সাআদাত হাসান মান্টোর ‘ধুঁয়া’ (ধোঁয়া) কোনো সস্তা অশ্লীলতা বা কেবল কামনার গল্প নয়; এটি বয়ঃসন্ধিকালের অদ্ভুত শারীরিক রূপান্তর, কৌতূহল এবং মনের ভেতর জমে ওঠা এক নামহীন ধোঁয়াশার সংবেদনশীল মনস্তাত্ত্বিক চিত্রায়ন। শীতের অলস দিনে বন্ধ ঘরের উষ্ণতা, সর্ষের তেলের গন্ধ আর যৌবনের অজানা আকর্ষণের মধ্য দিয়ে একটি কিশোরের মনস্তাত্ত্বিক তোলপাড়কে মান্টো এখানে এক অপূর্ব শিল্প সুষমার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন।
‘ধুঁয়া’ বিশ্লেষণ
গল্পটির মূল চরিত্র মাসুদ নামের এক কিশোর। সে কৈশোর থেকে যৌবনে পা দেওয়ার ঠিক মধ্যবর্তী এমন এক মানসিক ও শারীরিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে নিজের শরীরের পরিবর্তন এবং লিঙ্গীয় সচেতনতা তার কাছে এক রহস্যময় কৌতূহল হিসেবে দেখা দেয়। মান্টো কোনো রকম অশালীন শব্দের ব্যবহার না করেই কেবল পরিবেশ, গন্ধ, উত্তাপ আর অভিজ্ঞতার আলো-ছায়া দিয়ে একটি মনস্তাত্ত্বিক জগত নির্মাণ করেছেন।
গল্পে ‘ধুঁয়া’ বা ধোঁয়া হলো একটি শক্তিশালী রূপক। এটি কেবল শীতের বিকালের কুয়াশা বা চুল্লির ধোঁয়া নয়; এটি মাসুদের অবচেতন মনে জমতে থাকা যৌন সচেতনতা, অস্বস্তি এবং অস্পষ্ট কামনার ধোঁয়াশা। যে সমাজে যৌনতা এবং শরীরের রূপান্তরকে এক চরম গোপন ও লজ্জার বিষয় বানিয়ে রাখা হয়, সেখানে একটি কিশোর নিজের ভেতরের এই শারীরিক তোলপাড়কে বুঝ উঠতে না পেরে কেমন ব্যাকুল হয়ে ওঠে, মান্টো তা গভীরভাবে উন্মোচন করেছেন।
‘ধুঁয়া’ গল্পটির জন্য মান্টোকে অশ্লীলতার অভিযোগে আদালতের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল। অথচ পুরো গল্পটি ভালোভাবে পাঠ করলে দেখা যায়, এতে কোনো প্রত্যক্ষ অশ্লীল দৃশ্য নেই। যা আছে তা হলো কেবল মনস্তাত্ত্বিক আবহ এবং সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ। মান্টো মূলত দেখিয়েছেন যে, সমাজের চাপিয়ে দেওয়া কৃত্রিম নৈতিকতার দেয়ালগুলো কীভাবে একটি কিশোরের স্বাভাবিক অনুসন্ধিৎসাকে এক ধরনের অপরাধবোধ আর মানসিক অবরুদ্ধতায় পরিণত করে।
‘ধুঁয়া’ (গল্পের বাংলা অনুবাদ)
মূল: সাআদাত হাসান মান্টো
কনেকাটা শীতের এক দুপুর। ঘরের বাইরে হিমেল বাতাস বইছে, আর ঘরের ভেতরটা বেশ উষ্ণ ও থমথমে।
মাসুদ ভারী লেপের নিচে শুয়ে ছিল। তার বয়স এমন এক জায়গায় এসে ঠেকেছে, যেখানে শরীরের চামড়ার নিচে রক্ত যেন হঠাৎ গরম হয়ে ওঠে, অথচ সে নিজেও বোঝে না কেন এমন হচ্ছে। তার বড় বোন আবিদা আর তার এক বান্ধবী ঘরের এক কোণে বসে ছিল। আবিদার মাথায় তেল মালিশ করে দিচ্ছিল তার বান্ধবী। সর্ষের তেলের এক ঝাঁঝালো ও মেটে গন্ধ পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়েছিল।
মাসুদ লেপের ফাঁক দিয়ে চুপচাপ তাদের দেখছিল। বোন ও তার বান্ধবীর হালকা হাসাহাসি, তাদের অঙ্গভঙ্গি আর সর্ষের তেলের উগ্র গন্ধের মাঝে সে এক অদ্ভুত উত্তাপ অনুভব করল। ঘরের ভেতরে কোনো আগুন জ্বলছিল না, কিন্তু মাসুদের মনে হচ্ছিল একধরণের ধোঁয়া যেন লেপের তলা থেকে বের হয়ে তার পুরো মাথায় চেপে বসছে। সে চোখ বন্ধ করল, কিন্তু সেই উত্তাপ আর গন্ধ তাকে স্বস্তি দিচ্ছিল না।
একপর্যায়ে ঘরটা তার কাছে খুব দমবন্ধ মনে হতে লাগল। সে লেপ ঠেলে উঠে দাঁড়াল। নিজের ভেতরে হতে থাকা এই অজানা অস্বস্তি থেকে বাঁচতে সে সোজা বাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তায় চলে এলো।
বাইরে তখন প্রচণ্ড শীত। চত্বরের ওপর ঘন কুয়াশা আর ধোঁয়া মিলে এক হয়ে আছে। চারপাশের গাছপালা, মেঠো পথ—সবকিছু যেন এক আবছা ধোঁয়াশায় ঢাকা।
মাসুদ দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগল। সে চাইল বাইরের এই কনকনে ঠান্ডা বাতাস তার ভেতরের গরম ভাবটাকে জুড়িয়ে দিক। হাঁটতে হাঁটতে সে এক জায়গায় দেখতে পেল এক পথঘোরা কুকুর ঠান্ডায় কুঁকড়ে বসে আছে। মাসুদ এগিয়ে গিয়ে কুকুরটার গায়ে হাত দিল। কুকুরটার শরীরও কেমন যেন বরফের মতো ঠান্ডা।
মাসুদ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নিজের হাতের তালুর দিকে তাকিয়ে রইল। সে নিজের ভেজা ও গরম নিঃশ্বাস ছাড়ল। বাতাসে তার নিঃশ্বাসও ধোঁয়ার মতো উড়ে গেল। কিন্তু এত ঠান্ডার মধ্যেও তার ভেতরের সেই অচেনা অস্বস্তি আর ওলটপালট ভাবটা কমল না।
সে আবার ঘরের দিকে পা বাড়াল। গোধূলির আলোয় চারপাশ আরও ঘোলাটে হয়ে আসছিল। মাসুদ অনুভব করল, বাইরে যে কুয়াশা আর ধোঁয়া ঝুলে আছে, তার চেয়েও ঘন এক ধোঁয়াশা আটকে আছে তার নিজের বুকের ভেতরে—যা কেবল একটি উত্তপ্ত স্পর্শ আর সর্ষের তেলের গন্ধ ধরে তাকে এক অদ্ভুত প্রাপ্তবয়স্ক জগতের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সে কিছুতেই সেই ধোঁয়া থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারছে না।
