রাগ আভোগী বা আভোগী কফি বা আভোগী কানাড়া | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মেহফিলে রাত্রির প্রথম প্রহরে এমন কিছু রাগ বিস্তার লাভ করে, যা শুনলেই মনের ভেতরের যাবতীয় ব্যাকুলতা ও চাপ দূর হয়ে এক অদ্ভুত নির্মল প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ে। তেমনই এক অতি-মনোহর, সংহত এবং অনন্য পেন্টাটোনিক রূপ হলো ‘রাগ আভোগী’ (বা সংক্ষেপে ‘আভোগী’)। দক্ষিণ ভারতীয় কর্নাটকী সঙ্গীত ঐতিহ্য থেকে উত্তর ভারতীয় হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া রাগগুলোর মধ্যে আভোগী অন্যতম সফল ও জনপ্রিয় সংযোজন। উত্তর ভারতীয় প্রথায় সামান্য স্বর-সংস্কারের মাধ্যমে এটিকে কাফী ঠাটের অধীনে এমনভাবে স্থান দেওয়া হয়েছে, যার ঋজু ও স্পষ্ট স্বরবিন্যাস নিমিষেই শ্রোতার মন জয় করে নেয়।

সঙ্গীত শাস্ত্রে অঞ্চল ও ঐতিহ্যভেদে এটি ‘আভোগী’, ‘আভোগী কফি’ বা কর্নাটকী প্রথায় ‘আভোগী কানাড়া’ নামেও বহুল সমাদৃত।

ইতিহাস ও রাগের পরিচয়

রাগ আভোগীর মূল জন্মভূমি দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন কর্নাটকী সঙ্গীত সংস্কৃতি। সেখানে এটি ২২তম মেলকর্তা রাগ ‘খরহরপ্রিয়া’-র জন্য তৈরি একটি অতি পরিচিত জন্য রাগ। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে এবং প্রখ্যাত উত্তর ভারতীয় ওস্তাদদের হাত ধরে এই রাগটি হিন্দুস্তানি সঙ্গীতে প্রবর্তিত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতে রাগ আভোগীকে কাফী ঠাটের অন্তর্গত একটি পেন্টাটোনিক বা ঔড়ব-ঔড়ব রূপ হিসেবে গণ্য করা হয়। পাঁচ স্বরের রাগ হলেও এর মাধুর্য ও চলনে এক অপূর্ব প্রসন্নতা ফুটে ওঠে। এর প্রধান রস হলো ভক্তিরস, প্রীতি এবং শান্ত রস। রাত্রির সূচনাতেই এই রাগের স্পষ্ট স্বরপ্রক্ষেপণ মেহফিলে বিস্তার লাভ করলে তা শ্রোতার মনে এক পরম ধ্যায়নমগ্ন অনুভূতির উদ্রেক করে।

রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো

  • ঠাট: কাফী ঠাট।
  • জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহণ এবং অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই পাঁচটি করে স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • বাদী স্বর: ম (শুদ্ধ মধ্যম)।
  • সমবাদী স্বর: স (ষড়্‌জ)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহণ ও অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই পঞ্চম (প) এবং নিখাদ (ন) সম্পূর্ণ বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (র), কোমল গান্ধার (গ), শুদ্ধ মধ্যম (ম), শুদ্ধ ধৈবত (দ) এবং ষড়্‌জ (স)।
  • সময়: রাত্রির প্রথম প্রহর (সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টার মধ্যবর্তী সময়)।
  • প্রকৃতি: অত্যন্ত প্রসন্ন, গম্ভীর, স্নিগ্ধ, সুসংহত ও ভক্তিমূলক।

আরোহণ: স র জ্ঞ ম ধ র্স

অবরোহণ: র্স ধ ম জ্ঞ র স

প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):

স র জ্ঞ ম, ধ ম, জ্ঞ র স, র জ্ঞ ম ধ র্স, ধ ম, জ্ঞ র স

গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য

রাগ আভোগীর গায়কি অত্যন্ত সরল ও ঋজু মনে হলেও এর আসল নান্দনিকতা লুকিয়ে রয়েছে পাঁচটি স্বরের সঠিক প্রক্ষেপণ এবং মধ্যম স্বরের ওপর স্থায়ী আশ্রয়ের ওপর।

১. পাঁচ স্বরের সুষম বন্টন (পেন্টাটোনিক স্কেল): আরোহ ও অবরো দুটোতেই পঞ্চম এবং নিখাদ সম্পূর্ণ বর্জিত হওয়ার ফলে (স-র-জ্ঞ-ম-ধ) এতে অতিরিক্ত জটিলতা থাকে না।

২. বাদী স্বর মধ্যমের স্থিরতা: বাদী স্বর শুদ্ধ মধ্যম (ম) এবং সমবাদী ষড়্‌জ (স) হওয়ায় মধ্যম ও ধৈবতের মধ্যে দোলা রাগে এক বিশেষ আভিজাত্য এনে দেয়। ধ ম জ্ঞ র স চরণে ধৈবত থেকে সরাসরি মধ্যমে নেমে আসা এবং কোমল গান্ধারকে স্পর্শ করার চলনটি আভোগীর প্রধান চাবিকাঠি।

৩. ধৈবত ও ঋষভের গতি: তারা সপ্তকে ওঠার সময় ম ধ র্স তান আসরে এক অপরূপ প্রফুল্লতার জন্ম দেয়।

ধ্রুপদ, ধামার এবং প্রথাগত বিলম্বিত ও দ্রুত খেয়াল বন্দিশে রাগ আভোগীর গম্ভীর রূপ ফুটে ওঠে। সেতার, সরোদ, বাঁশি, সানাই ও সারেঙ্গীতে রাত্রির প্রারম্ভে এই রাগের আলাপ মেহফিলে এক পরম স্নিগ্ধ ও পবিত্র সুরলোক তৈরি করে। ওপরের সংযুক্ত ভিডিওগুলোতে প্রখ্যাত ওস্তাদ ও পণ্ডিতদের কণ্ঠে ও যন্ত্রে এই রাগের অনবদ্য বিস্তার সরাসরি উপভোগ করা যায়।

বাংলা গান ও সুগম সঙ্গীতে আভোগী

দক্ষিণী রাগ হলেও উত্তর ভারতীয় সুগম সঙ্গীত এবং বাংলা গানেও আভোগীর ছায়ায় অনবদ্য কিছু সুর সৃষ্টি হয়েছে। শাস্ত্রীয় ঘরানার রাগাশ্রয়ী প্রসংগে ও আধুনিক বন্দিশে এই রাগের উজ্জ্বল উপস্থিতি দেখা যায়।

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

  • রাগ কাফী: কাফী ঠাটের জনক রাগ; তবে এতে সাতটি স্বরই ব্যবহৃত হয় এবং এটি আভোগীর চেয়ে অনেক বেশি চঞ্চল।
  • রাগ বাঘেশ্রী: কাফী ঠাটের আরেকটি গভীর রাতের রাগ; তবে এতে নিখাদ ব্যবহৃত হয় এবং পঞ্চমের প্রয়োগ থাকে।
  • রাগ দুর্গাবতী / দুর্গা: বিলাবল বা খামাজ অঙ্গের পেন্টাটোনিক রাগ; স্বরকাঠামো কাছাকাছি হলেও এতে শুদ্ধ গান্ধার ব্যবহৃত হয়।

রাগ আভোগী হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দুই প্রধান ধারা—উত্তর ভারতীয় ও দক্ষিণ ভারতীয় পদ্ধতির এক পরম সফল ও সুমিষ্ট মিলনসেতু। কোনো জটিল অলঙ্কার বা স্বরের ঘনঘটা ছাড়াই কেবল পাঁচটি স্বরের বিশুদ্ধতায় এটি রাত্রির প্রথম প্রহরে যে অনাবিল প্রশান্তি তৈরি করে, তা এক কথায় অনন্য। সন্ধ্যা নামার পর যখন শিল্পীর কণ্ঠে কিংবা যন্ত্রের তারে আভোগীর ‘স র জ্ঞ ম, ধ ম, জ্ঞ র স’-র সুরতরঙ্গ ভেসে আসে, তখন তা মুহূর্তের মধ্যে মনকে এক অপার্থিব, স্নিগ্ধ ও পরম পবিত্র সুরলোকে নিয়ে যায়।

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স

১. ক্রমিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ৩ ও ৪) — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।

২. রাগ প্রবীণ ও রাগ বিজ্ঞান — পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন।

৩. Raganidhi (Vol 1-4) — বি. সুব্বা রাও (প্রখ্যাত সঙ্গীত তাত্ত্বিক)।

৪. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (SRA) আর্কাইভ — কাফী ঠাট ও আভোগী রাগ রূপ বিশ্লেষণ।