পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (ইরান) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

“অসুরের সুরলোকযাত্রা” সিরিজের আজকের পর্বে আমরা এমন এক সুর-সাম্রাজ্যে প্রবেশ করতে যাচ্ছি, যা তার তীব্র অন্তর্মুখিতা, সূক্ষ্ম কারিগরি এবং ধ্যানমগ্ন মেজাজের জন্য বিশ্বসঙ্গীতে এক অনন্য মর্যাদার অধিকারী। আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়—পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। ইরানে এই ধারাটিকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে ‘মুসিকি-এ আসিল-এ ইরানি’ (খাঁটি ইরানি সঙ্গীত) কিংবা ‘সোন্নতি সঙ্গীত’ (ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত) বলা হয়ে থাকে। এটিকে কেবল ইরানের একটি জাতীয় সঙ্গীত মাধ্যম হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি আসলে সমগ্র পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার মোডাল বা সুর-দর্শনের এক আদি ও প্রধান উৎসভূমি। এই সঙ্গীতের মজবুত ভিতটি গড়ে উঠেছে প্রাচীন পারস্যের রাজকীয় ঐতিহ্য, সাসানীয় দরবারের পরিশীলিত সংস্কৃতি, সুফি আধ্যাত্মিকতা, ধ্রুপদী ফার্সি কবিতা, ইসলামী যুগের দার্শনিক চেতনা এবং শতাব্দীপ্রাচীন ‘উস্তাদ-শাগির্দ’ মৌখিক শিক্ষাপদ্ধতির ওপর ভর করে। এই প্রাচীন ও জীবন্ত ঐতিহ্যের অনন্যতার কারণেই ইউনেস্কো (UNESCO) ইরানের এই ‘রদিফ’ (Radif) ঐতিহ্যকে মানবজাতির অমূল্য অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে।

পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রকৃত সৌন্দর্য কিন্তু কেবল চড়া স্বর বা দ্রুত গতির চমকদার কারিগরির মধ্যে লুকিয়ে নেই। এর আসল শক্তি নিহিত রয়েছে স্বরের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও মায়াবী চলন, মাইক্রোটোন (Microtone), কোয়ার্টার-টোন (Quarter-tone), মেলোডিক মেমোরি এবং তাৎক্ষণিক সুর বিস্তারের (Improvisation) এক ধ্যানমগ্ন গভীরতার মাঝে। আমাদের চেনা পাশ্চাত্য সঙ্গীতে স্কেল বা স্বরগ্রাম যেখানে একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক কাঠামোর মধ্যে স্থির থাকে, পার্সিয়ান সঙ্গীতে সেখানে ‘দস্তগাহ’ (Dastgah) হলো এক চলমান ও জীবন্ত সুর-জগৎ। এটি আসলে এমন এক আবেগীয় পরিবেশ, যেখানে সুর কোনো তাড়াহুড়ো না করে ধীরে ধীরে, অত্যন্ত পরম মমতায় নিজের ভেতরের রহস্যময় রূপটিকে শ্রোতার সামনে উন্মোচন করে।

পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (ইরান)
পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (ইরান)

Table of Contents

প্রাচীন শিকড়: সাসানীয় দরবার থেকে সুরের সূচনা

পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাস মানবসভ্যতার প্রাচীনতম দরবারি সঙ্গীত ঐতিহ্যের অন্যতম এক সাক্ষী। এর সুদূর উৎসটি খুঁজে পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় ৩য় থেকে ৭ম শতকের প্রখ্যাত সাসানীয় সাম্রাজ্যের রাজদরবারে। সেই প্রাচীন যুগে পারস্যে সঙ্গীত কেবল চিত্তবিনোদনের কোনো সস্তা মাধ্যম ছিল না; বরং একে দেখা হতো রাষ্ট্রীয় রুচি, পরিশীলিত সময়বোধ, গভীর আধ্যাত্মিকতা এবং নাগরিক নৈতিক শিক্ষার এক পরম ভাষা হিসেবে।

এই স্বর্ণযুগের সবচেয়ে কিংবদন্তিতুল্য এবং প্রভাবশালী সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব ছিলেন ‘বারবদ’ (Barbad)। পার্সিয়ান সঙ্গীত ঐতিহ্যে তাঁর নাম আজ এক পৌরাণিক ও শ্রদ্ধেয় মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। ঐতিহাসিক ও লোকজ বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি সাসানীয় সম্রাট দ্বিতীয় খসরুর (Khosrow II Parviz) দরবারের প্রধান সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। বারবদের নামকে কেন্দ্র করে সেই আমলে যে সুরতাত্ত্বিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক কল্পনা গড়ে উঠেছিল, তা পরবর্তীকালে পার্সিয়ান সঙ্গীতের মোডাল চিন্তাকে এক অবিশ্বাস্য গভীরতা প্রদান করেছিল।

প্রচলিত ঐতিহাসিক তথ্য ও লোকগাথা মতে, বারবদ প্রকৃতির নিয়ম ও মহাজাগতিক ক্যালেন্ডারের সাথে মিলিয়ে একটি প্রতীকী সুর-কাঠামো নির্মাণ করেছিলেন, যার বিন্যাস ছিল ঠিক এরকম:

  • ৭টি রাজকীয় মোড (Mode): যা ছিল সপ্তাহের সাতটি দিনের প্রতীক।
  • ৩০টি ডে-মোড (Day-mode): যা ছিল একটি মাসের ৩০টি দিনের সুর-রূপ।
  • ৩৬০টি মেলোডিক সাইকেল (Melodic Cycle): যা ছিল বছরের ৩৬০টি দিনের একটি সম্পূর্ণ সুর-মানচিত্র।

এই মহাজাগতিক ও প্রতীকী বিন্যাস থেকে খুব সহজেই অনুধাবন করা যায় যে, প্রাচীন পারস্যে সঙ্গীতকে সময়, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ঋতুচক্র এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আবেগের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত একটি পরম জ্ঞানব্যবস্থা বা বিজ্ঞান হিসেবে দেখা হতো। অর্থাৎ, সুর এখানে শুধু কানকে আরাম দেওয়ার বস্তু নয়; এটি আসলে সময়ের এক গভীর দার্শনিক বিন্যাস।

সাসানীয় যুগ থেকেই পারস্যের সমাজ ও রাষ্ট্রে সঙ্গীত কয়েকটি অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে আসছিল:

১. এটি ছিল রাজদরবারের উচ্চ রুচি ও আভিজাত্যের প্রধান প্রতীক।

২. সাহিত্যচর্চা, কাব্যপাঠ এবং রাজকীয় মহাকাব্য বা বীরগাথা আবৃত্তির অবিকল্প সঙ্গী ছিল এই সুর।

৩. মানুষের আত্মিক ও নৈতিক শিক্ষার এক প্রধান পাঠশালা হিসেবে কাজ করত এই মাধ্যম।

৪. প্রকৃতি, ঋতু বদল এবং মানুষের ভেতরের বিচিত্র আবেগের এক নিখুঁত সুর-মানচিত্র তৈরি করত এটি।

বিশেষ করে ফার্সি কাব্য ও বীরগাথা পাঠে সুরের ভূমিকা ছিল জাদুকরী। কারণ, লিখিত রূপের চেয়ে সুরের আধারে ধরে রাখা স্মৃতি, ইতিহাস ও নৈতিক বোধ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অনেক বেশি সহজে ও জীবন্তভাবে সঞ্চারিত হতে পারত। আজকের আধুনিক পার্সিয়ান মোডাল ঐতিহ্যের সূক্ষ্ম সুরচিন্তার পেছনে বারবদের এই ক্যালেন্ডার-ভিত্তিক প্রতীকী সুর-কল্পনাই এক অমোঘ ঐতিহাসিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, সাসানীয় যুগে পারস্যে সঙ্গীত ছিল সভ্যতার সময়-চেতনা এবং আধ্যাত্মিক স্মৃতির এক মহৎ মহাকাব্য—যার প্রতিধ্বনি আজও প্রতিটি ইরানি শাস্ত্রীয় সুরের গভীরে প্রতিধ্বনিত হয়।

ইসলামী যুগ ও ফার্সি কাব্যের অবিচ্ছেদ্য প্রভাব

ইসলামী যুগের আগমনের পর পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এক সম্পূর্ণ নতুন বৌদ্ধিক, কাব্যিক এবং মরমি আধ্যাত্মিক ভিত্তি লাভ করে। এই ঐতিহাসিক সময়টিতে ফার্সি ভাষা কেবল সাধারণ সাহিত্যের গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র ইসলামী বিশ্বের এক উচ্চ সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ভাষায় রূপান্তরিত হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সঙ্গীতের ওপর। সঙ্গীত তখন কেবল রাজদরবারের সস্তা আমোদ-প্রমোদের সীমা জয় করে গভীর কবিতা, অন্তর্মুখী দর্শন, সুফিবাদ এবং মানুষের ভেতরের তীব্র আধ্যাত্মিক আবেগের এক পরিশীলিত শিল্পভাষা হয়ে ওঠে।

এই অভাবনীয় রূপান্তরের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ধ্রুপদী ফার্সি কবিতা। রুদাকি, ফেরদৌসি, সাদি, হাফেজ এবং জালালুদ্দিন রুমির মতো যুগান্তকারী কবিদের সৃষ্টি পার্সিয়ান সঙ্গীতের লিরিক ঐতিহ্যকে এক অনন্য গভীরতা ও বহুমাত্রিকতা প্রদান করে। তাঁদের কবিতার প্রতিটি শব্দ, ছন্দের দোলাচল, রূপক এবং ভাবের একেকটি সূক্ষ্ম স্তর যখন সুরের সাথে এসে মিশে যায়, তখন তা এমন এক অলৌকিক অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করে যেখানে কবিতা ও সঙ্গীতকে আর আলাদা করা যায় না; তারা একে অপরের পরিপূরক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

এখানে একটি বিষয় খুব ভালো করে বোঝা দরকার—পার্সিয়ান সঙ্গীতে ‘প্রেম’ একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে বারবার ঘুরে আসে। কিন্তু এই প্রেম কখনো কেবল জাগতিক বা মাংসাশী নর-নারীর প্রেম নয়। অধিকাংশ সময়ই তা হয়ে ওঠে ঐশী প্রেম বা ইশকে হাকিকি, পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলনের আকুলতা, কিংবা স্রষ্টা ও সৃষ্টির চিরন্তন বিচ্ছেদের এক মরমী রূপক। এই বহুমাত্রিক প্রেমবোধ পার্সিয়ান সঙ্গীতকে একদিকে যেমন তীব্র আবেগঘন করে তোলে, অন্যদিকে একে দেয় এক অগাধ দার্শনিক ঋদ্ধতা।

ফার্সি কাব্যের কিছু সুনির্দিষ্ট প্রতীক পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সুরের শরীরে বারবার ফিরে আসে, যা না জানলে এই সঙ্গীতের ভেতরে প্রবেশ করা অসম্ভব:

  • ওয়াইন বা মদ (Wine): এটি মোটেও জাগতিক নেশার বস্তু নয়, এটি হলো আধ্যাত্মিক উন্মাদনা বা ঐশী প্রেমের পরমানন্দ (Divine Ecstasy)-র প্রতীক।
  • ট্যাভার্ন বা মদের আসর (Tavern): এটি আসলে সামাজিক ও বাহ্যিক নিয়মের বেড়াজাল ভেঙে আত্মিক মুক্তি খোঁজার এক পবিত্র স্থান।
  • বিলভেড বা প্রিয়তম (Beloved): এটি কখনো মানবপ্রেমিক, আবার কখনো স্বয়ং পরমেশ্বর বা স্রষ্টা।
  • নাইটিঙ্গেল বা বুলবুলি (Nightingale): এটি হলো বিরহে আকুল ও ব্যাকুল প্রেমিক আত্মা।
  • রোজ বা গোলাপ (Rose): এটি পরম সৌন্দর্য, পবিত্র প্রেম এবং ঐশী পূর্ণতার (Divine Perfection) রূপক।

এই গভীর প্রতীকগুলো পার্সিয়ান সঙ্গীতকে কেবল সাধারণ এক বিনোদন থেকে মুক্ত করে একে মরমি, রূপকধর্মী এবং ধ্যানমূলক করে তোলে। ফলে একই সুর বা গান একজন সাধারণ শ্রোতার কাছে বিরহের গান মনে হতে পারে, আবার একজন সুফি সাধকের কাছে তা হয়ে উঠতে পারে গভীর ধ্যানের এক পরম সোপান। এই কারণেই ফার্সি কবিতার নন্দনতত্ত্ব আর সুফি রূপকগুলো না বুঝে পার্সিয়ান সঙ্গীতকে জানা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এখানে সুর অনেক সময় কবিতার বাহ্যিক অর্থকে শুধু বহনই করে না, বরং তাকে ধ্যানের এক গভীর অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করে দেয়।

রদিফ: পারস্যের সাঙ্গীতিক স্মৃতির সংগঠিত ভাণ্ডার

পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসল প্রাণভোমরা বা হৃদয় লুকিয়ে আছে এর ‘রদিফ’ (Radif)-এর মধ্যে। রদিফ হলো আসলে শত শত বছরের পুঞ্জীভূত এক বিশাল মৌখিক সুরভাণ্ডার, যেখানে অসংখ্য ‘গুশেহ’ (Gusheh) একটি নির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল ক্রমে সাজানো থাকে। ইউনেস্কোর স্বীকৃত বিবরণ অনুযায়ী, এই রদিফের ভেতরে ২৫০টিরও বেশি মেলোডিক ইউনিট বা সুরাংশ রয়েছে, যা বিভিন্ন মোডাল সাইকেলের মধ্যে অত্যন্ত চমৎকারভাবে সংগঠিত।

তবে রদিফকে যদি কেউ কেবল কিছু “সুরের তালিকা” বা শুষ্ক স্বরলিপি ভাবেন, তবে তা হবে মস্ত বড় ভুল। এটি আসলে পার্সিয়ান সঙ্গীতের সামগ্রিক স্মৃতি, নন্দনতত্ত্ব এবং মঞ্চে তাৎক্ষণিক সুর নির্মাণের এক অলিখিত ব্যাকরণ। রদিফের ভেতরে একসাথে মিশে থাকে:

১. শতাব্দীর প্রাচীন সুরের যৌথ স্মৃতি।

২. মানুষের বিচিত্র আবেগের এক গাণিতিক ব্যাকরণ।

৩. তাৎক্ষণিক সুর সৃষ্টির (Improvisation) এক সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডার।

৪. উস্তাদ-শাগির্দ পরম্পরার এক পবিত্র মৌখিক উত্তরাধিকার।

সহজ কথায়, এটি এমন একটি সংগঠিত মেলোডিক মেমোরি সিস্টেম, যা একজন শিল্পীকে মঞ্চে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নতুন সুরের ইমারত গড়ার রসদ ও ক্ষমতা যোগায়। একজন শিল্পীকে বহু বছর ধরে অক্লান্ত সাধনা করে এই রদিফ আয়ত্ত করতে হয়। ইউনেস্কোর তথ্যমতে, এই দীক্ষা ও শিক্ষাপ্রক্রিয়া সাধারণত এক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে অলিখিতভাবে চলে। এই দীর্ঘ ও কঠোর সাধনার মূল উদ্দেশ্য কেবল তোতাপাখির মতো সুর মুখস্থ করা নয়; বরং প্রতিটি গুশেহর ভেতরের আসল আবেগ, বাক্যাংশের নিজস্ব যুক্তি (Phrase Logic), এক স্কেল থেকে অন্য স্কেলে যাওয়ার পথ (Modulation Pathway) এবং কাব্যের ভেতরের অনুরণনটিকে নিজের রক্তের সাথে মিশিয়ে নেওয়া।

এর ফলে ঘটে এক চমৎকার জাদু। মঞ্চে পারফর্ম করার সময় যখন একজন শিল্পী ‘আভাঝ’ (আভাঝ- তালহীন তাৎক্ষণিক সুর বিস্তার) করেন, তখন তিনি ঘরে বসে মুখস্থ করা কোনো সুর হুবহু গেয়ে যান না। তিনি আসলে তাঁর রদিফের সেই সমৃদ্ধ স্মৃতিভাণ্ডার থেকে মুহূর্তের মধ্যে সম্পূর্ণ নতুন ও জাদুকরী সুরের পথ তৈরি করেন। এটাই হলো পার্সিয়ান সঙ্গীতের আসল সৃজনশীলতার রহস্য।

আমাদের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সাথে তুলনা করলে এই রদিফকে অনেকটা রাগের পাকড়, চালন, বন্দিশ এবং ঘরানাভিত্তিক সাঙ্গীতিক স্মৃতির সম্মিলিত রূপের মতো মনে হতে পারে। তবে একটি মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো—রদিফ অনেক বেশি মোতিফ-ক্লাস্টার ভিত্তিক। অর্থাৎ, এখানে ছোট ছোট সুরাংশ বা ফ্রেইজ সেল এবং মেলোডিক কর্নার (গুশেহ)-এর সুসংগঠিত ভাণ্ডার থেকেই পুরো পরিবেশনার বিশাল ক্যানভাসটি ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে। এই অর্থে রদিফ হলো পার্সিয়ান সঙ্গীতের এক জীবন্ত ঐতিহাসিক আর্কাইভ, যেখানে সুর কেবল কিছু ফ্রিকোয়েন্সি নয়, বরং সাধনা ও ঐতিহ্যের এক পরম উত্তরাধিকার।

দস্তগাহ: পার্সিয়ান সুর-মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু

পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূল মোডাল ফ্রেমওয়ার্ক বা সুর-কাঠামোর নাম হলো ‘দস্তগাহ’ (Dastgah)। এটিকে কেবল একটি সাধারণ স্কেল, ঠাট বা স্বরবিন্যাস ভাবলে এর গভীরতা পরিমাপ করা যাবে না। দস্তগাহ হলো আসলে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন সুর-জগৎ, যেখানে স্বর, আবেগ, বাক্যাংশের গঠন (Phrase Architecture), গুশেহর বিন্যাস, মড্যুলেশন এবং সুরের অবসানের ধরণ—সবকিছু একটি নির্দিষ্ট ও কঠোর নান্দনিক শৃঙ্খলার মধ্যে সুসংগঠিত থাকে।

আধুনিক পার্সিয়ান সঙ্গীততত্ত্বে মূলত ৭টি প্রধান দস্তগাহ স্বীকৃত। এর পাশাপাশি কিছু ‘আভাঝ’ (Āvāz) বা উপ-ধারা রয়েছে, যেগুলো মূল দস্তগাহেরই শাখা বা প্রশাখা হিসেবে ঐতিহাসিক কাল থেকে বিকশিত হয়েছে। এই প্রধান ৭টি দস্তগাহ হলো:

১. শুর (Shur)

২. মাহুর (Mahur)

৩. হোমায়ুন (Homayoun)

৪. সেগাহ (Segah)

৫. চাহারগাহ (Chahargah)

৬. রাস্ত পাঞ্জগাহ (Rast Panjgah)

৭. নাভা (Nava)

প্রতিটি দস্তগাহের নিজস্ব কিছু অপরিহার্য ও অলঙ্ঘনীয় বৈশিষ্ট্য থাকে, যা তাকে অন্যগুলোর থেকে আলাদা করে:

  • তার একটি সুনির্দিষ্ট ও নিজস্ব স্বরপরিসর থাকে।
  • তাতে থাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রেস্টিং নোট (Resting Note) বা শায়েস্তে স্বর, যেখানে সুর এসে জিরিয়ে নেয়।
  • তার থাকে একটি সুনির্দিষ্ট আবেগগত চরিত্র (যেমন কোনোটি বীরত্বের, কোনোটি পরম করুণ রসের)।
  • তার থাকে নিজস্ব মড্যুলেশন পাথওয়ে এবং নির্দিষ্ট গুশেহর ক্লাস্টার।

সহজ কথায়, দস্তগাহ হলো এমন এক মোডাল ইকোসিস্টেম বা সাঙ্গীতিক ভূগোল, যেখানে শিল্পী একটি নির্দিষ্ট সুর-বলয়ে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে এক গুশেহ থেকে আরেক গুশেহতে পরিভ্রমণ করেন। তিনি কখনো সুরের মূল কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে চলে যান, আবার ‘ফরুদ’ (Forud)-এর জাদুকরী পথ ধরে পরম শান্তিতে তাঁর মূল সুরভূমিতে ফিরে আসেন।

শুর (Shur): দস্তগাহের জননী

এই সাতটি প্রধান দস্তগাহের মধ্যে ‘শুর’ (Shur)-কে পার্সিয়ান সঙ্গীতের ইতিহাসে “সব দস্তগাহের জননী” (Mother of all Dastgah) বলা হয়ে থাকে। এর প্রধান কারণ হলো, এই শুরের গর্ভ থেকেই পার্সিয়ান সঙ্গীতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও বিখ্যাত ‘আভাঝ’ বা উপ-শাখার জন্ম হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—আবু আতা (Abu Ata), বায়াত-এ তোর্ক (Bayat-e Tork), আফশারি (Afshari) এবং দাশতি (Dashti)। শুরের ভেতরের আবেগ সাধারণত অত্যন্ত গভীর, খাঁটি মানবিক, অন্তর্মুখী এবং চিন্তাশীল হয়। এটি পার্সিয়ান সঙ্গীতের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত ও হৃদয়ের কাছের মোডাল ক্ষেত্রগুলোর একটি।

ভারতীয় রাগের সাথে এর তাত্ত্বিক তুলনা

আমাদের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সাথে যদি আমরা তুলনা করি, তবে দস্তগাহকে অনেকটা ঠাট, রাগচালন এবং ঘরানাভিত্তিক ফ্রেইজ মেমোরির এক চমৎকার সম্মিলিত রূপ বলা চলে। তবে সূক্ষ্ম পার্থক্যটি হলো, দস্তগাহের ভেতরে গুশেহ ক্লাস্টারের ধারাবাহিক স্মৃতি এবং এক সুর থেকে অন্য সুরে যাওয়ার পথটি অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক ও সুনির্দিষ্টভাবে ফর্মাল। অর্থাৎ, এটি কেবল “কোন রাগে কোন স্বর লাগছে” সেই সাধারণ হিসাব নয়; বরং সুর কোন সুনির্দিষ্ট পথ ধরে হাঁটবে, কোথায় গিয়ে একটু থামবে, কীভাবে আবেগের মোড় পরিবর্তন করবে এবং শেষ পর্যন্ত কোন পথ দিয়ে ঘরে ফিরে আসবে—এই সম্পূর্ণ সুরযাত্রার সামগ্রিক নকশাটিই হলো দস্তগাহ। এক কথায়, দস্তগাহ হলো পার্সিয়ান সঙ্গীতের আবেগ ও সুর-পরিভ্রমণের এক কেন্দ্রীয় মহাবিশ্ব।

পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (ইরান)
পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (ইরান)

স্বরব্যবস্থা: কোয়ার্টার-টোন ও মাইক্রোটোনালের সূক্ষ্ম কারিগরি

পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে অনন্য, সূক্ষ্ম এবং নান্দনিক বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর মাইক্রোটোনাল (Microtonal) স্বরব্যবস্থা। আমাদের চেনা পাশ্চাত্য সঙ্গীত বা আধুনিক পপ মিউজিক যেখানে মূলত হোল-টোন (Whole tone) এবং সেমিটোন (Semitone)-এর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, পার্সিয়ান সঙ্গীতে সেখানে দুটি স্বরের মাঝামাঝি আরও কিছু অত্যন্ত সূক্ষ্ম ধাপ বা ব্যবধান ব্যবহৃত হয়। এই সূক্ষ্ম স্বরপ্রয়োগই পার্সিয়ান সুরকে এক বিশেষ ধরণের কোমলতা, ধ্যানমগ্নতা এবং তীব্র আবেগের গভীরতা দান করে।

এই মাইক্রোটোনাল স্বরচিন্তার একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অ্যাক্সিডেন্টাল (Accidental) বা স্বরচিহ্ন:

  • করোন (Koron): এই চিহ্নটি কোনো স্বরের সাথে যুক্ত হলে সেই স্বরটিকে স্বাভাবিক পিচ থেকে এক কোয়ার্টার-টোন নিচু বা হাফ-ফ্ল্যাট (Half-flat) করে দেয়।
  • সোরি (Sori): এই চিহ্নটি কোনো স্বরের সাথে যুক্ত হলে তাকে এক কোয়ার্টার-টোন উঁচু বা হাফ-শার্প (Half-sharp) করে তোলে।

সহজ কথায়, পশ্চিমা ফ্ল্যাট বা শার্প চিহ্নের মতোই এগুলো স্বরের উচ্চতা পরিবর্তন করে, কিন্তু এই পরিবর্তনের মাত্রাটা হয় অনেক বেশি সূক্ষ্ম। এই অতি সূক্ষ্ম ইন্টারভ্যাল বা স্বর-দূরত্বের কারণেই পার্সিয়ান সঙ্গীতের সুররেখা কখনো গভীর বিষণ্ণ, কখনো অপার্থিব কোমল, আবার কখনো এক রহস্যময় অন্তর্মুখী রূপ ধারণ করে শ্রোতার মনে আঘাত করে।

আলি-নাকি ভাজিরি এবং আধুনিক স্বর-সংস্কার

২০ শতকের প্রথম ভাগে কিংবদন্তি ইরানি সঙ্গীতজ্ঞ ও তাত্ত্বিক ‘আলি-নাকি ভাজিরি’ (Ali-Naqi Vaziri) পার্সিয়ান সঙ্গীতের এই প্রাচীন স্বরচিহ্নগুলোকে আধুনিক রূপ দেন। তিনি পশ্চিমা স্টাফ নোটেশনের (Staff Notation) সাথে সামঞ্জস্য রেখে ‘করোন’ এবং ‘সোরি’কে লিখিত নোটেশনে সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ভাজিরির এই তত্ত্বের হাত ধরেই এক অক্টেভ বা সপ্তককে ২৪টি কোয়ার্টার-টোনে বিভক্ত করার আধুনিক ধারণাটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, যা পরবর্তীকালে ইরানি সঙ্গীততত্ত্বে এক বিশাল বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক গবেষণার দ্বার খুলে দিয়েছিল।

এই সূক্ষ্মতার আবেগগত গভীরতা

পার্সিয়ান সঙ্গীতে এই মাইক্রোটোন কেবল কোনো শুষ্ক গণিত নয়; এটিই হলো এই সুরের মূল আবেগ। আপনি যদি একই সুরের ফ্রেইজ বা বাক্যাংশ সাধারণ সেমিটোনে বাজান, আর সেটিই যদি করোন বা সোরি ব্যবহার করে নিখুঁত মাইক্রোটোনে বাজান—তবে শ্রোতার মনের ভেতর তৈরি হওয়া অনুভূতিতে আকাশ-পাতাল পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠবে। পার্সিয়ান সঙ্গীতের মূল দর্শনই হলো “কম স্বরে বেশি আবেগ” প্রকাশ করা। আর এই দর্শনের পেছনে মূল হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে এই কোয়ার্টার-টোনের জাদুকরী ব্যবহার।

পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (ইরান)
পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (ইরান)

অন্যান্য এশীয় মোডাল ঐতিহ্যের সাথে তাত্ত্বিক তুলনা

পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এই মাইক্রোটোনাল স্বরচিন্তা কিন্তু পৃথিবীর বুকে সম্পূর্ণ একা বা বিচ্ছিন্নভাবে বিকশিত হয়নি। এটি বৃহত্তর এশীয় মোডাল ঐতিহ্যের (Modal Tradition) সাথে এক গভীর ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক আত্মীয়তায় যুক্ত। তবে ভারতীয়, আরবি এবং অটোমান সুরব্যবস্থার সাথে এর গভীর তুলনা করলেই পার্সিয়ান সঙ্গীতের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও আভিজাত্য সবচেয়ে সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে:

১. ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ‘শ্রুতি’ বনাম পার্সিয়ান মাইক্রোটোন

আমাদের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ‘শ্রুতি’র ধারণাটি যেমন স্বরের সূক্ষ্মতম নান্দনিক পার্থক্য বা বিভাজনকে বোঝায়, পার্সিয়ান সঙ্গীতেও ‘করোন’ ও ‘সোরি’র মাধ্যমে ঠিক অনুরূপ সূক্ষ্ম স্বরবিভাজন দেখা যায়। তবে মৌলিক পার্থক্য হলো—ভারতীয় সঙ্গীতে এই সূক্ষ্মতা সাধারণত রাগের স্বরপ্রয়োগের ধরণ, বিশেষ ধরণের গমক, মীড় এবং ঘরানাভিত্তিক আঙ্গিকের ওপর নির্ভর করে শিল্পীর গায়কিতে ফুটে ওঠে। অন্যদিকে, পার্সিয়ান সঙ্গীতে এই মাইক্রোটোনাল চলনটি ‘রদিফ’-এর ভেতরে গুশেহ-ভিত্তিক ফ্রেইজ মেমোরির অংশ হিসেবে অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক ও সুসংগঠিত।

২. আরবি ‘মাকাম’ (Maqam) বনাম পার্সিয়ান স্বরব্যবস্থা

আরবি মাকাম ঐতিহ্যে কোয়ার্টার-টোন এবং অন্যান্য মাইক্রো-ইন্টারভ্যাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং পার্সিয়ান সঙ্গীতের সাথে এর ঐতিহাসিক আদান-প্রদানও সুগভীর। তবে আরবি মাকাম ব্যবস্থায় আঞ্চলিক বৈচিত্র্য (Regional Variation) অনেক বেশি প্রকট। ফলে একই নামের মাকাম মিশর, সিরিয়া বা ইরাকে কিছুটা ভিন্নভাবে শোনায়। কিন্তু পার্সিয়ান ধারায় রদিফ-ভিত্তিক ঐতিহ্য এতটাই শক্তিশালী যে এর ক্যানোনিকাল মেমোরি সুরের মূল কাঠামোকে সব অঞ্চলে অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট ও ধরে ধরে বজায় রাখে।

৩. অটোমান ‘মাকাম’ (Makam) বনাম পার্সিয়ান ধারা

তুর্কি বা অটোমান মাকাম ঐতিহ্যে গাণিতিক নিখুঁততার জন্য এক অক্টেভ বা সপ্তককে ৫৩টি ‘কমা’ (Comma)-তে বিশ্লেষণ করা হয়, যা মাইক্রো-ইন্টারভ্যালকে এক চরম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। পার্সিয়ান সঙ্গীতে এমন গণিত-ভিত্তিক কঠোর উপ-বিভাজন তুলনামূলকভাবে কম, কিন্তু এখানে কান দিয়ে শুনে অনুধাবন করার মতো ফ্রেইজ নুয়ান্স বা স্বরের সূক্ষ্ম মোচড় অনেক বেশি প্রাধান্য পায়।

পার্সিয়ান ধারার নিজস্ব অনন্যতা

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পার্সিয়ান সঙ্গীতে মাইক্রোটোন কেবল একটি পিচ ভ্যালু বা কম্পাঙ্ক নয়। এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে সুরের বাঁক, গুশেহর স্মৃতি, দস্তগাহের মূল চরিত্র এবং সুরের শেষে ‘ফরুদ’-এর মাধ্যমে মূল ঘরে ফিরে আসার এক পরম তৃপ্তির সাথে। সামান্য একটু করোন বা সোরির পরিবর্তনে এখানে শুধু সুরের উচ্চতা বদলায় না, বরং মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় পুরো সুরের আবেগ এবং শ্রোতার মানসিক অবস্থা। এখানেই পার্সিয়ান ধারাটি অন্যান্য এশীয় ঐতিহ্যের পরম আত্মীয় হয়েও সম্পূর্ণ নিজস্বতায় ভাস্বর।

পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (ইরান)
পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (ইরান)

পার্সিয়ান নন্দনতত্ত্ব: ‘হাল’, ধ্যান ও অন্তর্মুখিতার দর্শন

পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সামগ্রিক নান্দনিকতা মূলত অন্তর্মুখী (Inward-looking)। এখানে সঙ্গীতের মূল উদ্দেশ্য কিন্তু বাহ্যিক কোনো চটকদার কারিগরি প্রদর্শন বা মঞ্চ কাঁপানো কোনো ভার্চুওসিক ব্রিলিয়ান্স (Virtuosic brilliance) দেখানো নয়। এর আসল উদ্দেশ্য হলো শ্রোতা এবং শিল্পী—উভয়ের মনের ভেতরে এক পরম সূক্ষ্ম মানসিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থার জন্ম দেওয়া।

এই নন্দনতত্ত্বের একদম কেন্দ্রবিন্দুতে যে শব্দটি রয়েছে, তা হলো—“হাল” (ḥāl)। হাল হলো আসলে সুর, কবিতা এবং পরিবেশনার সুগভীর মেলবন্ধনে তৈরি হওয়া এক মরমী আধ্যাত্মিক ও আবেগীয় অবস্থা, যা পারফর্ম্যান্সের সময় ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়। এই হাল কোনো স্থির বা জড় অনুভূতি নয়; এটি একটি চলমান স্বর্গীয় অনুভূতি, যেখানে মানুষের মন সুরের ভেলায় চড়ে এক স্তর থেকে অন্য এক উচ্চ স্তরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

পার্সিয়ান সঙ্গীতের প্রধান নান্দনিক লক্ষ্যগুলো মূলত:

  • শ্রোতার মনের ভেতরে এক বিশেষ শান্ত ও আধ্যাত্মিক অবস্থা নির্মাণ করা।
  • মানুষকে বাহ্যিক কোলাহল থেকে মুক্ত করে অন্তর্মুখী চিন্তার (Inward reflection) সুযোগ দেওয়া।
  • এক গভীর ধ্যানমগ্ন স্থিরতা (Contemplative stillness) তৈরি করা।
  • ফার্সি কবিতার মরমি ভাবকে সুরের অনুরণনে ফুটিয়ে তোলা।
  • সময়ের হিসাব ভুলিয়ে শ্রোতাকে এক অপার্থিব শূন্যতায় ভাসিয়ে রাখা।

এই বিশেষ দর্শনের কারণেই পার্সিয়ান সঙ্গীত অনেক সময় খুব ধীর, প্রসারিত এবং ধ্যানসুলভ মনে হয়। এখানে দ্রুত তান বা জটিল মারপ্যাঁচ দিয়ে শ্রোতাকে চমকে দেওয়া অপরাধের শামিল; বরং খুব অল্প সুরের নিখুঁত প্রয়োগে মানুষের বুকের ভেতর তীব্র আবেগ ও হাহাকার সৃষ্টি করাই এখানে মুখ্য। একটি ছোট বাক্যাংশ, সামান্য একটু মাইক্রোটোনাল মোচড় কিংবা একটি দীর্ঘায়িত কোমল স্বর—এই সামান্য উপাদান দিয়েই একজন খাঁটি উস্তাদ শ্রোতার চোখের কোণে জল এনে দিতে পারেন। এখানে সুরের মতোই সমান অর্থবহ হলো ‘নীরবতা’ (Silence)। সুর বাজাতে বাজাতে কখন ঠিক থামতে হবে, সেই নীরবতার স্পেসটুকুই সুরের আবেদনকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (ইরান)
পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (ইরান)

প্রধান বাদ্যযন্ত্রসমূহ: সুর-মহাবিশ্বের কণ্ঠস্বর

পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভেতরের আসল রূপটি বুঝতে হলে এর ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রগুলোর ভাষা জানা অত্যন্ত জরুরি। এখানে প্রতিটি যন্ত্র কেবল কাঠ আর তারের তৈরি কোনো সাধারণ বস্তু নয়; এদের প্রত্যেকের নিজস্ব একটি আধ্যাত্মিক কণ্ঠস্বর রয়েছে, যা দস্তগাহ ও গুশেহর সূক্ষ্মতা প্রকাশে একক ভূমিকা পালন করে। সমবেত পরিবেশনায় (Ensemble) তারা যখন একসাথে কথা বলে, তখন তৈরি হয় এক স্বর্গীয় আবহ। প্রধান বাদ্যযন্ত্রগুলোর পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:

১. তার (Tar)

‘তার’ হলো পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্যতম প্রধান এবং দীর্ঘ গ্রীবা বিশিষ্ট এক অনন্য লুট (Lute) জাতীয় তারবাদ্য। এর সাউন্ড-বক্সটি দেখতে অনেকটা ডাবল-হার্ট বা দুটি হৃদপিণ্ড জোড়া লাগালে যেমন হয়, ঠিক তেমন। এর থেকে নিঃসৃত ধ্বনি অত্যন্ত উজ্জ্বল, গভীর এবং তীব্র আবেগ প্রকাশে সক্ষম। দস্তগাহ-ভিত্তিক বাক্যাংশের জটিল কাঠামো এবং গুশেহর স্মৃতি প্রকাশে এই যন্ত্রটির কোনো বিকল্প নেই।

২. সেতার (Setar)

ফার্সি শব্দ ‘সেতার’-এর আক্ষরিক অর্থ “তিন তার”, তবে আধুনিক সেতারে সাধারণত চারটি তার ব্যবহৃত হয়। এটি অত্যন্ত কোমল, নরম এবং গভীর অন্তর্মুখী ধ্বনি উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। এটি মূলত রাজকীয় আসরের চড়া সুরের জন্য নয়, বরং নিভৃত ঘরের ধ্যানমগ্ন একক ‘আভাঝ’ পরিবেশনার জন্য এক পরম সঙ্গী। পার্সিয়ান নন্দনতত্ত্বের অন্তর্মুখী চিন্তার সাথে এই যন্ত্রের সম্পর্ক সবচেয়ে নিবিড়।

৩. সন্তুর (Santur)

‘সন্তুর’ হলো একটি ট্রাপিজিয়াম আকৃতির হ্যামারড জিদার (Hammered zither) জাতীয় তারবাদ্য, যা দুটি অত্যন্ত হালকা ও সূক্ষ্ম কাঠের ম্যালট বা মেজরাব দিয়ে আঘাত করে বাজানো হয়। সন্তুরের ঝংকারময় ও ক্রিস্টালাইন টোন পার্সিয়ান সঙ্গীতকে এক বিশেষ স্বচ্ছতা, মায়াবী রূপ এবং স্বপ্নময় আবহে ভরিয়ে দেয়। দ্রুত সুরের পুনরাবৃত্তি ও প্রতিধ্বনির জন্য এটি বিশেষভাবে সমাদৃত।

৪. কামানচেহ (Kamancheh)

‘কামানচেহ’ হলো পারস্যের ঐতিহ্যবাহী বাউড স্পাইক ফিডল (Bowed spike fiddle), যা দেখতে এবং বাজানোর ভঙ্গিতে অনেকটা আমাদের সারিন্দার মতো। এই যন্ত্রটির সুর মানুষের জীবন্ত কণ্ঠস্বরের মতোই তীব্র ভাবপ্রকাশক। তারের ওপর ছড় বা ধনুকের সামান্য ঘর্ষণে দীর্ঘ সুর টেনে রাখা কিংবা মাইক্রোটোনাল ইন্টারভ্যালের সূক্ষ্ম স্লাইড তৈরিতে কামানচেহ এক কথায় অসাধারণ। একে পার্সিয়ান কণ্ঠসঙ্গীতের সবচেয়ে কাছের বাদ্যযন্ত্র মনে করা হয়।

৫. নেয় (Ney)

‘নেয়’ হলো ফাঁপা নলখাগড়া দিয়ে তৈরি এক আদিম ও মরমী বাঁশি। সুফি ঐতিহ্যে এবং মাওলানা রুমির দর্শনে এই ‘নেয়’-এর স্থান সবার ওপরে। একে মনে করা হয় পরমাত্মা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানুষের ব্যাকুল আত্মার কান্নার প্রতীক। এর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা দীর্ঘ শ্বাসভিত্তিক ফুঁ পার্সিয়ান সঙ্গীতের ধ্যানমগ্ন স্থিরতাকে এক অপার্থিব ও অলৌকিক উচ্চতায় নিয়ে যায়।

৬. তোমবাক / জরব (Tombak / Zarb)

‘তোমবাক’ বা ‘জরব’ হলো পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রধান কাঠ দিয়ে তৈরি একমুখী চামড়ার তালবাদ্য। এর মাধ্যমে সুরের ভেতরে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ছন্দময় অভিব্যক্তি এবং গতির ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এটি ভারতীয় তবলার মতো কেবল স্রেফ ‘বিট’ বা ঠেকা ধরে রাখে না; বরং মূল মেলোডিক লাইনের সাথে এক চমৎকার সাঙ্গীতিক সংলাপে অংশ নেয়।

৭. দাফ (Daf)

‘দাফ’ হলো একটি সুবিশাল ফ্রেম ড্রাম (Frame drum), যার ভেতরের পরিধিতে অসংখ্য ছোট ছোট ধাতব রিং বা চেইন লাগানো থাকে। এটি বিশেষ করে সুফি খানকাহ এবং আধ্যাত্মিক ধিকিরের পরিবেশনায় ব্যবহৃত হয়। এর গম্ভীর চক্রাকার ছন্দ এবং রিংগুলোর সম্মিলিত ঝনঝনানি শ্রোতা ও শিল্পীর মনের ভেতর এক ধরণের ট্রান্স (Trance-like) বা আধ্যাত্মিক আচ্ছন্নতার সৃষ্টি করে।

সম্মিলিত সুরভাষার জাদু: হেটেরোফোনিক টেক্সচার

পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সমবেত দলগত পরিবেশনায় সব শিল্পীই মূলত একই মোডাল ভাষা বা দস্তগাহের ভেতরে অবস্থান করেন। কিন্তু পশ্চিমা অর্কেস্ট্রার মতো এখানে সবাই হুবহু একই নোট একসাথে বাজান না। এখানে প্রত্যেকের নিজস্ব অলঙ্কার (Ornament), বাক্যাংশের নিজস্ব চলন এবং মাইক্রোটোনাল শেডিং আলাদা হয়। এর ফলে সুরের জগতে এক চমৎকার ‘হেটেরোফোনিক টেক্সচার’ (Heterophonic Texture) তৈরি হয়—যেখানে একই সুরের মূল নদীর ভেতরে বহু বাদকের হাতের স্পর্শে অসংখ্য ছোট ছোট রঙের ঢেউ খেলা করে। এটাই হলো পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সমবেত রূপের পরম সৌন্দর্য।

 

 

পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (ইরান)
পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (ইরান)

 

 

পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কেবল এক নিটোল সুরের বিন্যাস নয়; এটি হলো মানুষের ভেতরের আত্মিক তৃষ্ণা, হাজার বছরের সভ্যতার স্মৃতি এবং মহাজাগতিক সময়ের সাথে সুর মেলাবার এক পরম সাধনা। সাসানীয় রাজদরবারের সেই গৌরবময় বারবদের যুগ থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক রদিফের যুগ পর্যন্ত—এই ধারাটি প্রমাণ করেছে যে সুরের ভাষা কতটা গভীর, মরমি এবং চিরন্তন হতে পারে। কোনো বাহ্যিক আড়ম্বর ছাড়াই, স্রেফ কয়েকটি সূক্ষ্ম স্বরের টানে এই সঙ্গীত মানুষের আত্মাকে পরমেশ্বরের সাথে এক সুতোয় বেঁধে রাখার ক্ষমতা রাখে।

উৎস (Sources) :

এই সমাপনী অংশের সমস্ত ঐতিহাসিক, গাণিতিক ও সাঙ্গীতিক তথ্যসমূহ তেহরান ইউনিভার্সিটি অফ ফাইন আর্টস (মিউজিক ডিপার্টমেন্ট), ইউনেস্কো ইন্ট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ আর্কাইভস, ডক্টর দরিউশ সাফাভেতের পার্সিয়ান মিউজিকোলজি নোটস।

সূত্র:

পার্সিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এই গভীর ও তাত্ত্বিক আলোচনার পেছনে বিশ্বখ্যাত মিউজিকোলজিস্টদের গবেষণা এবং প্রাতিষ্ঠানিক আর্কাইভের প্রধান রেফারেন্স বা উৎসগুলো নিচে দেওয়া হলো। আপনার ব্লগে বা লেখার শেষে গ্রন্থপঞ্জি (Bibliography) বা তথ্যসূত্র হিসেবে এগুলো ব্যবহার করতে পারবেন:

১. প্রাতিষ্ঠানিক ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

  • তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় আর্কাইভ
  • UNESCO Intangible Cultural Heritage (2009): “Radif of Iranian music”.
  • During, Jean & Mirabdolbaghi, Zia (1991): The Art of Persian Music. Mage Publishers.
  • Farhat, Hormoz (1990): The Dastgah Concept in Persian Music. Cambridge University Press.
  • Nettl, Bruno (1987): The Radif of Persian Music: Studies of Structure and Cultural Context in the Classical Music of Iran. Elephant & Cat.
  • Zonis, Ella (1973): Classical Persian Music: An Introduction. Harvard University Press.

আরও দেখুন: