নয়া কানুন – সাদাত হাসান মান্টো | রেখতা-উর্দু সাহিত্য । আমার সংস্কৃতি সিরিজ

সাআদাত হাসান মান্টোর ‘নয়া কানুন’ ঔপনিবেশিক রাজতন্ত্র, শাসন ব্যবস্থার ভণ্ডামি এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের রাজনৈতিক মোহভঙ্গের এক অনবদ্য সামাজিক উপহাস। লাহোরের এক অতি সাধারণ টাঙ্গাওয়ালা ওস্তাদ মঙ্গুর সরল রাজনৈতিক প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার নিষ্ঠুর আঘাতের মধ্য দিয়ে গল্পটি রূপ পেয়েছে। আইনের পাতায় কোনো রূপান্তর ঘটলেও শোষকের রূপ বা রাষ্ট্রযন্ত্রের চেহারা যে আমূল বদলে যায় না, মান্টো তা দেখিয়েছেন অদ্ভুত এক হিউমার ও শ্লেষের সাথে।

‘নয়া কানুন’ বিশ্লেষণ

গল্পের মূল চরিত্র ওস্তাদ মঙ্গু কোনো শিক্ষিত রাজনেতা নয়; সে খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ। প্রতিদিন টাঙ্গা চালাতে গিয়ে বিভিন্ন যাত্রীদের কথাবার্তা শুনে সে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে। ইংরেজ শাসকদের (গোরাদের) ঔদ্ধত্য ও অত্যাচার সে সহ্য করতে পারে না। তাদের প্রতি মঙ্গুর ঘৃণা ছিল তীব্র ও স্বতঃস্ফূর্ত।

১৯৩৫ সালের ‘গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট’ বা নতুন শাসন আইন নিয়ে যখন চারপাশে আলোচনা শুরু হয়, মঙ্গু ধরে নেয় এপ্রিলের এক তারিখে এই ‘নয়া কানুন’ কার্যকর হলেই বুঝি দেশ থেকে ব্রিটিশের গোলামি ও গোরাদের অত্যাচার শেষ হয়ে যাবে। সাধারণ মানুষ যেভাবে রাজনীতিকদের ফাঁকা আশ্বাসে বিশ্বাস স্থাপন করে, মঙ্গুর অশিক্ষিত কিন্তু নিষ্পাপ মনও ঠিক একইভাবে এক কাল্পনিক মুক্তির স্বপ্ন দেখতে থাকে।

গল্পের সবচেয়ে করুণ কিন্তু ব্যঙ্গাত্মক মোড় আসে এক এপ্রিলের সকালে। নয়া কানুনের শুভ সূচনার আশায় মঙ্গু নতুন করে সাজগোজ করে টাঙ্গা নিয়ে বের হয়। রাস্তায় এক ব্রিটিশ গোরার সাথে তার বচসা হয়—যে গোরাটি কিছুদিন আগেই তাকে অপমান করেছিল। এবার মঙ্গু আর মুখ বুজে থাকে না, সে উল্টো গোরাটির ওপর চড়াও হয় এবং তাকে মারতে মারতে বলে যে এখন আর পুরনো দিন নেই, এখন নয়া কানুন এসেছে।

কিন্তু যখন পুলিশ এসে ওস্তাদ মঙ্গুকে গ্রেপ্তার করে হাজতে পুরে দেয় এবং মঙ্গু চিৎকার করে নয়া কানুনের কথা বলতে থাকে, তখন দারোগা রুক্ষ স্বরে জানিয়ে দেয়—‘নয়া কানুন আবার কী? আইন যা ছিল তা-ই আছে।’ মান্টো এই শেষ বাক্যে বুঝিয়ে দিয়েছেন, শাসকের মুখ কিংবা নাম বদলালেও শোষিত মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় শোষণের পুরনো চাবুকটি একই থেকে যায়।

‘নয়া কানুন’ (গল্পের বাংলা অনুবাদ)

মূল: সাআদাত হাসান মান্টো

লাহোরের টাঙ্গাওয়ালাদের মধ্যে ওস্তাদ মঙ্গুর একটা আলাদা পরিচিতি ছিল। খুব বেশি লেখাপড়া না জানলেও মঙ্গুর রাজনৈতিক বিষয়ে নিজস্ব কিছু ধ্যানধারণা ছিল, যা সে টাঙ্গায় বসা যাত্রীদের কথা শুনে তৈরি করে নিয়েছিল। কিন্তু ইংরেজ গোরাদের সে একদম সহ্য করতে পারত না। ক্যানটনমেন্টের কোনো গোরা সওয়ারি তার টাঙ্গায় উঠলেই মঙ্গুর রক্ত গরম হয়ে উঠত। তাদের অন্যায় হুকুম আর গালিগালাজ সে মনে মনে জমিয়ে রাখত।

একদিন টাঙ্গায় দুজন ব্যারিস্টার যাত্রীর কথা শুনে মঙ্গু জানতে পারল, এপ্রিলের এক তারিখ থেকে দেশে একটা ‘নয়া কানুন’ আসছে। অর্থাৎ ১৯৩৫ সালের নতুন শাসন আইন। মঙ্গু ধরে নিল, এই নতুন আইন আসা মানেই ইংরেজদের রাজত্ব শেষ। এবার আর গোরাদের দাপট থাকবে না, সাধারণ মানুষ সমান অধিকার পাবে।

সেই থেকে ওস্তাদ মঙ্গুর দিন যেন আর কাটতে চায় না। সে অধীর আগ্রহে এক এপ্রিলের অপেক্ষা করতে লাগল। বন্ধুদের কাছে সে পানের দোকানে গিয়ে গল্প করত, “দেখে নিস, এপ্রিলের এক তারিখ আসতে দে, এই গোরাগুলোর সব জারিজুরি শেষ হয়ে যাবে। নয়া কানুন আসছে!”

অবশেষে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত এপ্রিলের এক তারিখ।

ভোরবেলা উঠে ওস্তাদ মঙ্গু তার টাঙ্গার ঘোড়াটিকে খুব যত্ন করে সাজাল। টাঙ্গায় নতুন পলিশ দিল। তারপর একটা নতুন চাদর গায়ে জড়িয়ে সে মহা আনন্দে শহরের রাস্তায় বের হলো। সে ভেবেছিল চারপাশের চেহারা বদলে যাবে, নতুন আইনের আনন্দে মানুষ উৎসবে মেতে উঠবে। কিন্তু রাস্তায় বের হয়ে সে দেখল সবকিছু আগের মতোই শান্ত ও স্বাভাবিক। কোনো নতুন উল্লাস নেই।

মঙ্গু ভাবল, হয়তো বেলা বাড়লে নয়া কানুনের রূপ দেখা যাবে।

সে ক্যানটনমেন্টের দিকে টাঙ্গা নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে সে দেখল এক গোরা দাঁড়িয়ে আছে। কাছে যেতেই মঙ্গু চিনতে পারল—এ তো সেই একই গোরা, যে গত বছর তার সাথে ভাড়া নিয়ে খামোখা ঝগড়া করেছিল এবং তাকে চরম অপমান করেছিল! সেদিন মঙ্গু গালি খেয়েও চুপচাপ সহ্য করে নিয়েছিল।

কিন্তু আজ তো এক এপ্রিল! আজ নয়া কানুন এসেছে!

গোরাটি মঙ্গুকে দেখে আগের মতোই উদ্ধত ভঙ্গিতে বলল, “হেই টাঙ্গাওয়ালা! ক্যানটনমেন্ট যাবি?”

মঙ্গু গোঁফ মোচড় দিয়ে সিটে বসে বলল, “ভাড়া কত দিবি?”

গোরাটি অবাক হলো। একজন সাধারণ টাঙ্গাওয়ালার এত সাহস! সে নিজের লাঠি দিয়ে মঙ্গুর গায়ে খোঁচা মেরে বলল, “তু আগের মতো কথা বলছিস না কেন রে? মেজাজ দেখাচ্ছিস?”

এই খোঁচা খেতেই মঙ্গুর ভেতরের দিনগুলোর পুঞ্জীভূত রাগ যেন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। সে এক লাফে টাঙ্গা থেকে নেমে এসে গোরার কলার চেপে ধরল।

গোরাটি কিছু বুঝে ওঠার আগেই মঙ্গু তাকে শক্ত ঘুষি বসিয়ে দিল। গোরা নিচে পড়ে গেলে মঙ্গু তার ওপর চেপে বসে চড়-থাপ্পড় মারতে মারতে চিৎকার করতে লাগল, “আজ আর আগের দিন নেই সরদার! আজ নয়া কানুন এসেছে! আজ নয়া কানুন!”

গোরাটির চিৎকার শুনে আসেপাশের লোক জড়ো হয়ে গেল। দুজন পুলিশ দৌড়ে এলো। তারা কোনোমতে মঙ্গুকে ধরে ফেলল এবং টানাটানি করে থানায় নিয়ে যেতে লাগল।

মঙ্গু পুলিশের হাতে বাঁধা পড়েও গর্বের সাথে হাঁক ছাড়তে লাগল, “আমাকে কেন ধরছিস? আজ তো নয়া কানুন এসেছে! এবার আর তোদের ওই পুরনো অত্যাচার চলবে না!”

পুলিশ অফিসারটি ধমক দিয়ে তাকে হাজতের ভেতর ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। তারপর চাবির থোকা ঘুরিয়ে রূঢ় গলায় বলল, “কীসের নয়া কানুন রে ব্যাটা? আইন যা ছিল তা-ই আছে। চুপচাপ বসে থাক!”

হাজতের স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ওস্তাদ মঙ্গু নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। বাইরের সেই নতুন সকালের কাল্পনিক আলো তখন এক নিমেষে নিভে গেছে।