ধ্রুপদে বেতিয়া ঘরানা (Bettiah Gharana) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রাচীনতম ধারাগুলোর মধ্যে ধ্রুপদ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, এবং এই ধ্রুপদ সংগীতের ধারাবাহিকতাকে ধরে রেখেছে কয়েকটি প্রধান ঘরানা। সেই পরম্পরার অন্যতম উল্লেখযোগ্য ধারা হলো বেতিয়া ঘরানা (Bettiah Gharana), যা বিহারের বেতিয়া অঞ্চলে বিকশিত হয়। এই ঘরানা ধ্রুপদের চার বাণী—গওহার, খণ্ডার, নওহার ও ডাগরবাণী—এর সম্মিলিত প্রভাব ধারণ করে একটি স্বতন্ত্র শৈলী গড়ে তোলে।

বেতিয়া ঘরানার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সাধারণভাবে পিয়ার খান এবং হায়দার খান-এর নাম উল্লেখ করা হয়, যাঁদের মাধ্যমে সেনিয়া ধারার প্রভাব এই অঞ্চলে প্রবেশ করে। পরবর্তীকালে বেতিয়া রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতায় এই ঘরানার বিকাশ ঘটে এবং এটি একটি সুসংহত ধ্রুপদ গায়কি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

বেতিয়া ঘরানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর বহুবাণীমূলক চরিত্র। যেখানে ডাগর ঘরানা প্রধানত ডাগরবাণীর ওপর নির্ভরশীল এবং দরভাঙ্গা ঘরানা গওহার বা খণ্ডার বাণীর দিকে বেশি ঝুঁকে থাকে, সেখানে বেতিয়া ঘরানা চারটি বাণীর উপাদানকে একত্রে গ্রহণ করে। ফলে এই ঘরানার গায়নশৈলী একদিকে যেমন গাম্ভীর্যপূর্ণ, অন্যদিকে তাতে অলংকার, লয়কারি এবং বৈচিত্র্যের একটি সুষম সমন্বয় দেখা যায়।

ধ্রুপদের অন্যান্য প্রধান ঘরানার সঙ্গে তুলনা করলে বেতিয়া ঘরানার স্বাতন্ত্র্য আরও স্পষ্ট হয়। যেমন, ডাগর ঘরানা—যার ধারক উস্তাদ নাসির মইনুদ্দিন ডাগরউস্তাদ জিয়া ফারিদুদ্দিন ডাগর—মূলত ধ্যানমুখী, ধীর এবং স্বরকেন্দ্রিক। অন্যদিকে দরভাঙ্গা ঘরানা, যার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে রাধাকৃষ্ণ মল্লিককার্তা রাম-এর নাম উল্লেখযোগ্য, সেখানে তাল ও লয়ের জটিলতা এবং বোলবন্ত গায়কি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। আবার তলোয়ান্ডি ঘরানা, যা পাঞ্জাব অঞ্চলে বিকশিত এবং নায়ক চাঁদ খানসুরজ খান-এর সঙ্গে যুক্ত, সেখানে দ্রুত আলাপের সমাপ্তি এবং জটিল ছন্দবিন্যাস দেখা যায়।

এই তুলনার মধ্যে বেতিয়া ঘরানার বিশেষত্ব হলো—এটি কোনো একক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর না করে একটি সমন্বয়ধর্মী শৈলী গড়ে তোলে। এখানে আলাপ ধীর ও সুসংহত হলেও গায়ন অংশে লয়কারি, বোলতান এবং অলংকারের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ, এটি ধ্রুপদের আধ্যাত্মিকতা এবং কারিগরি দক্ষতার মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করে।

বেতিয়া ঘরানার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সমৃদ্ধ বন্দিশভাণ্ডার। এই ঘরানার শিল্পীদের কাছে বহু প্রাচীন ধ্রুপদ রচনা সংরক্ষিত রয়েছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মৌখিকভাবে প্রচারিত হয়েছে। এই বন্দিশগুলো শুধু সংগীত নয়, বরং ইতিহাস ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ দলিল।