আমি দীর্ঘ সময় প্রধান তথ্য প্রযুক্তি কর্মকর্তা (CIO) হিসেবে কাজ করার সুবাদে একটি বিষয় খুব কাছ থেকে দেখেছি—এই চেয়ারটি কেবল প্রযুক্তি পরিচালনার জায়গা নয়, এটি একটি প্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন আর বাস্তবতাকে এক সুতোয় বাঁধার কারিগর। দীর্ঘ এই পথপরিক্রমায় আমি অনেকবার সফল হয়েছি, আবার অনেক সময় হাত পুড়িয়ে কঠিন সব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিখেছি কীভাবে বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, কীভাবে সঠিক প্রযুক্তি বেছে নিতে হয় আর কীভাবে একঝাঁক দক্ষ মানুষকে আগলে রাখতে হয়।
আমার দীর্ঘদিনের এই অভিজ্ঞতার নির্যাস থেকে এখন আমার একটিই বড় স্বপ্ন—বাংলাদেশের আইটি অঙ্গন থেকে এমন একঝাঁক যোগ্য ও অসাধারণ তথ্য প্রযুক্তি কর্মকর্তা গড়ে উঠুক, যারা শুধু দেশের ভেতরে নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখবে। আমি চাই আমাদের দেশের সন্তানরা তাদের যোগ্যতার জোরে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর গ্লোবাল লিডারশিপের হাল ধরুক।
সেই লক্ষ্যেই আমি এই ১০ পর্বের সিরিজটি শুরু করছি। এখানে আমি আমার দেখা বাস্তব চ্যালেঞ্জ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং আইটি নেতৃত্বের সূক্ষ্ম কৌশলগুলো সহজভাবে তুলে ধরব। এটি কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং একজন অভিজ্ঞ মানুষের চোখ দিয়ে আগামীর সিআইও (CIO) হয়ে ওঠার বাস্তব এক গাইডলাইন। আশা করি, আমার এই প্রচেষ্টা আগামী দিনের তথ্য প্রযুক্তি নেতাদের পরিশ্রম কিছুটা হলেও কমাবে এবং তাদের সাফল্যের পথকে প্রশস্ত করবে।
চলুন শুরু করা যাক সেই কাঙ্ক্ষিত যাত্রা—যেখানে প্রযুক্তি আর দূরদর্শিতা মিলে তৈরি হবে আগামীর এক একজন বিশ্বসেরা সিআইও।

পর্ব ১: সিআইও পদের বিবর্তন ও আধুনিক ‘নেভিগেশন হুইল’
তথ্যপ্রযুক্তি পেশায় যারা ক্যারিয়ার শুরু করেন, তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই চূড়ান্ত গন্তব্য থাকে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ আইটি পদটি। কেউ একে বলেন সিআইও (CIO), কেউ সিটিও (CTO), আবার কেউ বলেন হেড অফ আইটি। কিন্তু এই চেয়ারে বসার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিটা আসলে কী, তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই ধোঁয়াশা আছে। একজন সফল আইটি প্রধান হয়ে ওঠার প্রথম পাঠ হলো—এই পদের বিবর্তন বোঝা এবং এর বিশাল কর্মপরিধিকে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: কারিগরি ব্যবস্থাপক থেকে বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক
একটা সময় ছিল যখন আইটি প্রধানের মূল কাজ ছিল স্রেফ রক্ষণাবেক্ষণ। অফিসের পিসি নষ্ট হলো কি না, ইমেইল সার্ভার ঠিক আছে কি না, কিংবা প্রিন্টারে কালি আছে কি না—এগুলোই ছিল আইটি ম্যানেজারের মূল চিন্তা। তখন আইটি ছিল একটি ‘সাপোর্ট ফাংশন’। কিন্তু সময় বদলেছে। বিশ্বব্যাপী এই পদের সংজ্ঞায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে ১৯৯৬ সালে, যখন আমেরিকায় ‘ক্লিঙ্গার-কোহেন অ্যাক্ট’ (Clinger-Cohen Act) পাস হয়।
এই আইনের মাধ্যমে সিআইও পদটিকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়। এই আইনের মূল দর্শন ছিল—তথ্যপ্রযুক্তি প্রধান কেবল একজন কারিগরি বিশেষজ্ঞ (Technical Specialist) নন, বরং তিনি একজন ‘তথ্যপ্রযুক্তি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক’ (IT Investment Manager)। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি পয়সা যা প্রযুক্তিতে ব্যয় হচ্ছে, তার পেছনে বাণিজ্যিক যুক্তি এবং মুনাফার হিসাব দেওয়ার প্রধান ব্যক্তিটিই হলেন সিআইও। কারিগরি দক্ষতার চেয়েও এখানে কৌশলগত সিদ্ধান্তের গুরুত্ব অনেক বেশি। এই আইনের প্রভাবেই আজ বিশ্বজুড়ে বড় বড় কর্পোরেট হাউজগুলোর পরিচালনা পর্ষদে বা ম্যানেজমেন্ট বোর্ডে সিআইও-দের জন্য স্থায়ী আসন তৈরি হয়েছে।
সিআইও নেভিগেশন হুইল: আপনার পথচলার কম্পাস
একজন সিআইও-কে যদি আমরা একটি বিশাল জাহাজের নাবিক হিসেবে কল্পনা করি, তবে তার সামনের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য একটি নেভিগেশন হুইল বা চালক-চক্র প্রয়োজন। আমেরিকার ফেডারেল সিআইও কাউন্সিল এই চক্রটি তৈরি করেছে, যা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এই হুইলের মধ্যে বড় দাগে সিআইও-র ১০টি মূল দায়িত্ব বা ‘কমপিটেন্সি’ তুলে ধরা হয়েছে। সফল তথ্যপ্রযুক্তি প্রধান হওয়ার জন্য এই ১০টি বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জনের কোনো বিকল্প নেই।
চলুন সংক্ষেপে এই ১০টি স্তম্ভের গভীরে ঢোকা যাক:
১. নীতি ও কৌশল প্রণয়ন (Strategic Planning): এটি হলো ব্যবসার লক্ষ্যের সাথে প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো। কোম্পানি আগামী ৫ বছরে কোথায় যেতে চায় এবং প্রযুক্তি সেখানে কীভাবে সাহায্য করবে, সেই রোডম্যাপ তৈরি করা।
২. বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা (Capital Planning & Investment Control): প্রতিষ্ঠানের বাজেট থেকে প্রযুক্তির জন্য যে বরাদ্দ পাওয়া যায়, তার প্রতিটি টাকার হিসাব রাখা এবং তা থেকে সর্বোচ্চ মুনাফা বা ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’ (ROI) নিশ্চিত করা।
৩. পারফরম্যান্স মূল্যায়ন (Performance & Results-Based Management): প্রযুক্তির ব্যবহার কি সত্যিই কাজ সহজ করছে? নাকি এটি কেবল একটি দামি খেলনা হয়ে পড়ে আছে? সেটি মানদণ্ড দিয়ে বিচার করা।
৪. প্রক্রিয়া উন্নয়ন (Process Improvement): ব্যবসার পুরনো ও ধীরগতির কাজগুলোকে আইটির মাধ্যমে কীভাবে আরও দ্রুত এবং নির্ভুল করা যায়, সেই পথ বের করা।
৫. প্রজেক্ট ও প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট: বড় বড় আইটি প্রজেক্টগুলো নির্ধারিত সময়ে এবং বাজেটের মধ্যে সফলভাবে শেষ করার নেতৃত্ব দেওয়া।
৬. আইটি আর্কিটেকচার (Enterprise Architecture): প্রতিষ্ঠানের পুরো নেটওয়ার্ক, ডাটাবেজ এবং সফটওয়্যার কাঠামোটি কেমন হবে, যাতে তা ভবিষ্যতে ব্যবসার প্রসারের সাথে মানিয়ে নিতে পারে।
৭. সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার ব্যবস্থাপনা: প্রয়োজনীয় কারিগরি রিসোর্সগুলো সঠিক সময়ে কেনা এবং সেগুলোর উপযোগিতা বজায় রাখা।
৮. সাইবার নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা: ডিজিটাল এই যুগে প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো ‘তথ্য’। সেই তথ্যকে হ্যাকার বা অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ থেকে রক্ষা করার পূর্ণ দায়িত্ব সিআইও-র।
৯. মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা: আইটি বিভাগে যারা কাজ করছেন, তাদের দক্ষতা বাড়ানো, নতুন নেতৃত্ব তৈরি করা এবং একটি দক্ষ টিম গঠন করা।
১০. যোগাযোগ ও সমন্বয়: কারিগরি জটিল বিষয়গুলোকে সাধারণ মানুষের বা বোর্ডের কর্মকর্তাদের ভাষায় সহজ করে বুঝিয়ে বলা।
কেন এই হুইল আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
আমি আমার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দেখেছি, অনেক প্রতিভাবান আইটি পেশাজীবী কেবল এই ১০টি দিকের সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে সারা জীবন মিড-লেভেল ম্যানেজমেন্টেই আটকে থাকেন। তারা খুব ভালো কোডিং করতে পারেন, নেটওয়ার্কিং বোঝেন, কিন্তু যখনই বাজেট, স্ট্র্যাটেজি বা বিজনেস ভ্যালুর কথা আসে, তখন তারা খেই হারিয়ে ফেলেন।
আগামী দিনের সিআইও যারা হতে চান, তাদের জন্য আমার পরামর্শ হলো—আজ থেকেই এই ‘নেভিগেশন হুইল’ বা ডায়াগ্রামটিকে আপনার মনের পর্দায় গেঁথে নিন। আপনার প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজগুলোকে এই ১০টি গ্রুপের অধীনে ভাগ করার চেষ্টা করুন। যখনই কোনো নতুন প্রজেক্ট হাতে নেবেন, নিজেকে প্রশ্ন করুন—এটি কি আমার ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের অংশ? নাকি এটি রিস্ক ম্যানেজমেন্টের সাথে যুক্ত?
মনে রাখবেন, সিআইও হওয়া মানে কেবল একটি পদ পাওয়া নয়, এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি (Mindset)। এই ডায়াগ্রামটি আপনাকে সেই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে সাহায্য করবে। এটি আপনার টার্মিনালের ওয়ালপেপার করে রাখতে পারেন, যাতে চোখ গেলেই মনে পড়ে—আপনার লক্ষ্য কেবল কারিগরি সমাধান নয়, বরং একজন বিজনেস লিডার হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা।
পর্ব ২: স্বপ্ন ও বাস্তবতার ব্যবধান — ‘যাদুর কাঠি’ বনাম দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতি
আইটি পেশায় যারা ক্যারিয়ার শুরু করেন, তাদের বড় একটি অংশের চোখে রঙিন স্বপ্ন থাকে—একদিন তারা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বসবেন। সিআইও (CIO) বা সিটিও (CTO) হওয়ার সেই স্বপ্ন দেখা মোটেও দোষের কিছু নয়, বরং তা পেশাগত উন্নতির জন্য জরুরি। কিন্তু এই স্বপ্নের পেছনে যে কঠিন বাস্তবতা এবং প্রস্তুতির দীর্ঘ পথ থাকে, তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই এক ধরণের অলীক ধারণা কাজ করে। আমি আমার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এমন অনেক তরুণ পেশাজীবীকে দেখেছি, যারা মনে করেন একটি পদ বা চেয়ারে বসা মানেই কেবল সুযোগ-সুবিধা আর ক্ষমতার অধিকারী হওয়া। কিন্তু সেই চেয়ারের দায়বদ্ধতা এবং সেখানে পৌঁছানোর লড়াইটা তারা অনেক সময় তলিয়ে দেখেন না।
যাদুর কাঠির মোহ এবং অলীক প্রত্যাশা
একজন সিআইও বা হেড অফ আইটি-র কথা ভাবলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে—একটি অভিজাত অফিস, বিশাল ব্যাংক ব্যালেন্স, একাধিক কোম্পানি গাড়ি এবং সামাজিক মর্যাদা। আজকের দিনে ব্যবসায় প্রযুক্তি এতটাই অপরিহার্য হয়ে উঠেছে যে, বড় বড় দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের এই শীর্ষ পদের জন্য মোটা অংকের অর্থ বিনিয়োগ করতে দ্বিধা করছে না। তারা একজন যোগ্য নেতা চান, যিনি তাদের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগের সুরক্ষা দেবেন এবং মুনাফা নিশ্চিত করবেন।
সমস্যাটা বাঁধে যখন নবীন আইটি পেশাজীবীরা এই পদের চাকচিক্য দেখে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তারা যেন অবচেতন মনে কোনো একটি ‘যাদুর কাঠি’র সন্ধান করেন। তারা আশা করেন এমন কোনো শর্টকাট পথ বা গোপন কৌশল থাকবে, যা তাদের খুব দ্রুত এবং খুব কম পরিশ্রমে ওই কাঙ্ক্ষিত চেয়ারে বসিয়ে দেবে। এমনকি কেউ কেউ এমনও চান যে, সেই যাদুর কাঠিটি খুঁজে পেতেও যেন তাদের খুব বেশি কষ্ট করতে না হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—আইটি ম্যানেজমেন্টের এই শীর্ষ স্তরে পৌঁছানোর কোনো শর্টকাট নেই। যারা সেই অলীক কাঠির অপেক্ষায় দিন পার করেন, শেষ পর্যন্ত তাদের ভাগ্যে ওই চেয়ারটি আর জোটে না। স্বপ্ন কেবল আজীবন স্বপ্নই থেকে যায়।
দুই ধরণের পেশাদার: বিশেষজ্ঞ বনাম ব্যবস্থাপক
আইটি পেশায় যারা টিকে যান, তাদের মধ্যে মূলত দুটি ধারা দেখা যায়।
প্রথম ধারাটি হলো—বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ (Subject Matter Expert):
এই দলের সদস্যরা কোনো একটি নির্দিষ্ট কারিগরি বিষয়ে (যেমন: কোডিং, নেটওয়ার্কিং বা সাইবার সিকিউরিটি) অসম্ভব দক্ষ হতে চান। তারা প্রযুক্তির গভীরে ডুব দিতে ভালোবাসেন। কিন্তু যখনই ম্যানেজমেন্ট বা নেতৃত্বের কোনো দায়িত্ব তাদের সামনে আসে, তারা সেটাকে ‘ঝামেলা’ মনে করেন। তারা মানুষের সাথে কথা বলা, বাজেট করা বা ব্যবসায়িক কৌশল তৈরির চেয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনের সামনে কোডিং করতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। ফলে তারা খুব ভালো ইঞ্জিনিয়ার হতে পারেন, কিন্তু লিডার হতে পারেন না।
দ্বিতীয় ধারাটি হলো—উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্যবস্থাপক:
এই দলের সদস্যরা দ্রুত বড় পদে যেতে চান। কিন্তু তাদের মধ্যে আবার কারিগরি জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে এক ধরণের অনীহা দেখা যায়। তারা মনে করেন, ম্যানেজমেন্ট মানেই কেবল অর্ডার দেওয়া এবং তদারকি করা। অথচ একজন সিআইও-কে যখন কোটি টাকার প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্তের ঝুঁকি নিতে হয়, তখন তার কারিগরি ভিত মজবুত না থাকলে তিনি ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
বাস্তবতা হলো, চূড়ান্ত পর্যায়ে তথ্য প্রযুক্তি প্রধান হওয়ার দৌড়ে প্রতিযোগীর সংখ্যা আসলে খুব বেশি থাকে না। কারণ, কারিগরি জ্ঞান (Technology), ব্যবসায়িক বোঝাপড়া (Business Sense) এবং ব্যবস্থাপনা দক্ষতা (Management)—এই তিনটির সমন্বয় আছে এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। যারা ধৈর্য ধরে এই তিনটি গুণ সমানভাবে অর্জন করতে পারেন, তারাই প্রতিযোগিতায় অনেককে পেছনে ফেলে সময়ের আগেই শীর্ষ পদে বসে যান।
দায়বদ্ধতা: চাকুরিজীবী বনাম উদ্যোক্তা মনোভাব
একজন সাধারণ চাকুরিজীবী সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করেন এবং তার নির্দিষ্ট দায়িত্ব শেষে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু একজন সিআইও-র জন্য সময়সীমা বলে কিছু নেই। ব্যবসা এখন ২৪ ঘণ্টা চলে, তাই প্রযুক্তিকেও ২৪ ঘণ্টা সচল রাখতে হয়। এই চেয়ারের দায়বদ্ধতা একজন সাধারণ চাকুরিজীবীর সীমানা ছাড়িয়ে উদ্যোক্তার কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
একজন উদ্যোক্তা যেমন তার প্রতিষ্ঠানের লাভ-ক্ষতির প্রতিটি পেন্সের হিসাব রাখেন এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধে নেন, একজন সিআইও-কেও ঠিক সেই মানসিকতা পোষণ করতে হয়। সিস্টেম ডাউন হওয়া মানে কেবল সার্ভার বন্ধ হওয়া নয়, বরং কোম্পানির কয়েক লাখ বা কোটি টাকার ক্ষতি হওয়া। এই যে চাপের মুখে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা—এটিই একজন নেতাকে সাধারণ কর্মী থেকে আলাদা করে।
কীভাবে নিজেকে তৈরি করবেন?
আমি আমার দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় অনেক সময় সহজভাবে শিখেছি, আবার কখনও অনেক বড় মাশুল দিয়ে বা হাত পুড়িয়ে শিখেছি। যারা আগামীর সিআইও হতে চান, তাদের জন্য আমার পরামর্শ হলো—পেশার শুরুর দিন থেকেই নিজেকে ‘বিজনেস লিডার’ হিসেবে ভাবতে শুরু করুন।
টেকনোলজিতে দক্ষ হোন: নিজের কোর কারিগরি বিষয়ে কোনো ছাড় দেবেন না।
ব্যবসার ভাষা শিখুন: আপনার প্রতিষ্ঠানের লাভ কোথা থেকে আসে আর খরচ কোথায় হয়, তা জানুন।
ব্যবস্থাপনা বুঝুন: মানুষকে পরিচালনা করার কৌশল এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করুন।
আপনি যদি এই তিনটি বিষয়ের সমন্বয় ঘটাতে পারেন, তবে সাফল্য আপনার দরজায় কড়া নাড়বেই। মনে রাখবেন, সিআইও হওয়ার জন্য কোনো যাদুর কাঠির দরকার নেই; আপনার দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতি এবং পরিশ্রমই হলো সেই কাঠি যা আপনাকে একদিন শীর্ষ নেতৃত্বে নিয়ে যাবে।
আমি এই সিরিজটির মাধ্যমে আমার সেই তিল তিল করে জমানো অভিজ্ঞতাগুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই, যাতে আপনারা আমার করা ভুলগুলো এড়িয়ে গিয়ে আরও দ্রুত এবং যোগ্যতার সাথে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের আইটি সেক্টরকে তুলে ধরতে পারেন।
পর্ব ৩: সিআইও, সিটিও নাকি হেড অফ আইটি? নামের আড়ালে আসল কাজ কী?
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবীদের কাছে সিআইও (CIO), সিটিও (CTO), সিআইটিও (CITO) বা ‘হেড অফ আইটি’—এই শব্দগুলো যেন একেকটি স্বপ্নের চূড়া। অনেকেই মনে করেন পদগুলোর নাম ভিন্ন হলেও কাজ হয়তো একই। কিন্তু এই পদের নামের পেছনে লুকিয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানের ধরন এবং সেই ব্যক্তির ওপর অর্পিত সুনির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব। ক্যারিয়ারের শুরুতে এই পদের আভিজাত্য বা এর সাথে জড়িয়ে থাকা মোটা অংকের ব্যাংক ব্যালেন্স, সুসজ্জিত বড় অফিস কিংবা দামি গাড়ির সুবিধাগুলো আমাদের আকর্ষণ করে। কিন্তু এই চাকচিক্যের আড়ালে যে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ আর দায়বদ্ধতা থাকে, সেটি বুঝতে পারাটাই একজন সফল লিডার হওয়ার প্রথম সোপান।
পদের নাম বনাম প্রকৃত ভূমিকা
সাধারণত একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এই পদগুলোর কাজ কিছুটা ভিন্ন হয়।
সিআইও (Chief Information Officer): মূলত প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ আইটি পরিকাঠামো, কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেন। তার মূল ফোকাস থাকে—কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের খরচ কমানো যায় এবং কাজকে সহজ করা যায়।
সিটিও (Chief Technology Officer): সাধারণত যখন প্রতিষ্ঠানটি নিজেই কোনো প্রযুক্তিগত পণ্য বা সেবা বিক্রি করে, তখন সিটিও-র গুরুত্ব বাড়ে। তার কাজ হলো আগামীর প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করা এবং গ্রাহকের জন্য সেরা প্রযুক্তি পণ্য তৈরি করা।
সিআইটিও (Chief Information Technology Officer): এটি মূলত সিআইও এবং সিটিও-র একটি সমন্বিত রূপ, যেখানে তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন—উভয়ই একজনকে সামলাতে হয়।
তবে পদের নাম যাই হোক না কেন, আধুনিক ব্যবসায়িক বিশ্বে এদের মূল ভূমিকা এখন আর শুধু ‘সার্ভার রুম’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন তাদের বসতে হয় ম্যানেজমেন্ট বোর্ডে, সরাসরি সিইও (CEO) বা এমডি-র পাশে।
আসল কাজ: আভিজাত্য নয়, দায়বদ্ধতা
একজন আইটি প্রধানের প্রতিদিনের কাজ কী? তিনি কি শুধু নির্দেশ দেন? মোটেও না। তার কাজের তালিকায় থাকে—কৌশলগত পরিকল্পনা (Strategic Planning), দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ পরিকল্পনা, এবং সেই বিনিয়োগের সঠিক ব্যবস্থাপনা। তাকে প্রতিনিয়ত প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন মূল্যায়ন করতে হয়। আজ যে সফটওয়্যারটি সেরা, কাল হয়তো তা অকেজো হয়ে যেতে পারে। কোটি কোটি টাকার ক্রয়ে বা ইনভেস্টমেন্টে ভুল সিদ্ধান্ত নিলে প্রতিষ্ঠানের বিশাল ক্ষতি হতে পারে, আর সেই ভুলের পুরো দায়ভার এই চেয়ারটিকেই নিতে হয়।
এছাড়া তাকে লিডারশিপ বা নেতৃত্ব তৈরিতে মন দিতে হয়। একজন আইটি প্রধান একা সব কাজ করেন না, বরং তিনি এমন একঝাঁক দক্ষ কর্মী তৈরি করেন যারা প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে। তাকে ‘ফলাফল ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা’ বা Result-oriented management নিশ্চিত করতে হয়। দিনশেষে বোর্ড বা মালিকপক্ষ জানতে চায়—আইটিতে ৫ কোটি টাকা খরচ করে কোম্পানির মুনাফা বা কর্মদক্ষতা কতটুকু বাড়লো? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং তা প্রমাণ করাটাই হলো সিআইও-র আসল চ্যালেঞ্জ।
যাদুর মতো সফলতা এবং ব্যর্থতার দায়
আইটি প্রধানের কাজের একটি রোমাঞ্চকর দিক হলো—মাঝে মাঝে তাকে জাদুকরের মতো পারফরম্যান্স দেখাতে হয়। হয়তো সিস্টেম ক্রাশ করেছে, ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম, সবাই তাকিয়ে আছে আইটি প্রধানের দিকে। সেখানে কয়েক মিনিটের মধ্যে সমাধান বের করে আনাটা যেমন চরম সার্থকতা দেয়, তেমনি এর উল্টো পিঠও আছে। আইটি প্রজেক্টে সফলতার অনেক অংশীদার থাকে, কিন্তু ব্যর্থতার দায়ভার সিআইও-কে একাই নিতে হয়। এই যে ‘ব্যর্থতার পুরো দায়ভার’ কাঁধে নেওয়ার সাহস—এটিই একজন সাধারণ ম্যানেজার থেকে একজন প্রকৃত সিআইও-কে আলাদা করে।
উদ্যোক্তা বনাম চাকুরিজীবী মানসিকতা
আগে আইটি বিভাগকে দেখা হতো অর্থ বা প্রশাসন বিভাগের একটি ছোট্ট অংশ হিসেবে। কখনও কখনও বিভাগীয় প্রধান ছাড়াই আইটি চলতো। কিন্তু এখন প্রেক্ষাপট ভিন্ন। দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলো এখন আইটি প্রধানের পেছনে বড় বিনিয়োগ করছে। কেন? কারণ আইটি এখন আর স্রেফ খরচ নয়, এটি একটি লাভের ক্ষেত্র।
এই চেয়ারে বসে যারা কেবল ‘চাকুরিজীবী’র মতো চিন্তা করেন যে, “মাস শেষে বেতন পাবো আর ৮ ঘণ্টা ডিউটি করবো”—তারা খুব দ্রুতই এই পদ থেকে ছিটকে পড়েন। সফল আইটি প্রধানের মানসিকতা হতে হয় একজন ‘উদ্যোক্তা’র (Entrepreneur) মতো। তাকে ভাবতে হয় প্রতিষ্ঠানটি তার নিজের। সিস্টেমের প্রতিটি খুঁটিনাটি তাকে নজরে রাখতে হয়। ব্যবসার চাকা যেন এক মুহূর্তের জন্যও থমকে না যায়, তা নিশ্চিত করতে তার দায়বদ্ধতা ৮ ঘণ্টা থেকে ২৪ ঘণ্টায় পৌঁছে যায়।
প্রস্তুতি যেখানে হওয়া উচিত
আমি শুরু থেকেই একটি কথা বলে আসছি—প্রযুক্তি পেশায় যারা টিকে যায়, তাদের একটি বড় অংশ কেবল ‘টেকনিক্যাল স্পেশালিস্ট’ হয়ে থাকতে পছন্দ করে। তারা মনে করে আইটি ম্যানেজমেন্ট মানে প্রচুর মিটিং, ইমেইল আর ঝামেলার কাজ। এই সুযোগটিই নেন দূরদর্শী পেশাজীবীরা। যারা বুঝেন যে, শুধু কোডিং বা নেটওয়ার্কিং জানলে শীর্ষ পদে যাওয়া সম্ভব নয়।
একজন সিআইও হতে হলে আপনাকে কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি বাণিজ্যিক ও ব্যবস্থাপনা জ্ঞান অর্জন করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা কীভাবে চলে, টাকা কোথা থেকে আসে, গ্রাহক কী চায়—এই বিষয়গুলো যেদিন আপনি আপনার টেকনিক্যাল নলেজের সাথে মেলাতে পারবেন, সেদিনই আপনি এই চেয়ারের জন্য যোগ্য হয়ে উঠবেন।
পর্ব ৪: প্রতিষ্ঠানকে বুঝতে পারা—প্রযুক্তি নয়, আগে ব্যবসা চিনুন
একজন প্রধান তথ্য প্রযুক্তি কর্মকর্তা বা সিআইও হিসেবে সফল হওয়ার পথে সম্ভবত সবচেয়ে বড় এবং প্রথম কাজটি হলো—আইটি প্রধানের কাজের আসল ধরনটি বুঝতে পারা। এটি শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও, অনেক ঝানু আইটি বিশেষজ্ঞও এই একটি জায়গায় এসে খেই হারিয়ে ফেলেন। সিআইও হতে চাইলে আপনাকে প্রথমে আপনার প্রতিষ্ঠানের ‘ব্যবসা’ বা মূল কার্যক্রম সম্পর্কে পানির মতো পরিষ্কার ধারণা নিতে হবে। এটিই প্রধান কাজ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও ‘নম্বর’-এর খেলা
যেকোনো বাণিজ্যিক বা অবাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। কেউ চায় পণ্যের গুণগত মান (Quality) নিশ্চিত করতে, কেউ চায় বাজারে সবচেয়ে কম মূল্যে (Cost) পণ্য দিতে। এই মান বা মূল্যের হিসাব কষার জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত সবকিছুকে কিছু ‘নম্বর’-এ রূপান্তরিত করে। লাভ-ক্ষতির খতিয়ান বা ব্যালেন্স শিটের ওই নম্বরগুলোর কমবেশিতেই প্রতিষ্ঠানের সাফল্য বা ব্যর্থতা মাপা হয়।
একজন তথ্য প্রযুক্তি প্রধান হিসেবে আপনার সব আয়োজন হওয়া উচিত সেই নম্বরগুলোকে ঘিরে। যে উদ্যোগ বা প্রযুক্তি ওই নম্বরগুলোর ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে না, প্রতিষ্ঠানের কাছে তার কোনো মূল্য নেই। আপনি হয়তো বিশাল এক সার্ভার ফার্ম বসালেন বা খুব আধুনিক একটি সফটওয়্যার আনলেন, কিন্তু তা যদি কোম্পানির মুনাফা বাড়াতে বা খরচ কমাতে সাহায্য না করে, তবে ওই প্রতিষ্ঠানের কাছে আপনার সেই মহৎ কাজের কোনো দাম নেই।
পরিষ্কার ধারণা নিতে হবে যেখানে
আইটি প্রধান হিসেবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনাকে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে। এই উত্তরগুলো যত স্পষ্ট হবে, আপনার সিদ্ধান্ত তত নিখুঁত হবে:
১. মূল কার্যক্রম কী: প্রতিষ্ঠানটি আসলে কী করে? এটি কি সেবা দেয় নাকি পণ্য তৈরি করে?
২. লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিষ্ঠানটি কোথায় পৌঁছাতে চায়?
৩. প্রতিযোগী কারা: আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রতিদ্বন্দ্বী কারা এবং তারা কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে?
৪. ভোক্তা বা গ্রাহক কারা: গ্রাহকরা কীভাবে আপনার পণ্য বা সেবা গ্রহণ করেন? তাদের পছন্দ-অপছন্দ কী?
৫. সাফল্যের মানদণ্ড: প্রতিষ্ঠান তার সফলতা বা বিফলতা কীভাবে মূল্যায়ন করে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না জেনে যদি আপনি প্রযুক্তির ডালি সাজিয়ে বসেন, তবে আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ ভুল হওয়ার সম্ভাবনা ব্যাপক। সঠিক উত্তরগুলো জানলে আপনি বুঝতে পারবেন—কখন ক্লাউডে যেতে হবে আর কখন লোকাল সার্ভারেই কাজ চলবে।
চিন্তার প্যাটার্ন বদলানো: টেকনিক্যাল বনাম বিজনেস মাইন্ডসেট
সাধারণত যারা কারিগরি বা ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসেন, তাদের চিন্তার একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন থাকে। তারা প্রযুক্তিকে দেখেন নিখুঁত বা ‘পারফেক্ট’ হওয়ার জায়গা থেকে। কিন্তু বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অনেক সময় ‘পারফেক্ট’ হওয়ার চেয়ে ‘কার্যকর’ হওয়া বেশি জরুরি। এই চিন্তার পার্থক্যের কারণেই অনেক সময় আইটি প্রধানদের সাথে বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপকদের ভুল বোঝাবুঝি হয়।
সিআইও হিসেবে কাজ করতে হলে আপনার ‘থিংকিং প্যাটার্ন’ বদলাতে হবে। আপনার চিন্তা শুরু হতে হবে ব্যবসা দিয়ে, মাঝখানে প্রযুক্তিকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে এবং শেষমেশ আবার সেই ব্যবসাতেই ফিরে আসতে হবে। অর্থাৎ, প্রযুক্তির গোলকধাঁধায় হারিয়ে না গিয়ে ব্যবসাকে সহজ করার পথ খুঁজতে হবে।
প্রযুক্তির জন্য ব্যবসা নয়, ব্যবসার জন্য প্রযুক্তি
মনে রাখতে হবে, কোনো প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তির শখ মেটাতে আইটি বিভাগ খোলে না। প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হলো—কম খরচে, দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে কাজ করার মাধ্যমে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো। এই লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত করতেই আমাদের মতো কারিগরি লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয় এবং কোটি কোটি টাকা সিস্টেমের পেছনে খরচ করা হয়।
বাস্তব সত্য হলো, কারিগরি লোকেরা অনেক সময় এটি মেনে নিতে পারেন না। আমাদের চিন্তা অনেক সময় প্রযুক্তিতেই শুরু হয় এবং সেখানেই শেষ হয়। কিন্তু একজন সফল তথ্য প্রযুক্তি প্রধানের কাছে মুনাফার সম্পর্ক ছাড়া সর্বাধুনিক প্রযুক্তিও নিতান্তই মূল্যহীন। আপনাকে বুঝতে হবে, প্রযুক্তি মানেই খরচ। এই খরচ তখনই ‘বিনিয়োগে’ রূপান্তরিত হয়, যখন তা ব্যবসার লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে। আর সেই বিনিয়োগ যখন নির্দিষ্ট মুনাফা এনে দেয়, তখনই আপনি একজন সফল সিআইও হিসেবে গণ্য হন।
সেরা প্রযুক্তি বনাম উপযুক্ত প্রযুক্তি
আমাদের আইটি পেশাজীবীদের মধ্যে বাজারের ‘সেরা’ বা ‘লেটেস্ট’ প্রযুক্তির প্রতি এক ধরনের মজ্জাগত দুর্বলতা থাকে। আমরা সেরা প্রযুক্তি নিয়ে খেলা করার সুযোগ পেতে ভালোবাসি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রতিষ্ঠানের টাকা আমাদের ব্যক্তিগত শখের খেলনা কেনার জন্য নয়।
অনেক সময় আমরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি উন্নত এবং দামী প্রযুক্তি কিনতে চাই, যা হয়তো প্রতিষ্ঠানের আদৌ দরকার নেই। একে বলা হয় ‘ওভার-ইঞ্জিনিয়ারিং’। একজন দক্ষ সিআইও-কে এই আবেগ সংবরণ করতে হবে। সেরা প্রযুক্তির পেছনে না ছুটে ‘উপযুক্ত’ প্রযুক্তি (Appropriate Technology) বাছাই করার শিল্পে দক্ষ হতে হবে। চাকা নতুন করে আবিষ্কার করার প্রয়োজন নেই; বরং বাজারে যা সহজলভ্য, তা দিয়ে কীভাবে প্রতিষ্ঠানের জটিল কাজ সহজ করা যায়, সেটিই হবে আপনার মূলমন্ত্র।
পর্ব ৫: বিনিয়োগের নিয়ন্ত্রণ এবং আইটি বাজেটিং—হিসাব যখন লাভের অংকে
একজন তথ্য প্রযুক্তি প্রধানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো প্রতিষ্ঠানের অর্থ বা বিনিয়োগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। কারিগরি দক্ষতা দিয়ে আপনি হয়তো একটি সিস্টেম দাঁড় করাতে পারেন, কিন্তু সেই সিস্টেমের পেছনে হওয়া প্রতিটি টাকার হিসাব এবং তার বিপরীতে প্রাপ্ত সুফল বা ‘রিটার্ন’ না বুঝলে আপনি কখনোই নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সিআইও (CIO) হতে পারবেন না। এই পর্বে আমরা আলোচনা করব কেন আইটি প্রধানকে একজন দক্ষ বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক হতে হয়।
আইটি বাজেট: খরচ নয়, এটি একটি কৌশলগত বিনিয়োগ
প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বা বোর্ড যখন আইটির জন্য বাজেট বরাদ্দ করে, তারা একে স্রেফ ‘খরচ’ হিসেবে দেখতে চায় না। তারা দেখতে চায় এই টাকা ব্যয় করার ফলে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক লক্ষ্য অর্জনে কতটা অগ্রগতি হলো। এখানেই একজন সাধারণ আইটি ম্যানেজার এবং একজন সিআইও-র পার্থক্য।
সিআইও-কে বুঝতে হবে যে আইটি বাজেট মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত: ১. অপারেশনাল এক্সপেন্ডিচার (OpEx): যা প্রতিদিনের কাজ সচল রাখার জন্য ব্যয় হয় (যেমন: ইন্টারনেট বিল, লাইসেন্স রিনিউয়াল বা বেতন)। ২. ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার (CapEx): যা নতুন প্রযুক্তি বা অবকাঠামো তৈরির জন্য বিনিয়োগ করা হয় (যেমন: নতুন ইআরপি সফটওয়্যার বা ডাটা সেন্টার স্থাপন)।
একজন সফল সিআইও-র লক্ষ্য থাকে অপারেশনাল খরচ কমিয়ে সেই টাকা কৌশলগত বা উদ্ভাবনী কাজে বিনিয়োগ করা, যাতে কোম্পানি প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে।
বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণের আর্ট: আবেগ বনাম যুক্তি
আমরা যারা আইটি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসি, আমাদের মধ্যে প্রায়ই একটি প্রবণতা দেখা যায়—বাজারে নতুন আসা কোনো দামী বা চমকপ্রদ প্রযুক্তির প্রতি আমরা খুব দ্রুত আকৃষ্ট হই। একে বলা হয় ‘শাইনি অবজেক্ট সিনড্রোম’। হয়তো আপনার প্রতিষ্ঠানের বর্তমান সার্ভার আরও দুই বছর অনায়াসেই সেবা দিতে পারত, কিন্তু আপনি চাইলেন সবচেয়ে আধুনিক ক্লাউড সলিউশন নিতে।
এখানেই আবেগ সংবরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রতিষ্ঠানের টাকা আপনার ব্যক্তিগত গবেষণার জন্য নয়। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবসময় ‘বিজনেস কেস’ (Business Case) তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ, এই প্রযুক্তিটি কিনলে কোম্পানির ঠিক কত টাকা সাশ্রয় হবে বা কত টাকা বাড়তি আয় হবে, তার একটি গাণিতিক হিসাব বোর্ডকে দেখাতে হবে। যদি কোনো প্রযুক্তির মুনাফা অর্জনের ক্ষমতা না থাকে, তবে তা যত আধুনিকই হোক না কেন, একজন সিআইও হিসেবে আপনার উচিত সেটি প্রত্যাখ্যান করা।
ব্যবসা, জনশক্তি ও প্রযুক্তির সমন্বয়
আইটি প্রধানের আসল কাজ হলো ব্যবসার প্রয়োজনের সাথে কারিগরি সমাধানের সমন্বয় করা। এই সমন্বয়টি তিনটি স্তরে কাজ করে:
খুঁজে বের করা: কোন ম্যানুয়াল কাজটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে করা সম্ভব?
বাছাই করা: বাজারের শত শত অপশনের মধ্য থেকে সবচেয়ে কার্যকর এবং সাশ্রয়ী প্রযুক্তিটি কোনটি?
বাস্তবায়ন: কেবল সফটওয়্যার কিনলেই কাজ শেষ হয় না। সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য জনবলকে প্রশিক্ষিত করা এবং তাদের মানসিকতা পরিবর্তন করাও সিআইও-র কাজের অংশ।
মনে রাখবেন—প্রযুক্তি হলো স্রেফ একটি টুল। এটি যখন নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক লক্ষ্য নিয়ে কেনা হয়, তখন সেটি হয় ‘বিনিয়োগ’। আর যখন মানুষ এটি সঠিকভাবে ব্যবহার করে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য সফল করে, তখনই তা ‘মুনাফা’ হিসেবে গণ্য হয়। এই চক্রটি সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত প্রযুক্তির পেছনে ব্যয় করা প্রতিটি টাকা স্রেফ অপচয়।
চাকা পুন-আবিষ্কারের ভুল এড়িয়ে চলা
কারিগরি বিষয়ে অতি উৎসাহী ব্যক্তিরা অনেক সময় প্রতিটি সমস্যা নিজেদের মতো করে সমাধান করতে চান। তারা হয়তো এমন একটি সফটওয়্যার নিজেরা কোডিং করে বানাতে চান যা বাজারে অলরেডি খুব কম দামে পাওয়া যাচ্ছে। একে বলা হয় ‘Reinventing the wheel’ বা চাকা নতুন করে আবিষ্কার করা।
একজন স্মার্ট সিআইও জানেন যে, প্রযুক্তি ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের কাজ গবেষণা করা নয়, বরং ব্যবসা করা। আপনার প্রতিষ্ঠানের কাজ যদি হয় সিমেন্ট বা ওষুধ তৈরি করা, তবে আপনার আইটি টিমের কাজ হওয়া উচিত সেই সিমেন্ট বা ওষুধ বিক্রির প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজ করা, নতুন কোনো অপারেটিং সিস্টেম আবিষ্কার করা নয়। বাজারের সহজলভ্য ও প্রমাণিত সমাধানগুলো ব্যবহার করে সময় ও অর্থ বাঁচানোই হলো শ্রেষ্ঠ ব্যবস্থাপনা।
পরিচালক পর্ষদকে প্রভাবিত করা
সিআইও-কে প্রায়ই ফিন্যান্স ডিরেক্টর বা সিইও-র সাথে দরকষাকষি করতে হয়। তারা যখন প্রযুক্তির কারিগরি ভাষা (যেমন: ব্যান্ডউইথ, টেরা-বাইট বা ল্যাটেন্সি) বোঝেন না, তখন আপনাকে কথা বলতে হবে টাকার ভাষায়। তাদের বোঝাতে হবে—এই ৫ কোটি টাকার বিনিয়োগ আগামী তিন বছরে কোম্পানির ১০ কোটি টাকার অপচয় রোধ করবে। যেদিন আপনি কারিগরি গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে বোর্ডকে আর্থিক লাভের অংক বোঝাতে পারবেন, সেদিনই আপনি একজন দক্ষ তথ্য প্রযুক্তি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।
পর্ব ৬: আগামীর নেতৃত্ব—কীভাবে গড়ে তুলবেন আপনার আইটি টিম ও উত্তরসূরি?
একজন সফল প্রধান তথ্য প্রযুক্তি কর্মকর্তা বা সিআইও-র সার্থকতা কেবল তার প্রযুক্তির জ্ঞানে নয়, বরং তিনি তার অধীনে কেমন একটি দল গড়ে তুলেছেন তার ওপর। আমি আমার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অনেক মেধাবী আইটি প্রধানকে দেখেছি যারা প্রযুক্তিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, কিন্তু একটি দক্ষ টিম বা উত্তরসূরি রেখে যেতে না পারার কারণে তাদের প্রস্থান বা অনুপস্থিতিতে পুরো আইটি বিভাগ মুখ থুবড়ে পড়েছে। একজন প্রকৃত নেতার কাজ হলো আরও নেতা তৈরি করা, অনুসারী নয়। এই পর্বে আমরা আলোচনা করব কীভাবে আগামীর আইটি নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে।
উত্তরসূরি তৈরির পরিকল্পনা বা ‘সাকসেশন প্ল্যানিং’
প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার জন্য ‘সাকসেশন প্ল্যানিং’-এর চেয়ে কার্যকর আর কিছু নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়, একজন গুরুত্বপূর্ণ আইটি কর্মকর্তা চাকরি ছেড়ে দিলে পুরো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এটি নেতৃত্বের একটি বড় ব্যর্থতা। একজন সিআইও-কে সবসময় ভাবতে হবে—‘আজ যদি আমি না থাকি, তবে কে এই হাল ধরবে?’
এই পরিকল্পনাটি শুধু অধীনস্থদের দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া নয়; বরং তাদের ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত চিন্তাভাবনার সঙ্গে যুক্ত করা। আপনাকে আপনার টিমের ভেতর থেকে এমন কয়েকজনকে চিহ্নিত করতে হবে যাদের মধ্যে নেতৃত্বের সম্ভাবনা আছে। তাদের কেবল কোডিং বা নেটওয়ার্কিং শেখালে হবে না, তাদের শেখাতে হবে কীভাবে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং কীভাবে সংকটে শান্ত থাকতে হয়।
টিম গঠনের তিনটি স্তম্ভ: কারিগরি, ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনা
একজন আদর্শ আইটি কর্মীর মধ্যে তিনটি গুণের সমন্বয় থাকা জরুরি। যখন আপনি টিম গড়ে তুলবেন, তখন খেয়াল রাখুন: ১. কারিগরি দক্ষতা (Technical Prowess): তারা তাদের কাজে বিশেষজ্ঞ কি না। ২. ব্যবসায়িক বোঝাপড়া (Business Understanding): তারা কি বোঝে যে তারা যে সফটওয়্যারটি বানাচ্ছে তা কোম্পানির কোন কাজে লাগবে? ৩. ব্যবস্থাপনা বা সফট স্কিলস (Management Skills): তারা কি দলের অন্য সদস্যদের সাথে মিলেমিশে কাজ করতে পারে?
একজন সিআইও হিসেবে আপনার দায়িত্ব হলো আপনার টিমের সদস্যদের এই তিনটি ক্ষেত্রেই সমানভাবে দক্ষ করে তোলা। যারা কেবল কারিগরি বিষয়ে আগ্রহী, তাদের মাঝে মাঝে ব্যবসায়িক মিটিংগুলোতে নিয়ে যান। যারা ম্যানেজমেন্ট ভালো বোঝে, তাদের ছোট ছোট প্রজেক্টের দায়িত্ব দিয়ে পরীক্ষা করুন।
মেন্টরিং ও কোচিং: হাত কলমে শেখানো
মেন্টরিং হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যা যত দ্রুত শুরু করা যায়, তত ভালো। আমি আমার ক্যারিয়ারে একঝাঁক আইটি জনশক্তি গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছি। তাদের শেখানোর সময় আমি একটি বিষয় বুঝেছি—নির্দেশ দেওয়ার চেয়ে উদাহরণ তৈরি করা বেশি কার্যকর।
আপনার টিমের উচ্চ সম্ভাবনাময় সদস্যদের ‘শ্যাডোইং’ (Shadowing) করার সুযোগ দিন। অর্থাৎ, আপনি যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বাজেট মিটিংয়ে যাচ্ছেন বা কোনো ভেন্ডরের সাথে দরকষাকষি করছেন, তাদের সাথে রাখুন। তারা দেখুক আপনি কীভাবে চাপ সামলান, কীভাবে যুক্তি তুলে ধরেন। তাদের ভুল করার সুযোগ দিন এবং একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করুন যাতে তারা ভুল থেকে শিখতে পারে। মনে রাখবেন, হাত পুড়িয়ে শেখার অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়।
চাকা ঘোরাতে দক্ষ লোকবল: নিয়োগ ও মূল্যায়ন
সঠিক মানুষকে সঠিক পদে বসানো একটি শিল্প। আইটি বিভাগে নিয়োগের সময় কেবল সিজিপিএ বা সার্টিফিকেট না দেখে তার ‘শেখার মানসিকতা’ (Agility) দেখুন। প্রযুক্তি প্রতি বছর বদলায়, তাই আজ যে বিষয়ে কেউ বিশেষজ্ঞ, কাল হয়তো সেই প্রযুক্তিটিই থাকবে না। ফলে আপনার টিমে এমন মানুষ দরকার যারা দ্রুত নতুন বিষয় শিখে নিতে পারে।
প্রতিটি পদের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার তালিকা বা ‘স্কিল ম্যাট্রিক্স’ তৈরি করুন। নিয়মিত বিরতিতে কর্মীদের মূল্যায়ন করুন—তবে তা কেবল নম্বর দেওয়ার জন্য নয়, বরং তাদের দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করে তা কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পনা করার জন্য। যখন আপনার কর্মীরা বুঝবে যে আপনি তাদের উন্নতির ব্যাপারে আন্তরিক, তখন তাদের কাজের গতি ও আনুগত্য বহুগুণ বেড়ে যাবে।
নেতৃত্ব তৈরির চ্যালেঞ্জ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
বর্তমানে একটি বড় সংকট হলো, আইটি বিষয়ে পড়াশোনা করা অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী এখন পিওর আইটি ক্যারিয়ারের চেয়ে জেনারেল ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবসায়িক ক্যারিয়ারে বেশি আগ্রহী হচ্ছে। ফলে দক্ষ কারিগরি নেতৃত্ব খুঁজে পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞ সিআইও-দের দায়িত্ব অনেক বেশি। আমাদের উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে আইটি পেশাজীবীরা কেবল ‘সাপোর্ট স্টাফ’ হিসেবে নয়, বরং ‘বিজনেস লিডার’ হিসেবে গড়ে ওঠার স্বপ্ন দেখতে পারে। আমাদের অভিজ্ঞতাগুলো তাদের সাথে শেয়ার করতে হবে, যাতে তারা আমাদের করা ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও দ্রুত নিজেদের তৈরি করতে পারে।
পর্ব ৭: ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন—পুরাতন ব্যবস্থাকে প্রযুক্তির ছাঁচে নতুন রূপ দেওয়া
আজকাল কর্পোরেট জগতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দগুলোর একটি হলো ‘ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন’। অনেক আইটি পেশাজীবী মনে করেন, অফিসের সব কাজ কম্পিউটারে করা বা একটি দামী ইআরপি (ERP) সফটওয়্যার বসানোই হলো ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন। কিন্তু একজন অভিজ্ঞ সিআইও জানেন, এটি কেবল সফটওয়্যার বা হার্ডওয়্যার পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি হলো প্রতিষ্ঠানের কাজ করার ধরন এবং মানসিকতা পরিবর্তনের একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। এই পর্বে আমরা আলোচনা করব কীভাবে একটি প্রথাগত ব্যবসাকে প্রযুক্তির ছাঁচে নতুন রূপ দেওয়া যায়।
ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন আসলে কী?
সহজ কথায়, ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন হলো প্রযুক্তির এমন ব্যবহার যা ব্যবসার মডেলে আমূল পরিবর্তন আনে এবং গ্রাহকের কাছে সেবার মান বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এটি কেবল ‘ডিজিটাইজেশন’ (কাগজের কাজ কম্পিউটারে করা) নয়। বরং এটি হলো এমন একটি পর্যায় যেখানে প্রযুক্তিই ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়ায়।
একজন সিআইও হিসেবে আপনার কাজ হলো খুঁজে বের করা—কোথায় প্রযুক্তির ছোঁয়া দিলে ব্যবসার গতি বাড়বে। ধরুন, একটি কোম্পানি আগে হাতে লিখে অর্ডার নিত এবং পণ্য পৌঁছাতে সাত দিন সময় লাগত। আপনি এমন একটি সিস্টেম করলেন যেখানে গ্রাহক অ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার দিচ্ছে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে গুদামে খবর পৌঁছে যাচ্ছে, ফলে পণ্য পৌঁছাচ্ছে দুই দিনে। এই যে সময় এবং শ্রমের সাশ্রয়—এটাই হলো প্রকৃত রূপান্তর।
ট্রান্সফরমেশনের তিনটি প্রধান স্তম্ভ
ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন সফল করতে হলে সিআইও-কে তিনটি জায়গায় একসাথে কাজ করতে হয়:
১. প্রক্রিয়া বা প্রসেস (Process): অফিসের পুরনো এবং ধীরগতির কাজগুলোকে চিহ্নিত করা। অনেক সময় দেখা যায়, একটি ফাইলে সই হতেই তিন দিন সময় লাগে। এই বাধাগুলো দূর করে প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজকে স্বচ্ছ ও দ্রুত করাই হলো প্রথম ধাপ।
২. মানুষ বা পিপল (People): এটিই সবচেয়ে কঠিন অংশ। মানুষ সাধারণত পরিবর্তনকে ভয় পায়। আপনি নতুন সিস্টেম আনলে পুরনো কর্মীরা মনে করতে পারেন তাদের চাকরি চলে যাবে। সিআইও-র কাজ হলো তাদের বোঝানো যে, প্রযুক্তি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহায়ক। তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে নতুন ব্যবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করতে হবে।
৩. প্রযুক্তি (Technology): যখন মানুষ এবং প্রক্রিয়া প্রস্তুত হবে, তখনই কেবল উপযুক্ত প্রযুক্তি বেছে নিতে হবে। মনে রাখবেন, মানুষ ও প্রক্রিয়া ঠিক না করে দামী সফটওয়্যার কিনলে তা কেবল টাকার অপচয়ই হবে।
ডেটা-চালিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ (Data-Driven Decisions)
ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের প্রাণ হলো ‘ডেটা’ বা তথ্য। আগেকার দিনে ব্যবসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে বা অনেক সময় অনুমান করে। কিন্তু একজন আধুনিক সিআইও প্রতিষ্ঠানকে শেখান কীভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
আপনার সিস্টেম থেকে আসা তথ্য যখন সিইও-কে বলতে পারবে—আগামী মাসে কোন পণ্যের চাহিদা বাড়বে বা কোন এলাকায় বিক্রি কম হতে পারে, তখনই বুঝবেন আপনি সফলভাবে রূপান্তর ঘটাতে পেরেছেন। তথ্যকে শক্তিতে রূপান্তর করা এবং সেই শক্তিকে ব্যবসার মুনাফায় কাজে লাগানোই হলো একজন সিআইও-র বুদ্ধিমত্তা।
ভুল ধারণা ও ব্যর্থতার কারণ
ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের পথে পা বাড়িয়ে অনেক সিআইও হাত পুড়িয়েছেন। এর প্রধান কারণ হলো—ব্যবসায়িক লক্ষ্য ছাড়াই প্রযুক্তির পেছনে ছোটা। অনেকে মনে করেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা ব্লকচেইন ব্যবহার করলেই বুঝি রূপান্তর হয়ে গেল। কিন্তু যদি সেই প্রযুক্তির সাথে ব্যবসার কোনো যোগসূত্র না থাকে, তবে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য।
আমি আমার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দেখেছি, অনেক বড় প্রজেক্ট মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায় কারণ সিআইও কেবল কারিগরি দিকটা দেখেছিলেন, কিন্তু কর্মীদের মানসিকতা বা ব্যবসার প্রকৃত প্রয়োজন বুঝতে পারেননি। মনে রাখতে হবে, ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি নিরন্তর যাত্রা। প্রযুক্তি বদলালে এই যাত্রার মোড়ও বদলাবে।
সিআইও-র ভূমিকা: পরিবর্তনের অগ্রদূত
এই রূপান্তরের লড়াইয়ে সিআইও-র ভূমিকা হলো একজন ‘চেঞ্জ এজেন্ট’ বা পরিবর্তনের অগ্রদূতের মতো। তাকে শুধু আইটি ডিপার্টমেন্টের প্রধান হলে চলবে না, তাকে হতে হবে পুরো প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা। আপনাকে বোর্ডের সদস্যদের বোঝাতে হবে যে, আজ যদি আমরা ডিজিটাল না হই, তবে আগামী ৫ বছর পর আমরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারব না।
প্রযুক্তি কেনা সহজ, কিন্তু একটি পুরো প্রতিষ্ঠানের কাজের সংস্কৃতি বা ‘কালচার’ বদলে দেওয়া কঠিন। সেই কঠিন কাজটি করার সাহস এবং ধৈর্য যার আছে, তিনিই হতে পারেন একজন সফল আধুনিক সিআইও।
পর্ব ৮: আইটি ঝুঁকি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা—ডিজিটাল যুগে সম্পদ রক্ষার বর্ম
একবিংশ শতাব্দীতে এসে একটি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার ‘তথ্য’ বা ডেটা। আগেকার দিনে সম্পদ বলতে জমি, কারখানা বা নগদ টাকাকে বোঝানো হতো, কিন্তু এখনকার ডিজিটাল যুগে একটি প্রতিষ্ঠানের গোপন নথিপত্র বা গ্রাহকের তথ্য চুরি হওয়া মানে প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হয়ে যাওয়া। একজন প্রধান তথ্য প্রযুক্তি কর্মকর্তা বা সিআইও-র রাতের ঘুম হারাম হওয়ার জন্য একটি শক্তিশালী সাইবার আক্রমণই যথেষ্ট। এই পর্বে আমরা আলোচনা করব কীভাবে একজন সিআইও প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল সম্পদ রক্ষার বর্ম হিসেবে কাজ করেন।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: শুধু হ্যাকিং নয়, আরও গভীরে
আইটি ঝুঁকি বলতে অনেকেই শুধু হ্যাকিং বা ভাইরাস আক্রমণকে বোঝেন। কিন্তু একজন দূরদর্শী সিআইও-র কাছে ঝুঁকির পরিধি আরও ব্যাপক। ঝুঁকি মূলত তিন ধরনের হতে পারে: ১. প্রযুক্তিগত ঝুঁকি: সিস্টেম ক্রাশ করা, হার্ডওয়্যার নষ্ট হওয়া বা সফটওয়্যারে বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দেওয়া। ২. মানবিক ঝুঁকি: কর্মীদের অসাবধানতা, পাসওয়ার্ড শেয়ার করা বা ভেতরকার কোনো অসাধু কর্মীর মাধ্যমে তথ্য পাচার হওয়া। ৩. কৌশলগত ঝুঁকি: ভুল প্রযুক্তি বেছে নেওয়া বা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সিস্টেম আপডেট না করা, যা ব্যবসাকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেয়।
সিআইও-র কাজ হলো এই ঝুঁকিগুলো আগেভাগে চিহ্নিত করা এবং সেগুলো মোকাবিলার জন্য ‘রিস্ক মিটিগেশন প্ল্যান’ তৈরি রাখা।
সাইবার নিরাপত্তা: একটি নিরন্তর যুদ্ধ
বর্তমান বিশ্বে সাইবার অপরাধীরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কৌশলে আক্রমণ করছে। তাই নিরাপত্তা কোনো এককালীন প্রজেক্ট নয়, এটি একটি ২৪ ঘণ্টার যুদ্ধ। সিআইও হিসেবে আপনার দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠানে একটি ‘মাল্টি-লেয়ার ডিফেন্স’ বা বহুস্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
কেবল ফায়ারওয়াল বা অ্যান্টিভাইরাস থাকলেই আপনি নিরাপদ নন। আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে নিয়মিত ‘পেনিট্রেশন টেস্টিং’ বা নিজেদের সিস্টেমে নিজেরাই আক্রমণ করে দুর্বলতা খুঁজে বের করা। এছাড়া ব্যাকআপ সিস্টেম হতে হবে ত্রুটিহীন। আমি আমার ক্যারিয়ারে অনেকবার দেখেছি, সব নিরাপত্তা ভেঙেও যখন আক্রমণ হয়, তখন একমাত্র সঠিক ‘অফ-লাইন ব্যাকআপ’-ই একটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
ব্যর্থতার দায়ভার এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা (DRP)
আমি এই সিরিজের শুরুতে বলেছিলাম, সিআইও হলো সেই ব্যক্তি যিনি সফলতার আংশিক আর বিফলতার পুরো দায়ভার নেন। যদি কোনো কারণে সিস্টেম হ্যাক হয় বা ডেটা ডিলিট হয়ে যায়, বোর্ড প্রথমেই সিআইও-র জবাবদিহি চাইবে। সেখানে অজুহাত দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এই কারণেই প্রতিটি সিআইও-র হাতে একটি শক্তিশালী ‘ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যান’ (DRP) এবং ‘বিজনেস কন্টিনিউটি প্ল্যান’ (BCP) থাকতে হয়। অর্থাৎ, যদি আজ আপনার প্রধান ডাটা সেন্টারটি কোনো দুর্যোগে ধ্বংস হয়ে যায়, তবে কত দ্রুত আপনি বিকল্প উপায়ে ব্যবসা চালু করতে পারবেন? আপনার ডাউন-টাইম কত হবে? এই উত্তরগুলো আপনার নখদর্পণে থাকতে হবে। একজন ভালো সিআইও সবসময় সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকেন।
নিরাপত্তা বনাম ব্যবহারযোগ্যতা: ভারসাম্য রক্ষা
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে অনেক সময় ব্যবহারকারীর কাজ কঠিন হয়ে পড়ে। যেমন—খুব জটিল পাসওয়ার্ড বা বারবার ভেরিফিকেশন সিস্টেম কর্মীদের কাজের গতি কমিয়ে দিতে পারে। একজন দক্ষ আইটি প্রধানের মুন্সিয়ানা হলো নিরাপত্তা এবং ব্যবহারযোগ্যতার (Usability) মধ্যে একটি সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা। সিস্টেমকে এতটাই জটিল করবেন না যে কর্মীরা কাজ করতে বিরক্ত হয়, আবার এতটাই সহজ করবেন না যে হ্যাকারদের জন্য তা উন্মুক্ত হয়ে যায়।
সচেতনতা তৈরি: সবচেয়ে দুর্বল লিঙ্কটি মানুষ
আপনি কোটি টাকা খরচ করে বিশ্বের সেরা সিকিউরিটি সফটওয়্যার কিনলেন, কিন্তু আপনার একজন কর্মী একটি মেইল লিঙ্কে ক্লিক করে তার পাসওয়ার্ড দিয়ে দিল—ব্যস, আপনার সব বিনিয়োগ বৃথা। সাইবার নিরাপত্তার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বড় চুরিগুলো হয়েছে মানুষের ভুলের কারণে।
তাই সিআইও-র একটি বড় দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি স্তরের কর্মীকে সচেতন করা। নিয়মিত ‘সিকিউরিটি অ্যাওয়ারনেস ট্রেনিং’ আয়োজন করা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তার গুরুত্ব বোর্ড থেকে শুরু করে রিসেপশনিস্ট পর্যন্ত সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। প্রযুক্তি দিয়ে প্রযুক্তিকে রক্ষা করা যায়, কিন্তু মানুষের ভুল কমাতে প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।
পর্ব ৯: ক্রয় ব্যবস্থাপনা ও ভেন্ডর রিলেশন—সঠিক পণ্য সঠিক দামে পাওয়ার কৌশল
একজন প্রধান তথ্য প্রযুক্তি কর্মকর্তা বা সিআইও-র সফলতার একটি বড় অংশ নির্ভর করে তার ক্রয় ক্ষমতার ওপর। আইটি বিভাগে কোটি কোটি টাকার হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার এবং সার্ভিস কিনতে হয়। এই বিশাল অংকের বিনিয়োগের প্রতিটি পয়সা যাতে সঠিকভাবে ব্যয় হয়, তা নিশ্চিত করা সিআইও-র অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ক্রয় ব্যবস্থাপনা বা প্রকিউরমেন্ট কেবল পণ্য কেনা নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত যা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী মুনাফাকে প্রভাবিত করে।
ক্রয় ব্যবস্থাপনা: শখ বনাম উপযোগিতা
আমি আগের পর্বগুলোতে বলেছি, আইটি পেশাজীবীদের মাঝে বাজারের সেরা এবং আধুনিক প্রযুক্তির প্রতি এক ধরণের দুর্বলতা থাকে। কিন্তু ক্রয় করার সময় সিআইও-কে সম্পূর্ণ আবেগহীন এবং গাণিতিক হতে হয়। কোনো কিছু কেনার আগে নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করা জরুরি: ১. এটি কি সত্যিই আমাদের ব্যবসার বর্তমান সমস্যার সমাধান করবে? ২. এই প্রযুক্তির পেছনে ব্যয়ের বিপরীতে আমরা কী পরিমাণ মুনাফা বা সাশ্রয় পাবো (ROI)? ৩. আমাদের বর্তমান অবকাঠামো কি এই নতুন প্রযুক্তি ধারণ করার জন্য প্রস্তুত?
সেরা প্রযুক্তির পেছনে না ছুটে ‘উপযুক্ত’ প্রযুক্তি (Appropriate Technology) বাছাই করার দক্ষতাই একজন সিআইও-কে দক্ষ ম্যানেজার হিসেবে প্রমাণ করে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি শক্তিশালী (Over-provisioning) সার্ভার বা সফটওয়্যার কেনা মানে প্রতিষ্ঠানের অর্থ অপচয় করা।
ভেন্ডর রিলেশনশিপ: পার্টনারশিপ বনাম লেনদেন
একজন সিআইও-কে শত শত প্রযুক্তি সরবরাহকারী বা ভেন্ডরের সাথে কাজ করতে হয়। অনেকে মনে করেন ভেন্ডরের সাথে সম্পর্ক মানে শুধু দর কষাকষি করে দাম কমানো। কিন্তু আধুনিক আইটি ব্যবস্থাপনায় ভেন্ডররা কেবল বিক্রেতা নন, তারা আপনার ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার’।
এমন অনেক সময় আসবে যখন আপনার সিস্টেমে মাঝরাতে বড় কোনো বিপর্যয় দেখা দেবে। তখন কন্ট্রাক্টে কী লেখা আছে তার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়াবে আপনার সাথে ভেন্ডরের সম্পর্ক। একজন দক্ষ সিআইও এমনভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলেন যাতে সংকটের সময় ভেন্ডরকে পাশে পাওয়া যায়। তবে মনে রাখতে হবে, সম্পর্কের খাতিরে পেশাদারিত্বে ছাড় দেওয়া যাবে না। সব সময় ‘উইন-উইন’ (Win-Win) পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করতে হবে, যেখানে প্রতিষ্ঠান সেরা সেবা পাবে এবং ভেন্ডরও তার কাজের সঠিক মূল্য পাবে।
দর কষাকষির শিল্প (Art of Negotiation)
আইটি ক্রয় ব্যবস্থাপনায় নেগোসিয়েশন বা দর কষাকষি একটি অত্যন্ত জরুরি দক্ষতা। ভেন্ডররা যখন তাদের পণ্যের প্রেজেন্টেশন দেয়, তারা অনেক সময় অনেক গালভরা প্রতিশ্রুতি দেয়। একজন অভিজ্ঞ সিআইও-র কাজ হলো সেই চটকদার কথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অতিরিক্ত খরচগুলো (Hidden Costs) খুঁজে বের করা।
কেনার সময় কেবল ‘পারচেজ প্রাইস’ বা ক্রয়মূল্য দেখলে চলবে না; দেখতে হবে ‘টোটাল কস্ট অফ ওনারশিপ’ (TCO)। অর্থাৎ, আগামী ৫ বছরে ওই পণ্যটির রক্ষণাবেক্ষণ, লাইসেন্স ফি, বিদ্যুৎ খরচ এবং ট্রেনিং বাবদ মোট কত টাকা খরচ হবে, তার একটি পূর্ণাঙ্গ হিসাব করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় সস্তা পণ্য রক্ষণাবেক্ষণ করতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানির অনেক বেশি টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে।
এসএলএ (SLA) এবং চুক্তিনামা
সার্ভিস লেভেল এগ্রিমেন্ট বা এসএলএ হলো আইটি ক্রয়ের মেরুদণ্ড। কোনো সার্ভিস বা সাপোর্ট কেনার সময় এসএলএ-তে প্রতিটি শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। সিস্টেম ডাউন হলে ভেন্ডর কত সময়ের মধ্যে রেসপন্স করবে (Response Time) এবং কত সময়ের মধ্যে সমাধান দেবে (Resolution Time), তা লিখিত থাকতে হবে। চুক্তি করার সময় অস্পষ্ট কোনো শর্ত রাখা যাবে না। চুক্তিতে ‘এক্সিট ক্লজ’ বা সম্পর্ক ছিন্নের পথও খোলা রাখতে হবে, যাতে ভেন্ডর নিম্নমানের সেবা দিলে প্রতিষ্ঠান সহজেই বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারে।
স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা
ক্রয় ব্যবস্থাপনায় সিআইও-র সততা ও নৈতিকতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু এখানে বড় অংকের আর্থিক লেনদেন জড়িত, তাই সিআইও-কে হতে হবে প্রশ্নাতীতভাবে সৎ। কোনো নির্দিষ্ট ভেন্ডরের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বা ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণ করলে তা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে এবং আইটি প্রধানের সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। একটি স্বচ্ছ ‘টেন্ডারিং’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্য সরবরাহকারী খুঁজে বের করাই হলো আদর্শ পদ্ধতি।

পর্ব ১০: চূড়ান্ত লক্ষ্য—বিদেশের মাটিতে দেশের গৌরব এবং আগামীর সিআইও-দের প্রতি শেষ কথা
১০ পর্বের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আমরা একজন তথ্য প্রযুক্তি প্রধান বা সিআইও-র কাজের ধরণ, দায়িত্ব, ঝুঁকি এবং কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। কিন্তু সিরিজের এই শেষ পর্বে আমি শুধু কৌশল নিয়ে নয়, বরং একটি বড় স্বপ্ন আর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলতে চাই। আমি যখন ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ছিলাম, তখন আমাদের দেশের আইটি পেশাজীবীদের বড় স্বপ্ন ছিল বিদেশের কোনো কোম্পানিতে প্রোগ্রামার বা সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করা। কিন্তু আজ সময় বদলেছে। এখন আমাদের স্বপ্ন হওয়া উচিত—বিদেশের মাটিতে গিয়ে কোনো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আইটি লিডারশিপ বা সিআইও পদের হাল ধরা।
দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে
আমি আমার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অনেক মেধাবী বাংলাদেশি আইটি বিশেষজ্ঞকে দেখেছি। তাদের কারিগরি দক্ষতা বিশ্বের যেকোনো দেশের বিশেষজ্ঞদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তবে আমাদের যে জায়গাটিতে আরও কাজ করতে হবে, তা হলো—গ্লোবাল লিডারশিপ মাইন্ডসেট। বিদেশের বড় কোনো প্রতিষ্ঠানে সিআইও হতে হলে কেবল ভালো কোডিং বা নেটওয়ার্কিং জানলে চলে না; সেখানে প্রয়োজন হয় আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সংস্কৃতি বোঝা, ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে নেতৃত্ব দেওয়া এবং বিশ্ববাজারের প্রযুক্তির হাওয়া কোন দিকে বইছে তা আগেভাগে বুঝতে পারা।
আমার বড় প্রত্যাশা হলো, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমরা দেখব ফরচুন ৫০০ (Fortune 500) কোম্পানিগুলোর সিআইও বা সিটিও চেয়ারে বসে আছেন বাংলাদেশের কোনো কৃতি সন্তান। তারা কেবল কারিগরি পারদর্শিতা দিয়েই নয়, বরং তাদের দূরদর্শিতা আর নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেবেন। সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আজ থেকেই আমাদের গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডে নিজেদের তৈরি করতে হবে।
ক্রমাগত শেখা: সিআইও-র কোনো অবসর নেই
প্রযুক্তি এমন এক জগত যেখানে প্রতিটি দিন নতুন কিছুর জন্ম হয়। আজ আপনি যা শিখলেন, দুই বছর পর তা হয়তো সেকেলে হয়ে যাবে। একজন সফল সিআইও-র সবচেয়ে বড় গুণ হলো তার ‘শেখার ক্ষুধা’। নিজেকে সবসময় আপডেট রাখতে হবে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং বা ডাটা সায়েন্স—প্রযুক্তি যখন যেদিকে মোড় নেবে, আপনাকে তার আগে থাকতে হবে।
আমি আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে হাত পুড়িয়ে যা শিখেছি, তা হলো—শেখা যে দিন থামিয়ে দেবেন, সে দিন থেকেই আপনার পতন শুরু। তাই ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট অর্জনকেই শেষ মনে করবেন না। প্রতিটি নতুন প্রজেক্ট, প্রতিটি নতুন সমস্যা আপনার জন্য একেকটি পাঠ্যবই।
একটি লিগ্যাসি রেখে যাওয়া
একজন আইটি নেতার আসল সার্থকতা তার পদের নামে নয়, বরং তিনি যাওয়ার সময় কী রেখে গেলেন তার ওপর। আপনি কি একটি বিশৃঙ্খল সিস্টেম রেখে যাচ্ছেন, নাকি এমন একটি সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি করেছেন যা আপনার অবর্তমানেও বছরের পর বছর নিখুঁতভাবে চলবে?
লিগ্যাসি মানে কেবল ভালো সার্ভার বা সফটওয়্যার নয়; লিগ্যাসি মানে হলো একঝাঁক যোগ্য উত্তরসূরি। আপনি যদি আপনার নিচে অন্তত তিনজন মানুষকে এমনভাবে তৈরি করে যেতে পারেন যারা আপনার মতোই বা আপনার চেয়েও যোগ্য সিআইও হতে পারবে, তবেই আপনি একজন সফল লিডার। মনে রাখবেন, নিজের জ্ঞান বিলিয়ে দিলে কমে না, বরং তা নিজের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
আগামীর নেতাদের প্রতি শেষ কিছু কথা
যারা এই সিরিজটি পড়ছেন এবং আগামীর সিআইও হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের প্রতি আমার কয়েকটি বিশেষ অনুরোধ থাকবে:
১. নৈতিকতায় আপসহীন হোন: আপনার হাতে প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি টাকার বাজেট এবং হাজারো মানুষের তথ্য থাকবে। লোভের কাছে কখনো মাথানত করবেন না। আপনার সততাই আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ।
২. ধৈর্য ধরুন: রাতারাতি সিআইও হওয়া যায় না। এটি একটি দীর্ঘ যাত্রা। প্রতিটি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে সময় নিন এবং প্রতিটি ধাপে অভিজ্ঞতা অর্জন করুন। শর্টকাট খুঁজলে দ্রুত উপরে উঠা যায়, কিন্তু পতন হয় আরও দ্রুত।
৩. মানুষের ওপর গুরুত্ব দিন: দিনের শেষে আইটি মানে কেবল মেশিন নয়, এটি হলো মানুষের জন্য কাজ করা। আপনার টিম এবং আপনার গ্রাহক—এই দুই পক্ষের সন্তুষ্টিই আপনার সাফল্যের আসল মাপকাঠি।
৪. দেশকে ভালোবাসুন: আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, আপনার মূল শেকড় বাংলাদেশে। আমাদের দেশের আইটি সেক্টরকে এগিয়ে নিতে আপনার মেধা আর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান। বিদেশের মাটিতে দেশের পতাকা তুলে ধরুন।

আমার এই ১০ পর্বের সিরিজটি লেখার মূল উদ্দেশ্য ছিল—আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার নির্যাস আপনাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া, যাতে আপনাদের পথচলা কিছুটা হলেও সহজ হয়। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্ম অত্যন্ত মেধাবী এবং সাহসী। তারা একদিন বিশ্বজুড়ে আইটি লিডারশিপের উদাহরণ তৈরি করবে।
একজন সিআইও হিসেবে আপনার লড়াইটা সহজ হবে না। আপনাকে অনেক নির্ঘুম রাত কাটাতে হবে, অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং অনেক সময় একাকী লড়াই করতে হবে। কিন্তু যখন দেখবেন আপনার প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হাজারো মানুষের কাজ সহজ হয়ে গেছে বা একটি প্রতিষ্ঠান উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে, তখন সেই তৃপ্তির কাছে সব কষ্ট তুচ্ছ মনে হবে।
আপনারা যোগ্য হোন, অসাধারণ হোন এবং বিশ্বসেরা হোন—এই কামনায় এই সিরিজটি শেষ করছি। আপনাদের হাত ধরেই লেখা হোক বাংলাদেশের আইটি খাতের নতুন ইতিহাস।
#CIO #CTO #CITO #HeadofIT #CareerGuide
