অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (তুর্কি) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত—যাকে তুর্কিরা ভালোবেসে ডাকে ‘ওসমানলি ক্লাসিক মুসিকিসি’ বা ‘তুর্ক ক্লাসিক মুসিকিসি’—বিশ্বসঙ্গীতের ইতিহাসে এক পরম বিস্ময় ও গভীর আভিজাত্যের নাম। একে স্রেফ একটা রাজকীয় দরবারের গান-বাজনা হিসেবে দেখলে কিন্তু ভুল হবে। বহু শতাব্দী ধরে অটোমান সুলতানদের প্রাসাদ, সুফিদের খানকাহ, চঞ্চল নগর জীবন, ধর্মীয় আচার এবং উচ্চাঙ্গের সাহিত্য ও দর্শনের সুগভীর মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছে এই সুরের মহাবিশ্ব। মজার ব্যাপার হলো, আমাদের উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, আরবীয় মাকাম এবং পারস্যের মরমি সুরধারার সাথেও এর রয়েছে এক অদ্ভুত ঐতিহাসিক ও আত্মিক যোগাযোগ।

Table of Contents

অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (তুর্কি): সাম্রাজ্য, সুর, মাকাম ও আধ্যাত্মিকতার এক মহাবিশ্ব

 

তুর্ক - অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কনসার্ট
তুর্ক – অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কনসার্ট

 

ভৌগোলিক অবস্থান দিক থেকে অটোমান সাম্রাজ্য ছিল ইউরোপ, এশিয়া আর আরব বিশ্বের মিলনস্থল। আর ঠিক এই কারণেই তাদের সুরের ভুবনে পারস্য, বাইজেন্টাইন, আরবি, আনাতোলিয়ান ও বালকান লোকসুর এবং সুফি সঙ্গীতের এক অবিশ্বাস্য মেলবন্ধন ঘটেছিল। তবে বাইরের এই প্রভাবগুলোকে তারা অন্ধভাবে ধার করেনি, বরং নিজেদের সাঙ্গীতিক ছাঁচে ঢেলে অটোমান সঙ্গীতকে দিয়েছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও মার্জিত এক শাস্ত্রীয় রূপ। বিশেষ করে ইস্তাম্বুলের রাজকীয় দরবারি সংস্কৃতি এই সুরধারাকে এক অপার্থিব ও অভিজাত নান্দনিকতায় ভরিয়ে তোলে।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আদি শিকড় লুকিয়ে আছে সেলজুক তুর্কিদের ঐতিহ্য, মধ্যযুগীয় পারস্যের রাজদরবার আর বাইজেন্টাইন গির্জার প্রাচীন প্রার্থনা-সঙ্গীতের গভীরে। পরবর্তীতে ১৪শ থেকে ১৬শ শতকের মধ্যে অটোমান সাম্রাজ্য যখন বিশ্বমঞ্চে প্রতাপশালী হয়ে উঠতে শুরু করে, তখনই এই সঙ্গীত একটি মজবুত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজদরবারে তখন নামী-দামী সঙ্গীতজ্ঞ, দূর-দূরান্তের কবি, বাদ্যকার আর সুফি দরবেশদের এক গমগমে মিলনমেলা তৈরি হয়েছিল। আর তাদের সেই যৌথ সাধনার আঁতুড়ঘরেই ধাপে ধাপে পূর্ণতা পেয়েছিল এই রাজকীয় “Ottoman Court Music”।

 

তুর্ক - অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কনসার্ট
তুর্ক – অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কনসার্ট

 

রাজদরবার ও সুরের শাহী পৃষ্ঠপোষকতা

অটোমান সুলতানরা প্রথম দিকে মুসলিম হলেও ইসলামিস্ট ছিলেন না। অটোমান সুলতানদের বড় গুণ ছিল, তাঁরা কেবল যুদ্ধবিগ্রহ বা রাজনীতি নিয়েই মগ্ন থাকতেন না, বরং মনের গহীন থেকে শিল্প-সংস্কৃতিকে ভালোবাসতেন। বিশেষ করে সুলতান তৃতীয় সেলিম (Selim III) তো নিজেই ছিলেন একাধারে উচ্চমানের সুরকার এবং নতুন নতুন মাকামের স্রষ্টা। তাঁর হাত ধরেই অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এক সোনালী যুগে পা রাখে। এই সময়ে সুরের জগতে নতুন মাকাম, নতুন চলন আর বাদ্যরীতির এক অভূতপূর্ব জোয়ার আসে। রাজকীয় দরবারে তখন চালু হয় বিশেষ ‘ফাসিল’ (fasıl) ধারার অনুষ্ঠান—যেখানে সুনির্দিষ্ট একটি মাকামকে কেন্দ্র করে, একটার পর একটা সুরের চমৎকার ধারাবাহিকতায় পুরো আসর মায়াবী করে তোলা হতো।

অটোমান সঙ্গীতের বদ্যযন্ত্র - বেনদির
অটোমান সঙ্গীতের বদ্যযন্ত্র – বেনদির

সুফি তরিকা ও আধ্যাত্মিকতার মরমী ছোঁয়া

অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের যে সুবিশাল মহীরুহ, তার শিকড়ের একটা বড় অংশ রসদ পেয়েছে মেভলভি (Mevlevi) সুফি তরিকার অন্দরমহল থেকে। মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির প্রেম ও দর্শনে উজ্জীবিত এই ধারায় ‘নেয়’ (ney) বাঁশির উদাস করা সুরকে দেখা হতো খাঁচায় বন্দী ব্যাকুল আত্মার পরম ডাক হিসেবে। সুফিদের ‘সেমা’ (Sema) অনুষ্ঠানে যখন দরবেশরা সাদা আলখেল্লা পরে গোল হয়ে ঘুরতে ঘুরতে ধ্যানমগ্ন নৃত্য করেন, তখন ব্যাকগ্রাউন্ডে যে মরমি সুর বেজে ওঠে—তা-ই হলো অটোমান সঙ্গীতের সবচেয়ে পবিত্র ও আধ্যাত্মিক রূপ। এখানে সুর কেবল কানকে আরাম দেওয়ার সস্তা বিনোদন নয়; এটি আসলে মনকে ধুয়েমুছে সাফ করা, গভীর ধ্যান এবং পরমেশ্বরের সান্নিধ্য পাওয়ার এক অলৌকিক সোপান।

 

তুর্ক - অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কনসার্ট
তুর্ক – অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কনসার্ট

 

অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে রূপ ও পরিবেশনা

অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং বহুরূপী শিল্পধারা। এখানে বিভিন্ন সাঙ্গীতিক রূপ আর পরিবেশনার অংক মিলেমিশে এক সমৃদ্ধ নান্দনিক ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে। এই ধারার প্রতিটি রূপেরই রয়েছে নিজস্ব একেকটি কাঠামো, স্বতন্ত্র আবেগ আর পরিবেশনার সুনির্দিষ্ট ভূমিকা।

এর প্রধান সাঙ্গীতিক রূপগুলোর মধ্যে রয়েছে— তাকসিম, পেশরেভ, কার, বেস্তে, শার্কি এবং সাজ সেমাই। এগুলো সবই মাকাম-ভিত্তিক হলেও, এদের কাজ আর প্রকাশের ভঙ্গি কিন্তু একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

যেমন ধরা যাক ‘তাকসিম’ এর কথা। এটি হলো মূলত একক শিল্পীর বাজানো কোনো তালহীন, তাৎক্ষণিক সুরসৃষ্টি বা ইম্প্রোভাইজেশন—যা আমাদের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ‘আলাপ’-এর সমতুল্য। সাধারণত যেকোনো আসরের শুরুতে কিংবা মাঝপথে তাকসিম পরিবেশন করা হয়, যার মূল উদ্দেশ্য হলো নির্দিষ্ট কোনো একটা মাকামের চরিত্র, তার ভেতরের লুকিয়ে থাকা হাহাকার বা আনন্দ আর সুরের সম্ভাবনাগুলোকে শ্রোতার সামনে মেলানো। তাকসিমকে এক অর্থে মাকামের এক “জীবন্ত ব্যাখ্যা” বলা চলে—যেখানে শিল্পী তাঁর নিজের দীর্ঘ সাধনা ও সৃজনশীলতা ঢেলে দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে সুরের এক নতুন ইমারত খাড়া করেন।

অন্যদিকে, ‘ফাসিল’ হলো অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি পূর্ণাঙ্গ কনসার্ট ফরম্যাট। এখানে একই মাকামকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সাঙ্গীতিক রূপকে একটার পর একটা চমৎকার ধারাবাহিকতায় সাজানো হয়। এই পুরো আয়োজনটি এক অলিখিত কিন্তু কঠোর শৃঙ্খলা মেনে চলে, যার ফলে সুর, ছন্দ আর আবেগ ধাপে ধাপে শ্রোতার মনের ভেতর ডালপালা মেলে।

একটি আদর্শ ফাসিল সাধারণত শুরু হয় তাকসিম দিয়ে, আর তারপর এক এক করে আসর মাতায়:

  • পেশরেভ: যন্ত্রসঙ্গীতের চমৎকার এক মুখবন্ধ বা ভূমিকার মাধ্যমে পুরো আসরের সাঙ্গীতিক আবহ তৈরি করা।
  • কার / বেস্তে: কণ্ঠসঙ্গীতের অত্যন্ত গভীর, জটিল এবং ধ্রুপদী কিছু বন্দিশের পরিবেশনা।
  • শার্কি: লিরিক্যাল, চটুল ও ভীষণ আবেগঘন কিছু মেলোডিয়াস গান (যা অনেকটা আমাদের আধুনিক গীত বা গজলের মতো)।
  • সাজ সেমাই: দ্রুত ও চঞ্চল গতির এক অনবদ্য সমাপনী যন্ত্রসঙ্গীত, যা আসরের সমাপ্তি টানে।

এই পুরো কাঠামোটি আসলে একটিমাত্র মাকামের চাদরে জড়িয়ে সুরের ধীর উন্মোচন, তার চূড়ায় পৌঁছানো এবং পরম শান্তিতে শেষ হওয়ার এক অনবদ্য সাঙ্গীতিক মহাযাত্রা।

তুর্ক - অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কনসার্ট
তুর্ক – অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কনসার্ট

 

মাকাম, উসুল, ফাসিল, বাদ্যযন্ত্র ও প্রধান সুরকার

অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসল রূপ আর কারিগরি বুঝতে হলে এর সুরতত্ত্ব, তালচক্র আর পরিবেশনার বিশেষ জ্যামিতিটুকু চিনে নেওয়া দরকার। আমাদের চেনা উত্তর ভারতীয় বা হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সাথে এর এমন কিছু চমৎকার মিল-অমিল আছে, যা জানলে এই সুরের জগৎটা বুঝতে আরও সুবিধে হবে। এই পুরো সাঙ্গীতিক ইমারতটি মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে:

মাকাম:

এটি হলো অটোমান সুর-মহাবিশ্বের একদম প্রাণকেন্দ্র। সহজ কথায় বোঝার জন্য, একে আমাদের হিন্দুস্থানি সঙ্গীতের ‘রাগ’-এর সাথে তুলনা করা যায়। রাগের যেমন নির্দিষ্ট আরোহণ-অবরোহণ আর নিজস্ব একটা আবেগ থাকে (যেমন ভৈরবীর উদাসীনতা বা দরবারীর রাজকীয় গাম্ভীর্য), মাকামের চরিত্রও ঠিক তেমন। প্রতিটি মাকামের আবার নিজস্ব একটি ‘সেইর’ (Seyir) থাকে—যাকে আমরা রাগের ‘চলন’ বা রূপরেখা বলি। এই সেইর-ই ঠিক করে দেয় সুর ঠিক কোন পথ ধরে ওপরে উঠবে, কোথায় একটু জিরোবে আর কোন গলিপথ ধরে আবার নিচে নেমে আসবে।

উসুল:

সুর যদি হয় প্রাণ, তবে ‘উসুল’ হলো তার হৃদস্পন্দন—সহজ বাংলায় যা হলো আমাদের ‘তাল’। আমাদের যেমন দাদরা, রূপক বা ত্রিতাল আছে, তাদেরও তেমনি ২ মাত্রা থেকে শুরু করে ১২৮ মাত্রার চরম জটিল সব তাল রয়েছে। এটি কেবল ড্রামের ওপর চড়া কোনো আঘাত নয়, বরং জোর-নরমের দোলাচল, সূক্ষ্ম বিরতি আর ছন্দের অলঙ্করণে গড়া এক নিখুঁত স্থাপত্য। আমাদের তালের যেমন ‘ধা-ধিন-ধিন’ বোল থাকে, উসুলের প্রধান বোলগুলোও তেমনি—’দুম’ (গম্ভীর চড়া আঘাত) আর ‘তেক’ (হালকা তীক্ষ্ণ আঘাত)।

ফাসিল:

এই জায়গাটা একটু মন দিয়ে বোঝা দরকার। ফাসিল কিন্তু আমাদের কোনো একটা একক ‘বন্দিশ’ বা গান নয়। এটি হলো আসলে একই রাগে বোনা একটা পূর্ণাঙ্গ কনসার্ট বা ধারাবাহিক সুর-মালিকা। ভাবুন তো, একই রাগকে কেন্দ্র করে প্রথমে আপনি তার আলাপ করলেন, তারপর সেই রাগের একটা চমৎকার গৎ বাজালেন, এরপর একে একে ৩-৪টি ভিন্ন মেজাজের গান বা খেয়াল গাইলেন এবং শেষে একটা দ্রুত গতির চটুল বাদ্যযন্ত্রের টুকরো দিয়ে আসর শেষ করলেন—এই পুরো প্যাকেজটাই হলো একটা ‘ফাসিল’। এখানে শুরুতে থাকে তাকসিম (যা আমাদের আলাপ), তারপর একে একে আসে পেশরেভ, কার, বেস্তে, শার্কি (এগুলো সব এক একটা আলাদা মেজাজের বন্দিশ) এবং সবশেষে সাজ সেমাই। ফাসিলের ম্যাজিকটা হলো, এর প্রতিটি অংশ তার পরবর্তী অংশের জন্য আবেগের এক একটা নতুন সিঁড়ি তৈরি করে দেয়, যার ফলে পুরো আয়োজনটি শ্রোতার জন্য এক ক্রমবর্ধমান ও অপার্থিব সুরযাত্রা হয়ে ওঠে।

 

তুর্ক - অটোমান সঙ্গীত
তুর্ক – অটোমান সঙ্গীত

 

মাকাম: ভারত, পারস্য, আরবি সঙ্গীতের সাথে মিল ও পার্থক্য

উপরে মাকাম, উসুল, ফাসিল এর সাথে আমাদের সঙ্গীতের মিল নিয়ে বলেছি। এই কারণেই রাঁস্ত, হিজাজ, হুসাইনি, উশাক কিংবা নিহাভেন্দ – এর মতো মাকামগুলোকে শুধু শুষ্ক স্বরলিপি দিয়ে পুরো রুপ দেয়া যায় না; প্রতিটির রয়েছে আলাদা এক একটা মনস্তাত্ত্বিক আবহ। যেমন ধরুন, রাঁস্ত মাকামের রাজকীয় স্থিরতা শুনলে আপনার মনে হবে আমাদের বিলাবল ঠাটজাত কোনো গম্ভীর রাগ শুনছেন। আবার হিজাজ -এর ভেতরের সেই আকুলতা, রহস্যময় বেদনা আর হাহাকার আপনাকে অবলীলায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে ভৈরব বা টোড়ির চেনা আবেশে। অন্যদিকে, হুসাইনি মাকামের কোমল, মানবিক ও আধ্যাত্মিক আর্তি যেন আমাদের কাফি বা খাম্বাজ ঘরানার কিছু রাগের স্নিগ্ধতা মনে করিয়ে দেয়। আর নিহাভেন্দ মাকামটি পশ্চিমা মাইনর স্কেলের কাছাকাছি হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আমাদের আশাবরী রাগের এক অদ্ভুত মায়াবী ছায়া।

অটোমান সঙ্গীতের বদ্যযন্ত্র - কুদুম
অটোমান সঙ্গীতের বদ্যযন্ত্র – কুদুম

 

স্বরের কারিগরি: ২২ শ্রুতি বনাম ৫৩ কমা

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে আমরা ২২ শ্রুতির ধারণা পাই, যেখানে স্বরের অতি সূক্ষ্ম ওঠা-নামা রাগের রস ও রূপ তৈরিতে দারুণ ভূমিকা রাখে। যদিও আমাদের ধ্রুপদিয়ারা অনেক সময় ২২টির চেয়েও বেশি শ্রুতির চর্চা করেন, তবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বরলিপিতে ২২টিই স্বীকৃত। কিন্তু অটোমান সঙ্গীতে এই মাইক্রোটোনাল সূক্ষ্মতা আরও এগিয়ে। তারা এক সপ্তক বা অক্টেভকে গাণিতিকভাবে ৫৩টি ক্ষুদ্র স্বরাংশে (Comma) ভাগ করে দেখে! এজন্য তাদের সঙ্গীতে স্বরের সামান্যতম আবেগগত মোচড়, একটুখানি টান, ঝোঁক কিংবা এক মাকাম থেকে অন্য মাকামে যাওয়ার গলিপথগুলো স্বরলিপিতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লেখা থাকে। এই দিক থেকে মাকাম পদ্ধতি আমাদের শ্রুতি-চিন্তার আপন ভাই হলেও, এর গাণিতিক নিখুঁততা অনেক বেশি স্পষ্ট ও কঠোর।

ঐতিহাসিক নথি ঘাঁটলে অটোমান সঙ্গীতে প্রায় ৬০০–এরও বেশি মাকামের হদিস পাওয়া যায়, যার মধ্যে প্রায় ১২০টি মাকাম নিয়মিত আসরে বাজানো হতো। প্রতিটি মাকামের এই আরোহী-অবরোহী চলন, কেন্দ্রীয় বিশ্রামবিন্দু আর সুরের বাঁকগুলো আসলে আমাদের রাগের মতোই এক একটা সুর-ভ্রমণের মানচিত্র।

অটোমান সঙ্গীতের বদ্যযন্ত্র - উদ
অটোমান সঙ্গীতের বদ্যযন্ত্র – উদ

অটোমান বনাম আরবি মাকাম:

ঐতিহাসিকভাবে অটোমান মাকাম (Makam) এবং আরবি মাকাম (Maqam) হলো মধ্যপ্রাচ্যের একই বৃহৎ ইসলামী সুর-ঐতিহ্যের দুটি যমজ ভাই। পারস্য, আরব আর আনাতোলীয় সংস্কৃতির শত শত বছরের লেনদেনের ফলে এদের নামের মধ্যেও এক বিস্ময়কর মিল দেখা যায়। রাঁস্ত, বায়াতি, হিজাজ, নাহাওয়ান্দ কিংবা সাবার মতো মাকামগুলো দুই ধারাতেই সমান জনপ্রিয়। শুধু নাম নয়, এদের ভেতরের আবেগও খুব কাছাকাছি। যেমন দুই ধারাতেই ‘রাঁস্ত’ মানেই গাম্ভীর্য, ‘হিজাজ’ মানেই মরমী আকুলতা, আর ‘বায়াতি’ যেন মাটির কাছাকাছি থাকা এক লোকজ স্নিগ্ধতা।

এত মিলের পরও এদের ঘরের ভেতরে কিছু মৌলিক পার্থক্য আছে। অটোমান মাকামে সুরের যাত্রাপথ অর্থাৎ ‘সেইর’ অত্যন্ত কঠোর শৃঙ্খলায় বাঁধা। কোন মাকাম কোথা থেকে শুরু হয়ে কোথায় গিয়ে থামবে, তা ওই ৫৩-কমা তত্ত্বের নিখুঁত ছকে মাপা থাকে। ফলে অটোমান মাকাম অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজকীয়।

অন্যদিকে, আরবি মাকাম ঐতিহ্য এখনো অনেক বেশি মৌখিক বা ওস্তাদ-শাগির্দ পরম্পরার ওপর নির্ভরশীল। তাত্ত্বিক কাঠামো থাকলেও মিশর, সিরিয়া, ইরাক কিংবা লেবাননের মতো আলাদা আলাদা অঞ্চলে একই মাকাম গায়কির ফেরে কিছুটা ভিন্ন শোনায়। এই আঞ্চলিক স্বাধীনতাই আরবি মাকামকে একদিকে যেমন বহুমাত্রিক ও প্রাণবন্ত করেছে, অন্যদিকে অটোমান মাকামের তুলনায় একে কিছুটা নমনীয় রেখেছে।

এমনকি তাদের কনসার্ট বা আসর সাজানোর ঢংয়েও এই মিল-অমিল স্পষ্ট। আরবি সঙ্গীতে যেটাকে বলা হয় ‘তাকসিম ও ওয়াসলা’, অটোমান ধারায় তারই সমান্তরাল রূপ হলো ‘তাকসিম ও ফাসিল’। দুই জায়গাতেই শুরুতে তালহীন আলাপের (তাকসিম) মাধ্যমে মাকামের রূপ খোলা হয় এবং পরে একগুচ্ছ গানের মালা পরিবেশন করা হয়। তবে আরবি ধারায় কবিতার টান ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্য বেশি, আর অটোমান ফাসিল যেন নিখুঁত ও মার্জিত এক প্রোটোকল।

অটোমান সঙ্গীতের বদ্যযন্ত্র - কেমেনচে
অটোমান সঙ্গীতের বদ্যযন্ত্র – কেমেনচে

পারস্য দস্তগাহ বনাম অটোমান মাকাম:

পারস্যের ‘দস্তগাহ’ এবং অটোমান মাকাম – এই দুই ধারাও একই পারসিক-ইসলামিক দরবারি সংস্কৃতির কোলে বড় হয়েছে। ফার্সি কবিতা, সুফি দর্শন আর রাজকীয় রীতিনীতি অটোমান সভ্যতাকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে, দুই ধারার সুরের শরীরে এক গভীর আত্মীয়তা স্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলেই এদের স্বরবিন্যাস আর সুরের স্মৃতির মধ্যকার তফাতটা ধরা পড়ে।

পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ‘দস্তগাহ’ হলো সুরের এটি জগৎ। এর মূল সম্পদ হলো ‘রদিফ’ – যা কোনো খাতায় লেখা থাকে না, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ওস্তাদদের মুখে মুখে বেঁচে থাকে। এই রদিফের ভেতরে থাকে ছোট ছোট সুরের টুকরো, যাকে বলে ‘গুশেহ’। পারস্যের শিল্পীরা প্রথমে মূল সুরের দরজা খোলেন, তারপর একে একে বিভিন্ন গুশেহর গলিপথ ঘুরে, ‘আওয়াজ’-এর মাধ্যমে মনের মাধুরী মিশিয়ে তাৎক্ষণিক সুর বিস্তার করেন এবং সবশেষে ‘ফরুদ’ -এর পথ ধরে আবার মূল সুরভূমিতে ফিরে আসেন।

অটোমান মাকাম পদ্ধতিতে এই ফরুদ আর গুশেহর সমতুল্য জিনিসগুলোই হলো তাদের সেইর, তাকসিম আর ক্যাডেন্স পাথওয়ে। দুই ধারাতেই সুরের মূল দর্শনটা এক – ঘর থেকে বের হয়ে সুরের দুনিয়া ভ্রমণ করা এবং দিনশেষে আবার চেনা ঘরে ফিরে আসা।

তবে আসল তফাতটা রয়ে গেছে তাদের নন্দনতত্ত্বে ও স্বরের ব্যবহারে। অটোমান মাকাম হলো অনেকটা নিখুঁত ইটের পর ইট গেঁথে তৈরি করা সুসংহত এক সুর-স্থাপত্য। সেখানে ৫৩-কমা তত্ত্বের গাণিতিক নিয়মে প্রতিটি স্বরের অবস্থান একদম স্থির ও অটল।

অন্যদিকে, পারস্যের দস্তগাহ হলো নদীর জলের মতো বহমান ও তরল। সেখানে আধুনিক তত্ত্বের ২৪ কোয়ার্টার-টোন কিংবা ‘সোরি’ ও ‘কোরোন’-এর কথা বলা হলেও, বাস্তব গায়কিতে স্বরগুলো গাণিতিক নিয়মে আটকে থাকে না। একই স্বর আবেগের প্রয়োজনে কিংবা গুশেহর মেজাজ ভেদে কখনো সামান্য একটু উঁচুতে, কখনো একটু নিচুতে আলতো করে ছোঁয়া হয়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, পার্সিয়ান দস্তগাহ হলো স্মৃতির ওপর ভর করে গড়ে ওঠা এক মরমী সুরের প্রবাহ, যেখানে শিল্পী গুশেহর মায়া দিয়ে আবেগ ঢেলে দেন। আর অটোমান মাকাম হলো এক অনন্য সুর-স্থাপত্য, যেখানে সেইর আর স্বরের নিখুঁত ব্যবধান মিলে এক  সুসংহত নকশা ফুটিয়ে তোলে।

 

তুর্কি সঙ্গীতের কিছু তারযুক্ত যন্ত্র
তুর্কি সঙ্গীতের কিছু তারযুক্ত যন্ত্র

 

উসুল: তাল, লয়, ছন্দ

অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ‘উসুল’ হলো ছন্দের সেই স্থাপত্য, যা আমাদের হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ‘তাল’-এর ধারণার সাথে একদম হুবহু মিলে যায়। তবে উসুলকে কেবল খটখটে মাত্রা গোনার একটা সাধারণ ছক ভাবলে কিন্তু এর ভেতরের আসল রূপটা ধরা পড়বে না। এটি আসলে জোর-হালকার চমৎকার দোলাচল, সূক্ষ্ম কিছু বিরতি, ভেতরের চোরা টান আর ছন্দ-অলঙ্করণে গড়া এক নিখুঁত তাল কাঠামো—যার ওপর ভর করে অটোমান সুরের বিস্তার ডালপালা মেলে। আমাদের তালের মতোই এখানেও একটা চক্রাকার আবর্তনের ধারণা আছে, তবে অটোমান উসুলের মূল বিশেষত্ব হলো এর দীর্ঘ ছন্দচক্র আর সুরবাক্যের গঠন-কাঠামো।

এই উসুলের দুনিয়ায় যেমন খুব ছোট ছোট কিছু তাল আছে, তেমনি আছে বিস্ময়কর রকমের বড় সব ছন্দচক্র। যেমন ধরুন— দুয়েক মাত্র ৮ মাত্রার তাল, কিংবা আকসাক সেমাই ১০ মাত্রার। কিন্তু এর পাশাপাশি দেভর-ই কেবির যেমন ২৮ মাত্রার এক বিশাল তাল, তেমনি জেনচির নামের তালটি ৬০ থেকে শুরু করে ১২০ মাত্রা পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে! ঠিক এই দীর্ঘ ছন্দচক্রের কারণেই পেশরেভ, বেস্তে বা ফাসিলের মতো পরিবেশনাগুলোতে এক ধরণের দরবারি, ধীরস্থির এবং মহিমান্বিত মেজাজ ফুটে ওঠে।

তবে একটা জায়গায় আমাদের তালের সাথে এর সূক্ষ্ম একটু তফাত আছে। ভারতীয় সঙ্গীতে তালের ‘ঠেকা’ ধরে রেখে শিল্পীরা যেভাবে লয়কারি বা ইম্প্রোভাইজেশন করেন, অটোমান উসুলে সেই সুযোগ কিছুটা কম। সেখানে ছন্দ-স্থাপত্যটি অনেক বেশি কম্পোজিশন বা মূল বন্দিশের কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল এবং কঠোরভাবে সুনির্দিষ্ট।

সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হলো, এই উসুলের হিসাবটা কেবল দলের ড্রাম বা পারকাশন বাদকের একার দায়িত্ব নয়। কণ্ঠশিল্পী থেকে শুরু করে ‘নেয়’ বাঁশি, ‘তানবুর’ কিংবা ‘কানুন’ বাদক—প্রত্যেকে নিজের মনের গভীরে উসুলের এই অভ্যন্তরীণ স্পন্দন ধারণ করে সুর তৈরি করেন। ফলে সমবেত পরিবেশনার সময় পুরো দলটির মধ্যে এক ধরণের যৌথ আত্মিক ছন্দ-চেতনা কাজ করে। ছন্দের এই গভীর দর্শনটিই মূলত আরবীয় ‘ইকা’, পারস্যের ‘জরব’ চক্র এবং আমাদের ভারতীয় তালের সাথে মিলেমিশে গেছে।

নারী সঙ্গীতশিল্পী - অটোমান চিত্রকর্ম, অষ্টাদশ শতক।
নারী সঙ্গীতশিল্পী – অটোমান চিত্রকর্ম, অষ্টাদশ শতক।

 

অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বদ্যযন্ত্র:

অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বাদক দল সাধারণত খুব বড় হয় না, তবে তা অত্যন্ত মার্জিত এবং পরিশীলিত। অটোমান সুরের জগতে যে বাদ্যযন্ত্রগুলো রাজত্ব করে, চলুন তাদের সাথে একটু পরিচিত হওয়া যাক:

১. নেয় : অটোমান সঙ্গীতের প্রধান বাদ্যযন্ত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র ও আধ্যাত্মিক হলো এই ‘নেয়’। এটি মূলত এক ধরণের বিশেষ নলখাগড়ার বাঁশি। সুফি ও মেভলভি ধারায় এই বাঁশির উদাস করা সুরকে মানুষের আত্মার ব্যাকুল আর্তি, বিচ্ছেদ আর গভীর ধ্যানের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। আমাদের ভারতীয় বাঁশি কিংবা পারস্যের ‘নেয়’-এর সাথে এর অদ্ভুত আত্মিক মিল রয়েছে।

২. তানবুর : লম্বা ডাঁটি বা গ্রীবাওয়ালা এটি এক ধরণের তারবাদ্য। মাকামের অতি সূক্ষ্ম ও গাণিতিক স্বরবিস্তার (Microtonal চলন) ফুটিয়ে তুলতে এর জুড়ি মেলা ভার। আমাদের ভারতীয় সেতার কিংবা পারস্যের ‘তার’ (Tar) বাদ্যযন্ত্রের সাথে এর অবয়ব ও কাজের বেশ মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

অটোমান সঙ্গীতের বদ্যযন্ত্র - নেয়
অটোমান সঙ্গীতের বদ্যযন্ত্র – নেয়

৩. কানুন : এটি হলো চ্যাপ্টা টেবিলের মতো দেখতে একটি তারবাদ্য (Zither)। দ্রুত সুরের গতি, সূক্ষ্ম অলঙ্করণ আর সুরের এক মায়াবী ঝিলিক তোলার জন্য এটি বিখ্যাত। প্রথম দেখায় এটিকে আমাদের ভারতীয় ‘সন্তুর’-এর মতো মনে হতে পারে।

৪. কেমেনচে : এটি ছড় দিয়ে বাজানো এক ধরণের ছোট তারবাদ্য (Bowed string instrument)। এর সুর এতটাই দরদী যে শুনলে মনে হয় কোনো মানুষ গান গাইছে! আমাদের ভারতীয় ‘সারেঙ্গি’ কিংবা পারস্যের ‘কামানচেহ’-র মরমী সুরের সাথে এর দারুণ সাদৃশ্য রয়েছে।

৫. উদ : কোনো ফ্রেট বা পর্দা ছাড়া (Fretless) এই তারবাদ্যটি তার উষ্ণ ও গম্ভীর সুরের জন্য দারুণ জনপ্রিয়। ঐতিহাসিকভাবে একে প্রাচীন ‘রুদ’ বাদ্যযন্ত্রের উত্তরসূরি এবং বিস্তৃত এশীয় লিউট (Lute) বংশের অংশ বলে মনে করা হয়। দূরবর্তী দিক থেকে আমাদের ভারতীয় সিনের বা সেতারের সাথে এর একটা হালকা সম্পর্ক টানা যায়।

৬. কুদুম ও বেনদির : ছন্দের তাল সামলানোর জন্য এই দুটি পারকাশন বা চামড়াঘেরা বাদ্যযন্ত্র ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সুফিদের সেমা নৃত্য ও মেভলভি রীতিতে ‘কুদুম’-এর গম্ভীর ও ধ্যানমগ্ন ধীর স্পন্দন পুরো পরিবেশে এক অপার্থিব আধ্যাত্মিকতার জন্ম দেয়।

অটোমান সঙ্গীতের বদ্যযন্ত্র - কানুন
অটোমান সঙ্গীতের বদ্যযন্ত্র – কানুন

সুরের এক অনন্য বহুত্ব (Heterophonic Texture):

এই বাদক দলের সবচেয়ে চমৎকার ও জাদুকরী বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘হেটেরোফোনিক টেক্সচার’। সহজ কথায়, দলের সব বাদকই মূলত একই মূল সুরটি বাজান; কিন্তু প্রতিটি যন্ত্র নিজের মতো করে নিজস্ব অলঙ্করণ, সুরের স্বরাংশের কারুকাজ যোগ করে সেই সুরকে সম্পূর্ণ আলাদা একটা রঙ দেয়।

ঠিক যেমনটা আমাদের ভারতীয় রাগসঙ্গীতে তানপুরাকে সাক্ষী রেখে শিল্পীরা এককভাবে সুরের বিস্তার ঘটান, কিংবা আরবীয় ‘তাখত’ দল ও পারস্যের ‘রদিফ’ পরিবেশনায় দেখা যায়—এখানেও ঠিক তেমনি একই সুর বহু যন্ত্রের হাত ধরে, বহু রূপে, এক স্বর্গীয় ক্যানভাসে ফুটে ওঠে।

সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের অটোমান অর্কেস্ট্রা
সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের অটোমান অর্কেস্ট্রা

 

ফাসিল: এক মাকামে পূর্ণাঙ্গ সঙ্গীতানুষ্ঠান

অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্যতম সেরা কনসার্ট ফরম্যাট বা আসরের রূপ হলো ‘ফাসিল’। সহজ কথায়, এটি হলো সুনির্দিষ্ট একটি মাকাম বা রাগকে কেন্দ্র করে সাজানো এক চমৎকার ধারাবাহিক পরিবেশনা। যেখানে সুরের নানা রূপ একটার পর একটা এমনভাবে সাজানো থাকে, যা শুনতে ঠিক কোনো সুসংহত সুরনাট্যের মতো মনে হয়। এখানে প্রতিটি পর্ব কেবল আলাদা কোনো গান বা বাজনা নয়; বরং আগের পর্বের তৈরি করা আবহ, লয় আর সুরের রঙকে পুঁজি করে ধাপে ধাপে পরের পর্বে রূপ নেয়।

ফাসিলের সবচেয়ে বড় জাদু লুকিয়ে আছে এর এই ধারাবাহিক উত্তরণের (Sequential progression) মধ্যে। প্রতিটি অংশ শ্রোতার মনে আবেগ আর ছন্দের একেকটি স্তর তৈরি করে, যা পরের স্তরে যাওয়ার পথ মসৃণ করে দেয়। এই বদলটা কখনো ঘটে লয় বা গতিকে ধীরে ধীরে বাড়িয়ে, কখনো সুরের তীব্রতা বদলে, আবার কখনো বা একই মাকামের ভেতরে থাকা নানা উপ-আবেগের চোরাগলিতে ঘুরে আসার মাধ্যমে।

অটোমান সঙ্গীতের বদ্যযন্ত্র - কানুন
অটোমান সঙ্গীতের বদ্যযন্ত্র – কানুন

একটি আদর্শ ফাসিল সাধারণত কীভাবে ডানা মেলে, চলুন সেই যাত্রাপথটা একটু দেখে নেওয়া যাক:

তাকসিম:

আসরের শুরুটা হয় এই তালহীন, তাৎক্ষণিক সুরবিস্তার বা আলাপ দিয়ে। এটি মূলত শ্রোতাদের সামনে ওই নির্দিষ্ট মাকামের মূল চরিত্র আর মায়াবী আবহটাকে মেলে ধরে।

পেশরেভ:

আলাপের রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয় যন্ত্রসঙ্গীতের এই জটিল মুখবন্ধ। এর হাত ধরেই আসরে তালের (উসুল) আগমন ঘটে। এই পর্বে দলের সবকটি বাদ্যযন্ত্র একে একে প্রবেশ করে এবং মূল ছন্দ ও সুরের কাঠামোর সাথে নিজেদের চমৎকারভাবে মিলিয়ে নেয়।

কার কিংবা বেস্তে:

যন্ত্রের এই আবহের পর আসরে প্রবেশ করে কণ্ঠসঙ্গীতের পর্ব। ‘কার’ বা ‘বেস্তে’ হলো সাধারণত অত্যন্ত ধীর, গম্ভীর ও বিস্তারিত ধাঁচের ধ্রুপদী গান। এখানে সুরের অবয়বটি খুব ধীরে ধীরে খোলে এবং কণ্ঠশিল্পী মাকামের আসল গভীরতা শ্রোতার মনে গেঁথে দেন।

আঈর সেমাই:

এরপর আসে এই পর্বটি, যা ধীর লয়ের হলেও আগের চেয়ে কিছুটা বেশি গতিশীল ও বহমান। এই পর্যায়ে কণ্ঠ আর বাদ্যযন্ত্র একে অপরের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলে। অনেক সময় দেখা যায়, গায়কির একটি বাক্য শেষ হওয়ার আগেই কোনো বাদ্যযন্ত্র তার চমৎকার এক প্রতিধ্বনি বা উত্তর তৈরি করে দিচ্ছে।

শার্কি:

সুরের গভীরতা থেকে আসর এবার একটু হালকা ও মেলোডিয়াস গানের দিকে মোড় নেয়। শার্কি হলো তুলনামূলক ছোট, লিরিক্যাল ও সহজবোধ্য গান (যা আমাদের গজলের কাছাকাছি)। এখানে কণ্ঠ ও বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে এক ধরণের চমৎকার সাওয়াল-জওয়াব বা কথোপকথন চলতে থাকে। গায়ক যখন একটা লাইন শেষ করেন, কানুন বা কেমেনচে বাদক ঠিক সেই লাইনেরই এক অলঙ্কৃত পুনরাবৃত্তি করে সুরের আলাপটাকে এগিয়ে নিয়ে যান।

ইউরুক সেমাই:

এখান থেকে আসরের গতি বা লয় আরও দ্রুত হতে শুরু করে। তালের ছন্দচক্রটি এখানে একদম স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং দলের সব বাদ্যযন্ত্র একজোট হয়ে একে অপরের সাথে তাল মিলিয়ে বাজাতে থাকে। কোন যন্ত্র কখন আসবে আর কখন থামবে, তা এতটাই সূক্ষ্মভাবে মেলানো থাকে যে সুরের এই নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহে কোথাও কোনো ছেদ পড়ে না।

অটোমান সঙ্গীতের বদ্যযন্ত্র - তানবুর
অটোমান সঙ্গীতের বদ্যযন্ত্র – তানবুর

সাজ সেমাই:

পুরো ফাসিল বা আসরের দুর্দান্ত এক সমাপ্তি ঘটে এই যন্ত্রসঙ্গীতের চূড়ান্ত পর্বটি দিয়ে। এটি সাধারণত একটি দ্রুত ও বেশ উচ্ছ্বাসপূর্ণ অংশ। এখানে নেয়, তানবুর, কানুন এবং কেমেনচে একে অপরের ওপর সুরের স্তর তৈরি করে এক উজ্জ্বল ও অপার্থিব সাঙ্গীতিক মহাযাত্রার ইতি টানে।

এই পুরো কাঠামোর সবচেয়ে চমৎকার দিক হলো—একটি অংশ কখনোই আচমকা শেষ হয়ে আরেকটি শুরু হয় না। বরং আগের অংশের শেষ সুরের টুকরোটিই পরের অংশের জন্য প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। একই মাকামের সীমানায় থেকেও গতি, ছন্দের ঘনত্ব আর সুরের তীব্রতার এই ধীর পরিবর্তন আসরটিকে একদম প্রাকৃতিকভাবে সচল রাখে।

এই দিক থেকে দেখলে, ফাসিল পদ্ধতিটি আমাদের হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আলাপ-বন্দিশ-মধ্যলয়-দ্রুতলয় ও ঝালা গায়কির চেনা বিবর্তনের কথাই মনে করিয়ে দেয়। তবে অটোমান ফাসিলে আলাদা করে নজর কাড়ে এর ভেতরের এক ধরণের মার্জিত শৃঙ্খলা, দলের সবার মধ্যকার নিখুঁত পারস্পরিক সমন্বয় এবং জ্যামিতিক নকশার মতো সাজানো সাঙ্গীতিক বিন্যাস।

ওসমান জেকি উঙ্গোরের সাথে সঙ্গীতের বিদ্যার্থী
ওসমান জেকি উঙ্গোরের সাথে সঙ্গীতের বিদ্যার্থী

 

তাকসিম: ইমপ্রোভাইজেশন

অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ‘তাকসিম’ হলো শিল্পীর তাৎক্ষণিক সৃজনশীলতা বা ইম্প্রোভাইজেশনের এক অনন্য রূপ। এটি মূলত কোনো তাল বা ছন্দের কড়া শাসনে না বাঁধা, বাদ্যযন্ত্রের এমন এক সুরসৃষ্টি—যেখানে শিল্পী আগে থেকে তৈরি কোনো গৎ বা গানের ফ্রেমে আটকে থাকেন না। বরং একটা নির্দিষ্ট মাকামের সীমানায় দাঁড়িয়ে নিজের খেয়ালখুশি মতো ধীরে ধীরে সুরের ইমারত গড়েন। আর এই পুরো খেলায় শিল্পীর একমাত্র কম্পাস বা পথপ্রদর্শক হলো সেই মাকামের ‘সেইর’ – অর্থাৎ সুরের সেই চেনা চলন।

তাকসিম বাজানোর সময় শিল্পী প্রথমে মাকামের মূল স্বরগুলোকে শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেন। তারপর সেই চেনা গণ্ডির ভেতরেই সুরের নানারকম মোচড়, সূক্ষ্ম অলঙ্করণ আর অতি সূক্ষ্ম স্বরাংশের (Microtonal inflection) কারুকাজ দিয়ে সুরের ক্যানভাসটা বড় করতে থাকেন। এই সুরের বিস্তার কিন্তু সোজা পথে চলে না; এটি আসলে এক রোমাঞ্চকর সুর-ভ্রমণ। বাজাতে বাজাতে শিল্পী কখনো মূল মাকামে স্থির থাকেন, আবার কখনো তার খুব কাছের বা সম্পর্কিত অন্য কোনো মাকামের অচিন গাঁয়ে আলতো করে ঘুরে আসেন। কিন্তু দিনশেষে ঠিকই আবার চেনা ঘরের মূল মাকামে ফিরে আসেন। সুরের এই চঞ্চল আসাযাওয়াই তাকসিমকে করে তোলে জীবন্ত ও প্রাণবন্ত।

এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে তাকসিমকে আমাদের উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ‘আলাপ’-এর সাথে অনায়াসে তুলনা করা যায়। দুই জায়গাতেই আসরের শুরুটা হয় কোনো তাল ছাড়াই, আর সুরের চাদর সরিয়ে ধীরে ধীরে রাগ বা মাকামের আসল রূপটা শ্রোতার সামনে খোলসা করা হয়। শিল্পী ধাপে ধাপে এক একটি স্বরের সম্ভাবনা পরীক্ষা করেন, আবেগের পারদ চড়ান এবং শ্রোতাকে হাত ধরে নিয়ে যান সুরের এক মায়াবী ভুবনে। নিজের ভেতরের অনুভূতিকে প্রকাশ করার জন্য আলাপ এবং তাকসিম—দুটিই শিল্পীর জন্য এক অসীম স্বাধীনতার আকাশ।

তবে এই দুই ভাইয়ের মধ্যেও একটা বড় তফাত আছে। আমাদের ভারতীয় সঙ্গীতের আলাপ সাধারণত একটা নির্দিষ্ট রাগের ভেতরেই অনেক সময় নিয়ে, খুব ধীরে ধীরে ডালপালা মেলে এবং সেখানে চট করে অন্য রাগের ছোঁয়া (Modulation) লাগানো হয় না। অন্যদিকে, অটোমান তাকসিমের একটা বড় বিশেষত্বই হলো খুব সূক্ষ্মভাবে মাকাম পরিবর্তন বা মডুলেশন করা। একজন গুণী শিল্পী মূল মাকাম থেকে তার খুব কাছের অন্য মাকামে সাময়িকভাবে ঢুকে পড়েন, সেখানে সুরের কিছু খেলা দেখিয়ে আবার নিখুঁতভাবে মূল মাকামে ফিরে আসেন। এই ঘন ঘন রঙ বদলানোর কারণে তাকসিম অনেক সময় আলাপের চেয়ে বেশি গতিশীল ও বৈচিত্র্যময় শোনায়।

অটোমান সঙ্গীতের ইতিহাসে এই শিল্পরূপটিকে যিনি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি হলেন কিংবদন্তি তানবুর বাদক তানবুরি জেমিল বে (Tamburi Cemil Bey)। তিনি তাকসিমকে স্রেফ গানের আগের একটা ভূমিকা বা দুই গানের মাঝখানের একটুখানি বাজনা হিসেবে আটকে রাখেননি; বরং একে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও উচ্চাঙ্গের শিল্পে রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর হাতের তাকসিমে স্বরের অতি সূক্ষ্ম মোচড়, বুকের গভীর থেকে আসা আবেগ এবং সুরের এক নিখুঁত জ্যামিতিক স্পষ্টতা একসঙ্গে খেলা করত, যা অটোমান সঙ্গীতকে দিয়েছিল এক নতুন নান্দনিক রূপ।

 

তুর্ক - অটোমান সঙ্গীত
তুর্ক – অটোমান সঙ্গীত

 

নন্দনতত্ত্ব: রস, হাল, হুজুন

এই তিনটি বিশাল সাঙ্গীতিক ঐতিহ্যে মানুষের মনস্তত্ত্ব ও আবেগকে বোঝার জন্য তিনটি আলাদা অথচ ভেতরে ভেতরে যুক্ত শব্দ ব্যবহার করা হয়—আমাদের ভারতীয় ধারায় ‘রস’, সুফি ও আরবি আধ্যাত্মিকতায় ‘হাল’, আর অটোমান সঙ্গীতে বিশেষভাবে মিশে থাকা ‘হুজুন’

আমাদের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ‘রস’ হলো সৌন্দর্যের এক পরম নান্দনিক অনুভূতি, যা সঙ্গীত বা কবিতার মাধ্যমে শ্রোতার মনের গভীরে আলোড়ন তোলে। এটি প্রেম, করুণা, বীরত্ব, শান্তি কিংবা গভীর বেদনার মতো মানুষের চিরন্তন আবেগগুলোকে শিল্পের ছাঁচে ঢেলে এক অপার্থিব স্বাদে রূপান্তর করে। এখানে সঙ্গীতের মূল লক্ষ্য কেবল দুঃখ বা আনন্দ প্রকাশ করা নয়, বরং সেই আবেগকে ধুয়েমুছে এতটাই খাঁটি ও সুন্দর করে তোলা, যাতে শ্রোতা তার ভেতরে এক পরম শান্তি খুঁজে পান।

অন্যদিকে, সুফি ও আরবি আধ্যাত্মিক সঙ্গীতের দুনিয়ায় ‘হাল’ হলো মানুষের ভেতরের এক ক্ষণস্থায়ী অথচ তীব্র মানসিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থা। গভীর ধ্যান, জিকির কিংবা মরমী সুরের আবেশে মগ্ন হতে হতে সাধক বা শ্রোতা যখন নিজের অজান্তেই জাগতিক চেতনার ঊর্ধ্বে সম্পূর্ণ অন্য এক জগতে প্রবেশ করেন, সেটাই হলো হাল। এই অবস্থাকে কোনো নিয়মে বেঁধে ফেলা বা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না; এটি নিজের খেয়ালে আসে আর চলে যায়। কিন্তু যেটুকু সময় এটি থাকে, মানুষের পুরো অস্তিত্বকে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে আচ্ছন্ন করে রাখে।

অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শরীরে যে বিশেষ নন্দনতাত্ত্বিক অনুভূতিটি জড়িয়ে আছে, তার নাম হলো ‘হুজুন’। এই হুজুন কিন্তু আমাদের চেনা সাধারণ কোনো দুঃখ বা বিষণ্ণতা নয়। এটি হলো এক ধরণের গভীর, নরম এবং একাকী মনের মায়াবী মেলানকোলি—যার সাথে জড়িয়ে থাকে পুরনো শহর, ইতিহাস, ফেলে আসা স্মৃতি আর পরমেশ্বরের কাছ থেকে দূরে থাকার এক আধ্যাত্মিক বিচ্ছেদ বেদনা। ইস্তাম্বুলের বাতাস আর সাংস্কৃতিক স্মৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে এই হুজুন এমনভাবে মিশে আছে যে, তা এক ধরণের যৌথ আবেগীয় আবহ তৈরি করে। সেখানে বেদনা নিজেই এক পরম সৌন্দর্যে রূপ নেয়।

আপাতদৃষ্টিতে এই তিনটি ধারণা—রস, হাল এবং হুজুন—আলাদা মনে হলেও তারা আসলে একই মহাসত্যের তিনটি ভিন্ন রূপ। আমাদের ভারতীয় ‘রসে’ মানুষের আবেগ রূপ নেয় এক নান্দনিক অভিজ্ঞতায়; সুফি ‘হালে’ সেই আবেগই হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক জগত পার হওয়ার এক অলৌকিক সোপান; আর অটোমান ‘হুজুনে’ সেই একই আবেগ ইতিহাস, সংস্কৃতি আর স্মৃতির চাদরে মোড়ানো এক অন্তর্লীন মায়াবী সৌন্দর্যে পরিণত হয়।

তুর্কি - অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

 

প্রধান সুরকার ও সংগীত ব্যক্তিত্ব

অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে অনন্য নান্দনিক ও তাত্ত্বিক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পেছনে বেশ কয়েকজন কালজয়ী মানুষের অবদান আছে। সুরের এই মহীরুহদের মধ্যে কয়েকজন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:

সুলতান তৃতীয় সেলিম (Sultan Selim III):

বিশাল এক সাম্রাজ্যের সুলতান হওয়া সত্ত্বেও সুরের ভুবনে তাঁর অবদান ছিল এক পরম বিস্ময়। তিনি কেবল সঙ্গীতের একজন একনিষ্ঠ অনুরাগীই ছিলেন না, বরং নিজে ছিলেন একাধারে উচ্চমানের সুরকার ও মাকাম সংস্কারক। বেশ কিছু নতুন মাকাম সৃষ্টি ও তা ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে তিনি সরাসরি ভূমিকা রাখেন। তাঁর তৈরি করা সুরের বন্দিশগুলোতে দরবারের মার্জিত মেজাজ, সূক্ষ্ম আবেগ এবং অনন্য পরিশীলন একসঙ্গে দেখা যেত। তাঁর হাত ধরেই অটোমান সঙ্গীত কেবল সস্তা বিনোদন না থেকে এক উচ্চ সাংস্কৃতিক পরিচয় লাভ করে।

ইত্রি (Itri):

বুহুরিজাদে মুস্তাফা ইত্রি ছিলেন সপ্তদশ শতকের অন্যতম সেরা এক সুরকার। ধর্মীয় সঙ্গীত (যেমন মেভলভি সুফি তরিকার বন্দিশ) এবং দরবারি সঙ্গীত—উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান অত্যন্ত গভীর ও স্থায়ী। বিশেষ করে তাঁর সুরের ভেতরের মরমী আধ্যাত্মিকতা, গাম্ভীর্য এবং ছন্দের এক নিখুঁত ব্যালেন্স শ্রোতাকে মুগ্ধ করে। তাঁকে অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূল ভিত্তি নির্মাতাদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়।

দেদে এফেন্দি (Dede Efendi):

হামামিজাদে ইসমাইল দেদে এফেন্দি ছিলেন অটোমান সুর-আকাশের এক সত্যিকারের ধ্রুবতারা। তাঁর রচিত অসংখ্য সুর ও গান (Eser) আজও তুর্কি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একদম মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বেঁচে আছে। মাকাম ব্যবস্থার ভেতরে লুকিয়ে থাকা আবেগের শেষ কণাটুকুও তিনি তাঁর সুরে এত সূক্ষ্মভাবে ব্যবহার করেছেন, যা সুরকে এক গভীর মানবিক অভিজ্ঞতায় রূপ দেয়। তাঁর কাজগুলোতে আধ্যাত্মিক আর্তি, রোমান্টিক অনুভূতি আর দরবারি আভিজাত্য এক মোহনায় এসে মিশেছে।

তানবুরি জেমিল বে (Tamburi Cemil Bey):

অটোমান সঙ্গীতের ইতিহাসে তানবুরি জেমিল বে ছিলেন এক বিপ্লবী বাদ্যযন্ত্রশিল্পী। বিশেষ করে তানবুর এবং কেমেনচে বাজানোয় তাঁর দক্ষতা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো, তিনি ‘তাকসিম’ বা তাৎক্ষণিক সুরবিস্তারকে স্রেফ একটা ভূমিকার গণ্ডি থেকে বের করে এক উচ্চমাত্রার স্বাধীন শিল্পে রূপ দেন। তাঁর ইম্প্রোভাইজেশনে মাকামের অতি সূক্ষ্ম মোচড়, বুকের গভীর থেকে আসা আবেগ এবং সুরের এক জ্যামিতিক স্পষ্টতা একসঙ্গে খেলা করত, যা অটোমান সঙ্গীতকে দিয়েছিল এক নতুন নান্দনিক রূপ।

এই চারজন সুরকার ও শিল্পীর সাধনা ও সৃজনশীলতা মিলেই মূলত অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত একটি জীবন্ত, পরিশীলিত এবং বহুস্তরীয় সুরের ভাষা হিসেবে গড়ে উঠেছে—যা আজও বিশ্বসঙ্গীতের দরবারে এক অমূল্য ঐতিহ্য হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

তুর্কি - অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

 

মেভলভি সুফি সঙ্গীত: সুরের মধ্যে আত্মার ভ্রমণ

অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে প্রাচীন ও সুসংগঠিত ধারা হলো মেভলভি সুফি সঙ্গীত। ত্রয়োদশ শতকের সুফি সাধক মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির দর্শন এবং তাঁর অনুসারীদের সাঙ্গীতিক আচারের ওপর ভিত্তি করে এই ধারাটি গড়ে ওঠে।

এই ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি হলো ‘সেমা’ নামক একটি সুনির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক ইবাদত বা আচার। এতে বিশেষ সাদা পোশাক পরা দরবেশরা একটি বৃত্তাকার পথ ধরে ক্রমাগত আবর্তিত হতে থাকেন। এই ঘূর্ণনের গতি ও সময় পরিমাপ করা হয় মূলত নেয় (নলখাগড়ার বাঁশি), কুদুম (ছোট নকড়া জাতীয় পারকাশন), তানবুর এবং সমবেত কণ্ঠের লাইভ মিউজিকের মাধ্যমে। এটি কোনো সাধারণ নাচ বা গান নয়, বরং একটি কঠোরভাবে নির্দেশিত কোরিওগ্রাফি এবং সাঙ্গীতিক পারফরম্যান্স।

মেভলভি সঙ্গীতের প্রতিটি উপাদানের পেছনে সুনির্দিষ্ট তাত্ত্বিক ও প্রতীকী অর্থ রয়েছে:

নেয় বাজাবার কায়দা:

এই বাঁশির ভেতরের ফাঁপা অংশ এবং তা থেকে নির্গত বাতাস মানুষের জন্মগত একাকীত্ব এবং সৃষ্টির মূল উৎসের সাথে বিচ্ছেদের ধারণাকে নির্দেশ করে।

বিশেষ ঘূর্ণন:

দরবেশদের এই আবর্তন মূলত জ্যোতির্বিজ্ঞানের গ্রহ-নক্ষত্রের কক্ষপথের গতিকে অনুকরণ করে। ঘোরার সময় তাঁদের ডান হাতের তালু থাকে আকাশের দিকে এবং বাঁ হাতের তালু থাকে মাটির দিকে, যা মহাজাগতিক শক্তি গ্রহণ করে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতীক।

মেভলভি সঙ্গীতের উসুল:

মেভলভি সঙ্গীতে ব্যবহৃত ছন্দ বা তালগুলো সাধারণ সঙ্গীতের চেয়ে দীর্ঘ ও ধীর গতির হয়। এগুলো পরিবেশনার সময়কে একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক শৃঙ্খলায় ধরে রাখে, যা দরবেশদের মাথা ঘোরানো বা ভারসাম্য হারানোর হাত থেকে রক্ষা করে।

মেভলভি সঙ্গীতে মাকাম:

আসরের একেকটি পর্বে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের ধাপ অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন মাকাম ব্যবহার করা হয়, যা শ্রোতা ও সাধককে একটি নির্দিষ্ট মানসিক স্তরে স্থিতিশীল হতে সাহায্য করে।

এই ধারার সবচেয়ে জটিল ও দীর্ঘ সাঙ্গীতিক রূপবন্ধ হলো ‘আয়িন-ই শেরিফ’। এটি মূলত চার ভাগে বা চার পর্বে (Selam) বিভক্ত একটি পূর্ণাঙ্গ সঙ্গীতচক্র:

১. প্রথম সালাম: মানুষের খোদার অস্তিত্ব ও নিজের সৃষ্টিতত্ত্ব উপলব্ধি করার পর্ব।

২. দ্বিতীয় সালাম: ঈশ্বরের সৃষ্টিশৈলী ও মহিমান্বিত রূপ দেখে মানুষের মুগ্ধ হওয়ার পর্ব।

৩. তৃতীয় সালাম: এই মুগ্ধতা যখন গভীর প্রেমে রূপ নেয় এবং মানুষ নিজের অহংকার বিসর্জন দেয়।

৪. চতুর্থ সালাম: সাধনা শেষে আবার নিজের চেনা বাস্তবতায় এবং মানুষের সেবায় ফিরে আসার পর্ব।

এই আয়িনের প্রতিটি পর্বে মাকামের সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে এবং নিখুঁত নিয়ম মেনে ছন্দের লয় ধীর থেকে দ্রুততর হতে থাকে। এর ফলে সঙ্গীত, জ্যামিতিক শারীরিক চলন এবং আধ্যাত্মিক দর্শন একই সমান্তরালে বিকশিত হয়ে একটি সুসংহত সাঙ্গীতিক রূপ ধারণ করে।

 

তুর্কি - অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

 

দরবারি সঙ্গীত: সাম্রাজ্যের নান্দনিক ভাষা

অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থায় সঙ্গীত কেবল অবসরের বিনোদন ছিল না, বরং তা ছিল রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি এবং সামাজিক মর্যাদার একটি বড় মাধ্যম। তোপকাপি প্যালেসসহ বিভিন্ন রাজপ্রাসাদে পেশাদার সঙ্গীতশিল্পীদের জন্য আলাদা সাঙ্গীতিক পরিবেশ তৈরি করা হতো। সেখানে সঙ্গীতচর্চা চলত কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। এমনকি বেশ কয়েকজন অটোমান সুলতান নিজেরাও সুরকার ও কবি হিসেবে নিয়মিত সুরসৃষ্টি ও নতুন মাকাম তৈরিতে সরাসরি অংশ নিতেন।

এই দরবারি পরিবেশনার মূল ভিত্তি ছিল ‘ফাসিল এনসেম্বল’ বা সমবেত বাদক দল। এখানে কেবল সুরের ওপর জোর দেওয়া হতো না; বরং গান, কবিতা, পরিবেশনার শিষ্টাচার, পোশাকের নান্দনিকতা এবং মঞ্চের আচরণ—সবকিছু একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে পরিচালিত হতো। এই সুসংহত পরিবেশনাটিই তৎকালীন সময়ে দরবারের রুচি ও সভ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করত।

অটোমান শাসনব্যবস্থায় একজন শিক্ষিত নাগরিকের জন্য সাঙ্গীতিক জ্ঞান থাকাটা সামাজিক আভিজাত্যের অন্যতম শর্ত ছিল। সমাজে নিজেকে পরিশীলিত ও সভ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার প্রধানত চারটি বিষয়ে দক্ষতা থাকা প্রয়োজন হতো:

সাহিত্য ও কাব্যজ্ঞান: গানের কথামালা ও তার পেছনের ব্যাকরণ বোঝার ক্ষমতা।

মাকাম তত্ত্ব: বিভিন্ন মাকামের তাত্ত্বিক কাঠামো এবং সুরের বাঁকগুলো চেনার সক্ষমতা।

বাদ্যযন্ত্র চালনা: বিশেষ করে উদ (Oud) কিংবা তানবুর (Tanbur)-এর মতো ঐতিহ্যবাহী যন্ত্র বাজানোর দক্ষতা।

উসুলের ধারণা: সঙ্গীতের দীর্ঘ ও জটিল ছন্দচক্রগুলো নিখুঁতভাবে ধরতে পারার জ্ঞান।

এই প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা এবং উচ্চ সামাজিক চাহিদার কারণেই অটোমান দরবারি সঙ্গীত সময়ের সাথে সাথে অত্যন্ত সুসংহত ও গাণিতিক নিয়মে বিকশিত হতে পেরেছিল।

তুর্কি - অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

 

কবিতা ও সঙ্গীত: দিভান সাহিত্যর সঙ্গে সম্পর্ক

অটোমান শাস্ত্রীয় কণ্ঠসঙ্গীতের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে ‘দিভান সাহিত্য’ (Divan Literature)-এর ওপর। এটি ছিল মূলত একটি উচ্চ ঘরানার দরবারি কাব্যধারা। এই ধারায় ফার্সি, আরবি ও তুর্কি ভাষার শব্দভাণ্ডার এবং ছন্দকে এক সুতোয় বেঁধে একটি জটিল কাব্যভাষা তৈরি করা হয়েছিল। দিভান কবিতায় প্রেম, বিচ্ছেদ, আকাঙ্ক্ষা, মদ্য (Wine Symbolism) কিংবা আত্মিক ব্যাকুলতার মতো বিষয়গুলোকে সুনির্দিষ্ট রূপক ও প্রতীকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হতো।

এই কাব্যের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বহুমাত্রিক অর্থ। একই লাইনের বাহ্যিক অর্থ যদি হয় সাধারণ মানুষের মধ্যকার প্রেম-বিরহ, তবে তার ভেতরের গূঢ় অর্থটি নির্দেশ করে সৃষ্টিকর্তা ও মানুষের আত্মার মধ্যকার বিচ্ছেদকে। এই গভীরতার কারণে দিভান কবিতা একই সাথে সাহিত্য এবং দর্শনের একটি বড় মাধ্যম ছিল।

অটোমান সঙ্গীতের প্রধান তিনটি কণ্ঠরূপ বা গায়নশৈলীতে এই সাহিত্যের প্রভাব সরাসরি দেখা যায়:

কার:

এটি অত্যন্ত গম্ভীর ও বিস্তৃত আকারের ধ্রুপদী গান। এখানে দিভান কবিতার জটিল রূপকগুলোকে প্রকাশ করার জন্য সুরের অবয়বকে খুব ধীর গতিতে মেলে ধরা হয়।

বেস্তে:

এই রূপটিতে মূলত গজলধর্মী দুই লাইনের অন্ত্যমিলযুক্ত কবিতা (Couplet) ব্যবহার করা হয়। এখানে সুরের মূল কাজ থাকে কবিতার প্রতিটি পংক্তির অভ্যন্তরীণ অর্থ ও ওজনকে বজায় রেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ গায়কি তৈরি করা।

শার্কি:

এটি তুলনামূলক ছোট ও লিরিক্যাল গান। দিভান সাহিত্যের অপেক্ষাকৃত সহজ ও পদাশ্রয়ী কবিতাগুলো এই ধারায় ব্যবহৃত হতো, যেখানে কণ্ঠ ও বাদ্যযন্ত্রের সরল সুরের কথোপকথন প্রাধান্য পায়।

এখানে সুর কেবল কবিতার শব্দগুলোকে উচ্চারণ করার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে না; বরং কবিতার ছন্দের যে গতি (Metrical Structure), তার সাথে মিলিয়ে উসুল বা তালের নকশা ঠিক করা হতো। ফলে দিভান কবিতা ছাড়া অটোমান শাস্ত্রীয় কণ্ঠসঙ্গীতের তাত্ত্বিক পরিকাঠামো মূলত অসম্পূর্ণ। এই নিখুঁত সমন্বয়ের কারণেই অটোমান কণ্ঠসঙ্গীত একই সাথে শ্রোতার কাছে একটি সঙ্গীত এবং উচ্চমানের সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা হিসেবে ধরা দেয়।

তুর্কি - অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

 

নগর সংস্কৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবন

অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জন্ম রাজদরবারে হলেও সময়ের সাথে সাথে এর পরিধি প্রাসাদের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে এই সঙ্গীত ইস্তাম্বুলের সাধারণ নগরজীবনের বিভিন্ন স্তরে—যেমন কফিহাউস, সাহিত্যসভা, উচ্চবিত্তদের পারিবারিক আসর এবং সুফি দরগা বা খানকাহগুলোতে (Tekke) জায়গা করে নেয়। এর ফলে আনুষ্ঠানিক দরবারি গণ্ডি পেরিয়ে এটি একটি বিস্তৃত নাগরিক শিল্পসংস্কৃতিতে রূপান্তর লাভ করে।

এই রূপান্তরের পেছনে ইস্তাম্বুলের কফিহাউসগুলোর বড় ভূমিকা ছিল। তৎকালীন সময়ে এই কফিহাউসগুলো ছিল কবি, সঙ্গীতশিল্পী, বুদ্ধিজীবী এবং শিক্ষিত নাগরিকদের আড্ডার প্রধান কেন্দ্র। এখানে নিয়মিত কবিতা পাঠ, সুরারোপ এবং তত্ত্ব আলোচনা চলত। অন্যদিকে সুফি খানকাহগুলোতে এই সঙ্গীত চর্চা করা হতো আধ্যাত্মিক সাধনার অংশ হিসেবে, যা একে সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

নাগরিকদের এই উন্মুক্ত পরিবেশে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পায় ‘শার্কি’ নামক সাঙ্গীতিক রূপটি। দরবারের ‘কার’ বা ‘বেস্তে’-র মতো এটি অতটা দীর্ঘ ও জটিল ছিল না। শার্কি মূলত ছোট, গীতিময় এবং সহজবোধ্য ঘরানার গান হওয়ায় শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সমাজ একে দ্রুত আপন করে নেয়। এই গানের মাধ্যমে প্রেম, বিরহ বা দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ মানবিক অনুভূতিগুলো সহজ ভাষায় প্রকাশ করা হতো।

এই সামাজিক পরিবর্তনের ফলে অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত তার আভিজাত্য না হারিয়েই একটি গণমুখী রূপ পায়। উচ্চ দরবারি নান্দনিকতার সাথে সাধারণ নগরজীবনের এই মেলবন্ধন তৎকালীন ইস্তাম্বুলের সাংস্কৃতিক আবহকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ ও গতিশীল করে তুলেছিল।

তুর্কি - অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

 

পাশ্চাত্য প্রভাব ও পরিবর্তন

ঊনবিংশ শতাব্দীতে ‘তানজিমাত’ (Tanzimat) নামক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সংস্কারের মাধ্যমে অটোমান সাম্রাজ্যে বড় ধরণের আধুনিকীকরণ শুরু হয়। এই পরিবর্তনের হাওয়া প্রথাগত সঙ্গীত সংস্কৃতিতেও লাগে। এ সময় ইউরোপীয় সঙ্গীতচর্চার বিভিন্ন উপাদান, যেমন—পশ্চিমা স্টাফ নোটেশন (স্বরলিপি লেখার পদ্ধতি), অপেরা এবং হার্মোনির ধারণা অটোমান সঙ্গীতে প্রবেশ করতে থাকে। এমনকি সাম্রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী সামরিক ব্যান্ড ‘মেহতের’ (Mehter)-কে বদলে পশ্চিমা ধাঁচের মিলিটারি ব্যান্ড তৈরি করা হয়।

পাশ্চাত্যের এই আগমনে অটোমান সঙ্গীতজগতে দুটি সমান্তরাল ধারার সৃষ্টি হয়। একটি অংশ মাকাম, সেইর, উসুল এবং মাইক্রোটোনের প্রথাগত সাঙ্গীতিক কাঠামো কঠোরভাবে বজায় রাখে। অন্য অংশটি পশ্চিমা অর্কেস্ট্রা পদ্ধতি, কর্ডের ব্যবহার এবং বড় দলগত পরিবেশনার দিকে ঝুঁকে পড়ে।

তবে এই দুই বিপরীত ধারার বাইরে সুরকারদের একটি বড় অংশ একটি মধ্যপন্থা বেছে নিয়েছিলেন। তাঁরা পশ্চিমা স্টাফ নোটেশন ব্যবহার করে গান ও সুর লিখে রাখা শুরু করলেও, সুরের মূল মাকাম কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আনেননি। অর্থাৎ, সুর লিখে রাখার প্রযুক্তিটি পশ্চিমা হলেও গানের ভেতরের ভাষা, আবেগ এবং মাইক্রোটোনাল চরিত্রটি খাঁটি প্রাচ্যীয়ই থেকে যায়। এর ফলে একটি মিশ্র সঙ্গীত সংস্কৃতির জন্ম হয়।

এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ফলে অটোমান সঙ্গীত যেমন একদিকে আধুনিক বৈশ্বিক সাঙ্গীতিক লিপির সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়, তেমনি মাকামভিত্তিক নিজস্ব আদি ঐতিহ্যকেও নতুন উপায়ে ধরে রাখতে সক্ষম হয়।

তুর্কি - অটোমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

 

তথ্যসূত্র:

১/ Walter Feldman — Music of the Ottoman Court: Makam, Composition and the Early Ottoman Instrumental Repertoire
অটোমান দরবারি সঙ্গীত, মাকাম, পেশরেভ, সেমাই, তাকসিম, ফাসিল, মেভলভি প্রভাব এবং ১৭–১৮ শতকের court repertoire বোঝার জন্য এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক বই। আপনার লেখার মূল কাঠামোর বড় অংশ এই বইয়ের আলোচনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

২/ Karl L. Signell — The Turkish “Makam” System in Contemporary Theory and Practice
তুর্কি মাকাম তত্ত্ব, স্বরব্যবস্থা, seyir, tonal center, usûl এবং contemporary Turkish art music বোঝার জন্য এটি একটি ক্লাসিক রেফারেন্স বই। Ottoman makam বনাম Indian raga তুলনায়ও এটি খুব কার্যকর।

৩/ Owen Wright — Demetrius Cantemir: The Collection of Notations
অটোমান সঙ্গীতের প্রাচীন নোটেশন, makam progression, composition structure এবং early repertoire বিশ্লেষণে এই বই অত্যন্ত মূল্যবান।

৪/ Rauf Yekta Bey / H. S. Arel / Suphi Ezgi — Turkish Music Theory Works
তুর্কি মাকাম ও ৫৩-comma tuning system বোঝাতে Arel–Ezgi–Uzdilek school-এর বইগুলো অপরিহার্য।

৫/ İsmail Hakkı Özkan — Türk Mûsikîsi Nazariyatı ve Usûlleri
তুর্কি ভাষায় Turkish classical music theory, usûl, composition forms ও makam শেখার জন্য আধুনিক যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বই।

৬/ M. Ekrem Karadeniz — Türk Mûsikîsinin Nazariye ve Esasları
মাকাম, microtonal intervals, melodic contour এবং Ottoman–Turkish classical structure বোঝার জন্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ বই।

৭/ Walter Feldman — From Rumi to the Whirling Dervishes
মেভলভি সুফি সঙ্গীত, সেমা, আধ্যাত্মিক সঙ্গীতচর্চা এবং Ottoman Sufi soundscape বোঝার জন্য অসাধারণ গ্রন্থ।

৮/ Michael Church (ed.) — The Other Classical Musics
ভারতীয় রাগ, আরবি মাকাম, পারস্য দস্তগাহ ও Turkish/Ottoman modal music-এর তুলনামূলক নন্দনতত্ত্বের জন্য দারুণ বই।

আরও দেখুন: