রাগ আহির ভৈরব । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

আহির ভৈরব রাগটি তার গভীর প্রশান্তি এবং ভক্তি রসের জন্য বিশ্বজুড়ে সংগীতপ্রেমীদের কাছে সমাদৃত। এই রাগের কাঠামোতে ভৈরব রাগের গম্ভীর গাম্ভীর্য এবং আহিরী বা কাফি অঙ্গের চপল মাধুর্য এমনভাবে মিশেছে যে, এটি শ্রোতাকে একইসাথে অন্তর্মুখী ও আবেগপ্রবণ করে তোলে। এর স্বরবিন্যাসে কোমল ঋষভ (ঋ) এবং কোমল নিষাদ (ণ)-এর উপস্থিতি একে এক বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দান করে। এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর ‘আন্দোলন’। কোমল ঋষভের ওপর যখন মধ্যম থেকে ধীর মোঁড় নিয়ে আন্দোলন করা হয়, তখন ভোরের নিস্তব্ধতায় এক অপার্থিব আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি হয়। ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতে এই রাগটি কেবল খেয়াল বা ধ্রুপদেই নয়, বরং বাঁশি, সেতার ও সারেঙ্গির মতো যন্ত্রসংগীতেও অত্যন্ত প্রভাবশালী।

 

রাগ আহির ভৈরব

 

রাগ আহির ভৈরব

 

ঐতিহাসিকভাবে ধারণা করা হয়, এই রাগটি প্রাচীন ‘আহির’ নামক গোপ উপজাতির লোকসুর থেকে অনুপ্রাণিত। প্রাচীনকালে এটি ‘অহির ভৈরব’ নামেও পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে শাস্ত্রীয় সংগীতের পণ্ডিতগণ একে ভৈরব রাগের কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে একটি মার্গীয় রূপ দান করেন। দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী সংগীতে এই রাগের হুবহু প্রতিরূপ হলো ১৬ নম্বর মেলকর্তা রাগ ‘চক্রবাকম’। বিংশ শতাব্দীতে ওস্তাদ আমির খাঁ, পণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং ওস্তাদ রশিদ খানের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের পরিবেশনায় এই রাগটি এক অনন্য উচ্চতা লাভ করেছে।

রাগ আহির ভৈরব রাগটি রাত্রির চতুর্থ প্রহর বা দিনের সূচনালগ্নের রাগ বা ভোরবেলার রাগ। আহীর অর্থ -গোয়ালা। ভোরে গোয়ালা গ্রামে গ্রামে দুধ নিয়ে যায়। আহীর ভৈরবে সেই ভোর ভোর সময়টাকেই কল্পনা করা হয়েছে। এই রাগটি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ভক্তি মূলক পরিবেশনার জন্য একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় রাগ। যতদূর জানা যায় ভৈরব রাগ এবং প্রাচীন আহিরী রাগ এর সংমিশ্রণে এ রাগের জন্ম। এতে ঋষভ (ঋ) এবং নিষাদ (ণ) কোমল। বাকি সব স্বর শুদ্ধ। প্রতিটি স্বরই আরোহণ অবরোহণে ব্যবহৃত হয়। ঋষভ এর উপরের বিশেষ আন্দোলন আহির ভৈরব এর বিশেষ সৌন্দর্য।

 

রাগের শাস্ত্র

আহির ভৈরব রাগের প্রযুক্তিগত ও ব্যাকরণগত দিকগুলো নিচে বুলেট পয়েন্টে দেওয়া হলো:

  • ঠাট: ভৈরব।
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহ এবং অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই সাতটি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: স ঋ গ ম প ধ ণ র্স
  • অবরোহ: র্স ণ ধ প ম গ ঋ স
  • বাদী স্বর: মধ্যম (ম)
  • সমবাদী স্বর: ষড়জ (স)
  • বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (ঋ) কোমল এবং নিষাদ (ণ) কোমল; বাকি সব স্বর শুদ্ধ।
  • সময়: প্রাতঃকাল (দিনের প্রথম প্রহর বা ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, শান্ত এবং ভক্তিপ্রধান।

(দ্রষ্টব্য: এখানে ‘ঋ’ ও ‘ণ’ বলতে যথাক্রমে কোমল ঋষভ ও কোমল নিষাদ বোঝানো হয়েছে।)

আহির ভৈরব সম্পর্কিত অন্যান্য রাগ:

আহির ভৈরব রাগের সাথে চলন বা স্বরের সাদৃশ্য রয়েছে এমন কিছু রাগের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • রাগ ভৈরব: এটি আহির ভৈরবের মূল ভিত্তি রাগ; কেবল নিষাদ স্বরের ভিন্নতার কারণে (ভৈরবে শুদ্ধ নিষাদ ব্যবহৃত হয়) এই দুটি আলাদা।
  • রাগ আনন্দ ভৈরব: এই রাগেও ভৈরব ও কাফি রাগের মিশ্রণ দেখা যায়, তবে এর চলন ও স্বর বিন্যাস আহির ভৈরব থেকে কিছুটা জটিল।
  • রাগ নট ভৈরব: ভৈরব অঙ্গের রাগ হলেও এতে শুদ্ধ নিষাদ এবং শুদ্ধ ঋষভের সূক্ষ্ম প্রক্ষেপণ থাকে, যা আহির ভৈরব থেকে একে পৃথক করে।
  • রাগ রামকলী: এই রাগেও ভৈরব অঙ্গের গাম্ভীর্য আছে, কিন্তু এতে তীব্র মধ্যম ও কোমল নিষাদের বিশেষ প্রয়োগ দেখা যায়।
  • রাগ চক্রবাকম: কর্ণাটকী সংগীতের এই রাগটি আহির ভৈরবের দক্ষিণ ভারতীয় রূপান্তর।

 

আরোহ-আবরোহ এই লিঙ্ক গুলোতে গিয়ে শুনে নিতে পারেন । লিংক ১ 

 

রাগ আহির ভৈরব কেবল একটি শাস্ত্রীয় ব্যাকরণ নয়, এটি প্রভাতের এক অমলিন প্রার্থনা। এই রাগের মধ্যম বাদী হওয়ার কারণে এটি যেন চারপাশের প্রকৃতির সাথে এক নিবিড় সখ্যতা তৈরি করে। কোমল ঋষভের করুণ আর্তি আর কোমল নিষাদের স্পর্শ একে যেমন উচ্চাঙ্গ সংগীতে অনন্য করেছে, তেমনি বহু জনপ্রিয় ভজন ও চলচ্চিত্রের গানেও এর প্রভাব স্পষ্ট।

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 2 রাগ আহির ভৈরব । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, নতুন শ্রোতাদের জন্য রাগ চেনার সহজতম উপায় হলো সেই রাগের কাঠামোয় রচিত জনপ্রিয় ও সহজবোধ্য গানগুলো শোনা। যখন একজন শ্রোতা একই রাগের আধারে তৈরি নানা আঙ্গিকের গান বারবার শোনেন, তখন অবচেতনভাবেই তাঁর মনে সেই রাগের একটি সুনির্দিষ্ট ছাঁচ বা ‘মেলোডিক ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরি হয়ে যায়। রাগের বিশেষ চলনগুলো তখন আর অপরিচিত থাকে না। এই প্রাথমিক প্রস্তুতির পর যখন তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতের জটিলতর শাখা যেমন—ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল বা যন্ত্রসংগীত শোনেন, তখন রাগের সেই পরিচিত অবয়বটি খুঁজে পাওয়া তাঁর জন্য অনেক সহজ হয়ে ওঠে।

 

কণ্ঠে আহির ভৈরব:

কাজী নজরুল ইসলামের গানে আহির ভৈরব :

নজরুলের অনেক গান রাগাশ্রয়ী। নির্দিষ্ট রাগের আশ্রয়ে যে গানগুলোতে সুর করা হয়েছে, সেগুলোর পুরো সুরে রাগের অবয়ব বজায় রাখার চেষ্টা থেকেছে; খুব বেশি রাগভ্রষ্ট হয়নি। তাই নজরুলের গানগুলো কান তৈরিতে বেশি উপযোগী বলে আমার কাছে মনে হয়।

১. অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারি: এটি নজরুলের আহির ভৈরব রাগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রামাণ্য গান। গানটির সুরবিন্যাসে কোমল ঋষভ ও কোমল নিষাদের প্রয়োগ এতই স্পষ্ট যে, এটি শুনলে রাগের অবয়বটি সহজেই ধরা পড়ে।

 

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে আহির-ভৈরব:

রবীন্দ্রনাথের আহির-ভৈরব আশ্রিত গানগুলো শোনার সময় খেয়াল করবেন যে, তিনি অনেক ক্ষেত্রে ‘ভৈরব’ এবং ‘রামকলী’ রাগের সাথে আহির-ভৈরবকে একীভূত করে ফেলেছেন। তাই এগুলোকে ‘বিশুদ্ধ আহির-ভৈরব’ না বলে ‘আহির-ভৈরব মিশ্র’ বলাটা বেশি যুক্তিযুক্ত হবে।

 

হিন্দি/উর্দু ছায়াছবির গানে আহির ভৈরব:

ছায়াছবির গানে আহির-ভৈরব রাগের প্রয়োগ নতুন শ্রোতাদের জন্য সবচেয়ে বেশি কার্যকর। কারণ এখানে অর্কেস্ট্রেশন এবং বাণীর সাহচর্যে রাগের মেজাজটি খুব দ্রুত মনে গেঁথে যায়।

১. পুছো না ক্যায়সে ম্যায়নে রৈন বিতায়ি (চলচ্চিত্র: মেরি সুরাত তেরি আঁখেন, ১৯৬৩): এস. ডি. বর্মনের অসাধারণ সুরারোপে মান্না দে-র গাওয়া এই গানটি ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের ইতিহাসে ‘আহির-ভৈরব’ রাগের সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও প্রামাণ্য নিদর্শন। গানটির আলাপ, অন্তরা এবং ছোট ছোট তানের কাজগুলো রাগের ব্যাকরণগত শুদ্ধতা (বিশেষ করে কোমল ঋষভ ও কোমল নিষাদের প্রয়োগ) নিখুঁতভাবে বজায় রেখেছে। রাগ চেনার জন্য এটি দুনিয়ার যেকোনো সংগীত শিক্ষার্থীর কাছে প্রথম পাঠ হিসেবে গণ্য হয়।

২. আপ কি পলোঁ মেঁ কুছ অ্যায়সা গয়ে (চলচ্চিত্র: জ্যোতি, ১৯৮১): বাপ্পি লাহিড়ীর সুরে লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া এই গানটি আহির-ভৈরবের এক স্নিগ্ধ ও আধুনিক রূপ। গানটির স্থায়ী ও অন্তরায় রাগের চলনগুলো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে, যা সাধারণ শ্রোতার কান তৈরিতে সাহায্য করে।

৩. রামা গয়া বনবাস (চলচ্চিত্র: ভারত মিলাপ, ১৯৪২): সংগীত পরিচালক শঙ্কর রাও ব্যাসের সুরে পালুস্কর পদ্ধতির গায়কীতে এই গানটি আহির-ভৈরবের করুণ রসের এক অনন্য উদাহরণ। মহাকাব্যিক আবহে এই রাগের গম্ভীর প্রকৃতি এখানে অত্যন্ত সার্থকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।

৪. মন আনন্দ আনন্দ ছায়ো (চলচ্চিত্র: বিজেতা, ১৯৮২): পণ্ডিত সত্যশীল দেশপাণ্ডে এবং আশা ভোঁসলের কণ্ঠে এই গানটি আহির-ভৈরব রাগের এক ধ্রুপদী উপস্থাপনা। অজিত বর্মনের সুরে এই গানে রাগের ‘বাদী-সমবাদী’ এবং স্বরবিন্যাসের শুদ্ধতা বিস্ময়কর।

৫. সোলহ বরস কি বালি উমর কো সালাম (চলচ্চিত্র: এক দুজে কে লিয়ে, ১৯৮১): এল. ভি. প্রসাদের সুরে লতা মঙ্গেশকরের এই গানে আহির-ভৈরবের চপল ও আধুনিক প্রয়োগ দেখা যায়। যদিও এটি পুরোপুরি শাস্ত্রীয় ঘরানার নয়, তবে এর মূল সুরের কাঠামোতে আহির-ভৈরবের ছায়া অত্যন্ত স্পষ্ট।

খেয়ালে আহির ভৈরব:

খেয়াল শোনার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এতে রাগের ‘বাদী’ (মধ্যম) ও ‘সমবাদী’ (ষড়জ) স্বরের প্রয়োগ এবং ‘মেরুখণ্ড’ বা ‘বাড়ত’-এর মাধ্যমে রাগের পূর্ণ অবয়বটি ধাপে ধাপে উন্মোচিত হয়। নিচের পরিবেশনাগুলো রাগ চেনার জন্য মাইলফলক:

১. রামপুর সহসওয়ান ঘরানার ওস্তাদ রশিদ খানের – আহির-ভৈরব: ওস্তাদ রশিদ খানের গলায় আহির-ভৈরব এক অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতা। তাঁর কণ্ঠের সেই বিশেষ ‘পুকার’ এবং রাগের করুণ রসের সংমিশ্রণ শ্রোতাকে আবিষ্ট করে রাখে। তাঁর বিখ্যাত বন্দিশ “অ্যালবেলা সজন আয়ো রে” (যা পরবর্তীতে চলচ্চিত্রেও জনপ্রিয় হয়) এবং বিলম্বিত একতালে রাগের বিস্তার আহির-ভৈরব বোঝার জন্য অপরিহার্য। তাঁর তানের স্পষ্টতা এবং ‘কোমল ঋষভ’-এর প্রক্ষেপণ এই ঘরানার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।

২. ইন্দোর ঘরানার ওস্তাদ আমির খাঁ সাহেবের – আহির-ভৈরব: ওস্তাদ আমির খাঁ সাহেব এই রাগকে এক ধ্যানগম্ভীর রূপ দিয়েছেন। তাঁর ‘অতি বিলম্বিত’ লয়ে ঝুমরা তালের ওপর ভিত্তি করে রাগের যে বিস্তার, তা শান্ত ও আধ্যাত্মিক। তাঁর গায়নে ‘মেরুখণ্ড’ পদ্ধতির জটিল স্বরবিন্যাস থাকলেও তা রাগের প্রশান্তিকে ক্ষুণ্ণ করে না। নতুন শ্রোতাদের জন্য তাঁর বাদনশৈলী রাগের গভীরতা বুঝতে সাহায্য করে।

৩. পণ্ডিত কুমার গান্ধর্বের – আহির-ভৈরব: কুমার গান্ধর্ব ছিলেন প্রথা ভাঙা এক বিদ্রোহী শিল্পী। তাঁর আহির-ভৈরব গায়নশৈলী অত্যন্ত মৌলিক। তিনি অনেক সময় মালওয়া অঞ্চলের লোকসুরের নির্যাস এই রাগে যোগ করতেন। তাঁর গায়নে রাগের যে ‘ঝটকা’ বা স্বরের আকস্মিক চলন দেখা যায়, তা আহির-ভৈরবকে এক নতুন প্রাণশক্তি দান করে। (নোট: তিনি আহির-ভৈরবের সাথে কেদার রাগের সংমিশ্রণে ‘আহির-কেদার’ নামক এক অপূর্ব মিশ্র রাগও গাইতেন, যা তাঁর সৃজনশীলতার পরিচয় দেয়)।

৪. জয়পুর-অত্রৌলি ঘরানার বিদুষী কিশোরী আমনকারের গলায় – আহির-ভৈরব: কিশোরী তাই-এর গলায় এই রাগটি এক অনন্য নারীসুলভ কোমলতা ও আভিজাত্য লাভ করেছে। জয়পুর ঘরানার বিশেষত্ব অনুযায়ী তাঁর গায়নে ‘বক্র তান’ এবং ‘জটিল স্বরসংগতি’ থাকলেও আহির-ভৈরবের ভক্তি রসটি প্রধান হয়ে ওঠে। তাঁর পরিবেশনায় রাগের বিশুদ্ধতা ও গাণিতিক পারফেকশন রাগ চেনার জন্য অত্যন্ত সহায়ক।

৫. পণ্ডিত মুকুল শিবপুত্রের – আহির-ভৈরব: কুমার গান্ধর্বের পুত্র ও শিষ্য হিসেবে মুকুল শিবপুত্র তাঁর পিতার সেই স্বতন্ত্র শৈলীটি বহন করছেন। তাঁর কণ্ঠে আহির-ভৈরবের চলন অত্যন্ত দানাভরা এবং ওজস্বী। বিলম্বিত থেকে দ্রুত খেয়ালে যাওয়ার সময় তিনি রাগের কাঠামোর যে ভারসাম্য বজায় রাখেন, তা একজন শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষণীয়।

৬. গোয়ালিয়র ঘরানার বিদুষী শোভা মুডগালের – আহির-ভৈরব: শোভা মুডগালের ভরাট ও শক্তিশালী কণ্ঠে আহির-ভৈরব এক বিশেষ তেজস্বিতা লাভ করে। তিনি ধ্রুপদ ও খেয়াল উভয় অঙ্গের সংমিশ্রণে রাগটিকে পরিবেশন করেন। তাঁর গায়নে রাগের আরোহ-অবরোহ এবং স্বরের স্পষ্টতা নতুন কান তৈরির জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

 

যন্দ্রে আহির-ভৈরব:

সেতারে  আহির ভৈরব:

যন্ত্রসংগীতে আহির-ভৈরব শোনার বড় সুবিধা হলো, এখানে কোনো বাণী বা শব্দের অন্তরায় থাকে না; ফলে শ্রোতা সরাসরি সুরের চলন এবং স্বরের অবস্থানগুলো ধরতে পারেন। সেতারের তরফের তারের অনুরণন আহির-ভৈরবের আধ্যাত্মিক আবহকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

১. ইমদাদখানী ঘরানার ওস্তাদ শহীদ পারভেজ খানের সেতারে – আহির-ভৈরব: শহীদ পারভেজ খান তাঁর অনন্য গায়কী অঙ্গের জন্য বিশ্ববিখ্যাত। তাঁর বাজানো আহির-ভৈরব রাগটি এই ঘরানার একটি মাস্টারপিস। তিনি সেতারে যেভাবে কোমল ঋষভ থেকে ষড়জে মিঁড় নিয়ে আসেন, তা হুবহু মানুষের কণ্ঠের আর্তিকেও হার মানায়। তাঁর বিলম্বিত ও দ্রুত গৎ-এর কাজগুলো রাগের ‘স ঋ গ ম’ এবং ‘ধ ণ র্স’ চলনগুলোকে গাণিতিকভাবে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে। নতুন শ্রোতাদের কান তৈরির জন্য তাঁর এই লাইভ কনসার্ট বা স্টুডিও রেকর্ডিংগুলো শোনার বিকল্প নেই।

২. মৈহার ঘরানার পণ্ডিত রবিশঙ্করের সেতারে – আহির-ভৈরব: পণ্ডিত রবিশঙ্কর আহির-ভৈরব রাগকে বিশ্বদরবারে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর বাজানোয় ভৈরব অঙ্গের গাম্ভীর্যের সাথে আহিরী অঙ্গের এক অপূর্ব মেলবন্ধন পাওয়া যায়। তাঁর আলাপের অংশটুকু শুনলে আহির-ভৈরব রাগের ‘শান্ত’ ও ‘ভক্তি’ রসের প্রকৃত স্বরূপটি চেনা যায়। যোর ও ঝালা অংশে তিনি রাগের প্রতিটি স্বরের বিন্যাস অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করেছেন।

৩. ইমদাদখানী ঘরানার ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ সাহেবের সেতারে – আহির-ভৈরব: শহীদ পারভেজ খানের পূর্বসূরি ও ইমদাদখানী ঘরানার প্রাণপুরুষ বিলায়েত খাঁ সাহেবের আহির-ভৈরব বাদন এক অলৌকিক অভিজ্ঞতার মতো। তাঁর সেতারে গায়কী অঙ্গের প্রয়োগ এতই প্রবল যে, মনে হয় সেতারটি যেন কথা বলছে। তাঁর বাজানোয় ‘নি ধ প ম’ (নিষাদ থেকে মধ্যম) পর্যন্ত দীর্ঘ মিঁড়গুলো আহির-ভৈরব রাগটি চেনার জন্য অত্যন্ত সহায়ক।

৪. পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেতারে – আহির-ভৈরব: মৈহার ঘরানার এই প্রবাদপ্রতীম শিল্পীর বাজানোয় এক ধরণের অন্তর্নিহিত বিষাদ ও গভীর প্রশান্তি থাকে, যা আহির-ভৈরবের প্রকৃতির সাথে মিশে যায়। তাঁর অত্যন্ত ধীরস্থির আলাপ এবং তানের স্পষ্টতা একজন শিক্ষার্থীকে রাগের আরোহ-অবরোহ বুঝতে দারুণ সাহায্য করে।

 

সরদে আহির ভৈরব:

সরোদে আহির-ভৈরব শোনার সময় খেয়াল করবেন যে, যন্ত্রের ধাতব তারের প্রতিধ্বনি রাগের গম্ভীরতাকে আরও প্রগাঢ় করে তোলে। এই যন্ত্রে ‘মন্দ্র’ (Bass) ও ‘মধ্য’ সপ্তকের কাজগুলো রাগটি চেনার জন্য সবচেয়ে সহায়ক। সরোদে ‘রে’ (ঋষভ) ও ‘নি’ (নিষাদ)-এর প্রয়োগ অত্যন্ত গম্ভীর হয়, যা আহির-ভৈরবের মূল চরিত্র।

১. মৈহার ঘরানার খলিফা ওস্তাদ আলী আকবর খানের সরোদে – আহির-ভৈরব: ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ সাহেবকে বলা হয় সরোদের সম্রাট। তাঁর বাজানো আহির-ভৈরব একটি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মতো। তিনি এই রাগে ভৈরব অঙ্গের গাম্ভীর্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে যেভাবে আহিরী অঙ্গের মাধুর্য যোগ করেন, তা অতুলনীয়। তাঁর বিশেষ ‘জোড়’ এবং ‘ঝালা’র কাজগুলোতে রাগের আরোহ-অবরোহ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। নতুন শ্রোতাদের কান তৈরির জন্য তাঁর ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকের ঐতিহাসিক রেকর্ডিংগুলো শ্রেষ্ঠ পাঠ্য।

২. শাহজাহানপুর ঘরানার পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সরোদে – আহির-ভৈরব: পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতের একজন প্রাজ্ঞ পণ্ডিত ও শিল্পী। তাঁর বাদনশৈলীতে রাগের ব্যাকরণ ও গণিত অত্যন্ত নিখুঁত থাকে। আহির-ভৈরব বাজানোর সময় তিনি রাগের ‘বাদী’ (মধ্যম) এবং ‘সমবাদী’ (ষড়জ) স্বরের সম্পর্কটি যেভাবে গাণিতিক বিন্যাসে দেখান, তা একজন শিক্ষার্থীর জন্য রাগটি চেনার সহজতম উপায়। তাঁর তানের স্পষ্টতা এবং স্বরের শুদ্ধতা বিস্ময়কর।

৩. মৈহার ঘরানার ওস্তাদ আমজাদ আলী খানের সরোদে – আহির-ভৈরব: আমজাদ আলী খাঁ সাহেবের বাজানোয় এক ধরণের ‘গায়কী অঙ্গ’ থাকে। তিনি সরোদে যেভাবে মানুষের কণ্ঠের মতো গান গেয়ে ওঠেন, তাতে আহির-ভৈরবের কোমল স্বরগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। তাঁর বাজানো ‘একতাল’ বা ‘ত্রিতাল’-এর গৎগুলো আহির-ভৈরব রাগের ছন্দ ও কাঠামোর এক অনন্য উদাহরণ।

৪. ওস্তাদ আশীষ খানের সরোদে – আহির-ভৈরব: ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ সাহেবের সুযোগ্য পুত্র হিসেবে তিনি মৈহার ঘরানার ঐতিহ্য বজায় রেখেছেন। তাঁর বাজানোয় আহির-ভৈরবের একটি আধুনিক ও বিস্তারধর্মী রূপ পাওয়া যায়, যা বর্তমান প্রজন্মের শ্রোতাদের জন্য রাগটি বোঝা সহজ করে দেয়।

 

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 1 রাগ আহির ভৈরব । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ আহির ভৈরব।  এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

 

সোর্স ও তথ্যসূত্র:

১. “ক্রমিক পুস্তক মালিকা” (খণ্ড ২ ও ৩) — পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. “রাগ বিজ্ঞান” — পণ্ডিত বিনায়ক রাও পট্টবর্ধন।
৩. “ভারতের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও রাগমালা” — শ্রী বিমলাকান্ত রায়চৌধুরী।
৪. “The Ragas of North India” — Walter Kaufmann.
৫. সংগীত নাটক একাডেমি আর্কাইভ এবং বিশিষ্ট ঘরানার ওস্তাদদের প্রামাণ্য বিশ্লেষণ।

আরও দেখুন: