ব্যবসায়িক যাত্রার শুরুতে একজন উদ্যোক্তাকে অনেক কিছু নিয়ে ভাবতে হয়—পুঁজি, অফিস, সাপ্লাই চেইন আর কাস্টমার। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝে যে বিষয়টি একজন উদ্যোক্তাকে সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে একজন ‘আইকন’-এ পরিণত করে, তা হলো ব্র্যান্ডিং। গতকালের উদ্যোক্তা আড্ডায় যখন ব্র্যান্ডিং নিয়ে কথা হচ্ছিল, তখন বুঝলাম আমাদের নতুন উদ্যোক্তার মনে এই বিষয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা আছে। বিশেষ করে আমাদের দেশীয় কোম্পানিগুলো মাল্টিন্যাশনালদের সাথে পাল্লা দিয়ে দুর্দান্ত সব পণ্য বাজারে আনলেও কেন যেন ‘ব্র্যান্ড’ হিসেবে মানুষের মনে ওইসব ব্রান্ডের মতো স্থায়ী জায়গা নিতে পারছে না। সেই ভাবনার খোরাকের জন্য আজকের লেখা।
ব্র্যান্ডিং আসলে কী? পণ্য ও ব্র্যান্ডের পার্থক্য
অনেকে মনে করেন সুন্দর একটি লোগো আর নাম থাকলেই ব্র্যান্ডিং হয়ে গেল। আসলে তা নয়। পণ্য বা প্রোডাক্ট তৈরি হয় কারখানায়, আর ব্র্যান্ড তৈরি হয় মানুষের মস্তিষ্কে। পণ্য হলো তা-ই যা আপনি বিক্রি করছেন, আর ব্র্যান্ড হলো সেই প্রতিশ্রুতি (Promise) যা আপনি কাস্টমারকে দিচ্ছেন।
আমাদের দেশের কোম্পানিগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা অনেক ক্ষেত্রে মাল্টিন্যাশনালদের সাথে প্রতিযোগিতা করে সাকসেসফুলি মার্কেট শেয়ার ধরে রাখছে, কিন্তু ব্র্যান্ড হিসেবে তারা এখনো ততটা রিকগনাইজড নয়। এর কারণ হলো, আমরা ‘প্রোডাক্ট’ বা পণ্য তৈরিতে যতটা মনযোগী, ‘ব্র্যান্ডিং’ বা ইমোশনাল কানেকশন তৈরিতে ততটা নই। মনে রাখবেন, Brand is more than a product. পণ্য সময়ের সাথে পুরনো হয় বা পরিবর্তন হয়, কিন্তু ব্র্যান্ড মানুষের মনে বেঁচে থাকে।
ব্র্যান্ডিং কেন আপনার ব্যবসার সবচেয়ে বড় সম্পদ?
নতুন উদ্যোক্তাদের অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, “আমি মাত্র ব্যবসা শুরু করেছি, এখনই ব্র্যান্ডিং নিয়ে ভাবার কী দরকার?” তাদের জন্য একটি বিস্ময়কর উদাহরণ দেওয়া যাক।
বিশ্বখ্যাত ফাস্টফুড চেইন ম্যাকডোনাল্ডস (McDonald’s)-এর কথা ভাবুন। বর্তমানে তাদের স্থাবর সম্পত্তির (জমি, দালান, যন্ত্রপাতি) বাজার মূল্য প্রায় ৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু কেবল তাদের ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ বা ওই সোনালী ‘M’ লোগো এবং নামটির বাজারমূল্যই ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার!
এর মানে কী দাঁড়ালো? আজ যদি কোনো বড় কোম্পানি বা ইনভেস্টর পুরো ম্যাকডোনাল্ডসকে টেক-ওভার করতে চায়, তবে তাকে কমপক্ষে ৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করতে হবে। অথচ বিনিময়ে সে মাত্র ৩৬ বিলিয়ন ডলারের দৃশ্যমান সম্পদ পাবে। বাকি ৩৯ বিলিয়ন ডলার সে দিচ্ছে কেবল সেই ‘নাম’ এবং মানুষের ‘বিশ্বাসের’ জন্য যা কয়েক দশক ধরে গড়ে তোলা হয়েছে। ব্র্যান্ড এভাবেই দৃশ্যমান সম্পদের চেয়েও বড় সম্পদে পরিণত হয়।
ব্র্যান্ড কিন্তু উদ্যোক্তা তৈরি করে না, তৈরি করে কাস্টমার
একজন নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে এটি আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় লেসন হতে পারে। আপনি কোটি টাকা খরচ করে বিজ্ঞাপন দিতে পারেন, কিন্তু ব্র্যান্ড আপনি নিজে একা তৈরি করতে পারবেন না। ব্র্যান্ড তৈরি করবে আপনার কাস্টমাররা। বিষয়টি একটি সহজ উদাহরণের মাধ্যমে পরিষ্কার করি।
আপনাকে যদি আমি এখনই জিজ্ঞেস করি—ঢাকার সেরা কয়েকটা বিরিয়ানির নাম বলুন তো?
আপনি কোনো সময় না নিয়ে গড়গড় করে বলতে শুরু করবেন: হাজীর বিরিয়ানি, ফখরুদ্দিনের বিরিয়ানি, নান্নার বিরিয়ানি…। ঢাকায় তো কয়েক হাজার বিরিয়ানির দোকান আছে, তবে কেন আপনার মাথায় এই নামগুলোই প্রথম এলো? আপনার উত্তরটা সম্ভবত এমন হবে— “ভাই, এই বিরিয়ানিগুলোর স্বাদ আলাদা, তারা মান বজায় রাখে, দীর্ঘদিনের একটা ঐতিহ্য আছে এবং কাস্টমার রিলেশন ভালো।”
খেয়াল করে দেখুন, এই পজিটিভ কারণগুলো যখন আপনি রিয়ালাইজ করেছেন এবং অন্যদের কাছে নামগুলো বলছেন, তখন কিন্তু আপনি নিজেই তাদের ব্র্যান্ডিং করছেন। কাস্টমার যখন একটি পণ্যের কোয়ালিটি নিয়ে সন্তুষ্ট হয় এবং মানসিকভাবে পণ্যটির সাথে জড়িয়ে পড়ে, তখনই একটি সাকসেসফুল ব্র্যান্ডের জন্ম হয়। উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার কাজ হলো সেই বীজটি বপন করা, আর কাস্টমার তা মহীরুহে পরিণত করবে।
কোকা-কোলার ৯ বোতল থেকে বিশ্বজয়
উদ্যোক্তা জীবনের শুরুটা সবসময় ছোট হয়, কিন্তু ব্র্যান্ডিংয়ের শক্তি তাকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত কোকা-কোলা। ১৮৮৬ সালে যখন জর্জিয়ার আটলান্টা শহরে কার্বোনেটেড কোমল পানীয় হিসেবে কোকা-কোলা যাত্রা শুরু করে, তখন তারা প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৯ বোতল পানীয় বিক্রি করতে পারতো।
সেই ৯ বোতলের কোম্পানি আজ বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন ১.৯ বিলিয়ন সারভিং বিক্রি করছে। এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের পেছনে মূল চাবিকাঠি ছিল তাদের ধারাবাহিক ব্র্যান্ডিং এবং কাস্টমারের সাথে ইমোশনাল কানেকশন। কোকা-কোলা কেবল একটি চিনিযুক্ত পানীয় বিক্রি করেনি, তারা বিক্রি করেছে ‘সুখ’ বা ‘Happiness’। এটিই ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষমতা।
মার্কেটিয়ার বনাম কনজ্যুমার
একজন উদ্যোক্তা বা মার্কেটিয়ারের দায়িত্ব হলো প্রোডাক্টের যাবতীয় গুণাগুণ কনজ্যুমারের কাছে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারক হলো কনজ্যুমার। আপনার প্রোডাক্টের ফিজিক্যাল অ্যাট্রিবিউট বা গুণাবলী যদি তাদের পছন্দ হয় এবং তারা যদি বারবার সেটি গ্রহণ করতে চায়, তবেই আপনি একটি ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারবেন। অন্যথায়, হাজারো পণ্যের ভিড়ে আপনাকে মার্কেট থেকে হারিয়ে যেতে হবে।
ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রেও এই ‘Wholeness’ বা পূর্ণতা খুব জরুরি। পশ্চিমা ধারায় ব্র্যান্ডিংকে কেবল বিপণন কৌশল হিসেবে দেখা হলেও, প্রাচ্যের দর্শনে এটি একটি জীবনবোধ বা আস্থার সম্পর্ক। আপনি যখন আপনার পণ্যকে স্রেফ লাভ-ক্ষতির উর্ধ্বে নিয়ে একটি আস্থার প্রতীক হিসেবে গড়বেন, তখনই তা পূর্ণতা পাবে।
ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে ব্যবসার গতিপথ কেমন হয়?
নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় আশার কথা হলো, একবার যদি আপনার ব্র্যান্ড মানুষের মনে জায়গা করে নেয়, তবে আপনার মার্কেটিং করাটা অনেক সহজ হয়ে যায়।
১. বিজ্ঞাপন খরচ কমে আসা: আপনাকে আর চিল্লিয়ে বলতে হবে না আপনার পণ্য কত ভালো। কাস্টমাররা নিজেরাই আপনার প্রোডাক্ট খুঁজে নেবে।
২. মূল্য নির্ধারণে স্বাধীনতা: একটি ব্র্যান্ডেড প্রোডাক্টের জন্য কাস্টমার সবসময় একটু বেশি মূল্য দিতে রাজি থাকে, কারণ সেখানে ‘কোয়ালিটির নিশ্চয়তা’ থাকে।
৩. স্থায়িত্ব: তখন আপনাকে নতুন কাস্টমারের পেছনে যতটা ছুটতে হবে, তার চেয়ে বেশি মনযোগ দিতে হবে কোয়ালিটি ধরে রাখায়। বিজ্ঞাপন তখন আর পণ্য বিক্রির টুল থাকে না, বরং তা হয় কাস্টমারকে মনে করিয়ে দেওয়া—‘আমরা আছি।’
নতুন উদ্যোক্তাদের প্রতি আমার ৩টি পরামর্শ
১. কোয়ালিটির সাথে আপস নয়: ব্র্যান্ডিংয়ের ভিত্তি হলো কোয়ালিটি। হাজীর বিরিয়ানি বা ফখরুদ্দিন যদি কোয়ালিটি ছেড়ে দিতো, তবে আজ তারা ব্র্যান্ড থাকতো না। তাই ব্র্যান্ডিং করার আগে নিশ্চিত করুন আপনার পণ্যটি সেরা।
২. একটি গল্প তৈরি করুন: মানুষ পণ্য কেনে না, মানুষ গল্প কেনে। আপনার ব্যবসার পেছনে একটি উদ্দেশ্য বা একটি সুন্দর গল্প রাখুন যা মানুষের হৃদয়ে স্পর্শ করে।
৩. ধৈর্য ধরুন: ব্র্যান্ডিং রাতারাতি হয় না। কোকা-কোলা বা ম্যাকডোনাল্ডসের আজকের অবস্থানে আসতে কয়েক দশক লেগেছে। শুরুটা ছোট হলেও ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন।
পরিশেষে বলবো, আপনি কেবল একটি দোকান বা কারখানা দিচ্ছেন না, আপনি একটি লিগ্যাসি তৈরির পথে হাঁটছেন। আপনার সততা, পরিশ্রম আর সৃজনশীলতা দিয়ে আজই আপনার ব্র্যান্ডের ভিত্তি স্থাপন করুন। হয়তো কালকের ‘হাজীর বিরিয়ানি’ কিংবা ‘কোকা-কোলা’ হবে আপনার কোম্পানিটিই।
শুভকামনা সব নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য।
আরও দেখুন:
