ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নিশীথ বা মধ্যরাত্রির প্রহরে কানাড়া অঙ্গের রাগগুলোর স্থান এক অনন্য উচ্চতায়। রাজকীয় গাম্ভীর্য, আবেগ এবং মরমী ধ্যায়নমগ্নতার সমন্বয়ে গঠিত এই পরিবারের অন্যতম প্রাচীন, বিরল এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন সদস্য হলো ‘রাগ হুসেইনী-কানাড়া’ (বা সংক্ষেপে ‘হুসেইনী-কানাড়া’)। নাম থেকেই স্পষ্ট যে, এতে সুপ্রাচীন ঐতিহাসিক রাগ ‘হুসেইনী’ এবং মার্জিত ‘কানাড়া’ অঙ্গের এক অপূর্ব সাঙ্গীতিক সংমিশ্রণ ঘটেছে। মধ্যরাতের নির্জনতায় এই রাগের সুরতরঙ্গ যখন মেহফিলে বিস্তার লাভ করে, তখন তা রাজকীয় আভিজাত্যের সাথে এক পরম মরমী ব্যাকুলতার সৃষ্টি করে।
সঙ্গীত শাস্ত্রে অঞ্চল, প্রথা ও প্রামাণ্য গ্রন্থভেদে এটি ‘হুসেইনী কানাড়া’, ‘হুসেইনী-কানাড়া’, ‘হোসায়নী কানাড়া’ বা ‘হুসাইনি-কানাড়া’ নামেও বহুল সমাদৃত।
ইতিহাস ও রাগের পরিচয়
ইতিহাসের পাতায় রাগ হুসেইনী-কানাড়ার শিকড় জড়িয়ে রয়েছে মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষের রাজসভা ও সুফি ঐতিহ্যের সাথে। ‘হুসেইনী’ মূলত সুপ্রাচীন পারস্য ও ভারতীয় সঙ্গীতরীতির মিশ্রণে সৃষ্ট একটি বিশেষ রাগ অঙ্গ, যা পরবর্তীতে ধ্রুপদী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে কানাড়া অঙ্গের সাথে মিলে রূপ নেয় ‘হুসেইনী-কানাড়া’-য়। তানি সেন ও তৎসংলগ্ন মোঘল দরবারের সুরসাধকদের মাধ্যমে এই রাগের বহুল চর্চা ছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়।
হুসেইনী-কানাড়া প্রধানত কাফী ঠাটের আশ্রয়ে শ্রেণীবদ্ধ একটি অত্যন্ত গম্ভীর জোড়-রাগ (Jod-Raga)। কানাড়া অঙ্গের মৌলিক প্রকৃতি (যেমন কোমল গান্ধার ও মধ্যমের আন্দোলন) ধরে রাখার পাশাপাশি এতে ‘হুসেইনী’ অঙ্গের বিশেষ স্বরসংগতি এবং আরোহণে শুদ্ধ ঋষভের সংহত প্রয়োগ এক অনন্য আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য এনে দেয়। এর প্রধান রস হলো করুণ, বীর এবং শান্ত রস।
রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো
- ঠাট: কাফী ঠাট।
- জাতি: ষাড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে সাধারণত ছয়টি স্বর এবং অবরোহণে সাতটি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- বাদী স্বর: প (পঞ্চম)।
- সমবাদী স্বর: স (ষড়্জ)।
- বর্জিত স্বর: আরোহণে সাধারণত গা (কোমল গান্ধার) বক্রভাবে ব্যবহৃত বা এড়িয়ে যাওয়া হয়।
- ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (র), কোমল গান্ধার (গ), শুদ্ধ মধ্যম (ম), শুদ্ধ পঞ্চম (প), শুদ্ধ ধৈবত (দ – বক্র প্রয়োগ), কোমল নিখাদ (ন) এবং ষড়্জ (স)।
- সময়: রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর বা মধ্যরাত (রাত ৯টা থেকে রাত ১২টার মধ্যবর্তী সময়)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, মরমী, রাজকীয়, ব্যাকুল ও আভিজাত্যপূর্ণ।
আরোহণ: স র ম প, ধ নি র্স
অবরোহণ (কানাড়া অঙ্গ): র্স নি ধ প, ম প, গ ম র স
প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):
স র ম প, ধ নি র্স, র্স নি ধ প, ম প, গ ম র স
গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য
রাগ হুসেইনী-কানাড়ার আসল কারিগরি দক্ষতা লুকিয়ে রয়েছে এর হুসেইনী অঙ্গের ঋজু চাল এবং কানাড়া অঙ্গের বক্র মিড় ও আন্দোলনের সুষম ভারসাম্যের ওপর।
১. আরোহণে ‘স র ম প’-র সুদৃঢ় প্রক্ষেপণ: আরোহণে কোমল গান্ধার এড়িয়ে সরাসরি স র ম প ধরে পঞ্চমে যাওয়া হুসেইনী অঙ্গের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি। এটি রাগে এক রাজকীয় দৃঢ়তা এনে দেয়।
২. কানাড়া অঙ্গের ঐতিহ্যবাহী ‘গ ম র স’: অবরোহে নামার সময় তারা সপ্তক থেকে পঞ্চমে স্পর্শ করে কোমল গান্ধারের ওপর বিশেষ মন্থর আন্দোলনসহ গ ম র স মিড় ব্যবহার করা হয়, যা কানাড়া অঙ্গের স্বাক্ষর ফুটিয়ে তোলে।
৩. ধৈবতের বিশেষ ব্যবহার: এতে ধৈবত স্বরটির প্রয়োগ সরাসরি করার চেয়ে বক্রভাবে করা হয়, যা সাধারণ কাফী বা দরবারী রূপ থেকে হুসেইনী-কানাড়াকে আলাদা চেনা যায়।
ধ্রুপদ, ধামার এবং প্রথাগত প্রাক-মোঘল ঘরানার বিলম্বিত ও দ্রুত খেয়াল বন্দিশে হুসেইনী-কানাড়ার আসল গাম্ভীর্য ফুটে ওঠে। সেতার, সরোদ, রবাব ও সারেঙ্গীতে নিশীথ প্রহরে এই রাগের তান ও আলাপ মেহফিলে এক পরম অপার্থিব ও সুফি প্রকৃতির স্তব্ধতা তৈরি করে। ওপরের সংযুক্ত ভিডিওগুলোতে প্রখ্যাত ওস্তাদ ও পণ্ডিতদের কণ্ঠে ও যন্ত্রে এই রাগের অনবদ্য বিস্তার সরাসরি উপভোগ করা যায়।
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
- রাগ নায়কী কানাড়া: কাফী ঠাটেরই আরেকটি প্রাচীন কানাড়া রূপ; তবে এতে ধৈবত সম্পূর্ণ বর্জিত এবং আরোহের চঞ্চলতা আলাদা।
- রাগ দরবারী কানাড়া: আশাবরী ঠাটের মূল রাজকীয় রাগ; হুসেইনী-কানাড়ার চেয়ে এর কোমল গান্ধার ও কোমল ধৈবতের আন্দোলন অনেক বেশি ভারী।
- রাগ কাফী-কানাড়া: কাফী ও কানাড়া অঙ্গের মিশ্রণে সৃষ্ট জোড়-রাগ।
- রাগ সুহা কানাড়া: কাফী ঠাটের মধ্যরাতের আরেকটি কানাড়া রূপ।
রাগ হুসেইনী-কানাড়া হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মধ্যরাত্রির মেহফিলে প্রাচীন ইতিহাস ও রাজকীয় আভিজাত্যের এক প্রামাণ্য সুর দলিল। পারসিক-ভারতীয় রীতির ঐতিহাসিক মিলমিশ এবং কানাড়া অঙ্গের মরমী গাম্ভীর্য এখানে যেভাবে একাকার হয়েছে, তা অতুলনীয়। গভীর রাতের স্তব্ধতায় যখন হুসেইনী-কানাড়ার ‘স র ম প, র্স নি ধ প, গ ম র স’-র সুরতরঙ্গ ডানা মেলে, তখন তা অনায়াসেই শ্রোতার মনকে এক স্নিগ্ধ, আভিজাত্যপূর্ণ ও পরম আত্মমগ্ন সুরলোকে নিয়ে যায়।