান্ত্রিক ও সামরিক স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে।

ভারত বনাম আমাদের জাতীয় স্বার্থ: অভিন্ন লক্ষ্য

এখানে একটি প্রচলিত বিতর্ক হলো—পাকিস্তানের বিরোধিতা মানেই কি ভারতের দালালি? বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। আমাদের জাতীয় স্বার্থ এবং ভারতের জাতীয় স্বার্থের মধ্যে একটি জায়গায় ঐতিহাসিক ও আদর্শিক মিল রয়েছে। আমরা উভয়ই চাই:

  • গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা: যা একটি আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি।
  • সৌহার্দ্য ও উন্নয়ন: প্রতিবেশীর সাথে শত্রুতা করে অর্থ ও সময় অপচয় না করে, সেই সম্পদ নিজের দেশের মানুষের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের পেছনে ব্যয় করা।

ভারতের সাথে আমাদের নীতির এই মিলটি কোনো ‘দালালি’ নয়, বরং এটি একটি বাস্তবসম্মত ‘Strategic Alignment’। শত্রুতা করে যে বিশাল বাজেট সামরিক খাতে ব্যয় করতে হয়, তা বাঁচিয়ে উন্নয়ন করাটাই হলো প্রকৃত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা।

ক্ষমা ও উন্নয়নের ‘উইজডম’

পাকিস্তান আমাদের ওপর নজিরবিহীন গণহত্যা চালিয়েছে, আমাদের মা-বোনদের সম্ভ্রমহানি করেছে—এই নির্মম ইতিহাস আমরা ভুলে যাইনি। তা সত্ত্বেও, একজন আত্মমর্যাদাশীল এবং প্রগতিশীল জাতি হিসেবে আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটি পয়সাও যুদ্ধের জন্য অপচয় করতে চাই না। যুদ্ধ নয়, বরং শান্তিই আমাদের অগ্রগতির চাবিকাঠি। এই ‘উইজডম’ বা প্রজ্ঞাই একটি জাতিকে সত্যিকারের উন্নত জাতিতে রূপান্তর করে।

সিদ্ধান্ত আপনার: কোন পক্ষে দাঁড়াবেন?

একজন বাংলাদেশি হিসেবে আপনার আদর্শিক অবস্থান কী হওয়া উচিত, তা নির্ভর করছে আপনি দেশটিকে কোন চোখে দেখছেন তার ওপর। আপনি যদি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন এবং সার্বভৌমত্বের পক্ষে থাকেন, তবে আপনার আদর্শ অবশ্যই পাকিস্তানপন্থী ও পশ্চিমাদের তৈরি করা সেই ধ্বংসাত্মক রাজনীতির বিপক্ষেই যাবে।

 একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে গভীর মনোযোগ দিয়ে ভাবলে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, পাকিস্তান কোনো আদর্শ নয়, বরং একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রিক মডেল। বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের পথ হওয়া উচিত সম্প্রীতি, শান্তি এবং নিজেদের অর্থনৈতিক মুক্তির। বন্দুকের নল বা ধর্মের দোহাই দিয়ে ক্ষমতা দখল নয়, বরং জনগণের ভোটাধিকার এবং উন্নত জীবনের নিশ্চয়তাই আমাদের রাজনীতির মূলমন্ত্র হওয়া উচিত।

বাগদাদ প্যাক্ট প্রতিনিধিদল, আঙ্কারা, তুরস্ক- ২৮-১-১৯৫৮
বাগদাদ প্যাক্ট প্রতিনিধিদল, আঙ্কারা, তুরস্ক- ২৮-১-১৯৫৮

তথ্যসূত্র:

উপরের লেখায় ব্যবহৃত প্রতিটি ঐতিহাসিক দাবি এবং পরিসংখ্যান নিচে উল্লিখিত উৎস থেকে সংগৃহীত ও যাচাইকৃত।

জিও-স্ট্র্যাটেজিক মাস্টারপ্ল্যান ও ব্রিটিশ-মার্কিন ভূমিকা

  • Sarila, Narendra Singh (2005). The Shadow of the Great Game: The Untold Story of India’s Partition. HarperCollins. (পুরো প্রবন্ধের প্রথম অংশের প্রধান উৎস। বিশেষ করে ওলাফ ক্যারোর ভূমিকা ও ব্রিটিশ সামরিক নথির উদ্ধৃতি এই বই থেকে সংগৃহীত)।
  • British Chiefs of Staff Report (PHP 15/45, May 1945): এই গোপন সামরিক দলিলে উত্তর-পশ্চিম ভারতকে (বর্তমান পাকিস্তান) “Keystone of the strategic arch” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
  • Caroe, Olaf (1951). Wells of Power. Macmillan. (সোভিয়েত সম্প্রসারণ রোধে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি নিয়ে ক্যারোর নিজস্ব দর্শন)।
  • British Intelligence Documents (1947): লর্ড মাউন্টব্যাটেন ও ব্রিটিশ ফরেন অফিসের মধ্যকার যোগাযোগ ও কমনওয়েলথ নিয়ে গোপন নথিপত্র।

নেতৃত্বের শূন্যতা ও সেনাবাহিনীর উত্থান

  • Government of Pakistan Official Records: মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু এবং লিয়াকত আলী খানের হত্যাকাণ্ডের সরকারি বিবরণ।
  • Pakistan Economic Survey (1950-1970): ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে পাকিস্তানের ফেডারেল বাজেটের ৫০-৫৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের দাপ্তরিক পরিসংখ্যান।
  • Official Martial Law Declarations: ১৯৫৮, ১৯৬৯, ১৯৭৭ এবং ১৯৯৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞাপনসমূহ।
  • Refugee Population Data: ১৯৪৮ সালের সরকারি শুমারি ও পুনর্বাসন দপ্তরের তথ্য (পার্টিশন পরবর্তী ৮৫ লক্ষ শরণার্থীর পরিসংখ্যান)।

মোল্লা-মিলিটারি ফ্রেমওয়ার্ক ও ইসলামীকরণ

  • The Gazette of Pakistan: ১৯৭৯ সালের Hudood Ordinance, ১৯৮০ সালের Zakat & Ushr Ordinance এবং Federal Shariat Court গঠনের দাপ্তরিক নথি।
  • The Economist (1981): জেনারেল জিয়া-উল-হকের সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার যেখানে তিনি পাকিস্তানকে ইজরাইলের সাথে তুলনা করেন। (পুনঃপ্রকাশিত: India’s World, 2025)।
  • International Crisis Group (ICG) Report (2002): “Pakistan’s Madrasas, Extremism and the Military”। (মাদ্রাসা বিস্তারের পরিসংখ্যানগত উৎস)।
  • Devji, Faisal (2013). Muslim Zion: Pakistan as a Political Idea. Harvard University Press. (পাকিস্তানকে ‘আদর্শিক রাষ্ট্র’ হিসেবে বিশ্লেষণের প্রধান তাত্ত্বিক সূত্র)।

প্রক্সি যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সহায়তা

  • Congressional Research Service (CRS) Reports: * Direct Overt U.S. Aid to Pakistan for FY2002-FY2011 (Report R41856). * U.S. Foreign Aid to Israel (Report RL33222).
  • Center for Global Development (CGDev): ১৯৫১-২০১১ পর্যন্ত পাকিস্তানকে দেওয়া ৬৭ বিলিয়ন ডলারের (Constant Dollars) অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের ডেটা।
  • Coll, Steve (2004). Ghost Wars: The Secret History of the CIA, Afghanistan, and Bin Laden. (আফগান জিহাদে CIA-ISI কোলাবরেশনের প্রধান উৎস)।
  • Markey, Daniel S. (2013). No Exit from Pakistan: America’s Tortured Relationship with Islamabad. Cambridge University Press.

পাকিস্তান ও ইজরাইল: তুলনামূলক উপাত্ত

  • CFR (Council on Foreign Relations): ইজরাইলকে দেওয়া মার্কিন সামরিক সহায়তার (৩০০ বিলিয়ন+ ডলার) ঐতিহাসিক ও সাম্প্রতিক ডেটা।
  • Palestine-Israel Journal & Jerusalem Story: ১৯৪৭ সালের পাকিস্তানের Evacuee Property Law এবং ১৯৫০ সালের ইজরাইলের Absentee Property Law-এর আইনি সমান্তরাল বিশ্লেষণ।
  • Kumaraswamy, P.R. (1997): “The Star and the Crescent: Israel and Pakistan”। Middle East Quarterly-তে প্রকাশিত গবেষণা।

 

আরও:

১. Narendra Singh Sarila: ভারতভাগের নেপথ্যে সামরিক কৌশলের প্রমাণ।

২. Steve Coll: প্রক্সি যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি।

৩. Faisal Devji: ইজরাইল ও পাকিস্তানের আইডিওলজিক্যাল মিলের তাত্ত্বিক ভিত্তি।

৪. CRS Reports: আর্থিক ও সামরিক সাহায্যের নির্ভুল পরিসংখ্যান।