ধ্রুপদে নওহারবাণী তার দ্রুত চলন, স্বরের লম্ফন এবং বৈচিত্র্যময় অলংকারের জন্য সংগীতজগতে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
ঐতিহাসিক পটভূমি ও উৎস
নওহারবাণীর উৎপত্তিকাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা মত থাকলেও, এটি মূলত ১৬শ শতাব্দীতে মুঘল সম্রাট আকবরের রাজদরবারকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠাতা: নওহারবাণীর প্রবর্তক হিসেবে ধরা হয় কিংবদন্তি সংগীতজ্ঞ শ্রীচন্দ্র (Sreechand)-কে। মতান্তরে, তিনি আকবরের নবরত্নের অন্যতম নাহর খাঁ (Nahar Khan) নামেও পরিচিত ছিলেন।
ভৌগোলিক উৎস: রাজস্থানের ‘নওহার’ অঞ্চল থেকে এই বাণীর নামকরণ হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
পারিবারিক ঐতিহ্য: এই বাণীটি মূলত তওয়ায়েফ এবং দরবারী গায়কদের মাধ্যমে রক্ষিত হয়েছিল। বর্তমানে বিহারের বেতিয়া (Bettiah) ঘরানার গায়কি এবং উত্তরপ্রদেশের কিছু প্রাচীন ধ্রুপদী ঘরানায় নওহারবাণীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
নওহারবাণীর কারিগরি ও গায়ন বৈশিষ্ট্য
নওহারবাণী অন্য তিনটি বাণী থেকে তার স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে বিশেষ কিছু যান্ত্রিক ও শৈল্পিক কৌশলের মাধ্যমে। এর প্রধান কারিগরি দিকগুলো হলো:
ক. স্বরের লম্ফন বা লাফ (Jumps in Notes):
নওহারবাণীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি সরাসরি এক স্বর থেকে অন্য স্বরে লাফিয়ে চলে। যেখানে ডাগরবাণী ‘মীড়’ বা টেনে স্বর বিস্তার করে, সেখানে নওহারবাণী স্বরের মধ্যে ব্যবধান তৈরি করে বৈচিত্র্য আনে। একে সংগীতে ‘ছন্দোবদ্ধ লম্ফন’ বলা হয়।
খ. দ্রুততা ও চপলতা:
এই বাণীটি অত্যন্ত চঞ্চল প্রকৃতির। এতে বিলম্বিত লয়ের চেয়ে মধ্য ও দ্রুত লয়ের কাজ বেশি দেখা যায়। এর গায়কি অনেকটা বাঘের বা পশুর ক্ষিপ্র গতির মতো বলে অনেকে একে ‘জানোয়ার গায়কি’র একটি অংশ হিসেবেও তুলনা করেন।
গ. অলংকারের ব্যবহার:
নওহারবাণীতে ‘ছুট’ (Chhut) এবং ‘ঝটকা’ (Jhatka) জাতীয় তানের কাজ বেশি দেখা যায়। কণ্ঠকে হঠাৎ করে এক স্বর থেকে অন্য স্বরে নিয়ে যাওয়া এবং দ্রুত ফিরে আসা এই বাণীর বিশেষত্ব।
ঘ. রস ও মেজাজ:
ডাগরবাণী যেখানে ‘শান্ত’ ও ‘শৃঙ্গার’ রস প্রধান, নওহারবাণী সেখানে ‘অদ্ভুত’ এবং ‘বীর’ রসের সঞ্চার করে। এর চলন শ্রোতাকে বিস্মিত ও উদ্দীপিত করে তোলে।
আধুনিক ধ্রুপদে নওহারবাণীর প্রভাব
কালের বিবর্তনে স্বতন্ত্র নওহারবাণী গায়কের সংখ্যা কমে এলেও, এর প্রভাব হারিয়ে যায়নি।
১. বেতিয়া ঘরানা (Bettiah Gharana): বিহারের বেতিয়া ঘরানার ধ্রুপদ গায়করা তাঁদের গায়কিতে নওহারবাণীর চপলতা এবং খাণ্ডারবাণীর দাপটকে চমৎকারভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন। পন্ডিত ফাল্গুনী মিত্রের গায়কিতে এই বাণীর কিছু প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়।
২. বিষ্ণুপুর ঘরানা: বাংলার বিষ্ণুপুর ঘরানার কিছু প্রাচীন ধ্রুপদ বন্দিশে নওহারবাণীর ঢং লক্ষ্য করা যায়।
৩. ইন্দ্র কিশোর মিশ্র: বর্তমানে ধ্রুপদ জগতের অন্যতম প্রথিতযশা শিল্পী পণ্ডিত ইন্দ্র কিশোর মিশ্র নওহার এবং খাণ্ডারবাণীর সংমিশ্রণে গান পরিবেশন করেন।
ডাগরবাণীর সাথে নওহারবাণীর পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য | ডাগরবাণী (Dagarvani) | নওহারবাণী (Nauharvani) |
| গতি | ধীর, বিলম্বিত ও ধ্যানমগ্ন। | দ্রুত, চঞ্চল ও উদ্দাম। |
| স্বর সংযোগ | মীড় ও আঁশ প্রধান (Glide)। | লম্ফন ও ঝটকা প্রধান (Jump)। |
| প্রধান রস | শান্ত ও করুণ রস। | বীর ও অদ্ভুত রস। |
| আলাপ | অত্যন্ত দীর্ঘ ও বিস্তারিত। | সংক্ষিপ্ত ও বৈচিত্র্যময়। |
নওহারবাণী হলো ধ্রুপদ সংগীতের সেই রত্ন যা শাস্ত্রীয় সংগীতের কাঠিন্যের মধ্যে এক ধরনের রোমাঞ্চ ও গতির সৃষ্টি করে। যদিও এটি ডাগরবাণীর মতো এতোটা সুসংগঠিতভাবে প্রচার পায়নি, তবুও এর গাণিতিক জটিলতা এবং কণ্ঠের কসরত একে উচ্চমার্গের সংগীত হিসেবে অমর করে রেখেছে।
আরও দেখুন: