রাগের আরোহণ-অবরোহণ । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে প্রতিটি রাগের নিজস্ব চরিত্র নির্ধারণ করে তার স্বরগঠন, স্বরধারাবাহিকতা, অলঙ্কার ও লয়বদ্ধতা। এই চরিত্রের সবচেয়ে মৌলিক ভিত্তি হলো রাগের আরোহণ (Arohana) এবং অবরোহণ (Avarohana)। এগুলি রাগের মৌলিক সুরলিপি বা স্বরপথ। এটা কঠোর ভাবে অনুসরণ করা জরুরী।

রাগের আরোহণ-অবরোহণ

আরোহণ (Arohana):

আবোরণ হলো রাগের স্বরগুলির ক্রমবর্ধমান সিকোয়েন্স, যা নীচ থেকে উপরের স্বর পর্যন্ত উত্তরণ নির্দেশ করে। এটি রাগের স্বরলিপি ও মেলডিক প্রোফাইল নির্ধারণ করে।

উদাহরণ:

  • রাগ ভৈরব (Bhairav):
    • আরোহণ: সা ঋ গ ম প ধ্ নি সাঁ (Sa $\underline{Re}$ Ga Ma Pa $\underline{Dha}$ Ni $\dot{Sa}$)
    • বৈশিষ্ট্য: এখানে ঋষভ (Re) এবং ধৈবত (Dha) কোমল স্বর হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা এই রাগের শান্ত ও গম্ভীর প্রকৃতির পরিচয় দেয়।
  • রাগ ইমন (Yaman):
    • আরোহণ: নি রে গ হ্ম প ধ নি সাঁ (Ni Re Ga $M^#$ Pa Dha Ni $\dot{Sa}$)
    • বৈশিষ্ট্য: ইমনের আরোহণ সচরাচর ‘নি’ থেকে শুরু হয়। এখানে ‘ম’ এর পরিবর্তে কড়ি ‘হ্ম’ (Teevra Ma) ব্যবহৃত হয়। এটি একটি ‘কল্যাণ’ ঠাটের রাগ।
  • রাগ ভূপালী (Bhupali):
    • আরোহণ: সা রে গ প ধ সাঁ (Sa Re Ga Pa Dha $\dot{Sa}$)
    • বৈশিষ্ট্য: এটি একটি ঔড়ব জাতির রাগ। খেয়াল করুন, এর আরোহণে ‘ম’ এবং ‘নি’ স্বর দুটি সম্পূর্ণ বর্জিত।

 

আরোহ মানে উপর দিকে ওঠা হলেও অনেক রাগে সরল রেখায় (Sa Re Ga Ma Pa…) ওপরে ওঠা শাস্ত্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ। সেখানে সুরকে খানিকটা পিছিয়ে নিয়ে এসে বা পাক দিয়ে ওপরে তুলতে হয়। একে ‘বক্র আরোহণ’ বলে।

নিচে এরকম কিছু উল্লেখযোগ্য রাগের উদাহরণ দেওয়া হলো যেখানে আরোহণের সময় “উঠে-নেমে-আবার ওঠার” চমৎকার প্রয়োগ দেখা যায়:

  • রাগ বৃন্দাবনী সারং (Brindabani Sarang)

এই রাগে আরোহণের সময় সরাসরি ‘সা’ থেকে ‘রে’তে না গিয়ে একটি বিশেষ বক্র চলন ব্যবহার করা হয়।

আরোহণ: নি সা রে, ম প নি সাঁ

এখানে লক্ষ্য করলে দেখবেন, আরোহণের শুরুতে ‘নি’ থেকে ‘সা’ হয়ে ‘রে’ তে যাওয়ার সময় সুরের একটি দোলাচল থাকে, যা এই রাগের বিশেষত্ব।

  • রাগ কামোদ (Kamod)

বক্র চলনের অন্যতম সেরা উদাহরণ হলো রাগ কামোদ। এর আরোহণে সুর সোজা পথে না হেঁটে অনেকটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে ওপরে ওঠে।

আরোহণ: সা রে প, ম প ধ প, নি ধ সাঁ

দেখুন, ‘সা’ থেকে ‘রে’তে গিয়ে সোজা ‘প’ (পঞ্চম)-তে লাফ দেয়। তারপর আবার ‘ম’ (মধ্যম)-তে নেমে এসে ‘প’ হয়ে ‘ধ’ পর্যন্ত যায়, আবার ‘প’-তে নেমে আসে। এই যে ওপরে উঠে নিচে নেমে আবার ওপরে যাওয়া, এটাই হলো বক্র গতি।

  • রাগ গৌড় সারং (Gaud Sarang)

গৌড় সারং রাগটি সম্পূর্ণভাবে বক্র স্বরের ওপর দাঁড়িয়ে। এর আরোহণ এতটাই আঁকাবাঁকা যে একে শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম কঠিন ও সুন্দর চলন মনে করা হয়।

আরোহণ: সা গ রে ম, গ প, ম ধ প, নি ধ সাঁ

খেয়াল করুন— প্রতিবার ওপরে ওঠার পর সুর এক ধাপ নিচে নেমে এসে আবার ওপরে উঠছে।

  • রাগ হামীর (Hamir)

হামীর রাগে মধ্যম (Ma) এবং পঞ্চম (Pa) স্বরের মধ্যে এমন এক ধরনের বক্রতা দেখা যায়।

আরোহণ: সা রে গ ম, প ধ নি সাঁ

সাধারণ আরোহণ সরল মনে হলেও, গান বা বাজানোর সময় শিল্পীরা ‘সা রে গ ম, প ধ নি ধ সাঁ’ অথবা ‘গ ম ধ’ স্টাইলে বক্রতা তৈরি করেন যা এই রাগের বীরত্বপূর্ণ মেজাজ ফুটিয়ে তোলে।

 

অবরোহণ (Avarohana):

অবরোহণ হলো উচ্চ স্বর থেকে ক্রমান্বয়ে নিচের স্বরের দিকে অবতরণ। এটি রাগের ভাবমূর্তি সম্পূর্ণ করে এবং অনেক ক্ষেত্রে আরোহণের চেয়ে অবরোহণেই রাগের আসল রূপটি বেশি স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়।

উদাহরণ:

রাগ আশাবরী (Asavari):

  • অবরোহণ: সাঁ ন্ ধ্ প ম গ্ ঋ সা

  • বৈশিষ্ট্য: এর অবরোহণে গান্ধার (Ga), ধৈবত (Dha) এবং নিষাদ (Ni)—এই তিনটি স্বরই কোমল হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা রাগের মধ্যে একটি বিষণ্ণ ও গম্ভীর আবহ তৈরি করে।

রাগ খামাজ (Khamaj):

  • অবরোহণ: সাঁ ন্ ধ প ম গ রে সা

  • বৈশিষ্ট্য: খামাজ রাগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর আরোহণে শুদ্ধ ‘নি’ ব্যবহৃত হলেও অবরোহণে সবসময় কোমল ‘নি’ ব্যবহৃত হয়। এই পরিবর্তনটিই রাগের রঞ্জকতা বাড়িয়ে দেয়।

রাগ কাফি (Kafi):

  • অবরোহণ: সাঁ ন্ ধ্ প ম গ্ ঋ সা

  • বৈশিষ্ট্য: কাফি একটি সম্পূর্ণ জাতির রাগ। এর অবরোহণে গা এবং নি কোমল হয়। লোকসংগীত ও ঠুমরিতে এই অবরোহণের চলন বহুল ব্যবহৃত।

 

অবরোহণ মানে ওপর থেকে নিচে নামা হলেও, অনেক রাগে সরাসরি বা সরল রেখায় (সাঁ নি ধ প ম…) নিচে নামা শাস্ত্রীয়ভাবে বারণ। সুরকে কিছুটা ওপরে তুলে বা পেঁচিয়ে নিচে নামাতে হয়। একে ‘বক্র অবরোহণ’ বলে। নিচে বক্র অবরোহণের কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেওয়া হলো:

রাগ বিহাগ (Bihag):

বিহাগ রাগে অবরোহণের সময় কড়ি মধ্যম ও শুদ্ধ মধ্যমের একটি বিশেষ কারুকাজ দেখা যায়।

অবরোহণ: সাঁ নি ধ প, হ্ম প ম গ, রে সা

খেয়াল করুন, ‘প’ থেকে সরাসরি ‘ম’ তে না গিয়ে সুরটি আগে কড়ি ‘হ্ম’ তে যায়, সেখান থেকে আবার ‘প’ তে ফিরে এসে তারপর শুদ্ধ ‘ম’ হয়ে ‘গ’ তে নামে। এই সূক্ষ্ম বক্রতা বিহাগের প্রাণ।

রাগ দেশ (Desh):

দেশ রাগের অবরোহণে কোমল নিষাদের ব্যবহার অত্যন্ত শ্রুতিমধুর এবং বক্র প্রকৃতির।

অবরোহণ: সাঁ ন্ ধ প, ম গ রে, গ ন্ সা

এখানে ‘রে’ থেকে সরাসরি ‘সা’ তে না গিয়ে সুরটি আবার ‘গ’ তে ফিরে আসে এবং কোমল ‘নি’ হয়ে ‘সা’ তে ঠেকে। এই চলনটি রাগের চঞ্চল ও রোমান্টিক ভাব প্রকাশ করে।

রাগ ছায়ানট (Chhayanat):

ছায়ানট রাগের অবরোহণ বেশ জটিল এবং অত্যন্ত বক্র।

অবরোহণ: সাঁ নি ধ প, ম রে, প ম গ ম, রে সা

এখানে ‘ম’ থেকে সরাসরি ‘রে’ তে নেমে আসা (ম~রে) এবং পুনরায় ‘প’ থেকে ‘ম-গ-ম’ হয়ে ঘুরে আসা এই রাগের আভিজাত্য প্রকাশ করে।

রাগ মালকোষ (Malkauns):

এটি একটি ঔড়ব রাগ (পাঁচ স্বরের), যেখানে অবরোহণের সময় স্বরগুলো বেশ বড় দোলার মাধ্যমে নিচে নামে।

অবরোহণ: সাঁ ন্ ধ্ ম গ্ ঋ সা

মালকোষের অবরোহণে স্বরগুলো সরাসরি না নেমে কিছুটা গুমরিয়ে বা রেশ রেখে নামে, যা এক ধরনের আধ্যাত্মিক ও ধ্যানমগ্ন পরিবেশ তৈরি করে।

আরোহণ-অবরোহণের প্রভাব

নিদ্রিষ্ট আরোহণ-অবরোহণ স্বর ব্যবস্থাপনা রাগের মৌলিক চরিত্রকে স্থির রাখে। আরোহণ-অবরোহণের সীমা ও ক্রম শিল্পীকে সঠিক অলঙ্কার আটকে থাকতে সাহায্য করে।