বৈশাখের বর্ষবরণ উৎসব: কাদের জন্য, আর কাদের জন্য নয়?

পহেলা বৈশাখ বা বর্ষবরণ উৎসব মূলত এবং প্রধানত বাঙালির। এই উৎসবের মূল নিহিত রয়েছে বাঙালির হাজার বছরের কৃষি-সভ্যতা, ভূখণ্ড এবং ঐতিহ্যের গভীর শেকড়ে। তাই বৈশাখকে যাপন করার অধিকার প্রতিটি বাঙালির একান্ত নিজস্ব। এই উদযাপন কে কীভাবে করবেন, কতটুকু করবেন কিংবা আদৌ করবেন কি না—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা ওই বাঙালি ব্যক্তির। তাঁর উদযাপনের ভঙ্গি সঠিক কি না, তা বিচার করার জন্য কারও হাতে কোনো তথাকথিত নৈতিকতার মানদণ্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার প্রয়োজন নেই।

আপনি যদি নিজেকে বাঙালি মনে করেন, তবে এই উৎসব আপনার। এই উৎসবে আপনার অংশগ্রহণের ধরনটি হবে আপনার নিজের রুচি ও বিশ্বাসের প্রতিফলন। বাঙালির এই বহুত্ববাদী সংস্কৃতির সৌন্দর্যই হলো এর বৈচিত্র্য। আপনার পাশের বাঙালিটি কীভাবে বৈশাখ পালন করছেন, সেটি নিয়ে অস্থির হওয়ার কিছু নেই। বরং তাকে তার মতো করে এই দিনটি যাপন করতে দেওয়াই হলো প্রকৃত সাংস্কৃতিক সৌজন্য।

বাংলাদেশে বসবাসরত নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী বা যারা ভিন্ন কোনো সাংস্কৃতিক বলয় (যেমন পাকিস্তানপন্থী বিহারি বা পাঞ্জাবি ঐতিহ্যের অনুসারী) থেকে এসেছেন, তাদের নিজস্ব ‘Vaisakhi’ বা ‘Baisakhi’ পালনের অধিকার অবশ্যই আছে। তারা তাদের সংস্কৃতি অনুযায়ী উৎসব পালন করবেন। আমরা বাঙালিরা ঠিক করে দেব না তারা কিভাবে পালন করবেন। ঠিক তেমনভাবেই আমরা আশা করি না তারা ঠিক করে দেবার চেষ্টা করবেন আমরা কিভাবে পালন করবো।

যাদের কোনো সুনির্দিষ্ট নৃতাত্ত্বিক বা ভৌগোলিক জাতিপরিচয় নেই, কিংবা যারা নিজেদের জাতিপরিচয় নিয়ে গর্বিত নন, তাদের জন্য এই বৈশাখের কোনো উৎসবের প্রয়োজন নেই। যাঁদের শেকড় এই বাংলার মাটির সাথে যুক্ত নয়, বৈশাখ তাঁদের জন্য অন্য আরেকটি দিনের মতোই। সুতরাং, যাঁদের পরিচয়ের সাথে বৈশাখের কোনো ঐতিহাসিক বা আবেগীয় যোগসূত্র নেই, এই উৎসব নিয়ে তাঁদের অনাবশ্যক উত্তেজনা প্রদর্শন বা কোনো মতামত দেওয়ারও দরকার নেই। প্রসংসাও দরকার নেই।

যারা ধর্মবাজ বা ধর্ম-প্রদর্শক, তথা সবকিছুর মধ্যে ধর্ম খুঁজে বেড়ান, তারা নিশ্চিত জানবেন এটি ধর্মের কোনো অনুষ্ঠান নয়। ধর্মের সাথে এর দূরদূরান্ত পর্যন্ত কোনো সম্পর্ক নেই। তাই এর সাথে আপনাদের ধর্মের সম্পর্ক খোঁজা নিরর্থক। এটি বাঙালিদের একটি সামাজিক আচার—যেমন মিসরের “শাম এল-নেসিম”, ইরাক ও সিরিয়ার “আকিস্তু”, ইরান, আফগানিস্তান ও তাজিকিস্তানের “ইয়েলদা রাত”, তুরস্কের “হিড্রেলেজ”, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার “গাবান”, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান ও কিরগিজস্তানের “জালালি নববর্ষ” বা মালদ্বীপের “হুনু পহেলা”। এসব অনুষ্ঠান বিষয়ে আপনাদের মতামত কেউ আশা করে না। এসব অনুষ্ঠানের দিনে আপনারা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকাই ভালো। যা আপনাদের নয়, তার মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে অশান্তি সৃষ্টি করবেন কেন?

পহেলা বৈশাখ আমাদের একটি জীবন্ত উত্তরাধিকার। আমরা যার যেমন ইচ্ছে, তেমন করে পালন করবো।