রাগ কলাবতী । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের আকাশে এক অত্যন্ত উজ্জ্বল, মোহময়ী এবং আধুনিক রাগ হলো রাগ কলাবতী। এটি মূলত তার শৈল্পিক কারুকার্য এবং মধুর চলনের জন্য সংগীতপিপাসুদের কাছে এক বিশেষ আবেগের নাম। বিশেষ করে বাঁশি, সেতার এবং কণ্ঠসংগীতে এই রাগের পরিবেশনা শ্রোতাকে এক অপার্থিব প্রশান্তি দান করে।

রাগ কলাবতীর পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস

রাগ কলাবতী মূলত খামাজ ঠাটের অন্তর্গত একটি রাগ। তবে এর সবচেয়ে মজার এবং ঐতিহাসিক দিক হলো—এটি উত্তর ভারতীয় বা হিন্দুস্তানি সংগীতের নিজস্ব উদ্ভাবন নয়। এটি দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী সংগীত পদ্ধতি থেকে ধার করা হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পণ্ডিত ও ওস্তাদদের হাত ধরে এটি উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে স্থায়ী আসন করে নেয়।

এই রাগের বিশেষত্ব হলো এর সীমিত স্বরবিন্যাস। এতে মাত্র পাঁচটি স্বর (ঔড়ব জাতি) ব্যবহৃত হয়। এই পাঁচটি স্বরের মাধ্যমেই যে বিশাল এক সুরের মায়াজাল তৈরি করা সম্ভব, কলাবতী তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এই রাগে মধ্যম (মা) এবং ঋষভ (রে) পুরোপুরি বর্জিত। এর চলনে এক ধরনের চঞ্চলতা থাকলেও এর গভীরতা অত্যন্ত প্রশান্ত। মূলত এটি ভক্তি ও শৃঙ্গার রসের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। গভীর রাতে যখন এই রাগের আলাপ বা ধ্রুত লয় পরিবেশিত হয়, তখন চারপাশের পরিবেশ থমকে যায়।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাটে: খামাজ।
  • জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহে ৫টি এবং অবরোহে ৫টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: স গ প ধ ন স (সা গা পা ধা নি সা)।
  • অবরোহ: স ন ধ প গ স (সা নি ধা পা গা সা)।
  • বাদী স্বর: প (পঞ্চম)।
  • সমবাদী স্বর: স (ষড়জ)।
  • বর্জিত স্বর: ঋষভ (রে) এবং মধ্যম (মা) আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: গান্ধার (গা), পঞ্চম (পা), ধৈবত (ধা) — এই স্বরগুলো শুদ্ধ এবং নিষাদ (নি) সবসময় কোমল ব্যবহৃত হয়।
  • সময়: রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে ১২টা)।
  • প্রকৃতি: চঞ্চল, স্নিগ্ধ ও শৃঙ্গার রসপ্রধান।

সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ

  • রাগ জনসম্মোহিনী: কলাবতী রাগের সাথে ঋষভ (রে) যুক্ত করলে তা জনসম্মোহিনী রাগে পরিণত হয়।
  • রাগ তিলাং: তিলাং রাগে ধৈবত (ধা) অনুপস্থিত, কিন্তু কলাবতীতে ধৈবত প্রধান স্বর হিসেবে কাজ করে।
  • রাগ খামাজ: তিলাং-এর মতো খামাজও একই ঠাটের রাগ, তবে খামাজে সব স্বর (সম্পূর্ণ জাতি) ব্যবহৃত হয়।
  • রাগ মাড়ু খামাজ: স্বর বিন্যাসের ক্ষেত্রে মিল থাকলেও মানজ বা মাড়ু খামাজের চলন অনেক বেশি বিস্তৃত ও বক্র।
  • রাগ বৈরাগী: বৈরাগীর আরোহ-অবরোহ কলাবতীর কাছাকাছি মনে হলেও বৈরাগীর ঠাট (ভৈরব) এবং কোমল ঋষভের ব্যবহার একে সম্পূর্ণ আলাদা করে।

রাগ কলাবতী হলো শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই বিশেষ সুর যা জটিল ব্যাকরণের মারপ্যাঁচ এড়িয়ে সরাসরি মানুষের আত্মায় কড়া নাড়ে। এর সংক্ষিপ্ত কাঠামো কিন্তু অসীম গভীরতা শিল্পীকে অবারিত সৃজনশীলতার সুযোগ দেয়। এটি এমন এক রাগ যা রাতের নিস্তব্ধতায় প্রেমের এবং পরমাত্মার প্রতি সমর্পণের এক অপূর্ব আবহ তৈরি করে। আধুনিক শাস্ত্রীয় সংগীতে কলাবতীর জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ এর আবেদন যেমন চিরায়ত, তেমনই আধুনিক কানের কাছে অত্যন্ত শ্রুতিমধুর।

তথ্যসূত্র:

১/ রাগ পরিচয় (১ম-৪র্থ খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে: হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের ব্যাকরণগত ভিত্তি।

২/ সংগীত বিশারদ – বসন্ত: রাগের তাত্ত্বিক কাঠামো ও কর্ণাটকী-হিন্দুস্তানি তুলনামূলক আলোচনার নির্ভরযোগ্য উৎস।

৩/ The Raga Guide: A Survey of 74 Hindustani Ragas – Joep Bor: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ ও অডিও-ভিজ্যুয়াল বিশ্লেষণ।

৪/ ভারতীয় সংগীতের রাগ-রাগিনী – স্বামী প্রজ্ঞানন্দ: রাগের বিবর্তন ও দক্ষিণ ভারতীয় প্রভাবের ওপর গবেষণা।

৫/ কাব্য ও সংগীত – ওস্তাদ আমির খাঁ ও পণ্ডিত রবিশঙ্কর: বিভিন্ন সেমিনারে কলাবতী রাগের গায়নশৈলী নিয়ে তাঁদের অভিমত।