রাগ চন্দ্রকোষ । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ চন্দ্রকোষ হলো হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও মধুর একটি রাগ। এটি মূলত রাগ মালকোষের একটি অতি নিকটবর্তী “ভগ্নী রাগ” বা উপ-রাগ। চন্দ্রকোষের আবহ তৈরি হয় মালকোষের গম্ভীর কাঠামোর ওপর। মালকোষের আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য চন্দ্রকোষে এসে কিছুটা রোমান্টিক, উজ্জ্বল এবং মায়াবী হয়ে ওঠে।

রাগ চন্দ্রকোষ

বিশেষত্ব ও ইতিহাস

রাগ চন্দ্রকোষের নামকরণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর গভীর অর্থ। ‘চন্দ্র’ শব্দের অর্থ চাঁদ এবং ‘কোষ’ বা কাউনস (Kauns) অর্থ হলো প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী সুর। অর্থাৎ চাঁদের আলোর মতো স্নিগ্ধ ও শান্ত এক পরিবেশ তৈরি করে এই রাগ। মালকোষের সাথে এর পার্থক্য মাত্র একটি স্বরের। মালকোষে যেখানে কোমল নিখাদ (নী) ব্যবহৃত হয়, চন্দ্রকোষে সেখানে শুদ্ধ নিখাদ (নী) ব্যবহৃত হয়। এই সামান্য একটি স্বরের পরিবর্তনের ফলে রাগের পুরো মেজাজ বিষাদ থেকে এক অদ্ভুত রোমান্টিকতা ও গভীরতায় রূপ নেয়।

প্রাচীন সঙ্গীতশাস্ত্রে এর সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও, আধুনিক হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতে বিশ শতকের প্রবাদপ্রতিম সঙ্গীতজ্ঞদের (যেমন পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখণ্ডে) হাত ধরে এর প্রচার ও প্রসার ঘটে। এটি মূলত শৃঙ্গার (রোমান্টিক) এবং শান্ত রসের রাগ।

রাগের শাস্ত্র (The Science of Raga)

  • ঠাট: ভৈরবী ঠাট (পণ্ডিত ভাতখণ্ডের স্বরলিপি অনুযায়ী এটি ভৈরবী ঠাটের অন্তর্গত ধরা হয়, কারণ এতে গান্ধার ও ধৈবত কোমল)।
  • জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহ এবং অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই ৫টি করে স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: সা — জ্ঞা — মা — দা — নী — র্সা
  • অবরোহ: র্সা — নী — দা — মা — জ্ঞা — সা
  • বাদী স্বর: মধ্যম (মা)
  • সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা)
  • বর্জিত স্বর: ঋষভ (রে) এবং পঞ্চম (পা) সম্পূর্ণ বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: সা, কোমল গান্ধার (জ্ঞা), মা, কোমল ধৈবত (দা) এবং শুদ্ধ নিখাদ (নী)।
  • সময়: রাতের তৃতীয় প্রহর (রাত ১২টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত গাওয়ার আদর্শ সময়)।
  • প্রকৃতি: চপল নয়, বরং গম্ভীর ও শান্ত প্রকৃতির, তবে মালকোষের চেয়ে উজ্জ্বল ও রোমান্টিক।

 

কণ্ঠে চন্দ্রকোষ:

উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত (খেয়াল ও ধ্রুপদ)

১. খেয়াল (বিলম্বিত ও দ্রুত): ওস্তাদ আমীর খাঁ (ইন্দোর ঘরানা) – বন্দিশ: ধমক ধমক চলো চলোরে – তাল: দ্রুত ত্রিতাল – সূত্র: সারেগামা/এইচএমভি রেকর্ডস – চন্দ্রকোষের শান্ত ও মায়াবী রূপ ফুটিয়ে তোলার জন্য ওস্তাদ আমীর খাঁর এই রেকর্ডটি বিশ্বজুড়ে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে ধরা হয়।

২. খেয়াল (পাটিয়ালা গায়কী): ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁ – বন্দিশ: আজু মোরি বাতিয়া (Aaju Mori Batiyan) অথবা কৌন গ্যাত ভাই রে (Kaun Gat Bhai Re) – সূত্র: অল ইন্ডিয়া রেডিও (AIR) ক্লাসিক্যাল আর্কাইভ ও সারেগামা – পাটিয়ালা ঘরানার গমক ও তান প্রয়োগের প্রামাণিক ঐতিহাসিক রেকর্ড।

৩. ধ্রুপদ (ডাগরবাণী): ওস্তাদ জিয়া ফরিদউদ্দিন ডাগর – ধ্রুপদ আলাপ ও বন্দিশ – সূত্র: ডাগর ঘরানার ঐতিহাসিক লাইভ রেকর্ডস (ভূপাল ধ্রুপদ কেন্দ্র) – ধ্রুপদে মালকোষের গাম্ভীর্যের ছায়া নিয়ে চন্দ্রকোষের ধীর গতির আলাপ যে কত গম্ভীর হতে পারে, এটি তার চূড়ান্ত প্রমাণ।

 

চলচ্চিত্র ও গজল (হিন্দি ও উর্দু)

১. মুঝে না বুলা (Mujhe Na Bula) – কণ্ঠ: লতা মঙ্গেশকর – সুরকার: জয়দেব – চলচ্চিত্র: চাঁদ অউর সুরুজ (Chaand Aur Suraj, 1965) – জয়দেব সাহেব এই গানে চন্দ্রকোষ রাগের মায়াবী ও বিরহী রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন।

২. তু চল মেরে সঙ (Tu Chal Mere Sang) – কণ্ঠ: লতা মঙ্গেশকর – সুরকার: জয়দেব – চলচ্চিত্র: রেশমা অউর শেরা (Reshma Aur Shera, 1971) –  এই গানটিতে মরুভূমির পটভূমিতে চন্দ্রকোষের বিষাদ ও ধীর মেজাজ ব্যবহার করা হয়েছে।

 

রাগ চন্দ্রকোষের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য রাগ:

সঙ্গীতের ব্যাকরণ অনুযায়ী যে সব রাগের নামের শেষে “কোষ” বা “কাউন্স” অঙ্গ থাকে এবং পঞ্চম ও ঋষভ দুর্বল বা বর্জিত থাকে, তারা সবাই চন্দ্রকোষ বা মালকোষের সমগোত্রীয়।

১. মালকোষ — চন্দ্রকোষের শুদ্ধ নিখাদ (নী) সরিয়ে কোমল নিখাদ (নী) ব্যবহার করলেই তা মালকোষে রূপান্তরিত হয় (এটিই চন্দ্রকোষের সবচেয়ে নিকটবর্তী মাতৃ রাগ)।

২. মধুকোষ — চন্দ্রকোষের কোমল গান্ধার (জ্ঞা)-এর জায়গায় শুদ্ধ গান্ধার (গা) এবং পঞ্চম (পা) স্বর যুক্ত করলে তা মধুকোষ রাগ হয়ে ওঠে।

৩. সম্পূর্ণ চন্দ্রকোষ — চন্দ্রকোষের পাঁচটি স্বরের সাথে যখন অবরোহে বক্রভাবে ঋষভ (রে) এবং পঞ্চম (পা) যুক্ত করা হয়, তখন তাকে সম্পূর্ণ চন্দ্রকোষ বলা হয়।

৪. যোগকোষ — রাগ চন্দ্রকোষের কাঠামোর সাথে যখন রাগ যোগ-এর কিছু রূপ (শুদ্ধ গান্ধার ও পঞ্চম) মিশে যায়, তখন এই মিশ্র রাগের সৃষ্টি হয়।

৫. হংসকাউন্স — চন্দ্রকোষের কাঠামো থেকে কোমল ধৈবত (দা) বর্জন করে যদি পঞ্চম (পা) ব্যবহার করা হয়, তবে তা হংসকাউন্স রাগ হয়ে ওঠে।

 

 যন্ত্রসঙ্গীতের প্রামাণিক রেকর্ড (সেতার ও সরোদ)

১. সেতার: পণ্ডিত নিখিল ব্যানার্জী (মাইহার ঘরানা) – সূত্র: Live in California, 1982 (Raga Records) – চন্দ্রকোষ রাগে পণ্ডিত নিখিল ব্যানার্জীর বিলম্বিত আলাপ ও জোড় এবং অতি ধীর গতির ত্রিতাল গত সেতার যন্ত্রসঙ্গীতের ইতিহাসে অন্যতম প্রামাণ্য দলিল।

২. সেতার: ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ (ইটাওয়া ঘরানা) – সূত্র: The Golden Collection (Saregama/HMV) – সেতারে মানুষের গলার গান ফুটিয়ে তোলার গায়কী অঙ্গের প্রয়োগে ওস্তাদ বিলায়েত খাঁর চন্দ্রকোষ বাজানো এক চরম বিস্ময়।

৩. বাঁশি: পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া (মাইহার ঘরানা) – সূত্র: সারেগামা ক্লাসিক্যাল আর্কাইভ – বাঁশির দীর্ঘ টানে চন্দ্রকোষের শুদ্ধ নিখাদ দিয়ে তার সপ্তকে যাওয়ার সুর শ্রোতাদের এক গভীর ধ্যানের দিকে নিয়ে যায়।

কিছু ভুল ধারণা:

অনেক সময় ইন্টারনেটে বা সাধারণ ব্লগে মালকোষ ও চন্দ্রকোষের মধ্যে গুলিয়ে ফেলা হয়। মনে রাখতে হবে:

১/ অনেকেই মনে করেন চন্দ্রকোষে মালকোষের মতোই কোমল নিখাদ ব্যবহার করা যায়। এটা ঠিক না। আসল বিষয় হলো সঙ্গীতের ব্যাকরণ অনুযায়ী চন্দ্রকোষে কোমল নিখাদ একেবারেই বর্জিত। কোমল নিখাদ ব্যবহার করলেই তা মালকোষ হয়ে যাবে। চন্দ্রকোষের মূল মেরুদণ্ডই হলো এর শুদ্ধ নিখাদ (নী)।

২/ চন্দ্রকোষে পঞ্চম (পা) ব্যবহার করা যায়। এটা ঠিক না। আসল বিষয় হলো এটি একটি ঔড়ব-ঔড়ব (৫ স্বরের) রাগ। এতে পঞ্চম (পা) এবং ঋষভ (রে) সম্পূর্ণ বর্জিত। তবে কিছু আধুনিক মিশ্র রাগে (যেমন মধুকাউন্স) পঞ্চম যুক্ত হতে পারে, বিশুদ্ধ চন্দ্রকোষে নয়।

রাগ চন্দ্রকোষ নিছক মালকোষের একটি রূপান্তর নয়; এটি নিজে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক ও রোমান্টিক মহাবিশ্ব। রাতের নির্জনতায় যখন এই রাগের কোমল গান্ধার ও শুদ্ধ নিখাদের অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটে, তখন তা কেবল সুর হিসেবে থাকে না—হয়ে ওঠে ধ্যানের গভীর স্তর। যারা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মাধুর্য ও আভিজাত্য এক সাথে উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য চন্দ্রকোষ শোনার বিকল্প নেই।