আমাদের সেক্যুলার রাজনীতি যারা করেন, তাঁদের বেশিরভাগই জানেন না—কওমি মাদ্রাসায় আসলে কী পড়ানো হয়, কেন পড়ানো হয়, সেই পাঠে কী দক্ষতা তৈরি হয়, কওমিতে পড়লে কী দক্ষতা অর্জিত হয় বা কোথায় গ্যাপ থাকে। অথচ আমাদের প্রতিনিয়ত তাঁদের সাথে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক যুদ্ধ করতে হচ্ছে। সেক্যুলারদের না জানার কারণে এক ধরনের ভয় আছে, আবার সেক্যুলাররা জানে না বলে ইসলামিস্টদের এক ধরনের সুপেরিওরিটি কমপ্লেক্স আছে। আমি এই লেখাটি লিখছি আমাদের সেক্যুলার বন্ধুদের কওমি মাদ্রাসার লেখাপড়ার সাথে পরিচয় করাতে। আমি খুব নিরপেক্ষ থেকে চেষ্টা করব তাদের লেখাপড়ার পদ্ধতি, বই-পুস্তক ও সেগুলো পড়ানোর উদ্দেশ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরতে। আমি আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র ছিলাম, কওমিতে আমি পড়িনি। তবে আমার প্রচুর জানাশোনা লোকজন আছেন যারা কওমিতে পড়েছেন। তাঁদের লিখিত সিলেবাস, বই-পত্র দেখে ও তাঁদের সাথে আলাপ করে এই লেখাটি শুরু করলাম। আশা করি লেখাটি আপনাদের সাহায্য করবে।
বাংলাদেশের কওমী শিক্ষাব্যবস্থা কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নয়, এটি একটি ধর্মীয়, সামাজিক ও আকিদাগত গণজাগরণের ঐতিহ্যবাহী ধারা। তবে বাইরের পর্যবেক্ষকদের কাছে, এমনকি অনেক সাধারণ শিক্ষিত মানুষের কাছেও কওমী শিক্ষার অভ্যন্তরীণ কাঠামো, এর নেসাব (পাঠ্যক্রম), ভিন্ন ভিন্ন বোর্ডের গতিপ্রকৃতি এবং দরসী কিতাবসমূহের তাত্ত্বিক গভীরতা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অস্পষ্ট থেকে যায়। এই দীর্ঘ গ্রন্থে একজন আলিম ও ফকীহের অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ, ঐতিহ্যবাদী অথচ নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গিতে কওমী শিক্ষার অতীত, বর্তমান, প্রাতিষ্ঠানিক বিন্যাস, পঠিত কিতাবাবলীর বিশদ পরিচিতি এবং আধুনিক যুগের নিরিখে এর জ্ঞানগত সীমাবদ্ধতা (নলেজ গ্যাপ) বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।
১: কওমী শিক্ষার তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক শিকড়: দারসে নিজামী থেকে দেওবন্দ হয়ে বাংলা
কওমী শিক্ষাব্যবস্থার স্বরূপ বুঝতে হলে প্রথমেই এর ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎস অনুধাবন করা প্রয়োজন। কওমী মাদ্রাসার বর্তমান নেসাব কোনো আকস্মিক উদ্ভাবন নয়; বরং এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে গড়ে ওঠা একটি নির্দিষ্ট ইলমী ধারা বা ‘ঐতিহ্যবাহী পাঠদান পদ্ধতি’র বিবর্তিত রূপ।
১. দারসে নিজামীর সূচনা ও ঐতিহ্য
উপমহাদেশের ইসলামি শিক্ষার ইতিহাসে ‘দারসে নিজামী’ একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে (প্রায় ১৭৪৮ খ্রিষ্টাব্দে) লখনৌর ‘ফরঙ্গী মহল’-এর প্রখ্যাত আলেম মোল্লা নিজামুদ্দীন সিহালভী এই পাঠ্যক্রম প্রস্তুত করেন। তদানীন্তন মুঘল ভারতের আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা এবং ধর্মীয় অঙ্গনের রাষ্ট্রীয় চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে এই নেসাব প্রণীত হয়েছিল।
দারসে নিজামীর মৌলিক দর্শন ছিল ‘মা’কূলিয়াৎ’ (যুক্তিভিত্তিক শাস্ত্র) এবং ‘মানকূলিয়াৎ’ (ঐতিহ্য বা বিবরণভিত্তিক শাস্ত্র)-এর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা। মোল্লা নিজামুদ্দীন সিহালভী তাঁর পাঠ্যক্রমে ইলমুল কালাম (ইসলামি দার্শনিক ধর্মতত্ত্ব), মানতিক (যুক্তিবিদ্যা), হিকমাত (প্রাচীন দর্শন ও আধুনিক বিজ্ঞান), বালাগাত (অলংকারশাস্ত্র), এবং ফিকহ ও উছূলুল ফিকহকে ব্যাপক প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
তৎকালীন সময়ে মনে করা হতো, যদি একজন তালিবে ইলম (শিক্ষার্থী) মানতিক ও উছূলের জটিল কিতাবসমূহ সঠিকভাবে আয়ত্ত করতে পারে, তবে সে পরবর্তীতে স্বীয় মেধা ও প্রজ্ঞার বলে যেকোনো কঠিন কিতাব নিজে নিজে অধ্যয়ন করে বিধান বের করতে সক্ষম হবে। এটিকে বলা হতো ‘সলাহিয়্যাত’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা অর্জন।
২. দেওবন্দ আন্দোলন ও নেসাবে পরিবর্তন
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব ও আজাদী আন্দোলনের বিপর্যয়ের পর যখন ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পূর্ণাঙ্গ শাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং মুঘল আমলের ফার্সিভিত্তিক প্রশাসনিক ও বিচারিক কাঠামো বিলুপ্ত করে দেয়, তখন ইসলামি দ্বীন, সংস্কৃতি ও ইলমকে টিকে রাখার জন্য এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। এই পটভূমিতে ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার দেওবন্দ নামক স্থানে হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা কাসেম নানুতবী, ফকীহুন নফছ মাওলানা রশীদ আহমদ গঙ্গোহী এবং তাঁদের সহযোদ্ধাগণ প্রতিষ্ঠা করেন ‘দারুল উলূম দেওবন্দ’।
- প্রথমত: সরকারি বা রাজকীয় সাহায্য পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে সাধারণ মুসলিম জনতা বা ‘কওম’-এর স্বেচ্ছাদানের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার নীতি গ্রহণ করা হয়। সেখান থেকেই ‘কওমী’ (জনগণ সংক্রান্ত বা জাতীয়) শব্দের উৎপত্তি।
- দ্বিতীয়ত: মা’কূলিয়াৎ বা দর্শন-যুক্তিবিদ্যার চেয়ে ‘মানকূলিয়াৎ’ অর্থাৎ হাদীছ শরীফ, তাফসীর এবং ফিকহে ইসলামির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হয়। সাহারানপুর ও দেওবন্দে শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছে দেহলভী-এর ইলমে হাদীছের ধারাকে পাঠ্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করা হয়।
- তৃতীয়ত: প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা, শ্রেণিবিন্যাস এবং একটি নির্দিষ্ট মেয়াদী কোর্স চালু করা হয়, যা প্রাচীন ব্যক্তিগত ইজাযাহ (অনুমতি) প্রথার চেয়ে আলাদা ছিল।
৩. বাংলায় কওমী ধারার বিস্তার
দেওবন্দের এই সংস্কারকৃত দরসে নিজামী ধারা বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তৎকালীন বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার হাঠহাজারীতে ‘জামিয়া আহলিয়া দারুল উলূম মঈনুল ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশে কওমী ধারার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা সুদৃঢ় হয়। পরবর্তীতে মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী, মুফতী আজীজুল হক, খলীফায়ে মাদানী মাওলানা আতহার আলী সহ অসংখ্য দেওবন্দমনস্ক বুজুর্গ ও আলিমগণের প্রচেষ্টায় সমগ্র বাংলাদেশে হাজার হাজার কওমী মাদ্রাসা গড়ে ওঠে।
২: বাংলাদেশে কওমী শিক্ষাধারা: ত্রিধারা বিভাজন ও বৈশিষ্ট্যাবলী
বাংলাদেশে “কওমী মাদ্রাসা” বললেই মনে করা হয় এটি একটি একক, অভিন্ন ছকে তৈরি প্রতিষ্ঠান। বাস্তব সত্য হলো, মৌলিক আদর্শিক ও আকিদাগত জায়গায় এক হলেও পরিচালনার পদ্ধতি, পাঠ্যক্রম এবং লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের বিচারে বাংলাদেশের কওমী শিক্ষাকে তিনটি প্রধান ধারায় বিভক্ত করা যায়:
১. প্রচলিত বা সনাতন দেওবন্দী দরসে নিজামী ধারা
- শিক্ষা পদ্ধতি: প্রাচীন আরবি, ফার্সি ও উর্দু টেক্সট বা ‘মতনে কিতাব’ কেন্দ্রিক দরস।
- ভাষা মাধ্যম: কিতাবগুলোর ভাষা আরবি, তবে ব্যাখ্যার মাধ্যম হিসেবে কওমী ঘরানার নিজস্ব পরিভাষা সমৃদ্ধ বাংলা ব্যবহৃত হয়। ঐতিহ্যগত কারণে উচ্চতর স্তরে উর্দু ও ফার্সি সাহিত্যের উপস্থিতি এখনও বিদ্যমান।
- মূল উদ্দেশ্য: সনাতন ইসলামি শাস্ত্রে গভীর পারদর্শী আলেম, মুহাদ্দিছ, মুফাসসির ও ফকীহ তৈরি করা, যারা দ্বীনের মৌলিক আমানত পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অপরিবর্তিত অবস্থায় পৌঁছে দেবেন।
- সীমাবদ্ধতা: এতে আধুনিক সাধারণ শিক্ষার (যেমন: উচ্চতর বিজ্ঞান, আধুনিক বিশ্ব ইতিহাস, ইংরেজি সাহিত্য বা অর্থনীতি) সংযোগ অত্যন্ত ক্ষীণ।
২. সমন্বিত বা আধুনিকায়িত কওমী ধারা
বিগত চার-পাঁচ দশকে কওমী অঙ্গনের ভেতর থেকেই একদল চিন্তাশীল আলেম উপলব্ধি করেন যে, কেবল প্রাচীন কিতাবী ইলম দিয়ে বর্তমান যুগের সাধারণ মানুষের কাছে দ্বীনের দাওয়াত ও যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন। এই উপলব্ধি থেকে জন্ম নেয় সমন্বিত কওমী ধারা।
- শিক্ষা পদ্ধতি: প্রারম্ভিক মারহালা (ইবতেদাইয়্যাহ ও মুতাওয়াসসিতাহ) অর্থাৎ প্রথম শ্রেণী থেকে অষ্টম-নবম শ্রেণী সমমান পর্যন্ত ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি জাতীয় পাঠ্যক্রমের বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, ভূগোল ও সমাজবিজ্ঞান পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
- ভাষাগত পরিবর্তন: ফার্সি ও উর্দুর প্রাথমিক কিতাবসমূহের স্থানে বিশুদ্ধ বাংলা সাহিত্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক আরবি ভাষা শিক্ষার আধুনিক পদ্ধতি (আছ-ছাক্বাফাতুল ইসলামিয়্যাহ বা আধুনিক আদব) যুক্ত করা হয়েছে।
- মূল উদ্দেশ্য: একই সাথে দ্বীনি মেজাজ ধরে রাখা এবং সাধারণ শিক্ষিত সমাজের সাথে যোগাযোগ ও বুদ্ধিবৃত্তিক মোকাবিলা করার উপযোগী আলেম তৈরি করা।
৩. বিশেষায়িত কওমী প্রতিষ্ঠান (তাজবীদ, হিফজ ও তাখাস্সুস)
- হিফজুল কুরআন মাদ্রাসা: এখানে মূল কাজ হলো শিশু-কিশোরদের পূর্ণ ৩০ পারা কুরআন শরীফ সহীহ-শুদ্ধভাবে হিফজ (মুখস্থ) করানো। সাথে থাকে তাজবীদ ও প্রারম্ভিক দ্বীনিয়াত।
- ক্বিরাআত ও তাজবীদ কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান: কুরআন তেলাওয়াতের বিভিন্ন প্রথাগত কেরাত পদ্ধতি (যেমন: কিরাআতে সাব’আ ও আশারা—কুরআন পাঠের সাত বা দশটি প্রখ্যাত সনদপ্রাপ্ত পদ্ধতি) শিক্ষা দেওয়ার জন্য বিশেষায়িত মাদ্রাসা।
- উচ্চতর তাখাস্সুস প্রতিষ্ঠান: দাওরায়ে হাদীছ উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য ১ থেকে ৩ বছর মেয়াদী বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র। যেমন: মা’হাদুল বুহুছিল ইসলামিয়া বা উচ্চতর ইফতা ও হাদীছ রিসার্চ সেন্টারসমূহ।
৩: কওমী শিক্ষার ৬টি স্বীকৃত বোর্ড: বিস্তৃত বিশ্লেষণ ও তুলনা
২০১৮ সালের আইনি কাঠামোর অধীনে বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসাসমূহের সর্বোচ্চ স্তর ‘দাওরায়ে হাদীছ’-কে মাস্টার্স (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমানের মর্যাদা প্রদান করা হয়। এই মাস্টার্স পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণের জন্য গঠন করা হয় কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’। হাইআতুল উলয়ার অধীনে ৬টি পৃথক কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড রয়েছে।
১. বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বেফাক)
- প্রতিষ্ঠাকাল ও ব্যাকগ্রাউন্ড: ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বোর্ডটি বাংলাদেশের কওমী শিক্ষার সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী সমন্বিত বোর্ড। শায়খুল হাদীছ আল্লামা আজিজুল হক, মুফতী আতহার আলী সহ তৎকালীন শীর্ষ আলিমদের উদ্যোগে এটি গড়ে ওঠে।
- আঞ্চলিক প্রভাব: কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়; উত্তরবঙ্গ থেকে চট্টগ্রাম, ঢাকা থেকে খুলনা—সমগ্র বাংলাদেশে এর লাখ লাখ তালিবে ইলম ও হাজার হাজার অধিভুক্ত জামিয়া রয়েছে।
- কেন্দ্রীয় কার্যালয়: যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।
- পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষা ব্যবস্থা: অত্যন্ত শৃঙ্খল ও কঠোর পরীক্ষার জন্য পরিচিত। ইবতেদাইয়্যাহ, মুতাওয়াসসিতাহ, ছানাবিয়্যাহ আম্মাহ, ছানাবিয়্যাহ উলইয়া এবং ফযীলত—প্রতিটি মারহালায় বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এদের নেসাবে প্রারম্ভিক স্তরে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত রাখা হলেও কিতাবী স্তরে পৌঁছানোর পর ঐতিহ্যবাহী দেওবন্দী নেসাব কঠোরভাবে অনুসৃত হয়।
২. আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ (ইত্তেহাদ)
- প্রতিষ্ঠাকাল ও ব্যাকগ্রাউন্ড: ১৯৫৯ সালে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বৃহত্তম দ্বীনি নিকেতন আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া পটিয়ার তৎকালীন মুহতামিম ও ফকীহুল মিল্লাত মুফতী আজীজুল হক -এর উদ্যোগে গঠিত হয়। এটি বেফাক প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই দশক আগের ঐতিহাসিক বোর্ড।
- আঞ্চলিক প্রভাব: প্রধানত বৃহত্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও ফেনী অঞ্চলে এর শক্তিশালী প্রভাব বিদ্যমান।
- কেন্দ্রীয় কার্যালয়: পটিয়া, চট্টগ্রাম।
- বিশেষত্ব: ইত্তেহাদ বোর্ডের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ফিকহ ও আদবের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ এবং তাজবীদ ও ক্বিরাআতের ওপর বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি। ইত্তেহাদ অধীনস্থ মাদ্রাসাগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের ক্বারী ও ফকীহ তৈরির একটি দীর্ঘ প্রথা রয়েছে।
৩. বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া গওহরডাঙ্গা বাংলাদেশ
- প্রতিষ্ঠাকাল ও ব্যাকগ্রাউন্ড: ১৯৭৬ সালে প্রখ্যাত বুজুর্গ ও মুজাহিদে আজম আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী -এর প্রতিষ্ঠিত গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে এই বোর্ড গড়ে ওঠে।
- আঞ্চলিয় প্রভাব: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল অর্থাৎ বৃহত্তর ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, খুলনা, নড়াইল, বরিশাল ও পটুয়াখালী অঞ্চলে এর মূল বিস্তার।
- কেন্দ্রীয় কার্যালয়: গওহরডাঙ্গা, গোপালগঞ্জ।
- বিশেষত্ব: আল্লামা ফরিদপুরী -এর চিন্তা ছিল সাধারণ শিক্ষার সাথে দ্বীনি শিক্ষার এক বলিষ্ঠ সমন্বয়। তাই গওহরডাঙ্গা বোর্ডের প্রাথমিক ও মধ্যম মারহালার নেসাবে মাতৃভাষা বাংলা, আধুনিক ইংরেজি, বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের চর্চা অন্যান্য সনাতন কওমী বোর্ডের চেয়ে তুলনামূলক বেশি জোর দেওয়া হয়।
৪. আজাদ দ্বীনি এদারায়ে তা’লীম বাংলাদেশ (এদারা)
- প্রতিষ্ঠাকাল ও ব্যাকগ্রাউন্ড: ১৯৪১ সালে প্রখ্যাত পীর ও সংস্কারক হযরত মাওলানা আতহার আলী এবং শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী – এর চিন্তার আলোকে সিলেটের ঐতিহাসিক দরগাহ মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে এই বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন কওমী বোর্ড।
- আঞ্চলিক প্রভাব: বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল (সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ)।
- কেন্দ্রীয় কার্যালয়: সিলেট শহর।
- বিশেষত্ব: এদারা বোর্ডের অধীনস্থ মাদ্রাসাগুলোর সাথে যুক্তরাজ্য, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী সিলেটি মুসলিম সমাজের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। এর পাঠ্যক্রমে প্রাচীন দেওবন্দী ঐতিহ্যের সাথে স্থানীয় ইলমী ঐতিহ্যের চমৎকার মিশেল দেখা যায়।
৫. তানযীমুল মাদারিসিদ্দীনিয়া বাংলাদেশ (তানযীম)
- প্রতিষ্ঠাকাল ও ব্যাকগ্রাউন্ড: ১৯৯৫ সালে উত্তরবঙ্গের কওমী মাদ্রাসাগুলোকে একক সাংগঠনিক ও পরীক্ষার কাঠামোয় আনার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়।
- আঞ্চলিক প্রভাব: বৃহত্তর উত্তরবঙ্গ (বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা)।
- কেন্দ্রীয় কার্যালয়: জামিয়া ইসলামিয়া কাসেমুল উলূম জামিল, বগুড়া।
- বিশেষত্ব: উত্তরবঙ্গের তুলনামূলক দারিদ্র্যপীড়িত ও দাওয়াতী কাজের জন্য উর্বর অঞ্চলে কওমী শিক্ষার বিস্তার ও শৃঙ্খলা রক্ষায় তানযীম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এদের নেসাবে কিতাবী পাঠের সাথে প্রারম্ভিক দাওয়াতী প্রশিক্ষণ যুক্ত থাকে।
৬. জাতীয় দ্বীনি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বাংলাদেশ
- প্রতিষ্ঠাকাল ও ব্যাকগ্রাউন্ড: ২০১৬ সালে আল্লামা ফরিদ উদ্দীন মাসউদ-এর নেতৃত্বে এই বোর্ডটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
- আঞ্চলিক প্রভাব: ঢাকাকেন্দ্রিক তবে দেশের বিভিন্ন জেলায় এর অধিভুক্ত মাদ্রাসা রয়েছে।
- কেন্দ্রীয় কার্যালয়: ঢাকা।
- বিশেষত্ব: এটি আধুনিক যুগের চাহিদা বিবেচনা করে কওমী কাঠামোর ভেতরেই প্রাথমিক স্তরে পূর্ণাঙ্গ সাধারণ শিক্ষার সংযোজন এবং আধুনিক আরবি ভাষা শেখার আধুনিক কলাকৌশল প্রয়োগে তুলনামূলক বেশি আগ্রহী।
৪: মারহালাভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস, সময়কাল ও সাধারণ শিক্ষার সমমান
১. মারহালাতু ইবতেদাইয়্যাহ (প্রাথমিক স্তর)
- সময়কাল: ৫ বছর (প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী সমমান)।
- পঠিত বিষয়: কুরআনে কারীম নাজেরা ও ছহীহ তেলাওয়াত, তাজবীদ, উর্দুর প্রারম্ভিক কিতাব (হাদীকাতে উর্দু, তাহযীবুল আখলাক), ফার্সি প্রারম্ভিক পাঠ (পান্দে নামা এটাদী), ইসলামিয়াত, প্রাথমিক আকিদা ও দোআ-কালাম। একই সাথে বাংলা সাহিত্য, প্রাথমিক গণিত, ইংরেজি শব্দকোষ ও ভূগোল।
- সাধারণ শিক্ষার সমমান: প্রাথমিক বিদ্যালয় বা পিএসসি (Primary School Certificate)।
২. মারহালাতুল মুতাওয়াসসিতাহ (নিম্ন-মাধ্যমিক স্তর)
- সময়কাল: ৩ বছর (কওমী পরিভাষায়: মিজান, নাহবেমীর ও পাঞ্জুম শ্রেণী)।
- পঠিত বিষয়: ইলমুছ ছরফ (শব্দবিজ্ঞানের প্রাথমিক ও মধ্যম কিতাব: মিজানুস ছরফ, মুনশাইব, ইলমুছ ছরফ), ইলমুন নাহু (আরবি বাক্যগঠন রীতিনীতি: নাহবেমীর, শরহে মিয়াতে আমেল), ফার্সি সাহিত্য (পান্দে আত্তার, গুলস্তাঁ, বোস্তাঁ), ফিকহের প্রারম্ভিক কিতাব (নূরুল ইযাহ, মালা বুদ্দা মিনহু)। সাথে বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার ও পাটিগণিত/বীজগণিত।
- সাধারণ শিক্ষার সমমান: জুয়িনর স্কুল বা জেএসসি (JSC / Class 8)।
৩. মারহালাতুচ্ছ ছানাবিয়্যাতুল আম্মাহ (মাধ্যমিক স্তর)
- সময়কাল: ২ বছর (কওমী পরিভাষায়: কুদুরী ও কাফিয়া শ্রেণী)।
- পঠিত বিষয়: হানাফী ফিকহের সুপ্রসিদ্ধ আকর গ্রন্থ ‘মুখতাছারুল কুদুরী’, উছূলুল ফিকহের প্রারম্ভিক কিতাব ‘উছূলুশ শাশী’, উচ্চতর নাহু ‘কাফিয়া’ ও ‘হেদায়াতুন নাহু’, ইলমুছ ছরফের শেষ কিতাব ‘ইলমুছ সীগাহ’, প্রারম্ভিক মানতিক ‘তাইসীরুল মানতিক’ ও ‘মিরক্বাত’, এবং আরবি সাহিত্য কিতাব ‘রওজাতুল আদব’।
- সাধারণ শিক্ষার সমমান: মাধ্যমিক বা এসএসসি (SSC / Class 10)।
৪. মারহালাতুচ্ছ ছানাবিয়্যাতুল উলইয়া (উচ্চ-মাধ্যমিক স্তর)
- সময়কাল: ২ বছর (কওমী পরিভাষায়: শরহে বেকায়া ও হেদায়া-১ম শ্রেণী)।
- পঠিত বিষয়: ফিকহ ও ফিকহের দর্শনের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘শরহে বেকায়া’ (১ম ও ২য় খণ্ড), উছূলুল ফিকহের প্রমাণ্য গ্রন্থ ‘নূরুল আনওয়ার’ ও ‘হুছামী’, বালাগাত বা অলংকারশাস্ত্রের বিশ্ববিখ্যাত কিতাব ‘মুখতাছারুল মাআনী’, উচ্চতর নাহু ‘শরহে জামী’, সীরাতুন্নবী ও ইতিহাসের কিতাব এবং উচ্চতর মানতিক ‘ক্বুতবী’।
- সাধারণ শিক্ষার সমমান: উচ্চ-মাধ্যমিক বা এইচএসসি (HSC / Class 12)।
৫. মারহালাতুল ফযীলত (স্নাতক/ডিগ্রি স্তর)
- সময়কাল: ২ বছর (কওমী পরিভাষায়: হেদায়া-শেষ শ্রেণী এবং মেশকাত শ্রেণী)।
- পঠিত বিষয়: হানাফী ফিকহের সর্বোচ্চ তাত্ত্বিক কিতাব ‘আল-হেদায়া’ (৩য় ও ৪র্থ খণ্ড), তাফসীরে কুরআন ‘তাফসীরে জালালাইন’ ও ‘তাফসীরে বায়যাবী’, উছূলুত তাফসীর ‘আল-ফাউজুল কবীর’, এবং হাদীছ শাস্ত্রের সুবিশাল সংকলন ‘মেশকাতুল মাছাবীহ’ (১ম ও ২য় খণ্ড)। সাথে উছূলুল হাদীছের বিশ্ববিখ্যাত কিতাব ‘নুখবাতুল ফিকার’।
- সাধারণ শিক্ষার সমমান: ব্যাচেলর অব আর্টস (BA) / ডিগ্রী বা অনার্স।
৬. মারহালাতু তিসজীল বা তাকমীল (দাওরায়ে হাদীছ – স্নাতকোত্তর স্তর)
- সময়কাল: ১ বছর।
- পঠিত বিষয়: এই এক বছর সম্পূর্ণভাবে হাদীছ শাস্ত্রের জন্য উৎসর্গীকৃত। এতে হাদীছের ৬টি সর্বাধিক প্রখ্যাত আকর গ্রন্থ (সিহাহ ছিত্তাহ) সহ মোট ১০টি হাদীছ গ্রন্থ আমূল ও পূর্ণাঙ্গভাবে পাঠ করানো হয়:১. সহীহ আল-বুখারী (১ম ও ২য় খণ্ড)২. সহীহ মুসলিম (১ম ও ২য় খণ্ড)৩. জামে’ আত-তিরমিজী (১ম ও ২য় খণ্ড)৪. সুনানে আবু দাউদ (১ম ও ২য় খণ্ড)৫. সুনানে নাসাঈ৬. সুনানে ইবনে মাজাহ৭. মুয়াত্তা ইমাম মালিক৮. মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ৯. শারহু মাআনিল আছার (তহাবী শরীফ)১০. শামায়েলে তিরমিজী
- আইনগত স্বীকৃতি: ২০১৮ সালের আইন অনুযায়ী এই মারহালাটি ‘ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি’ বিষয়ে মাস্টার্স (M.A.) সমমানের সরকারি মর্যাদা প্রাপ্ত।
৭. মারহালাতুাত তাখাস্সুস (উচ্চতর গবেষণা ও বিশেষায়িত ডিগ্রি)
- সময়কাল: ১ থেকে ৩ বছর।
- শাখাসমূহ:
- তাখাস্সুস ফীল ফিকহ ওয়াল ফাতাওয়া (ইফতা): ইসলামি আইনশাস্ত্র ও ফতোয়া প্রদান পদ্ধতি সম্পর্কিত উচ্চতর গবেষণা।
- তাখাস্সুস ফীল হাদীছ: হাদীছের সনদ, আসমাউর রিজাল (বর্ণনাকারীদের জীবনী) ও জারহ-তা’দীল সম্পর্কিত উচ্চতর গবেষণা।
- তাখাস্সুস ফীত তাফসীর: কুরআনের উচ্চতর তাফসীর ও উছূলুত তাফসীর গবেষণা।
- তাখাস্সুস ফিল লুগাতিল আরাবিয়্যাহ: আরবি ভাষা ও উচ্চতর সাহিত্য গবেষণা।
- সাধারণ শিক্ষার সমমান: পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন গবেষণা / এমফিল বা পিএইচডি (MPhil / PhD) পর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি।
৫: নেসাব ও কিতাবভিত্তিক ব্যবচ্ছেদ (প্রারম্ভিক ও মাধ্যমিক স্তর)
কওমী শিক্ষাব্যবস্থার আসল পরিচিতি লুকিয়ে আছে এর নির্দিষ্ট দরসী কিতাব সমূহের মধ্যে। সাধারণ শিক্ষায় যেখানে প্রতি বছর বা কয়েক বছর পর পর বোর্ডের পাঠ্যবই পরিবর্তন হয়, কওমী মাদ্রাসায় শতাব্দীপ্রাচীন আরবি টেক্সটসমূহ অবিকল পাঠ করানো হয়। উস্তাদগণ শ্রেণীকক্ষে সেই মূল আরবি পাঠ (ইবারত) রিডিং পড়েন, প্রতিটি শব্দের ব্যাকরণগত অবস্থান ব্যাখ্যা করেন এবং অতপর কিতাবের শারাহ বা ব্যাখ্যার আলোকে গভীর ইলমী বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন।
১. ইলমুছ ছরফ (শব্দবিজ্ঞান ও রূপান্তর)
- মিজানুস ছরফ ও মুনশাইব: ফার্সি ও আরবি মিশ্রিত প্রারম্ভিক বই। এখানে ‘ফা-আ-লা’ (সে করলো) এই মূল ধাতুর ওপর ভিত্তি করে অতীত (মাযী), বর্তমান/ভবিষ্যৎ (মুযারে), আদেশ (আমোর) ও নিষেধ (নাহী)-এর রূপান্তর (ছীগাহ বা گردان) মুখস্থ করানো হয়। তালিবে ইলম শেখে কীভাবে একটি ক্রিয়া থেকে একবচন (ওয়াহিদ), দ্বিবচন (তাছনিয়া) ও বহুবচন (জামা) এবং পুরুষবাচক (মুযাক্কার) ও স্ত্রীবাচক (মুআন্নাস)-এর ১৪টি আলাদা রূপ তৈরি হয়।
- ইলমুছ ছরফ ও ইলমুছ সীগাহ: মধ্যম স্তরের কিতাব। এখানে আরবি শব্দের ভেতরে ‘তালীল’ (অক্ষরের পরিবর্তন, যেমন ওয়াও বা ইয়া বর্ণ কীভাবে আলিফে রূপান্তরিত হয়) এবং ‘ইদগাম’ (দুটি সমবর্ণকে যুক্ত করা)-এর জটিল গাণিতিক নিয়মাবলী শেখানো হয়। ‘ইলমুছ সীগাহ’ কিতাবটি ফার্সি ভাষায় লেখা, যা শিক্ষার্থীদের জটিল শব্দ বিশ্লেষণ বা ‘সীগাহ এছবাত’ করার সক্ষমতা দেয়।
২. ইলমুন নাহু (বাক্যরীতি ও ব্যাকরণ)
- নাহবেমীর: প্রখ্যাত আলিম মীর সায়েদ শরীফ জুর্জানী -এর লেখা ফার্সি ভাষার প্রারম্ভিক নাহু কিতাব। এখানে বাক্যকে দুই ভাগে ভাগ করা শেখানো হয়—জুমলায়ে ইছমিয়্যা (বিশেষ্যমূলক বাক্য) এবং জুমলায়ে ফেলিয়্যা (ক্রিয়ামূলক বাক্য)। ইছম (বিশেষ্য), ফেল (ক্রিয়া) ও হরফ (অব্যয়)-এর পরিচয় এবং বাক্যে এদের অবস্থান চিহ্নিত করা শেখে তালিবে ইলম।
- হেদায়াতুন নাহু: মাঝারি স্তরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরবি কিতাব। এখানে ‘ই’রাব’ (শব্দের শেষ বর্ণে পেশ, জের বা যবর হওয়ার নিয়ম) নিয়ে গভীর আলোচনা করা হয়। ‘আমেল’ (যিনি শব্দের শেষে পরিবর্তন ঘটান), ‘মা’মূল’ (যার ওপর পরিবর্তন ঘটে) এবং ‘ই’রাব’-এর এই ত্রিমুখী সম্পর্ক বোঝা কওমী শিক্ষার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
- কাফিয়া: আল্লামা (ইবনুল হাজিব) রচিত নাহুর চূড়ান্ত কিতাব। কিতাবটি অত্যন্ত সংক্ষেপিত অথচ গভীর। এতে আরবি ব্যাকরণের জটিল নিয়মগুলোকে যুক্তি ও মানতিকের আদলে উপস্থাপন করা হয়েছে। কাফিয়ার ইবারত বোঝা এবং এর কঠিন ব্যাকরণগত জটিলতা জট খোলা কওমী মেধার এক বড় পরীক্ষা।
৩. প্রারম্ভিক ফিকহ (ইসলামি আইনশাস্ত্র)
- নূরুল ইযাহ: ইমাম হাসান শুরুনবুলালী রচিত হানাফী ফিকহের প্রাথমিক আকর। এখানে প্রধানত ইবাদাত অংশ রয়েছে। তাহারাত (পবিত্রতা), ওজু, গোসল, তায়াম্মুম, নাজাছাত, সালাত (নামাজ), ছিয়াম (রোজা) ও ই’তিকাফের মাসায়েল এতে অত্যন্ত সহজ ও সুন্দর বিন্যাসে উপস্থাপন করা হয়েছে।
- মুখতাছারুল কুদুরী: ইমাম আবুল হুসাইন আহমদ আল-কুদুরী রচিত হানাফী ফিকহের অন্যতম সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য কিতাব। একে হানাফী মাযহাবের ‘মেতন’ বা মূল আইনসূত্র ধরা হয়। এতে কেবল ইবাদাত নয়; বরং মুয়ামালাত (ক্রয়-বিক্রয়, সুদ, ইজারা, জামানত, রহন বা বন্ধক) এবং মুনাকাহাত (বিবাহ, দেনমোহর, তালাক, ইদ্দত, দুধপান) এবং জিনায়াত (অপরাধ ও শাস্তি) থেকে শুরু করে বিচার ব্যবস্থার মৌলিক বিধানাবলী অধ্যায়ভিত্তিক বর্ণিত হয়েছে। কুদুরী পাঠের মাধ্যমেই একজন তালিবে ইলম ফিকহী মানসিকতায় প্রবেশ করে।
৪. উছূলুল ফিকহ (আইননীতির বিজ্ঞান)
- উছূলুশ শাশী: ইমাম নিজামুদ্দীন আশ-শাশী রচিত উছূলুল ফিকহের প্রারম্ভিক আকর। ফিকহের মাসআলাগুলো সরাসরি কুরআন ও হাদীছ থেকে কীভাবে বের করা হয় (ইছতিনবাত), তার মূলনীতি এতে শেখানো হয়। কুরআন ও হাদীছের শব্দমালাকে চারভাগে ভাগ করে আলোচনা করা হয়:১. খাছ (নির্দিষ্ট), আম (সাধারণ), মুশত যৌথ অর্থবোধক) ও মুআব্বাল (ব্যাখ্যাকৃত)।
২. জাহের (প্রকাশ্য), তাফছীর, মহকাম ও তা’বীল।
৩. হাকীক্বত (আক্ষরিক অর্থ) ও মাজায (রূপক অর্থ)।
৪. অমোর (আদেশ) ও নাহী (নিষেধ)-এর আইনি প্রভাব।
এছাড়াও ইজমা (ঐকমত্য) এবং ক্বিয়াস (সাদৃশ্যমূলক আইনি অনুমান)-এর নিখুঁত নীতি এতে শেখানো হয়।
৬: নেসাব ও কিতাবভিত্তিক ব্যবচ্ছেদ (উচ্চতর স্তর ও দাওরায়ে হাদীছ)
১. ফিকহ ও উছূলুল ফিকহের সর্বোচ্চ স্তর
- শরহে বেকায়া: আল্লামা বুহানুল শরীআহ রচিত কিতাব। এটি ‘বেকায়াতুর রিওয়ায়াহ’ নামক মূল ফিকহী মেতনের বিস্তারিত শারাহ বা ব্যাখ্যা। এতে প্রতিটি ফিকহী মাসআলায় হানাফী মাযহাবের যুক্তি, দলীলের বিশ্লেষণ এবং অন্যান্য মাযহাবের (যেমন ইমাম শাফেয়ী বা ইমাম মালিক-এর) সাথে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য তুলে ধরা হয়।
- আল-হেদায়া: আল্লামা বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী রচিত ইসলামি আইনের কালজয়ী এনসাইক্লোপিডিয়া। পৃথিবীর ইতিহাসে আইনশাস্ত্রের ওপর রচিত অন্যতম গভীরতম গ্রন্থ এটি। ব্রিটিশ আমলে ভারতের আদালতগুলোতে হানাফী আইন পরিচালনায় এই হেদায়া কিতাবের ইংরেজি অনুবাদ ব্যবহৃত হতো। হেদায়ার দরসে উস্তাদগণ প্রতিটি মাসআলায় ‘আছহাবুর রায়’ (যুক্তিভিত্তিক ফকীহগণ) এবং ‘আছহাবুল হাদীছ’-এর অবস্থানের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। ইমাম আজম আবু হানীফা, তাঁর দুই প্রখ্যাত ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ -এর (যাদের একত্রে ‘সাহেবাইন’ বলা হয়) ভেতরের অভ্যন্তরীণ ইলমী ইখতিলাফ বা মতপার্থক্য এবং এর পেছনের ‘ইলেল’ বা যুক্তি বর্ণনা করা হেদায়ার প্রধান বৈশিষ্ট্য।
- নূরুল আনওয়ার: মোল্লা জিউন রচিত উছূলুল ফিকহের প্রখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ (যা মূলত ‘আল-মানার’ কিতাবের শারাহ)। এতে ইসলামি আইনের উৎসসমূহ (কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও ক্বিয়াস)-এর তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর অত্যন্ত সূক্ষ্ম যুক্তিভিত্তিক আলোচনা রয়েছে।
২. বালাগাত ও মানতিক (অলংকারশাস্ত্র ও যুক্তিবিদ্যা)
- মুখতাছারুল মাআনী: আল্লামা তাফতাযানী রচিত বালাগাতের সর্বোচ্চ কিতাব। কিতাবটি তিনটি মূলভাগে বিভক্ত:১. ইলমুল মাআনী: বাক্যের শব্দসংস্থান ও শ্রোতার মানসিক অবস্থা অনুযায়ী বাক্যের প্রয়োগ।২. ইলমুল বায়ান: উপমা (তাশবীহ), রূপক (মাজায ও ইস্তিআরাহ) এবং পরোক্ষ ইঙ্গিত (কিনায়াহ)-এর অলংকার বিশ্লেষণ।৩. ইলমুল বাদী: শব্দের অলংকার ও অর্থের সৌন্দর্যের সূক্ষ্ম কারুকাজ। কুরআনের অলৌকিকত্ব ও ভাষাগত সৌন্দর্য অনুধাবনে এই কিতাব অপরিহার্য।
- ক্বুতবী: কাজী ক্বুতবুদ্দীন আল-রাযী রচিত মানতিকের উচ্চতর কিতাব। এতে ‘তাছাব্বুরাত’ (ধারণাসমূহ) এবং ‘তাছদীক্বাত’ (সত্যতা নিরূপণ ও অনুমান)-এর ওপর গভীর গ্রীক-ইসলামি যুক্তিশাস্ত্রের দরস দেওয়া হয়।
৩. তাফসীর ও উছূলুত তাফসীর
- তাফসীরে জালালাইন: দুই জালাল অর্থাৎ জালালুদ্দিন আল-মহাল্লী ও জালালুদ্দিন আস-সুয়ূতী রচিত সংক্ষেপিত অথচ অনন্য তাফসীর। এখানে কুরআনের ইবারতের ব্যাকরণগত অবস্থান, অস্পষ্ট শব্দের ব্যাখ্যা, শানে নুযূল (অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট) এবং নাসিখ-মানসূখ (রহিতকারী ও রহিত হওয়া আয়াত) নির্দেশ করা হয়।
- তাফসীরে বায়যাবী: কাজী নাছিরুদ্দীন বায়যাবী রচিত সূক্ষ্মতম তাফসীর। এতে কুরআনের বাক্যের গভীর বালাগাত, ভাষাগত অলংকার এবং কালামী (আকিদাগত) জটিলতার ওপর গভীর একাডেমিক ফারাক তুলে ধরা হয়।
- আল-ফাউজুল কবীর ফী উছূলিত তাফসীর: শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছে দেহলভী রচিত তাফসীর বিজ্ঞানের মূলনীতি সংক্রান্ত ফার্সি বই। এতে কুরআন বোঝার ৫টি মৌলিক ইলম (ইলমুল আহকাম, ইলমুল মুখাছামাহ, ইলমু তাযকীরে বি-আলাইল্লাহ, ইলমু তাযকীরে বি-আইয়ামিল্লাহ, এবং ইলমু তাযকীরে বিল-মাউত)-এর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
৪. তাকমীল/দাওরায়ে হাদীছের নিবিড় পর্যালোচনা
হাদীছের প্রতিটি সনদের (বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিক শিকল) রাবী বা বর্ণনাকারীদের চরিত্র, স্মৃতিশক্তি, বিশ্বস্ততা এবং শিক্ষক-ছাত্রের সাক্ষাতের ঐতিহাসিক প্রমাণ পরীক্ষা করা হয়। একে বলা হয় ‘জারহ ওয়া তা’দীল’ (সমালোচনা ও অনুমোদন) শাস্ত্র। কওমী তালিবে ইলমরা শেখে ইমাম বুখারী কেন কোনো রাবীর হাদীছ গ্রহণ করেছেন আর ইমাম মুসলিম বা ইমাম আবু দাউদ কেন তাঁকে গ্রহণ বা বর্জন করেছেন।
সহীহ বুখারীর প্রতিটি ‘বাব’ বা অনুচ্ছেদের শিরোনামের (তরাজুমুল আবওয়াব) পেছনে ইমাম বুখারীর গভীর ফিকহী ইজতিহাদ লুকিয়ে থাকে। দরসে বুখারীতে উস্তাদগণ শেখান কীভাবে ইমাম বুখারী একটি অনুচ্ছেদের শিরোনাম দিয়ে নির্দিষ্ট কোনো ফিকহী মাযহাবের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন কিংবা খণ্ডন করেছেন। পাশাপাশি ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম তিরমিজী এবং ফুকাহায়ে কেরামের মধ্যে হাদীছের ব্যাকরণগত ও আইনি প্রয়োগ নিয়ে যে মতপার্থক্য রয়েছে, তা অকাট্য দলীল ও যুক্তির মাধ্যমে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয় এবং হানাফী মাযহাবের দলীলের প্রাবল্য প্রমাণ করা হয় (যাকে কওমী পরিভাষায় ‘থারজীহে মাযহাবে হানাফী’ বলা হয়)।
কেবল হাদীছের বাহ্যিক শব্দ নয় (রেওয়ায়েত), হাদীছের গভীর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও যুক্তির সাথে সামঞ্জস্যতা (দেরায়েত) বিচার করা শেখানো হয়। বিশেষ করে ইমাম আবু জাফর তহাবী -এর ‘শারহু মাআনিল আছার’ (তহাবী শরীফ) কিতাবে বাহ্যিকভাবে বিরোধপূর্ণ মনে হওয়া হাদীছগুলোর মধ্যে কীভাবে সামঞ্জস্যবিধান (তাতবীক্ব) করতে হয় বা কোনটা নাসিখ (রহিতকারী) তা বের করার চমৎকার গাণিতিক পদ্ধতি দরস দেওয়া হয়।
৭: তাখাস্সুস বা উচ্চতর গবেষণা: ফিকহ, হাদীছ ও দাওয়াহ
১. তাখাস্সুস ফীল ফিকহ ওয়াল ফাতাওয়া (ইফতা)
- পঠিত মূল কিতাব ও আকর গ্রন্থ: ‘রদ্দুল মুহতার আলাদ্দুররিল মুখতার’ (যা ‘ফাতাওয়া-ই শামী’ নামে বিখ্যাত – আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী রচিত হানাফী ফিকহের সর্বাধুনিক সর্বসম্মত আইনি এনসাইক্লোপিডিয়া), ‘ফাতাওয়া-ই ক্বাজীখান’, ‘আল-ফাতাওয়া আল-আলমগীরী’ (ফাতাওয়া-ই হিন্দিয়া), ‘আশ-শব্দ ওয়ান-নাযায়ির’ (ইমাম ইবনে নুজাইম রচিত ফিকহী প্রবাদ ও উছূলের কিতাব), এবং ‘উফূদ আল-মালী ফী উছূলি ইফতা’।
- অর্জিত বাস্তবমুখী আমলী শিক্ষা (তাজীবে ফাতাওয়া): তালিবে ইলমদের প্রতিদিন নির্দিষ্ট মাসআলায় ফতোয়া লিখতে দেওয়া হয় (যাকে ‘তমরীন’ বা চর্চা বলা হয়)। উস্তাদগণ (মুফতী সাহেবগণ) সেই লেখা পরীক্ষা করে ইবারত, ফিকহী উছূলের সঠিক প্রয়োগ এবং দলীলের রেফারেন্স ভুল হলে সংশোধন করে দেন। একজন গবেষক যখন শত শত ফতোয়া লিখে উস্তাদের কাছ থেকে অনুমোদন বা ‘দস্তখত’ পান, তখন তাঁকে ‘মুফতী’ বা বিচারিক আইনি পরামর্শক হিসেবে সনদ ও ইজাযাহ প্রদান করা হয়।
২. তাখাস্সুস ফীল হাদীছ
- পঠিত মূল কিতাব: আল্লামা ইবনে হাজার আসক্বালানী রচিত ‘ফাতহুল বারী’ (বুখারীর সেরা ব্যাখ্যাগ্রন্থ), ইমাম নববীর ‘শারহে মুসলিম’, ইবনে কাছীরের ‘আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া’, এবং ইমাম যাহাবী রচিত ‘মিযানুল ইতিদাল’ ও ‘তাজকীরাতুল হুফফাজ’।
- গবেষণার কাজ: তালিবে ইলমকে কোনো একটি অপ্রকাশিত বা জটিল হাদীছের পান্ডুলিপির সনদ তাহকীক করা, রাবীদের অবস্থা চুলচেরা বিশ্লেষণ করা এবং হাদীছটি সহীহ না দো’ঈফ—তার ওপর বৈজ্ঞানিক থিসিস (রিসালাহ) প্রস্তুত করতে হয়।
- অষ্টম অধ্যায়: কওমী তালিবে ইলমের অর্জিত প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক সক্ষমতা, টেক্সচুয়াল গভীরতা ও ফিকহী মেধার ইতিবাচক বিশ্লেষণ।
- নবম অধ্যায়: নলেজ গ্যাপ (Knowledge Gap) ও বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতার নির্মোহ বিশ্লেষণ: বিজ্ঞান, বিশ্ব ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, আধুনিক অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অনুপস্থিতি।
- দশম অধ্যায়: সমকালীন বিশ্ব, আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো এবং কওমী শিক্ষা: আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ, সমন্বয়ী প্রস্তাবনা ও বাস্তবমুখী সংস্কার রূপরেখা।
৮: কওমী শিক্ষার অনন্য বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ও ইতিবাচক দিক
কওমী শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা বা আধুনিক যুগের নিরিখে এর ঘাটতি আলোচনার পূর্বে এই ব্যবস্থার ভেতরের সেই সমস্ত বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক শক্তির জায়গাগুলো বোঝা জরুরি। একজন তালিবে ইলম (শিক্ষার্থী) যখন সাড়ে ১৫ থেকে ১৮ বছর কওমী পরিবেশে সময় পার করে, তখন তার ভেতরে কিছু নির্দিষ্ট দক্ষতা গড়ে ওঠে, যা আধুনিক সাধারণ শিক্ষার সাথে তুলনা করা কঠিন।
১. ইবারত ফহমী বা টেক্সচুয়াল অ্যানালিসিসের দক্ষতা
কওমী শিক্ষার সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য হলো প্রাচীন ও জটিল ভাষাগত পাঠ্য বিশ্লেষণ (Textual Analysis)-এর ক্ষমতা। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেখানে শিক্ষার্থীদের অনুবাদ বা সহজ করা নোট পড়তে দেওয়া হয়, সেখানে কওমী মাদ্রাসায় একেবারে প্রাথমিক স্তর অতিক্রম করার পর থেকেই মূল আরবি গ্রন্থ বা ‘মেতন’ সামনে রাখা হয়।
এই কিতাবগুলোতে কোনো হরকত (যের, যবর, পেশ) থাকে না। এমনকি কোথায় বাক্য শেষ হলো, কোথায় নতুন ব্যাকরণগত শর্ত যুক্ত হলো—তার কোনো আধুনিক বিরামচিহ্নও (Comma, Full stop) থাকে না। একজন তালিবে ইলমকে কেবল ব্যাকরণের (নাহু ও ছরফ) সুগভীর প্রয়োগ ঘটিয়ে অনুমান করতে হয় কোথায় ‘মুবতাদা’ (Subject) আর কোথায় ‘খবর’ (Predicate), কোথায় ‘ফায়েল’ (Subject of verb) আর কোথায় ‘মাফউল’ (Object)।
২. প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পদ্ধতি: মুতাওলাআ, দরস, তাকরীর ও মুযাকারা
- মুতাওলাআ (পূর্ব প্রস্তুতি): শ্রেণীকক্ষে উস্তাদ (শিক্ষক) কিতাব পড়ানোর আগে শিক্ষার্থীরা রাতে নিজেরা বা সহপাঠীদের সাথে পরদিনের নির্ধারিত অংশ পড়ে আসে। কিতাবের কোথায় কঠিন ইবারত রয়েছে, কোন শব্দের অর্থ অজানা এবং কোথায় যুক্তির মারপ্যাঁচ রয়েছে—তা শিক্ষার্থী আগেই চিহ্নিত করার চেষ্টা করে।
- দরস ও তাকরীর (শ্রেণীকক্ষের দরস ও বক্তৃতা): উস্তাদ যখন দরসে কিতাব খুলে পঠিত অংশের ইবারত শোনেন, তখন তিনি কেবল আক্ষরিক অনুবাদ করেন না; বরং কিতাবের ব্যাখ্যামূলক বিস্তার (তাকরীর) উপস্থাপন করেন। উস্তাদ পূর্বে পঠিত বিভিন্ন শাস্ত্রের রেফারেন্স যুক্ত করে কিতাবের মূল দাবি তুলে ধরেন।
- ইশকাল ও জওয়াব (প্রশ্নোত্তর ও সংশয় নিরসন): দরস চলাকালীন বা দরস শেষে শিক্ষার্থীরা মুক্তমনে উস্তাদকে প্রশ্ন বা ‘ইশকাল’ (সংশয়) উত্থাপন করতে পারে। কোনো শিক্ষার্থী যদি কিতাবের লেখকের যুক্তিতে কোনো দুর্বলতা পায় বা উস্তাদের ব্যাখ্যার সাথে অন্য কিতাবের বৈপরীত্য দেখে, তবে সে বিনীত কিন্তু স্বাধীন যুক্তি নিয়ে উস্তাদের মুখোমুখি হতে পারে। উস্তাদ যুক্তি ও দলীলের মাধ্যমে সেই ইশকালের নিরসন (জওয়াব) করেন। এটি কওমী শিক্ষার অন্যতম স্বাধীন চিন্তার জায়গা।
- মুযাকারা (দলগত পুনরালোচনা): রাতের দরস শেষে তালিবে ইলমরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে সারাদিনে পঠিত বিষয়াবলী পুনরায় আলোচনা করে। একজন শিক্ষার্থী উস্তাদের ভূমিকায় গিয়ে অন্য সহপাঠীদের সামনে সারাদিনের দরস পুনরায় উপস্থাপন করে। এতে যার কোথাও অস্পষ্টতা থাকে, তা দূর হয়ে যায় এবং স্মৃতিতে পাঠ স্থায়ী হয়।
৩. ফিকহী আইননীতি ও যুক্তিশাস্ত্রের চর্চা
কওমী পাঠ্যক্রমে ‘মা’কূলিয়াৎ’ (যুক্তিভিত্তিক শাস্ত্র) অর্থাৎ মানতিক, বালাগাত এবং উছূলুল ফিকহের প্রাধান্য থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি কিছুটা শাণিত হয়। ফিকহী কিতাবগুলো (যেমন: কুদুরী, শরহে বেকায়া, হেদায়া) অধ্যয়নের মাধ্যমে তারা শেখেন কীভাবে একটি মূল আইনসূত্র থেকে শত শত আনুষঙ্গিক শাখা-মাসআলা বের করতে হয়।
৪. ত্যাগের মানসিকতা, চারিত্রিক বিশুদ্ধতা ও মেহনতের সংস্কৃতি
কওমী শিক্ষারর চেষ্টা করে শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠন ও অনাড়ম্বর জীবনধারা। আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় যেখানে ডিগ্রিকে কেবল অর্থনৈতিক উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়, কওমী শিক্ষায় ‘ইলম’ অর্জনকে দেখা হয় ইবাদাত ও আত্মশুদ্ধির (তাজকিয়া) মাধ্যম হিসেবে।
৯: নলেজ গ্যাপ বা জ্ঞানগত শূন্যতার নির্মোহ বিশ্লেষণ
কওমী শিক্ষার ইতিবাচক ঐতিহ্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা যতটাই সমৃদ্ধ হোক না কেন, সমকালীন বিশ্ব বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ালে এর আধুনিক জ্ঞানগত শূন্যতা বা ‘নলেজ গ্যাপ’ অত্যন্ত প্রকট হয়ে ওঠে। দেওবন্দী নেসাব যে প্রেক্ষাপটে ও যুগে প্রণীত হয়েছিল, আজকের একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বব্যবস্থা তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে এই নেসাবে অর্জিত ইলম দিয়ে দ্বীনের হিফাজত করা সম্ভব হলেও, আধুনিক বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়া বা আধুনিক সমস্যার সময়োপযোগী সমাধান প্রদান করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
১. প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও পরীক্ষণমূলক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অনুপস্থিতি
- পদ্ধতিগত পার্থক্য: কওমী শিক্ষার অনুসন্ধানের মূল পদ্ধতি হলো ‘ডিডাক্টিভ’ বা শাস্ত্রীয় বচন ও সিদ্ধান্ত থেকে ফল বের করা (Deductive Logic)। পক্ষান্তরে, আধুনিক বিজ্ঞান দাঁড়িয়ে আছে ‘ইম্পিরিক্যাল’ বা পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও ল্যাবরেটরি-ভিত্তিক পরীক্ষামূলক পদ্ধতির ওপর (Empirical Method)।
- ঘাটতির ক্ষেত্রসমূহ: আধুনিক রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জিন প্রকৌশল (Genetic Engineering), এবং কম্পিউটার সায়েন্সের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি উচ্চতর কওমী স্তরে নেই।
- সৃষ্ট সমস্যা: এর ফলে যখন কোনো আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিষয় সংক্রান্ত ফিকহী বিধান বা ফতোয়া নির্ধারণের প্রয়োজন হয় – যেমন অর্গান ট্রান্সপ্লান্টেশন (অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন), ব্রেন ডেথ, টেস্টটিউব বেবি, ক্লোনিং, জিন সম্পাদনা বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা – তখন কওমী মুফতীগণ পুরোপুরি বাহ্যিক সোর্স বা বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। আধুনিক বিজ্ঞানের ভেতরের পদ্ধতি না বোঝায় অনেক সময় ফতোয়াগুলোতে প্রাক্সিস বা বাস্তবমুখীতার অভাব দেখা যায়।
২. বিশ্ব ইতিহাস, বিশ্বায়ন ও সামাজিক বিজ্ঞানের অজ্ঞতা
- অনুপস্থিত ঐতিহাসিক বাঁকসমূহ: ইউরোপীয় রেনেসাঁ (Renaissance), প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলন, শিল্প বিপ্লব (Industrial Revolution), ফরাসি বিপ্লব, আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের (Nation-State) উদয়, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, বিশ্বায়ন (Globalisation) এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক (Post-colonial) বিশ্বব্যবস্থার রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস নেসাবে অন্তর্ভুক্ত নয়।
- সমাজবিজ্ঞানের অভাব: সমাজবিজ্ঞান (Sociology) ও নৃবিজ্ঞান (Anthropology)-এর জ্ঞান না থাকার ফলে আধুনিক সমাজের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন, সামাজিক রূপান্তর, পারিবারিক কাঠামোর ভাঙ্গন এবং গণমাধ্যমের প্রভাব অনুধাবন করা কওমী গ্রাজুয়েটদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ইতিহাসকে কেবল ‘ভালো আলেম বনাম খলনায়ক’-এর দ্বিমুখী চোখে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়, যা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির জটিল চালচিত্র বোঝার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
৩. আধুনিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার দূরত্ব
- অনুপস্থিত অর্থনৈতিক ধারণা:
১. ফিয়াট মানি (Fiat Money) বা স্বর্ণ মানদণ্ডবিহীন আধুনিক কাগজী মুদ্রা ও ডিজিটাল কারেন্সির মান নির্ধারণী তত্ত্ব।
২. সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা, মুদ্রাস্ফীতি (Inflation), ফ্লোটিং এক্সচেঞ্জ রেট এবং সুদের হার নিয়ন্ত্রণের অর্থনৈতিক কার্যপ্রণালী।
৩. পুঁজিবাজার (Stock Market), ডেডিভেটিভস, ফিউচার ট্রেডিং, শেয়ার বাজার এবং আধুনিক ইনসিওরেন্স (Insurance) বা তাকাফুল ব্যবস্থা।
৪. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা (WTO), বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং বৈশ্বিক পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামো (Capitalist Economy)। - সৃষ্ট আইনি সংকট: একজন উচ্চতর ইফতা পড়ুয়া তালিবে ইলম প্রাচীন কিতাব পড়ে জানেন যে কীভাবে দুটি ঘোড়া বা এক বস্তা গমের বিনিময় করতে হয়। কিন্তু তিনি যখন আধুনিক কর্পোরেট আইন, ইসলামী ব্যাঙ্কিংয়ের সূক্ষ্ম পোরটফোলিও, সুকুক (Sukuk) বন্ড কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির (Crypto Currency) মুখোমুখি হন, তখন কেবল প্রাচীন নজির দিয়ে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঠিক সমাধান দিতে গিয়ে বড় ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েন।
৪. আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শন, রাজনৈতিক মতবাদ ও অন্যান্য ধর্ম অধ্যয়ন
- অনুপস্থিত দর্শনসমূহ:
১. এপিস্তেমোলজি বা আধুনিক জ্ঞানতত্ত্ব (Descartes, Kant, Hume-এর দর্শন)।
২. সেক্যুলারিজম (ধরমনিরপেক্ষতাবাদ), হিউম্যানিজম (মানবতাবাদ), এবং লিবারেল ডেমোক্রেসি (উদারনৈতিক গণতন্ত্র)।
৩. মেটেরিয়ালিজম (বস্তুবাদ), মার্ক্সবাদ (Marxism), এবং আধুনিক উত্তর-আধুনিকতাবাদ (Postmodernism) ও জেন্ডার থিওরি (Gender Theory)। - ধর্মীয় আকিদার সংকট: আজকের তরুণ সমাজ মধ্যযুগীয় মু’তাযিলাদের সংশয় নিয়ে চিন্তিত নয়; বরং তারা নাস্তিক্যবাদ (Atheism), সংশয়বাদ (Agnosticism) এবং সেক্যুলার নৈতিকতার প্রশ্নে বিভ্রান্ত। কওমী আলেমদের নেসাবে এই আধুনিক দর্শনগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ না থাকায় তারা অনেক সময় আধুনিক তরুণদের যুক্তিভিত্তিক সংশয় নিরসন করতে না পেরে কেবল ‘ফতোয়া’ বা ‘কুফরী’-র ট্যাগ দিয়ে আলোচনা শেষ করতে চান, যা সমস্যার সমাধান করে না।
- তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অভাব: হিন্দুধর্ম, খ্রিস্টধর্ম, বৌদ্ধধর্ম বা অন্যান্য বিশ্বধর্মের মূল আকর গ্রন্থসমূহ নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে অধ্যয়ন করার (Comparative Religion) কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই। ফলে অন্যান্য ধর্মের মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশল তৈরি হচ্ছে না।
৫. ভাষাগত সীমাবদ্ধতা ও প্রযুক্তিগত পিছিয়ে থাকা
- আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি: প্রথাগত কওমী নেসাবে আধুনিক কাজের উপযোগী একাডেমিক বা কূটনৈতিক ইংরেজি শেখার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ফলে আন্তর্জাতিক সেমিনার, জাতিসংঘ বা বৈশ্বিক বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে ইসলামি দৃষ্টিকোণ তুলে ধরার মতো উচ্চমানের ইংরেজিভাষী আলিম তৈরি হচ্ছে না।
- আধুনিক আরবি বনাম প্রাচীন কিতাবী আরবি: কওমী তালিবে ইলমরা প্রাচীন কিতাবী আরবি (Fusha) পড়তে ও বুঝতে অত্যন্ত পারদর্শী হলেও, মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক ব্যাকরণভিত্তিক কথোপকথন (Ammiya/Modern Standard Arabic) এবং আধুনিক আরবি সাহিত্য পাঠে অনেকেই অনভ্যস্ত।
- তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল দক্ষতা: আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি (ICT), কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল মিডিয়া, ডাটা অ্যানালিসিস এবং আধুনিক একাডেমিক সাইটেশন ও রিসার্চ মেথোডলজির সাথে কওমী তালিবে ইলমদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় না থাকা তাঁদের গবেষণাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পৌঁছাতে বাধা দেয়।
১০: সমকালীন বিশ্ব, আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো এবং কওমী শিক্ষা
১. জাতিরাষ্ট্র ও আধুনিক আইনসভার মুখোমুখি কওমী ফিকহ
কিন্তু আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে ‘জাতিরাষ্ট্র’, লিখিত সংবিধিবদ্ধ আইন (Statutory Law) এবং সার্বভৌম আইনসভার (Parliament) ওপর। আধুনিক রাষ্ট্রে আইন প্রণয়ন করেন পার্লামেন্টের সদস্যরা এবং বিচার বিভাগ সেই লিখিত কোডিফাইড আইনি ধারা অনুযায়ী বিচার কাজ পরিচালনা করেন।
- কওমী নেসাবে ফিকহকে পড়ানো হয় একটি সম্পূর্ণ ও স্বাধীন আইনি ব্যবস্থা হিসেবে। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রে আদালতের বিচারক কিতাবের ইবারত দেখে নয়, বরং রাষ্ট্রের দণ্ডবিধি ও দেওয়ানী আইন দেখে রায় দেন।
- এর ফলে দাওরায়ে হাদীছ ও তাখাস্সুস উত্তীর্ণ হাজার হাজার আলেম প্রচলিত দেশের বিচার ব্যবস্থা, সংবিধান, মানবাধিকার আইন এবং প্রশাসনিক কাঠামোর সাথে নিজেদের দ্বীনি ইলমের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ খুঁজে পান না। তারা কেবল ব্যক্তিগত ইবাদাত ও পারিবারিক আইনের (নিকাহ, তালাক, উত্তরাধিকার) গণ্ডিতে নিজেদের সীমাবদ্ধ করতে বাধ্য হন।
২. সংস্কার ও সমন্বয়ের একটি বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবমুখী রূপরেখা
- মাতৃভাষা বাংলা ও ইংরেজি
- আধুনিক গণিত ও বিজ্ঞান
- কম্পিউটার ও ইতিহাস
- দেওবন্দী মূল কিতাব
- সনাতন ফিকহ ও হাদীছ
- প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ণ
- আধুনিক আইন, অর্থনীতি ও বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণা
- ইন্টারডিসিপ্লিনারি থিসিস
ক. প্রথম পদক্ষেপ: প্রাথমিক ও নিম্ন-মাধ্যমিক স্তরের আধুনিকায়ন (ইবতেদাইয়্যাহ ও মুতাওয়াসসিতাহ)
- বাধ্যতামূলক বিষয়াবলী: ইবতেদাইয়্যাহ ও মুতাওয়াসসিতাহ মারহালায় জাতীয় পাঠ্যক্রমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাংলা সাহিত্য, প্রাতিষ্ঠানিক ইংরেজি ভাষা (Grammar & Spoken), বীজগণিত ও পাটিগণিত, সাধারণ বিজ্ঞান এবং ভূগোল পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
- ভাষার সংস্কার: ফার্সি ও উর্দুর প্রাথমিক যে কিতাবগুলো বর্তমানে পড়ানো হয় (যার অনেকগুলোই কেবল প্রাচীন ভাষার চর্চা), সেগুলোর স্থান আধুনিক আরবি ভাষা শেখার পাঠ্যক্রম (যেমন: আল-আরাবিয়্যাতু লি-নাফিশীনা) এবং মাতৃভাষা বাংলা চর্চা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা উচিত। ফার্সি ও উর্দু শেখাকে ঐচ্ছিক সাহিত্যিক বিষয় হিসেবে রাখা যেতে পারে।
খ. দ্বিতীয় পদক্ষেপ: উচ্চতর স্তরে ‘ইন্টারডিসিপ্লিনারি’ বা বহুমুখী শিক্ষার সংযোজন
- ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান কোর্স: ইসলামি ইতিহাসের পাশাপাশি বিশ্ব ইতিহাস, রাজনৈতিক তত্ত্ব (Political Theory) এবং বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রশাসনিক আইনি ব্যবস্থার ওপর একটি নির্দিষ্ট কিতাব বা কোর্স চালুকরণ।
- অর্থনীতি কোর্স: উচ্চতর ফিকহ (শরহে বেকায়া ও হেদায়া)-র ব্যবসায়িক অধ্যায়গুলো পড়ানোর সময় আধুনিক অর্থনীতির মৌলিক নীতি, আধুনিক ব্যাঙ্কিং, শেয়ার বাজার এবং ইসলামী অর্থনীতির প্রায়োগিক রূপ নিয়ে সহায়ক গ্রন্থ যুক্ত করা।
- বিজ্ঞান ও আধুনিক দর্শন কোর্স: কালাম শাস্ত্র ও আকাইদ পড়ানোর সময় প্রাচীন মু’তাযিলাদের খণ্ডনের পাশাপাশি আধুনিক নাস্তিক্যবাদ, সেক্যুলারিজম ও বিজ্ঞানের আধুনিক আবিষ্কারগুলোর সাথে আকিদার সামঞ্জস্য ব্যাখ্যা করে নতুন নেসাব তৈরি করা।
গ. তৃতীয় পদক্ষেপ: তাখাস্সুস বা গবেষণার আন্তর্জাতিকীকরণ
- যৌথ ফতোয়া ও আইন গবেষণা কেন্দ্র: তাখাস্সুস ফীল ফিকহ (ইফতা)-এর শিক্ষার্থীদের জন্য কেবল প্রাচীন কিতাব দেখে ফতোয়া লেখার পাশাপাশি দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী, অর্থনীতিবিদ, পরিবেশবিদ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের এনে নিয়মিত লেকচার ও কর্মশালার ব্যবস্থা করা।
- গবেষণা থিসিস (Thesis): তাখাস্সুসের ডিগ্রি প্রদানের জন্য সমকালীন কোনো বাস্তব সমস্যার (যেমন: ক্রিপ্টোকারেন্সির ফিকহী হুকুম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আইনি দায়, বা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের নৈতিক সীমানা) ওপর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গবেষণা থিসিস জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা।
ঘ. চতুর্থ পদক্ষেপ: শিক্ষক প্রশিক্ষণ (তাদরীস) ও মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকায়ন
- শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট: কওমী বোর্ডগুলোর (যেমন: বেফাক বা হাইআতুল উলয়া) অধীনে স্থায়ী শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে হবে। সেখানে উস্তাদদের আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি (Pedagogy), শ্রেণীকক্ষ ব্যবস্থাপনা, শিশুর মনস্তত্ত্ব এবং আধুনিক মূল্যায়নের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
- পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার: কেবল মুখস্থনির্ভর বা গতানুগতিক প্রশ্নপত্রের বদলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল চিন্তা, জটিল সমস্যার আইনি সমাধান বের করার ক্ষমতা (Case study based evaluation) পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা।
বাংলাদেশের কওমী শিক্ষাব্যবস্থা কেবল কতগুলো দালানকোঠা বা পাঠ্যবইয়ের সমষ্টি নয়; এটি একটি শতাব্দীপ্রাচীন বিশ্বাস, ত্যাগ ও আত্মমর্যাদার নাম। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ঐতিহ্য হলো এর চারিত্রিক বিশুদ্ধতা, কুরআন ও হাদীছের টেক্সটের প্রতি অবিচল আনুগত্য, ইবারত বিশ্লেষণের সুগভীর মেধা এবং বস্তুবাদের মুখে টিকে থাকার বিস্ময়কর ঈমানী শক্তি। কিন্তু অতীত ঐতিহ্য যত গৌরবময়ই হোক না কেন, অতীতকে আঁকড়ে ধরে কোনো জাতি চিরকাল ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দিতে পারে না।
আজকের একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে বিশ্বায়ন, উত্তর-আধুনিক দার্শনিক সংশয় এবং জটিল অর্থনীতি মানুষের ঈমান ও জীবনকে প্রতি মুহূর্তে চ্যালেঞ্জ করছে। এই যুগে কেবল মসজিদ ও মাদ্রাসার চার দেয়ালের ভেতরে দ্বীনকে রক্ষা করাই যথেষ্ট নয়; বরং মানবজাতির সামনে ইসলামকে একটি সম্পূর্ণ, সুসংহত ও জীবনমুখী মেগা-অল্টারনেটিভ (Mega Alternative) হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে।
এই মহান দায়িত্ব পালন করতে হলে কওমী শিক্ষার ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত শিকড়কে বিন্দুমাত্র স্পর্শ না করে, ডালপালাকে আধুনিক যুগের আসমানের দিকে মেলে দিতে হবে। প্রাচীন ইবারতের আকর জ্ঞানের সাথে আধুনিক বিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতি ও আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক প্রজ্ঞাপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ সংমিশ্রণ ঘটাতে হবে।
যেদিন একজন কওমী আলেম বুখারী শরীফের কঠিন সনদের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের সাথে সাথে আধুনিক পুঁজিবাজারের জটিল আইনি জট খুলতে পারবেন, যেদিন তিনি ফিকহের হেদায়া কিতাবের আইনি দর্শনের পাশাপাশি আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের অসামঞ্জস্যতা নিয়ে বিশ্বমঞ্চে বিশ্বমানের ইংরেজিতে যুক্তি উপস্থাপন করতে পারবেন—সেদিনই কওমী শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য ও ঐতিহাসিক সার্থকতা পূর্ণতা পাবে।
