গান শুনতে গিয়ে স্রেফ কান ব্যবহারের বাইরে কেন বাড়তি শ্রম দিতে হবে? কেন আমাদের মস্তিষ্ককে কিছুটা খাটাতে হবে? এই প্রশ্নটির উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের স্বাদ ও রুচির বিবর্তনে। জন্মগতভাবে আমরা যে খুব সামান্য কিছু আদিম আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আসি, তা তো আগেই বলেছি। সেই স্তরে বিনোদনের জন্য কোনো শ্রমের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু আপনি যখন সাধারণ থেকে অসাধারণের দিকে যাত্রা করতে চান, তখন আপনার মস্তিষ্ককে একটি বিশেষ ‘প্রশিক্ষণ‘ দিতে হয়।
আমরা সুখ খুঁজি ঝাল দেওয়া কষা মাংসে কিংবা সর্ষে ইলিশের ঝাঁঝালো ঘ্রাণে। এই নামগুলো শুনলেই মনটা অজান্তেই আনচান করে ওঠে। কেন? কারণ বাঙালি হিসেবে শৈশব থেকেই আমাদের ঘ্রাণেন্দ্রিয় এবং জিহ্বার স্নায়ুগুলো এই স্বাদের সাথে নিবিড়ভাবে পরিচিত। কিন্তু একজন পশ্চিমা মানুষের সামনে এই মেন্যু ধরলে সে হয়তো ‘ইয়াক’ (Yuck) বলে নাক সিটকোবে। কারণ, ওই মশলার জটিল রসায়ন তার জিহ্বার জানা নেই, আর সেই তীব্রতা সহ্য করার মতো ‘গাট পাওয়ার’ বা পেটের শক্তিও তার নেই। তার কাছে যা বিস্বাদ বা যন্ত্রণাদায়ক, আপনার কাছে তা-ই পরম তৃপ্তি। এই যে পার্থক্যের দেয়াল—এটিই হলো অভিজ্ঞতার দেয়াল।
আবার ধরুন, আপনিই হয়তো প্রথমবার ‘স্টিংকি টোফু’ (Stinky Tofu) খেতে গিয়ে উৎকট দুর্গন্ধে বমি করে দিয়েছিলেন। তবুও কৌতূহলবশত বা নতুন স্বাদের সন্ধানে হয়তো দ্বিতীয়বার চেষ্টা করেছেন। যার সহ্য হওয়ার নয়, তিনি হয়তো একে স্রেফ ‘পচা খাবার’ বলে গালি দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু যিনি এর প্রকৃত স্বাদটি ধরতে পেরেছেন, তিনি ঠিকই এর প্রেমে পড়ে গেছেন। আজ হয়তো তিনি পুরো পরিবার নিয়ে সেই টোফু খেতে যান এবং আপাতদৃষ্টিতে বিভীষিকাময় এই গন্ধের আড়ালে এক স্বর্গীয় উমামি (Umami) স্বাদ লাভ করেন। ব্লু চিজ, ডুরিয়ান, কাভিয়ার, ট্রাফল কিংবা ন্যাটটো—এসবই সেই গোত্রের খাবার, যা প্রথম গ্রাসেই আপনাকে আকাশছোঁয়া তৃপ্তি দেবে না। এর গূঢ় রস পেতে হলে বারবার আস্বাদন করে এর ভেতরের গূঢ় রসায়নটা বুঝতে হয়। এই যে বারবার চেষ্টা করে একটি রুচি তৈরি করা, শিল্পের ভাষায় একেই বলা হয় ‘অ্যাকোয়ার্ড টেস্ট’ (Acquired Taste)।
চিত্রকলার ক্ষেত্রেও একই কথা সমানভাবে সত্য। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’, ভ্যান গগের ‘দ্য স্টারি নাইট’, পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’ কিংবা মোনের ‘ওয়াটার লিলিস’ সিরিজ দেখলে একজন আনাড়ি দর্শকের কাছে এগুলো কেবল কিছু রঙ আর হিজিবিজি রেখা মনে হতে পারে। অথচ একজন প্রকৃত শিল্প-বোদ্ধার রাতের পর রাত নির্ঘুম কেটে যেতে পারে এই ছবিগুলোর সূক্ষ্ম কারুকাজ বিশ্লেষণ করে। তিনি হয়তো সারা জীবন তিল তিল করে টাকা জমাবেন শুধু এই ক্যানভাসগুলোর সামনে একবার দাঁড়িয়ে জীবনকে সার্থক করার জন্য। কেন? কারণ তিনি জানেন, ওই আপাত-সাধারণ রঙের প্রলেপের আড়ালে শিল্পী জীবনের কোন মহাকাব্যিক লড়াই কিংবা মহাজাগতিক বিষাদ লুকিয়ে রেখেছেন। এই দেখার ক্ষমতা তিনি অর্জন করেছেন বছরের পর বছর চিত্রকলার ব্যাকরণ ও ইতিহাস বুঝে।
একইভাবে মাইকেলাঞ্জেলোর ‘ডেভিড’, রদ্যাঁ-র ‘দ্য থিঙ্কার’ কিংবা বার্নিনির ‘একস্টাসি অফ সেন্ট তেরেসা’ ভাস্কর্যগুলো আপনার-আমার কাছে নিছক জড় পাথর মনে হতে পারে। কিন্তু যারা শাস্ত্রীয় ভাস্কর্যের মর্ম বোঝেন, তাঁদের কাছে এগুলো সামনে থেকে দেখা মানে এক জীবনের শ্রেষ্ঠ সিদ্ধি। তাঁরা যখন পাথরের কঠিন ভাঁজে মানুষের কোমল পেশির টান দেখেন, কিংবা মার্বেলে খোদাই করা শিরার স্পন্দন অনুভব করেন, তখন তাঁরা আর মাটির পৃথিবীতে থাকেন না। এই দেখার চোখটি কিন্তু প্রকৃতি আমাদের এমনি এমনি দেয় না; এটি তৈরি করে নিতে হয় নিরলস শ্রম, মনোযোগ আর সাধনায়।
শাস্ত্রীয় সংগীত বিষয়টিও ঠিক তেমনি। এটি আর দশটি ‘অ্যাকোয়ার্ড টেস্ট’-এর মতোই এক রাজকীয় এবং অভিজাত অভিজ্ঞতা। এটি স্রেফ কানে শোনার বিষয় নয়, এটি ধ্যানের মতো করে অনুভব করার বিষয়। এর স্বাদের অন্দরে প্রবেশ করতে হলে শুরুতে একটুখানি পরিশ্রম, ধৈর্য আর সময়ের বিনিয়োগ করতে হবে। শুরুতে হয়তো আপনার মনে হবে—এ তো বড় একঘেয়ে! কিন্তু একবার যদি এর যাদু আপনার স্নায়ুকে স্পর্শ করে ফেলে, তবে সেই ভালো লাগা জ্যামিতিক হারে বাড়তেই থাকবে।
তখন আপনি বুঝতে পারবেন, কেন এই বাড়তি শ্রমটুকু দেওয়া জরুরি ছিল। একবার এই স্বাদের উচ্চমার্গে পৌঁছে গেলে সাধারণ চটুল গান আর আপনার আত্মার ক্ষুধা মেটাতে পারবে না। তখন আপনি সুরের সেই ‘রসিক’ হয়ে উঠবেন, যিনি সাধারণের আড়ালে অসাধারণকে আবিষ্কার করতে জানেন। মনে রাখবেন, সস্তা আনন্দ পেতে শ্রম লাগে না, কিন্তু শৈল্পিক আনন্দ পেতে গেলে নিজেকে সেই শিল্পের যোগ্য করে গড়ে তুলতে হয়।
আমি কেন শুনতে করলাম তার কারণ অসুরের সুরলোকযাত্রাতে লিখেছি।
উত্তর পেয়ে থাকলে চলুন আবার ফিরে যাই – অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ সূচি [ গান খেকো ] – আর্টিকেলে।
