ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে একটি প্রচলিত উক্তি আছে—“তাল পিতা, সুর সঙ্গীতের মাতা।” অর্থাৎ সুর যেমন সংগীতকে প্রাণ দেয়, তেমনি তাল তাকে শৃঙ্খলা ও কাঠামো প্রদান করে। আর তালের মূল ভিত্তি হলো লয় বা গতি। তবে তালের জটিল তত্ত্ব জানা গান উপভোগ করার জন্য আবশ্যক নয়; কিন্তু সংগীতের গভীরতা বুঝতে আগ্রহ থাকলে এই বিষয়গুলো জানা অত্যন্ত সহায়ক। তালের জাতি সম্পর্কে জানা গান শোনার জন্য জরুরী নয়। আপনার আগ্রহ হলে পড়তে পারেন।

তাল, ঠেকা, লয়
তাল কী
তাল হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত ও নৃত্যের একটি মৌলিক ছন্দব্যবস্থা। এটি মূলত সংগীতের সময়কে নিয়মিত ও পরিমিত ভাগে বিভক্ত করে এবং ছন্দের বিভিন্ন অংশের গুরুত্ব বা লঘুত্ব নির্ধারণ করে। সহজভাবে বলা যায়, তাল হলো সংগীতের সময়বিন্যাসের নিয়মতান্ত্রিক কাঠামো, যার মাধ্যমে সুর ও ছন্দ একটি নির্দিষ্ট গতিতে অগ্রসর হয়।
লয়
সংগীতের গতিকে বলা হয় লয়। সুর কত দ্রুত বা ধীর গতিতে পরিবেশিত হচ্ছে, তা লয়ের ওপর নির্ভর করে। সাধারণভাবে লয়কে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়—
১. বিলম্বিত লয় – ধীর গতির সংগীত।
২. মধ্য লয় – মাঝারি গতির সংগীত।
৩. দ্রুত লয় – দ্রুত গতির সংগীত।
মধ্য লয়ের গতি সাধারণত বিলম্বিত লয়ের দ্বিগুণ এবং দ্রুত লয়ের অর্ধেকের সমান বলে বিবেচিত হয়। যদিও অনেক বিশেষজ্ঞের মতে লয়ের সূক্ষ্ম বিভাজন আরও বিস্তৃত হতে পারে—যেমন আড়, কুয়াড়, বিযাড় ইত্যাদি—যেগুলো মূলত মাত্রার ভগ্নাংশের ওপর ভিত্তি করে গঠিত।
মাত্রা
সঙ্গীতের গতি বা লয় পরিমাপ করার জন্য যে ক্ষুদ্রতম একক ব্যবহার করা হয় তাকে মাত্রা বলা হয়। প্রত্যেকটি মাত্রার মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান সমান থাকে। কয়েকটি ছন্দোবদ্ধ মাত্রা মিলেই গঠিত হয় একটি তাল।
অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট সময়কে সমান ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে ছন্দবদ্ধভাবে সাজিয়ে তালবাদ্যের মাধ্যমে পুনরাবৃত্তি ঘটানোই হলো তাল ব্যবস্থার মূল ধারণা।

তাল ও প্রকৃতির ছন্দ
প্রকৃতির দিকে তাকালেই দেখা যায়—সবকিছুই একটি নির্দিষ্ট ছন্দে চলছে। দিন-রাত্রির পরিবর্তন, ঋতুচক্র, হৃদস্পন্দন—সবকিছুই যেন এক অদৃশ্য তালের নিয়ম মেনে চলছে। এই কারণেই ছন্দ বা তাল আমাদের কাছে স্বাভাবিক ও আনন্দদায়ক বলে মনে হয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা যখন ট্রেনে যাত্রা করি তখন তার একটানা ছন্দময় শব্দের মধ্যেও অনেক সময় ঘুমিয়ে পড়ি। কারণ তার চলার গতি একটি নির্দিষ্ট ছন্দে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু হঠাৎ ব্রেক কষলে আমরা চমকে উঠি—কারণ তখন সেই ছন্দের ভাঙন ঘটে। সংগীতেও ঠিক একইভাবে তালই সংগীতের প্রাণ, এবং এর বিচ্যুতি শ্রোতার কাছে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।
তালের বিভাগ, সম ও খালি
একটি তালের মোট মাত্রাগুলোকে কয়েকটি ছোট বা বড় বিভাগে ভাগ করা হয়। এই বিভাগগুলো দুই বা ততোধিক মাত্রা নিয়ে গঠিত হতে পারে।
- তালের প্রথম বিভাগের প্রথম মাত্রাকে বলা হয় সম।
- সমকে বোঝাতে সাধারণত + বা X চিহ্ন ব্যবহার করা হয় এবং পরিবেশনের সময় এটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কোনো কোনো বিভাগের প্রথম মাত্রাকে বলা হয় খালি বা ফাঁক, যা ০ চিহ্ন দিয়ে বোঝানো হয়। খালির সময় হাতে তালি না দিয়ে হাত নেড়ে ইঙ্গিত করা হয়।
তালের যেসব বিভাগের প্রথম মাত্রায় তালি দিয়ে শব্দ করা হয়, সেগুলোকে তালি বা ভরী বলা হয়। অর্থাৎ খালি ছাড়া বাকি সব বিভাগের প্রথম মাত্রায় তালি দেওয়া হয়।
আবর্তন
তালের প্রথম মাত্রা থেকে শেষ মাত্রা পর্যন্ত সম্পূর্ণ একবার বাজিয়ে আবার প্রথম মাত্রায় ফিরে আসাকে বলা হয় আবর্তন। সংগীত পরিবেশনে এই আবর্তনের ধারাবাহিক পুনরাবৃত্তির মধ্য দিয়েই তাল চলতে থাকে।
সমপদী ও বিসমপদী তাল
তালের পদবিভাগের গঠন অনুসারে তালকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা হয়।
সমপদী তাল
যে সব তালের বিভাগ সমান সংখ্যক মাত্রা নিয়ে গঠিত, সেগুলোকে সমপদী তাল বলা হয়।
উদাহরণস্বরূপ দাদরা তাল (৬ মাত্রা) –
ধা ধি না | না তি না
এখানে তিন + তিন করে সমানভাবে মাত্রা বিভাজন করা হয়েছে।
কাহারবা, ত্রিতাল, চৌতাল ইত্যাদিও সমপদী তালের উদাহরণ।
বিসমপদী তাল
যে সব তালের বিভাগ অসমান সংখ্যক মাত্রা দিয়ে গঠিত, সেগুলোকে বিসমপদী তাল বলা হয়।
উদাহরণস্বরূপ তেওড়া তাল (৭ মাত্রা) –
ধা ধি না | ধি না | ধি না
এখানে তিন + দুই + দুই করে অসমান বিভাজন করা হয়েছে।
ঝাপতাল, ধামার ইত্যাদিও বিসমপদী তালের অন্তর্ভুক্ত।
তিহাই
সমান সংখ্যক মাত্রা বিশিষ্ট কোনো বোল বা বাক্যাংশকে পরপর তিনবার বাজিয়ে তালের সমে এসে শেষ করাকে বলা হয় তিহাই। এটি মূলত সংগীত বা বাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অলংকার।
তিহাই দুই ধরনের হতে পারে—
১. দমদার তিহাই – যেখানে প্রতিটি অংশের মাঝখানে সামান্য বিরতি বা শ্বাস নেওয়ার সুযোগ থাকে।
২. বেদমদার তিহাই – যেখানে কোনো বিরতি ছাড়াই তিনটি অংশ ধারাবাহিকভাবে বাজানো হয়।
ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে অসংখ্য তালের সৃষ্টি হয়েছে—আবার সময়ের প্রবাহে অনেক তাল হারিয়েও গেছে। তেমনি তালবাদ্যেরও রয়েছে অসংখ্য রূপ। তবে সংগীত শেখার শুরুতে সবকিছু জানা প্রয়োজন নেই। বরং কয়েকটি পরিচিত তালের সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচিত হওয়াই যথেষ্ট। এই পরিচয়ই সংগীতের গভীর জগতে প্রবেশের দরজা ধীরে ধীরে খুলে দেয়।
বিভিন্ন প্রকার তাল
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে তাল ব্যবস্থার বৈচিত্র্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা, বিভাগ ও ছন্দের বিন্যাসের মাধ্যমে অসংখ্য তাল সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে কিছু তাল খুবই প্রচলিত এবং প্রায় সব ধরনের সংগীতে ব্যবহৃত হয়, আবার কিছু তাল অপেক্ষাকৃত কম ব্যবহৃত বা অপ্রচলিত। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তালের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হলো।
ত্রিতাল (Teentaal)
ত্রিতাল হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত তালগুলোর একটি। এটি ১৬ মাত্রার একটি সমপদী তাল। এর ৪টি বিভাগ রয়েছে এবং প্রতিটি বিভাগে ৪টি করে মাত্রা থাকে (৪/৪/৪/৪)। ত্রিতালে ৩টি তালি এবং ১টি খালি থাকে। এই তিনটি তালি থাকার কারণেই এর নাম তিনতাল বা ত্রিতাল; একে অনেক সময় তেতাল বা তেতালা বলেও উল্লেখ করা হয়।
তালি ও খালি বিন্যাস:
সম (১) – তালি
৫ – তালি
৯ – খালি
১৩ – তালি
ঠেকা (বোল):
- ধা ধিন ধিন ধা | ২ ধা ধিন ধিন ধা | ০ না তিন তিন তা | ৩ তেতে ধিন ধিন ধা ||
কাহারবা তাল (Kaharba)
কাহারবা, কাহেরবা বা কার্ফা নামেও পরিচিত। উচ্চাঙ্গ সংগীতে ৪–৪ ছন্দে সাধারণত ত্রিতাল বেশি ব্যবহৃত হলেও লঘু সংগীত—যেমন লোকসংগীত, আধুনিক গান বা চলচ্চিত্র সংগীতে—৪–৪ ছন্দের জন্য কাহারবা তাল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
এটি ৮ মাত্রার একটি সমপদী তাল এবং এর ছন্দ বিন্যাস ৪ + ৪। এতে ১টি তালি এবং ১টি খালি থাকে।
ঠেকা (বোল):
- ধা গে না তি | ০ না ক ধি না ||
আরেকটি প্রচলিত রূপ:
- ধা গে তে টে | ০ না ক ধি না ||
দাদরা তাল (Dadra)
দাদরা একটি ৬ মাত্রার সমপদী তাল। এর ছন্দ বিন্যাস ৩ + ৩। এতে ১টি তালি এবং ১টি খালি থাকে। তালি পড়ে ১ম মাত্রায় এবং খালি পড়ে ৪র্থ মাত্রায়।
ঠেকা (বোল):
- ধা ধিন না | ০ না থুন না ||
অন্য একটি রূপ:
- ধা ধি না | ০ না তি না ||
খেমটা তাল (Khemta)
খেমটা তালও ৬ মাত্রার এবং গঠনে দাদ্রার কাছাকাছি। এতে ১টি তালি এবং ১টি খালি থাকে।
ঠেকা (বোল):
- ধাগে কৎ তা | ০ ধাগে ধিন ধাধা ||
তেওরা তাল (Teora)
তেওরা তালকে কখনো তেওট নামেও ডাকা হয়। এটি ৭ মাত্রার একটি বিসমপদী তাল। এর বিভাগ বিন্যাস ৩ + ২ + ২। এতে ৩টি তালি থাকে এবং সাধারণত খালি থাকে না।
ঠেকা (বোল):
- ধা দেন তা | ২ তিট কতা | ৩ গদি ঘিন ||
আরেকটি রূপ:
- ধা কৎ তা | ২ ধিন ধা | ৩ ত্রেকে ধিন ||
রূপক তাল (Rupak)
রূপক তালও ৭ মাত্রার একটি বিসমপদী তাল এবং এর বিভাগও ৩ + ২ + ২। তবে তেওরা তালের সঙ্গে পার্থক্য হলো—রূপক তালে প্রথমেই খালি থাকে। এতে সাধারণত ২টি তালি ও ১টি খালি ব্যবহৃত হয়।
ঠেকা (বোল):
০ তী তী না | ১ ধী না | ২ ধী না ||
অন্য রূপ:
০ তিন তিন তাক | ১ ধিন ধাগে | ২ ধিন ধাগে ||
ঝাঁপতাল (Jhaptal)
ঝাঁপতাল একটি ১০ মাত্রার তাল। এর বিভাগ বিন্যাস সাধারণত ২ + ৩ + ২ + ৩। এতে ৩টি তালি এবং ১টি খালি থাকে।
ঠেকা (বোল):
- ধিন ধা | ৩ ধিন ধিন ধা |
০ কৎ তা | ১ ধিন ধিন ধা ||
একতাল (Ektal)
একতাল ১২ মাত্রার একটি সমপদী তাল। এটি বিভিন্ন রূপে ব্যবহৃত হয়—
- দ্বিমাত্রিক একতাল
- ত্রিমাত্রিক একতাল
- চতুর্মাত্রিক একতাল
বিলম্বিত লয়ে একতাল বাজানোর সময় প্রতিটি মাত্রা দীর্ঘায়িত হয়ে অনেক সময় ৪৮ মাত্রার মতো অনুভূত হতে পারে, যদিও মূলত এটি ১২ মাত্রারই তাল।
ঠেকা (একটি প্রচলিত রূপ):
- ধিন ধিন | ০ ধাগে তেরেকেটে | ২ তু না | ০ কৎ তা | ৩ ধাগে তেরেকেটে | ৪ ধি না ||
চৌতাল (Chautal)
চৌতাল ১২ মাত্রার একটি সমপদী তাল। এতে ৬টি বিভাগ থাকে এবং প্রতিটি বিভাগে ২টি করে মাত্রা (২+২+২+২+২+২)। এতে ৪টি তালি এবং ২টি খালি থাকে।
ঠেকা (বোল):
- ধা ধা | ০ দেন তা | ২ কৎ তাগে | ০ দেন তা | ৩ তেটে কতা | ৪ গদি ঘেনে ||
কিছু অপ্রচলিত তাল
ভারতীয় সংগীতে আরও কিছু অপেক্ষাকৃত কম ব্যবহৃত তাল রয়েছে, যেমন—
- খামসা তাল – ৮ মাত্রা; ৫ তালি ও ৩ খালি
- পটতাল – ৪ মাত্রা; ১ তালি ও ১ খালি
- মোহন তাল – ১২ মাত্রা; ৭ তালি ও ৫ খালি
- দোবাহার তাল – ১৩ মাত্রা; ৯ তালি ও ৪ খালি
- ধামার তাল – ১৪ মাত্রা; ৩ তালি ও ১ খালি
ভিডিও রিসোর্স
Shruti Jauhari: Rhythm & Tempo (Laya & Taal) – Part 1
https://www.youtube.com/watch?v=U8faahFF8bw
তাল বিষয়ে সারিতা পাঠকের টিউটোরিয়াল
https://www.youtube.com/watch?v=1Mag3hinBeU
Shruti Jauhari : Rhythm & Tempo (Laya & Taal) – Part 1:
তাল বিষয়ে সারিতা পাঠক এর টিউটোরিয়াল:
তাল লয় বিষয়ে পড়ুন:
আরও দেখুন:
