হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

ধ্রুপদে বেতিয়া ঘরানা (Bettiah Gharana) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

বেতিয়া রাজের স্থাপত্য

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাচীনতম, বিশুদ্ধতম ও ভাবগম্ভীর অঙ্গ হলো ধ্রুপদ। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে শত শত বছর ধরে সজীব ও সমৃদ্ধ রাখার পেছনে যে কয়েকটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী রাজদরবার ও আঞ্চলিক কেন্দ্র মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে, তার মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নাম বিহারের ঐতিহাসিক বেতিয়া রাজ (Bettiah Raj)। এই রাজকীয় পরিবেশেই ধ্রুপদের চার বাণীর অভূতপূর্ব সংমিশ্রণে গড়ে ওঠে ভারতীয় সঙ্গীতের এক অনন্য স্বকীয় অধ্যায়—বেতিয়া ঘরানা (Bettiah Gharana)।

বিহারের চম্পারণ (Champaran) অঞ্চলে অবস্থিত বেতিয়া রাজ দরবারের আনুকূল্যে ও বৈষ্ণব উপাসনালয়ের ব্যাকরণে এই বিশেষ গায়কী বিকাশ লাভ করে। ধ্রুপদ সঙ্গীত গবেষণায় বেতিয়া ঘরানাকে বলা হয় ধ্রুপদের সবচেয়ে প্রজ্ঞাময়, সুসংহত ও সাহিত্য সমৃদ্ধ ‘সমন্বিত ঐতিহ্য’ (Composite Tradition)।

ঐতিহাসিক পটভূমি, সেনিয়া ঐতিহ্য ও প্রতিষ্ঠাতা পরম্পরা

বেতিয়া ঘরানার সাঙ্গীতিক উত্থান ঘটে অষ্টাদশ শতাব্দীতে বেতিয়া এস্টেটের মহারাজা আনন্দ কিশোর সিংহ এবং মহারাজা নবল কিশোর সিংহের রাজত্বকালে। এই রাজপরিবার স্বয়ং সঙ্গীতানুরাগী, প্রজ্ঞাবান রচয়িতা ও ধ্রুপদের একনিষ্ঠ সাধক ছিলেন।

বেতিয়া ঘরানার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপনে সবচেয়ে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন তানসেনের ধ্রুপদী বংশধারার (সেনিয়া ঘরানা) বিশিষ্ট উস্তাদ পিয়ার খাঁ (Ustad Pyar Khan) এবং উস্তাদ হায়দার খাঁ (Ustad Haider Khan)। দিল্লির মোগল দরবারের অবক্ষয়কালে তাঁরা বেতিয়া রাজ দরবারের স্থায়িত্ব ও পরম পৃষ্ঠপোষকতায় এসে আশ্রয় নেন। স্থানীয় প্রাজ্ঞ সঙ্গীতসাধক এবং মিশ্র ও মল্লিক বংশীয় পণ্ডিতদের সাথে তাঁদের সাঙ্গীতিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে সেনিয়া ঐতিহ্য ও স্থানীয় ভক্তিগীতি মিলে বেতিয়া ঘরানার জন্ম হয়।

সেনিয়া ধারা (উস্তাদ পিয়ার খাঁ ও হায়দার খাঁ) ──┐
                                       ├───>  বেতিয়া ঘরানা (চার বাণীর সুষম মেলবন্ধন)
বেতিয়া রাজ পৃষ্ঠপোষকতা ও স্থানীয় সাধক ──┘

চার বাণীর অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ (বহুবাণীমূলক চরিত্র)

ধ্রুপদ সঙ্গীত মূলত চারটি প্রধান ‘বাণী’-র ওপর প্রতিষ্ঠিত—গওহার বাণী (Gauhar Bani), খণ্ডার বাণী (Khandar Bani), নওহার বাণী (Nauhar Bani) ও ডাগরবাণী (Dagarvani)। বেশিরভাগ ধ্রুপদ ঘরানা নির্দিষ্ট কোনো একটি বা দুটি বাণীর ওপর একক প্রভাব বজায় রাখে। কিন্তু বেতিয়া ঘরানার সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর বহুবাণীমূলক সমন্বয়বাদ।

  • গওহার বাণীর প্রভাব: রাগের সুষম সুরময়তা, প্রশান্তি ও শান্তরসের বিস্তার।
  • খণ্ডার বাণীর প্রভাব: ওজস্বী স্বরপ্রক্ষেপণ, গলার তেজ ও শারীরিক সামর্থ্য।
  • নওহার বাণীর প্রভাব: ছন্দের জটিল বক্রগতি, ক্ষিপ্রতা ও চমকপ্রদ অলঙ্করণ।
  • ডাগরবাণীর প্রভাব: প্রারম্ভিক আলাপের গভীরতা, সূক্ষ্ম স্বরপ্রক্ষেপণ ও ধ্যানমগ্নতা।

চারটি বাণীর এই অপূর্ব সমাহারে বেতিয়া গায়কী একদিকে যেমন শাস্ত্রীয় ব্যাকরণে কঠোর, অন্যদিকে তেমনি অলঙ্কার, লয়কারি ও কাব্যিক মাধুর্যে অতুলনীয়।

গায়কী শৈলী ও নান্দনিক বৈশিষ্ট্য

বেতিয়া ঘরানার ধ্রুপদ গায়কী অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং বেশ কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্যে ভরপুর:

১. শাস্ত্রনিষ্ঠ ও মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী আলাপ

বেতিয়া গায়কী ডাগরবাণীর মতো অতিরিক্ত ধীর ও দীর্ঘায়িত নয়, আবার তলোয়ান্ডি ঘরানার মতো অতিমাত্রায় দ্রুত গতিসম্পন্নও নয়। এখানে রাগের স্বরস্থান রক্ষা করে একটি সুষম, স্বরকেন্দ্রিক ও গতিশীল ‘নোম-তোম’ আলাপ বিস্তার করা হয়।

২. অতুলনীয় বন্দিশভাণ্ডার ও সাহিত্যিক সমৃদ্ধি

ধ্রুপদ সাহিত্যের ইতিহাসে বেতিয়া ঘরানার বন্দিশভাণ্ডারকে সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও প্রাতিষ্ঠানিক রত্নাগার মনে করা হয়। বেতিয়ার মহারাজা নবল কিশোর সিংহ ‘নবলরং’ ভণিতায় সহস্রাধিক উচ্চাঙ্গের ধ্রুপদ, ধামার ও খেয়াল পদ রচনা করেছিলেন। এই বন্দিশগুলোতে সংস্কৃত, ব্রজবুলি ও হিন্দির কাব্যিক প্রজ্ঞা ফুটে ওঠে।

৩. ক্ষিপ্র বোল-তান ও বৈচিত্র্যময় লয়কারি

বেতিয়া ঘরানায় পদের শব্দের সাথে ছন্দের বৈচিত্র্যময় পরীক্ষা-নিরীক্ষা (বোল-বাট ও বোল-তান) অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিবেশন করা হয়। দুগুণ, তি গুণ, চৌগুণ থেকে শুরু করে ‘আড়’ ও ‘কুয়াড়’ লয়ে লয়কারির সুচিন্তিত বিস্তার এই গায়কদের প্রধান শক্তি।

৪. চারিত্রময় ঝম্পাতাল, শূলতাল ও ধামার পরিবেশনা

বেতিয়া ঘরানায় চৌতাল (১২ মাত্রা), ধামার (১৪ মাত্রা), সূলতাল (১০ মাত্রা) এবং ঝম্পাতাল (১০ মাত্রা)-র প্রাধান্য বেশি দেখা যায়। পখাওয়াযের সঙ্গতের সাথে কণ্ঠশিল্পীর ছন্দময় দ্বৈরথ আসরে এক পরম প্রাণবন্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে।

অন্যান্য ধ্রুপদ ঘরানার সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণ

ধ্রুপদের মূল ঘরানাগুলোর সাথে তুলনা করলে বেতিয়া ঘরানার ভারসাম্যপূর্ণ ও সমন্বিত রূপটি স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়:

ঘরানা/ধারাপ্রধান প্রতিনিধি ও প্রতিষ্ঠাতাপ্রধান বাণী ও সাঙ্গীতিক চরিত্রগায়কী ও লয়কারির গতি
ডাগর ঘরানাউস্তাদ নাসির মইনুদ্দিন ডাগর, জিয়া ফারিদুদ্দিন ডাগর।ডাগরবাণী: অত্যন্ত ধ্যানমুখী, ধীর, স্বরকেন্দ্রিক ও গম্ভীর।অত্যন্ত বিলম্বিত, ধ্যায়নী ও শান্ত।
দরভাঙ্গা ঘরানারাধাকৃষ্ণ মল্লিক, কার্তা রাম।খণ্ডার ও গওহার বাণী: ওজস্বী, ক্ষিপ্র লয়কারি ও বোলবন্ত গায়কী।প্রখর শক্তিপ্রধান ও উচ্চ লয়কেন্দ্রিক।
তলোয়ান্ডি ঘরানানায়ক চাঁদ খাঁ, নায়ক সুরজ খাঁ।খণ্ডার বাণী: গতিময়, দ্রুত আলাপের সমাপ্তি ও কঠিন ছন্দবিন্যাস।অত্যন্ত দ্রুত, ক্ষিপ্র ও ওজস্বী।
বেতিয়া ঘরানাপিয়ার খাঁ, হায়দার খাঁ, মহারাজ নবল কিশোর।চার বাণীর সমন্বয়: বহুবাণীমূলক, ভাবঘন, সাহিত্যনির্ভর ও সুষম।ভারসাম্যপূর্ণ, প্রজ্ঞাময় ও অলঙ্কারসমৃদ্ধ।

গুরু-শিষ্য পরম্পরা, আধুনিক রূপান্তর ও বর্তমান পরিস্থিতি

বেতিয়া ঘরানার সাঙ্গীতিক আলো ছড়িয়ে পড়েছিল ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে। উত্তরপ্রদেশ, বাংলা ও সমগ্র উত্তর ভারতে এই ঘরানার প্রখ্যাত গুণীশিল্পীরা সঙ্গীতের চর্চা করেছেন। প্রখ্যাত ধ্রুপদী পণ্ডিত গোবিন্দচন্দ্র রায়, পণ্ডিত রাম চতুর মল্লিক (বেতিয়া ও দরভাঙ্গা উভয় ঐতিহ্যের বাহক), পণ্ডিত গণেশ প্রসাদ মিশ্র এবং পণ্ডিত ইন্দ্রকিশোর মিশ্রের মতো শিল্পীরা বেতিয়া গায়কীধারাকে টিকিয়ে রাখতে প্রভূত অবদান রেখেছেন।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মহারাজাদের রাজকীয় আনুকূল্য কমে যাওয়া এবং আধুনিক রেকর্ড শিল্পে খেয়াল গায়কী মূলধারায় চলে আসায় বেতিয়া ঘরানার মতো গভীর সাহিত্যনির্ভর প্রাচীন ধ্রুপদী ধারা অনেকটাই প্রচারবিমুখ হয়ে পড়ে। তবে অনলাইন ক্যাটালগ ও জাতীয় সঙ্গীত আর্কাইভের মাধ্যমে বেতিয়ার প্রাচীন বন্দিশ ও চার বাণীর গায়নশৈলী নিয়ে পুনরায় প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা শুরু হয়েছে।

SufiFaruq.com, Logo - 252x68 (1)

বেতিয়া ঘরানা হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সেই অমূল্য দর্পণ, যেখানে ধ্রুপদের চার বাণীর সৌন্দর্য, ঐতিহ্যবাহী রাজকীয় আভিজাত্য এবং সুগভীর সাহিত্যচিন্তা এক সূত্রে গাঁথা হয়েছে। ধ্রুপদকে কেবল একমুখী কাঠামোর মধ্যে না রেখে, তাকে এক সার্বজনীন, প্রজ্ঞাময় ও পরিশীলিত শিল্পরূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেতিয়া ঘরানার ঐতিহাসিক অবদান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স

১. বিহার কি সঙ্গীত পরম্পরা (Classical Music Traditions of Bihar) — ড. উমা বাসুদেব।
২. ধ্রুপদ: ইতিহাস ও ঐতিহ্য — রামচতুর মল্লিক ও ড. সুভদ্রা চৌধুরী।
৩. উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতি — পণ্ডিত ভাতখণ্ডে।
৪. সঙ্গীত নাটক আকাদেমি ও আইটিসি সঙ্গীত গবেষণা একাডেমি (SRA) আর্কাইভ — নতুন দিল্লি ও কোলকাতা।
আরও দেখুন:
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।