মোটর ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নির্দেশিকা । পেশা পরামর্শ সভা

একটি সুশৃঙ্খল এবং নিরাপদ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দক্ষ চালকের বিকল্প নেই। ড্রাইভিং কেবল একটি কারিগরি দক্ষতা নয়, এটি একটি মহান দায়িত্ব। সড়কে নিজের এবং অন্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই একজন আদর্শ চালকের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর-এর উদ্যোগে এই ‘মোটর ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ’ নির্দেশিকাটি তৈরি করা হয়েছে যাতে আমাদের দেশের তরুণরা সঠিক নিয়ম মেনে দক্ষ ও সচেতন চালক হিসেবে গড়ে উঠতে পারেন এবং একে একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন।

মোটর ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নির্দেশিকা

১. যানবাহন ও ইঞ্জিনের প্রাথমিক ধারণা

  • ইঞ্জিনের প্রধান যন্ত্রাংশ: সিলিন্ডার হেড, পিস্টন, কানেক্টিং রড, ক্র্যাঙ্কশ্যাফট এবং স্পার্ক প্লাগ/নজেল সম্পর্কে চাক্ষুষ ধারণা।
  • ফুয়েল সিস্টেম: পেট্রোল, ডিজেল এবং অকটেন ইঞ্জিনের পার্থক্য। ফুয়েল ফিল্টার পরিষ্কার রাখা এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের উপায়।
  • লুব্রিকেন্ট (ইঞ্জিন অয়েল): মোবিল কেন ব্যবহার করা হয়? সঠিক গ্রেডের লুব্রিকেন্ট চেনা এবং অয়েল ফিল্টার পরিবর্তনের গুরুত্ব।
  • কুলিং সিস্টেম: রেডিয়েটরের কাজ, কুল্যান্টের ব্যবহার এবং ফ্যান বেল্ট চেক করা। ইঞ্জিন অতিরিক্ত গরম (Overheat) হওয়ার কারণ ও করণীয়।

২. ট্রাফিক আইন ও সিগনাল পরিচিতি

  • বাধ্যতামূলক সাইন: গোল আকৃতির লাল বর্ডারযুক্ত চিহ্ন (যেমন: প্রবেশ নিষেধ, থামুন, হর্ন বাজানো নিষেধ)।
  • সতর্কতামূলক সাইন: ত্রিভুজ আকৃতির চিহ্ন (যেমন: সামনে স্কুল, সরু রাস্তা, উঁচু-নিচু রাস্তা)।
  • তথ্যমূলক সাইন: চৌকো বা আয়তকার চিহ্ন (যেমন: হাসপাতাল, ফিলিং স্টেশন, পার্কিং স্থান)।
  • রোড মার্কিং: ভাঙা সাদা রেখা ও টানা সাদা রেখার পার্থক্য (কখন লেন পরিবর্তন করা যাবে আর কখন যাবে না)।
  • সড়ক পরিবহন আইন (২০১৮): ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা বা মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর দণ্ড ও জরিমানা সম্পর্কে ধারণা।

৩. ড্রাইভিং শুরুর প্রস্তুতি

  • সিট অ্যাডজাস্টমেন্ট: ক্লাচ ও ব্রেক পর্যন্ত পা আরামে পৌঁছাতে পারে এমনভাবে সিট সেট করা।
  • মিরর সেটিং: লুকিং গ্লাস এবং রিয়ার ভিউ মিরর এমনভাবে সেট করা যাতে ‘ব্লাইন্ড স্পট’ বা অন্ধ কোণ কম থাকে।
  • ড্যাশবোর্ড ইন্ডিকেটর: ইঞ্জিন চেক লাইট, অয়েল প্রেসার লাইট, টেম্পারেচার মিটার এবং ফুয়েল গেজ চেনা।
  • প্রাক-যাত্রা চেকিং: প্রতিদিন গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগে চাকার হাওয়া ও নিচের কোনো লিকেজ আছে কি না তা দেখা।

৪. বেসিক ড্রাইভিং টেকনিক

  • স্টিয়ারিং কন্ট্রোল: ‘৯টা-৩টা’ (9 and 3 o’clock) পজিশনে হাত রাখা এবং স্মুথ টার্নিং শেখা।
  • গিয়ার শিফটিং: ১ থেকে ৫ নম্বর গিয়ার এবং রিভার্স গিয়ারের অবস্থান ও পরিবর্তনের সঠিক সময় (RPM বুঝে)।
  • ABC সমন্বয়: অ্যাক্সিলারেটর (A), ব্রেক (B) এবং ক্লাচ (C) এর মধ্যে নিখুঁত সমন্বয়। বিশেষ করে ক্লাচ ছাড়ার সময় গাড়ির কাঁপুনি বা ‘বাইটিং পয়েন্ট’ বোঝা।
  • ব্রেকিং সিস্টেম: ইমার্জেন্সি ব্রেক বনাম গ্রাজুয়াল (ধীরে ধীরে) ব্রেকিংয়ের পার্থক্য।

৫. উন্নত ড্রাইভিং কৌশল

  • রিভার্সিং: লুকিং গ্লাস ব্যবহার করে আঁকাবাঁকা পথে বা সরু জায়গায় গাড়ি পেছনে নেওয়া।
  • পার্কিং: গ্যারেজ পার্কিং, রাস্তার পাশে প্যারালাল পার্কিং এবং ঢালু জায়গায় হ্যান্ডব্রেক ব্যবহার করে পার্কিং।
  • ওভারটেকিং: ডান দিক দিয়ে ওভারটেক করার নিয়ম, সিগন্যাল দেওয়া এবং সামনের গাড়ির দূরত্ব মেপে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
  • হিল ড্রাইভিং: পাহাড়ি রাস্তায় বা ফ্লাইওভারে উঠার সময় গাড়ি পেছনে না গিয়ে স্টার্ট ধরে রাখার কৌশল।

৬. রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রাথমিক মেরামত

  • টায়ার পরিবর্তন: স্পেয়ার চাকা বের করা, জ্যাক সেট করা এবং নাট খোলার সঠিক ক্রম (ক্রিস-ক্রস পদ্ধতি)।
  • ফ্লুইড চেক: ব্রেক অয়েল, গিয়ার অয়েল এবং উইন্ডশিল্ড ওয়াইপার ফ্লুইড পরীক্ষা করা।
  • ব্যাটারি: টার্মিনালে কার্বন জমলে পরিষ্কার করা এবং ডিস্টিলড ওয়াটার চেক করা।
  • ফিউজ বক্স: হেডলাইট বা হর্ন হঠাত কাজ না করলে ফিউজ চেক করার পদ্ধতি।

৭. সড়ক নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা সচেতনতা

  • নিরাপদ দূরত্ব: সামনে থাকা গাড়ি থেকে অন্তত দুই সেকেন্ডের দূরত্ব বজায় রাখা (Two-second rule)।
  • লেন ডিসিপ্লিন: রাস্তার বাম পাশ ঘেঁষে চলা এবং টার্নিংয়ের অন্তত ১০০ ফিট আগে ইন্ডিকেটর ব্যবহার করা।
  • পথচারী ও জেব্রা ক্রসিং: জেব্রা ক্রসিংয়ে পথচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং স্কুল জোনে গতি কমানো।
  • জরুরি সিদ্ধান্ত: ব্রেক ফেল করলে বা টায়ার বার্স্ট হলে আতঙ্কিত না হয়ে গাড়ি নিয়ন্ত্রণের কৌশল।

৮. লাইসেন্স প্রাপ্তি ও পেশাদারিত্ব

  • বিআরটিএ পরীক্ষা: লার্নার কার্ড থেকে শুরু করে লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষার সাধারণ প্রশ্নগুলোর প্রস্তুতি।
  • ফিল্ড টেস্ট: ইংরেজি ‘L’, ‘Z’ এবং ‘S’ আকৃতির ট্র্যাকে গাড়ি চালিয়ে দক্ষতা প্রমাণ।
  • আচরণবিধি: যাত্রীদের সাথে নম্র ব্যবহার, ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশ মান্য করা এবং মাদক থেকে দূরে থাকা।
  • পেশাদারিত্ব: সময়ানুবর্তিতা এবং গাড়ির কাগজপত্র (ট্যাক্স টোকেন, ফিটনেস, ইন্স্যুরেন্স) সবসময় সাথে রাখা।

 

প্রশিক্ষকদের জন্য নোট:

তাত্ত্বিক আলোচনার পর প্রতিটি বিষয় অন্তত তিনবার করে প্রশিক্ষণার্থীদের দিয়ে প্র্যাকটিক্যাল করিয়ে নিতে হবে। কোনো বিষয়ে দুর্বলতা থাকলে সেই মডিউলটি পুনরায় শেখাতে হবে।

প্রশিক্ষকদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা:

প্রতিজন প্রশিক্ষক প্রতিটি ব্যাচে উপরের আউটলাইনটি কঠোরভাবে অনুসরণ করবেন। বিশেষ করে ট্রাফিক আইন এবং সড়ক নিরাপত্তার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে শেখাতে হবে। মাঠ পর্যায়ের প্রশিক্ষণের সময় ধৈর্য ও সতর্কতার সাথে প্রতিটি ধাপ হাতে-কলমে শেখানো বাধ্যতামূলক। নির্ধারিত তালিকার বাইরেও অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকগণ নতুন টিপস শেয়ার করতে পারেন, তবে মূল কাঠামোটি অবশ্যই বজায় রাখতে হবে।

আরও দেখুন: