বিআইআইসি প্রাণন এন্টারপ্রেনারসিপ ইনকিউবেটর আগামী উদ্যোক্তার জন্য পথ । উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি

বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির অভাবনীয় বিপ্লব আজ প্রতিটি সৃজনশীল ও উদ্যোগী মনকে স্বপ্ন দেখায় নিজের প্রতিভাকে পূর্ণ মাত্রায় বিকশিত করার। সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপ দিতে এবং দেশের তরুণদের মেধাকে বৈশ্বিক সম্পদে রূপান্তর করতে বিআইআইসি-প্রাণন এন্টারপ্রেনারশিপ ইনকিউবেটর এক অনন্য ভূমিকা পালন করছে। এটি কেবল একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়, বরং এটি সম্ভাব্য উদ্যোক্তাদের জন্য এক প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক আইটি বাজারে প্রবেশের এক নতুন তোরণ।

একটি সফল উদ্যোগ যেমন একজন ব্যক্তির আত্মকর্মসংস্থান নিশ্চিত করে, তেমনি এটি নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে জাতীয় বেকারত্ব সমস্যার সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বিআইআইসি-প্রাণন ইনকিউবেটর নিজেকে ‘উদ্যোক্তা তৈরির কারিগর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

বিআইআইসি - প্রাণন এন্টারপ্রেনারসিপ ইনকিউবেটর আগামী সফল উদ্যোক্তার প্রসারিত পথ

আমাদের লক্ষ্য ও ভিশন

আমাদের প্রাথমিক যাত্রা শুরু হয়েছে খুলনা মহানগরীকে কেন্দ্র করে। খুলনার দক্ষ জনবলকে IT (Information Technology) এবং ITES (IT Enabled Services) সেক্টরে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং তাদের মাধ্যমে বৃহৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। আমাদের ভিশন হলো—আমাদের উদ্যোক্তারা কেবল দেশীয় বাজারে নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে সমান দক্ষতা ও সাহসের সাথে কাজ করবে। খুলনার এই পাইলট প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর আমাদের এই কার্যক্রম দেশব্যাপী বিস্তৃত করা হবে, যা বাংলাদেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

কেন এই ইনকিউবেটরের প্রয়োজন?

বর্তমানে বাংলাদেশে আইটি ফ্রিল্যান্সারদের সংখ্যা আশাব্যঞ্জক হারে বাড়ছে। বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারে বাংলাদেশ এখন একটি শক্তিশালী নাম। তবে ফ্রিল্যান্সিং ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলে অর্থনীতির ভীত ততটা শক্তিশালী হয় না, যতটা হয় একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে।

আমাদের দেশের অনেক মেধাবী তরুণ শিক্ষা জীবন শেষ করে আইটি সেক্টরকে ভিত্তি করে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়তে চান। কিন্তু সঠিক দিকনির্দেশনা, আধুনিক প্রশিক্ষণ, বৈশ্বিক নেটওয়ার্কিং এবং দক্ষ ব্যবসায়িক পরিকল্পনার অভাবে সেই স্বপ্নগুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (KUET), খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (KU), খুলনা পলিটেকনিকসহ বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের গ্র্যাজুয়েটদের এই সুপ্ত প্রতিভাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে আমাদের এই পথচলা। আমরা চাই একজন ফ্রিল্যান্সার যেন কেবল কাজ না করে, বরং তিনি যেন একটি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা হয়ে আরও দশজনের কাজের সুযোগ করে দেন।

SufiFaruq.com Logo 252x68 1 বিআইআইসি প্রাণন এন্টারপ্রেনারসিপ ইনকিউবেটর আগামী উদ্যোক্তার জন্য পথ । উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি

ইনকিউবেশন মডেল এবং বহুমুখী দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি

বিআইআইসি-প্রাণন এন্টারপ্রেনারশিপ ইনকিউবেটর কেবল তাত্ত্বিক শিক্ষায় বিশ্বাসী নয়, বরং এটি একটি ‘হ্যান্ডস-অন’ বা ব্যবহারিক ল্যাবরেটরি। আমরা আমাদের ইনকিউবেশন প্রক্রিয়াকে এমনভাবে সাজিয়েছি যাতে একজন তরুণ শিক্ষার্থী এক বছরের মধ্যে একজন পরিপক্ক ব্যবসায়ীতে রূপান্তরিত হতে পারেন।

১. ইনকিউবেশন কাঠামো ও ব্যাচ বিন্যাস

প্রাথমিকভাবে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে ১২ জন সম্ভাব্য উদ্যোক্তাকে নিয়ে। আমাদের প্রতিটি ইনকিউবেশন কোর্সের মেয়াদ ১ বছর

  • চক্রাকার পদ্ধতি: প্রতি ৪ মাস অন্তর ১২ জনের একটি নতুন ব্যাচ এই কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়। এভাবে এক বছরে মোট ৩টি ব্যাচ বা ৩৬ জন উদ্যোক্তা তৈরির প্রক্রিয়া চলমান থাকে।
  • টিম ফরমেশন: আমরা ৩ জন উদ্যোক্তাকে নিয়ে একটি করে গ্রুপ বা ‘কোর টিম’ তৈরি করে দিই। ইনকিউবেশন পিরিয়ড শেষ হওয়ার আগেই এই গ্রুপটি একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার জন্য প্রস্তুত হয়। অর্থাৎ, বছর শেষে আমরা ১২টি নতুন আইটি কোম্পানি উপহার দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করি।
২. টেকনিক্যাল ও প্রফেশনাল প্রশিক্ষণ

একজন আইটি উদ্যোক্তাকে বর্তমান বাজারে টিকে থাকতে হলে কারিগরি জ্ঞানের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির খুঁটিনাটি জানতে হয়। আমাদের অভিজ্ঞ মেন্টররা নিয়মিতভাবে নিচের বিষয়গুলোতে নিবিড় প্রশিক্ষণ প্রদান করেন:

  • সফটওয়্যার ও ওয়েব ডেভেলপমেন্ট: আধুনিক ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন ও জটিল সফটওয়্যার আর্কিটেকচার।
  • গ্রাফিক ও ইউআই/ইউএক্স ডিজাইন: আন্তর্জাতিক মানের ডিজাইন সেন্স তৈরি করা।
  • মোবাইল অ্যাপস: অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস প্ল্যাটফর্মের জন্য অ্যাপ্লিকেশন তৈরি।
  • ডিজিটাল মার্কেটিং: এসইও (SEO), কন্টেন্ট রাইটিং, ই-কমার্স এবং ইন্টারনেট মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি।
৩. ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনা ও লিডারশিপ প্রশিক্ষণ

প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকলেই ব্যবসা সফল হয় না, তার জন্য প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা। তাই আমরা উদ্যোক্তাদের শেখাই:

  • ইফেক্টিভ বিজনেস প্ল্যান: কীভাবে একটি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা লিখতে হয়।
  • ফাইন্যান্সিয়াল প্রোজেকশন: আয়ের উৎস ও ব্যয়ের সঠিক হিসাব রাখা।
  • এইচআর ম্যানেজমেন্ট: দক্ষ কর্মী খুঁজে বের করা এবং তাদের সঠিক নেতৃত্ব দেওয়া।
  • নেটওয়ার্কিং ও কমিউনিকেশন: ক্লায়েন্টের সাথে পেশাদার উপায়ে কথা বলা এবং সম্পর্ক উন্নয়ন।
৪. বিশ্বমানের অবকাঠামোগত সুবিধা

একজন নতুনের পক্ষে শুরুতেই বিশাল অফিস ভাড়া নেওয়া অসম্ভব। তাই বিআইআইসি-প্রাণন তাদের জন্য সব ধরণের লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করে:

  • স্মার্ট কো-ওয়ার্কিং স্পেস: আধুনিক ফার্নিচার সমৃদ্ধ অফিস পরিবেশ।
  • হাই-টেক ল্যাব: ল্যাপটপ, উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ (আইপিএস/জেনারেশন) সুবিধা।
  • লজিস্টিক সার্পোট: প্রিন্টার, স্ক্যানার, ফটোকপিয়ার এবং সার্বক্ষণিক ফ্রন্ট ডেস্ক ও সিকিউরিটি সার্ভিস।

এছাড়াও আমরা নিয়মিত আইটি বিশেষজ্ঞ এবং সফল উদ্যোক্তাদের সাথে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সেশন আয়োজন করি, যা নবীনদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় এবং বড় স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করে।

SufiFaruq.com Logo 252x68 3 বিআইআইসি প্রাণন এন্টারপ্রেনারসিপ ইনকিউবেটর আগামী উদ্যোক্তার জন্য পথ । উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি

উপার্জনের মাধ্যমে পুঁজি গঠন ও টেকসই উদ্যোক্তা সংস্কৃতি

বিআইআইসি-প্রাণন ইনকিউবেটরের সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিক হলো এর ‘আর্ন অ্যান্ড লার্ন’ (উপার্জন ও শিক্ষা) মডেল। এখানে একজন সম্ভাব্য উদ্যোক্তা কেবল প্রশিক্ষণই নেন না, বরং ইনকিউবেশন চলাকালীন সময়েই তাঁর পেশাদার কর্মজীবন শুরু হয়।

১. আয় নিশ্চিতকরণ ও প্রজেক্ট সোর্সিং

ইনকিউবেটর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব নেটওয়ার্ক ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রজেক্ট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের জন্য নিয়মিত কাজের যোগান দেয়। আমাদের লক্ষ্য থাকে, একজন উদ্যোক্তা যেন এই এক বছরের ইনকিউবেশন পিরিয়ডে ন্যূনতম ৪ লক্ষ টাকা বা তার অধিক অর্থ উপার্জন করতে পারেন। এটি তাঁকে ব্যবসার বাস্তব চ্যালেঞ্জ বুঝতে এবং নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করে।

২. আয়ের সুষম বণ্টন ও ভবিষ্যৎ পুঁজি গঠন

একজন নতুন উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হলো ব্যবসার শুরুর মূলধন বা ‘সিডিং ক্যাপিটাল’। এই সমস্যা সমাধানে আমরা একটি বিশেষ আর্থিক কাঠামো তৈরি করেছি। উদ্যোক্তার উপার্জিত মুনাফা নিচের ৩টি ভাগে বণ্টিত হয়:

  • ৩০% লজিস্টিক সাপোর্ট: ইনকিউবেটরের আধুনিক অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহের জন্য।
  • ৪০% ব্যক্তিগত আয়: উদ্যোক্তা এই অংশটি তাঁর জীবনযাত্রা ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে প্রতি মাসে উত্তোলন করতে পারেন।
  • ৩০% ব্যবসায়িক পুঁজি (সঞ্চয়): এই অংশটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি উদ্যোক্তার জন্য ইনকিউবেটর কর্তৃক বাধ্যতামূলকভাবে সঞ্চয় করা হয়। ইনকিউবেশন শেষে যখন তিনি নিজস্ব প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি নিবন্ধন করবেন, তখন এই জমানো অর্থই তাঁর ব্যবসার প্রাথমিক মূলধন হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে তাঁকে কারো কাছে হাত পাততে হয় না।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি সহায়তা

ইনকিউবেশন শেষে কোম্পানি গঠনের প্রক্রিয়াটি অনেক জটিল হতে পারে। বিআইআইসি-প্রাণন এই পর্যায়েও উদ্যোক্তার ছায়া হয়ে পাশে থাকে। লিগ্যাল প্রসেসিং, ট্রেড লাইসেন্স, কোম্পানির আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন তৈরি, ব্যাংকিং সুবিধা এবং বিক্রয় ও বিপণন—প্রতিটি ধাপে আমরা বিশেষজ্ঞ পরামর্শ প্রদান করি। সম্পর্কের ধারাবাহিকতা এবং পারস্পরিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে, বিআইআইসি-প্রাণন নবগঠিত কোম্পানিগুলোর মাত্র ৫% শেয়ারের অংশীদার থাকে (প্রথম ৬ বছর ৬ মাস পর্যন্ত), যা মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদী মেন্টরশিপ বন্ড হিসেবে কাজ করে।

৪. আগামীর স্বপ্ন: খুলনা থেকে ‘আইটি উপত্যকা’

একজন সফল উদ্যোক্তা কেবল নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করেন না, বরং তিনি গোটা অর্থনীতির চাকাকে সচল ও বেগবান করেন। বিআইআইসি-প্রাণন ইনকিউবেটরের মাধ্যমে আমরা একটি শক্তিশালী আইটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখি।

ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন আজ আমাদের এক নতুন যুগে নিয়ে এসেছে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং এই ইনকিউবেশন মডেলের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে খুলনা একদিন বিশ্বের মানচিত্রে ‘আইটি উপত্যকা’ (IT Valley) নামে পরিচিতি পাবে। সেই দিন খুব বেশি দূরে নয়, যখন আমাদের এই ল্যাবরেটরিতে তৈরি হওয়া উদ্যোক্তারা বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব দেবে এবং দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এক অনন্য মাইলফলক স্থাপন করবে।

বিআইআইসি-প্রাণন এন্টারপ্রেনারশিপ ইনকিউবেটর কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নের এক প্রসারিত রাজপথ। এই রাজপথ ধরেই জন্ম নেবে আগামীর সফল নেতৃত্ব এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

প্রধান নির্বাহী, বিজনেস ইনোভেশন এন্ড ইনকিউবেশন সেন্টার (বিআইআইসি)

 

আরও দেখুন:

Leave a Comment