কানাড়া অঙ্গের অন্যতম গতিশীল ও বীররস প্রধান রাগ হলো ‘রাগ আড়ানা’ (বা আডানা)। এটি মূলত আশাবরী ঠাটের অন্তর্গত একটি রাগ। কানাড়া পরিবারের রাজা ‘রাগ দরবারী কানাড়া’র সাথে এর স্বরবিন্যাসে প্রচুর মিল থাকলেও, চলন ও গতির কারণে আড়ানা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপ পরিগ্রহ করে। যেখানে দরবারী গম্ভীর, মন্থর ও প্রশান্ত; সেখানে আড়ানা চঞ্চল, ক্ষিপ্র ও চড়াসুর প্রধান। এই রাগের সাথে রাগ ‘বাহার’-এরও কিছুটা সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। এটি মূলত একটি উত্তরাঙ্গ প্রধান রাগ।

রাগ আড়ানা বা আড়ানা কানাড়া
রাগ আড়ানার ব্যকরণ
সঙ্গীত শাস্ত্রে আড়ানা রাগের আরোহ ও অবরোহ নিয়ে কিছুটা ভিন্ন মত থাকলেও, সর্বজনগ্রাহ্য ব্যাকরণটি নিচে দেওয়া হলো:
- ঠাট: আশাবরী।
- জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (মতান্তরে ঔড়ব-ষাড়ব)। এর আরোহে সাধারণত গান্ধার ($g$) এবং ধৈবত ($d$) বর্জিত হয় (৫টি স্বর)। অবরোহে সবগুলো স্বরই ব্যবহৃত হয়।
- বাদী স্বর: পঞ্চম ($P$)।
- সমবাদী স্বর: তার সপ্তকের ষড়জ ($\dot{S}$)।
- অঙ্গ: উত্তরাঙ্গ প্রধান রাগ (যেহেতু এর বাদী স্বর সপ্তকের উত্তর অংশে এবং এর চলন তার সপ্তকে বেশি)।
- সময়: রাত্রির তৃতীয় প্রহর (মধ্যরাতের পর)।
- প্রকৃতি: চঞ্চল ও বীররস প্রধান।
আরোহণ-অবরোহণ ও পকড় (নোটেশন):
- আরোহণ: সা রে মা পা ণ র্সা (কোমল নিখাদ)
- অবরোহণ: র্সা ণ পা মা পা জ্ঞ মা রে সা (কোমল গান্ধার ও কোমল নিখাদ)
- পকড় (রাগের রূপ): মা পা ণ র্সা, ধা ণ পা, মা পা জ্ঞ মা রে সা
আরোহ-আবরোহ এই লিঙ্ক গুলোতে গিয়ে শুনে নিতে পারেন । লিংক ১ ।
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে আড়ানা
আড়ানা রাগটি দ্রুত লয়ের খেয়াল, তারানা এবং যন্ত্রসঙ্গীতে শোনার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। নিচে গুণী শিল্পীদের কিছু অবিস্মরণীয় পরিবেশনার তালিকা দেওয়া হলো (ইউটিউবে সার্চ করে এগুলো শোনা যাবে):
১. ওস্তাদ আমীর খাঁ: আড়ানা রাগে তাঁর তারানা গায়ন অত্যন্ত চমৎকার এবং আভিজাত্যপূর্ণ।
২. ওস্তাদ রশিদ খান (রামপুর সহসওয়ান ঘরানা): তাঁর কণ্ঠে আড়ানার দ্রুত তান ও গলার কাজ শোনার মতো।
৩. পণ্ডিত কুমার গান্ধর্ব: প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিমায় কেদার-আড়ানা এবং আড়ানার মিশ্রণ অনবদ্য।
৪. বিদুষী কিশোরী আমনকার (জয়পুর ঘরানা): জয়পুর ঘরানার নিখুঁত স্বরপ্রয়োগের এক অনন্য উদাহরণ।
৫. বিদুষী শোভা মুডগাল: তাঁর উদাত্ত কণ্ঠে আড়ানার প্রকাশ খুবই জোরালো।
যন্ত্রসঙ্গীত (সেতার ও সরোদ):
১. ওস্তাদ শহীদ পারভেজ খান (সেতার): ইমদাদখানী ঘরানার এই সেতারীর দ্রুত গতির মীড় ও ঝালা আড়ানা রাগকে অনন্য মাত্রা দেয়।
২. ওস্তাদ আলী আকবর খান (সরোদ): মাইহার ঘরানার এই খলিফার সরোদে আড়ানার গম্ভীর ও ক্ষিপ্র রূপের মেলবন্ধন পাওয়া যায়।
৩. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (সরোদ): শাস্ত্রীয় ব্যাকরণ বজায় রেখে সরোদে আড়ানার রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন।
টিউটোরিয়াল ও স্বরলিপি (কীভাবে রাগটি চিনবেন)
যেকোনো রাগের চলন বোঝার জন্য শুরুতেই কিছু স্বর-মালিকা বা সারগম-গীত শোনা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি ‘লক্ষণ গীত’ (যে গানে রাগের ব্যাকরণের বর্ণনা সুর করে গাওয়া হয়) শুনলে রাগ চেনা সহজ হয়।
১. রাগ আড়ানার স্বরমল্লিকা বা সারগম গীত: অনলাইনে বিভিন্ন ঘরানার সারগম গীত পাওয়া যায় যা স্বরের গতিপ্রকৃতি বুঝতে সাহায্য করে।
২. এনসিইআরটি (NCERT) বা অন্যান্য টিউটোরিয়াল: শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি আর্কাইভ থেকে আড়ানা রাগের প্রাথমিক টিউটোরিয়াল শোনা যেতে পারে।
কাব্য ও আধুনিক গানে রাগ আড়ানার প্রয়োগ
শুদ্ধ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলা গান এবং উপ-শাস্ত্রীয় সঙ্গীতেও রাগ আড়ানার সার্থক প্রয়োগ ঘটেছে। নিচে কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো:
কাজী নজরুল ইসলামের গানে আড়ানা:
নজরুলের অনেক গানই গভীর রাগাশ্রয়ী। নির্দিষ্ট রাগের আশ্রয়ে যে গানগুলোতে তিনি সুরারোপ করেছেন, সেগুলোতে রাগের মূল অবয়ব বজায় রাখার চেষ্টা থেকেছে; খুব বেশি রাগভ্রষ্ট হয়নি। নজরুলের চলন ও চঞ্চল প্রকৃতির গানগুলোর সাথে আড়ানার গতিময়তার দারুণ সাযুজ্য পাওয়া যায়। তাই নজরুলের গানগুলো কান তৈরিতে বেশি উপযোগী বলে মনে করা হয়।
- এস হে সজল শ্যাম ঘন দেয়া
- খোল খোল খোল গো দুয়ার
- যোগী শিব শঙ্কর ভোলা দিগম্বর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে আড়ানা:
কবিগুরু তাঁর অনেক সৃষ্টিতে প্রচলিত রাগের আশ্রয় নিলেও প্রায়শই রাগের কঠোর কাঠামোর মধ্যে আটকে থাকতে চাননি। সুরের প্রয়োজনে তাঁর গতিবিধি রাগের নির্দিষ্ট নিয়মের বাইরে চলে গেছে। তাই শাস্ত্রীয় ব্যাকরণের নিরিখে কঠোরভাবে বিশ্লেষণ করলে তাঁর গান সবসময় বিশুদ্ধ রাগাশ্রয়ী গানের আদর্শ উদাহরণ নাও হতে পারে, তবে সঙ্গীতের নান্দনিকতায় তা অনন্য।
- বাণী তব ধায় অনন্ত গগনে লোকে লোকে
- চক্ষে আমার তৃষ্ণা, ওগো তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে (বৃন্দাবনী সারং-আড়ানা মিশ্রন)
- নিয়ে আয় কৃপাণ। রয়েছে তৃষিতা শ্যামা মা
- ইচ্ছে ! –ইচ্ছে !
- রাজা মহারাজা কে জানে,আমিই রাজাধিরাজ।
গজল, ভজন ও ঠুমরিতে আড়ানা:
চঞ্চল ও বীররস প্রধান হওয়ার কারণে আড়ানা রাগের বন্দিশ বা তারানা যেভাবে জমে ওঠে, উপ-শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে এর চলন একটু ভিন্ন মাত্রায় ধরা দেয়।
গজল ও ভজন: মেহেদী হাসান বা গোলাম আলীর মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের গজলে অথবা শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যবাহী ভজনে আড়ানার মিশ্রণ পাওয়া যায়।
ঠুমরি: চপল অঙ্গের ঠুমরিতেও আড়ানার দ্রুত তান চমৎকার মানিয়ে যায়।
সঙ্গীত গুরুকুলের রাগ আড়ানা নিয়ে লিখেছি, পড়ে দেখতে পারেন।
শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ আড়ানা বা আডানা। এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।
আরও দেখুন:
