আমাদের অতি পরিচিত এবং পরম প্রিয় রাগ ‘চন্দ্রকোষ’ যেন এক শান্ত, নিঝুম জ্যোৎস্না রাতের প্রতিচ্ছবি। তবে শুদ্ধ চন্দ্রকোষ হলো একটি ঔড়ব রাগ—অর্থাৎ এতে মাত্র পাঁচটি স্বর খেলা করে। কিন্তু আমাদের সংগীতের জাদুকরেরা এই পাঁচ স্বরের মায়াবী ফ্রেমে যখন একটু বৈচিত্র্য আনতে চাইলেন, তখনই জন্ম নিল এক অনন্য ও রূপবতী রাগ, যার নাম ‘সম্পূর্ণ চন্দ্রকোষ’।
সহজ কথায়, শুদ্ধ চন্দ্রকোষের সেই চেনা পাঁচ স্বরের (সা, জ্ঞা, মা, দা, না) সাথে অবরোহের সময় যখন অত্যন্ত চাতুর্য ও বক্রতার সাথে বাকি দুটি স্বর—অর্থাৎ ঋষভ (রে) এবং পঞ্চম (প) জুড়ে দেওয়া হয়, তখনই রাগটি তার নামের সার্থকতা খুঁজে পায়। এটি যেন মেঘমুক্ত আকাশে চাঁদের ষোলো কলা পূর্ণ হওয়ার মতো এক সুরের মহোৎসব!
সম্পূর্ণ চন্দ্রকোষের পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস
ঐতিহাসিকভাবে সম্পূর্ণ চন্দ্রকোষ খুব প্রাচীন রাগ না হলেও, আধুনিক হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে এর আবেদন আকাশচুম্বী। এর আরেকটি বহুল প্রচলিত নাম হলো ‘মিশ্র চন্দ্রকোষ’। অনেক ঘরানায় একে আবার ‘চন্দ্রকৌঁস সম্পূর্ণ’ রূপেও ডাকা হয়।
এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব লুকিয়ে আছে এর অবরোহের চলনে। যখন সুর ওপর থেকে নিচের দিকে নামতে থাকে, তখন হঠাৎ করে ঋষভ ও পঞ্চমের সূক্ষ্ম প্রবেশ শ্রোতাকে এক লহমায় চমকে দেয়। যেখানে সাধারণ চন্দ্রকোষের মেজাজ কিছুটা গম্ভীর ও বৈরাগ্যপ্রধান, সেখানে সম্পূর্ণ চন্দ্রকোষে ‘রে’ এবং ‘প’ যুক্ত হওয়ার ফলে এর ক্যানভাসটা অনেক বড় হয়ে যায় এবং এর ভেতরে এক ধরণের রোমান্টিক আকুলতা ও শৃঙ্গার রসের ছোঁয়া লাগে। এটি যেন চেনা কোনো চিলতে উঠোনে হুট করে এক জোরালো হাওয়া এসে দোলা দিয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি!
সম্পূর্ণ চন্দ্রকোষ রাগের শাস্ত্র
- অন্যান্য নাম: মিশ্র চন্দ্রকোষ, চন্দ্রকৌঁস সম্পূর্ণ।
- ঠাট: ভৈরব ঠাট (যেহেতু অবরোহে কোমল ঋষভ ও কোমল ধৈবত আসে, তবে এর মূল চলনটি কাফী বা আসাবরীর ছোঁয়াও রাখে। পণ্ডিত মহলে এর ঠাট নিয়ে কিছুটা মতভেদ থাকলেও ভৈরব ঠাটের অন্তরালেই একে বেশি স্বীকৃতি দেওয়া হয়)।
- জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৫টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: সা জ্ঞা মা দা না সঁ (নোটেশন: সা গ্ ম ধ্ নি সঁ — এখানে গান্ধার ও ধৈবত কোমল, নিষাদ শুদ্ধ এবং রে ও প সম্পূর্ণ বর্জিত)।
- অবরোহ: সঁ না দা পা মা জ্ঞা র্রে সা (নোটেশন: সঁ নি ধ্ প ম গ_ র্রে সা — এখানে নামার সময় অত্যন্ত বক্রভাবে পঞ্চম ও কোমল ঋষভ স্পর্শ করা হয়)।
- বাদী স্বর: মধ্যম (মা)।
- সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা)।
- বর্জিত স্বর: আরোহে ঋষভ (রে) এবং পঞ্চম (প) সম্পূর্ণ বর্জিত; অবরোহে কোনো স্বর বর্জিত নয়।
- ব্যবহৃত স্বর: গান্ধার (গ_) ও ধৈবত (ধ্) সবসময় কোমল; অবরোহে ব্যবহৃত ঋষভটিও কোমল (
র্রে); মধ্যম ও নিষাদ সবসময় শুদ্ধ। - সময়: রাত্রির তৃতীয় প্রহর (রাত ১২টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত, নিঝুম মধ্যরাতের রাগ)।
- প্রকৃতি: গম্ভীর, রোমান্টিক, মরমী এবং কিছুটা চঞ্চল (মিশ্র প্রকৃতির)।
- চলন: সা জ্ঞা মা, মা দা না দা মা, মা জ্ঞা র্রে সা, মা প ধ্ ম জ্ঞা, মা জ্ঞা র্রে সা।
সম্পূর্ণ চন্দ্রকোষ সম্পর্কিত রাগের তালিকা
- রাগ চন্দ্রকোষ: এটি এই রাগের মূল ভিত্তি; তবে শুদ্ধ চন্দ্রকোষে আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই ঋষভ ও পঞ্চম সম্পূর্ণ বর্জিত থাকে।
- রাগ মালকোষ: মালকোষের সাথে এর হুবহু মিল রয়েছে, কেবল মালকোষে কোমল নিষাদ ব্যবহৃত হয় আর সম্পূর্ণ চন্দ্রকোষে শুদ্ধ নিষাদ লাগে।
- রাগ মধুভন্তী: মধুভন্তীর স্বরবিন্যাসের সাথে এর কিছুটা গাণিতিক মিল থাকলেও, কড়ি মধ্যমের কারণে মধুভন্তী সম্পূর্ণ আলাদা মেজাজ তৈরি করে।
- রাগ ললিতধ্বনি: কিছু কিছু তান ও স্বরসঙ্গতির ক্ষেত্রে ললিতধ্বনির হালকা আভাস পাওয়া গেলেও এর অবরোহের রূপটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সম্পূর্ণ চন্দ্রকোষ হলো সুরের আকাশের এক ঝলমলে পূর্ণিমা। সাধারণ চন্দ্রকোষের যে বৈরাগ্য বা উদাসীন ভাব, তাকে কিছুটা আড়াল করে এই রাগটি শ্রোতাকে এক মায়াবী ভালোবাসার গল্প শোনায়। ওস্তাদ ও পণ্ডিতেরা যখন মধ্যরাতের আসরে এই রাগের আরোহে সোজা গিয়ে অবরোহে হঠাৎ বক্র চালের ‘পা’ আর ‘রে’ ছুঁয়ে আসেন, তখন আসরে বসা রসিক শ্রোতার বুক থেকে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই বের হয় না। এটি ব্যাকরণের খাঁচায় বন্দি থেকেও কীভাবে ডানায় নতুন রঙ লাগানো যায়, তার এক অনবদ্য সৃষ্টি।
তথ্যসূত্র (Sources)
১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দোস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (খণ্ড ৪, মিশ্র ও অপ্রচলিত রাগ অধ্যায়)।
২. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (সংগীত কার্যালয়, হাতরস)।
৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘भारतीय संगीतकोष’ (ভারতীয় সংগীতকোষ)।
৪. আইটিসি সঙ্গীত রিচার্চ একাডেমি (ITC SRA) — রাগের স্বরপ্রয়োগ ও ঘরানাধারী চলন আর্কাইভ।
আরও দেখুন:
