রাগ ললিতধ্বনি । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

আমাদের অতি পরিচিত এবং পরম প্রিয় প্রাচীন রাগ ‘ললিত’ শুনলেই মনের ভেতর ভোরের আলো-আঁধারি আর এক অদ্ভুত বৈরাগ্যের ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু শাস্ত্রীয় সংগীতের আঙিনায় সব সময়ই নতুন সুরের অন্বেষণ চলেছে। এই অন্বেষণেরই এক চমৎকার ও আধুনিক সৃষ্টি হলো ‘রাগ ললিতধ্বনি’

প্রবাদপ্রতিম সেতার বাদক, মাইহার ঘরানার প্রাণপুরুষ পণ্ডিত রবিশঙ্কর এই রাগটির স্রষ্টা। তিনি ভোরের চিরন্তন রাগ ললিতের চেনা সুরকাঠামোতে একটি সূক্ষ্ম অথচ জাদুকরী পরিবর্তন এনে এই নতুন রাগের জন্ম দেন। প্রথাগত ললিত রাগের চড়া বা তীব্র মেজাজকে কিছুটা নমনীয় করে এতে এক অনাবিল মাধুর্য ও আলোর সঞ্চার করেছেন তিনি, যা এই রাগকে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

রাগ ললিতধ্বনি

রাগ ললিতধ্বনির পরিচয়, বিশেষত্ব ও ললিতের সাথে পার্থক্য

ললিতধ্বনি মূলত একটি আধুনিক রাগ। এর নামের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এর আসল পরিচয়—’ললিত’-এর আধ্যাত্মিক ভাবের সাথে এক নতুন ‘ধ্বনি’ বা সুরের মেলবন্ধন।

এই রাগের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব এবং ট্র্যাডিশনাল ললিত রাগের সাথে এর মূল পার্থক্যটি লুকিয়ে আছে ‘মধ্যম’ (ম) স্বরের ব্যবহারে। উচ্চাঙ্গ সংগীতের যারা নিয়মিত শ্রোতা, তারা জানেন যে ললিত রাগের আসল সিগনেচার হলো এর দুই মধ্যমের (শুদ্ধ ও কড়ি মধ্যম) পাশাপাশি বসার ভঙ্গি (মা ম^ মা)। কিন্তু পণ্ডিত রবিশঙ্কর ললিতধ্বনি রাগটি তৈরি করার সময় প্রথাগত ললিতের কড়ি মধ্যম (তীব্র ম) এবং কোমল ধৈবত (ধ্) সম্পূর্ণ বর্জন করেন। এর বদলে তিনি এখানে নিয়ে আসেন শুদ্ধ ধৈবত (ধ) এবং শুদ্ধ নিষাদ (নি)

সহজ কথায়, ললিত রাগের চেনা বিষাদ ও গাম্ভীর্যকে বিদায় জানিয়ে ললিতধ্বনি রাগটি শ্রোতাকে ভোরের এক নতুন আশার আলো দেখায়। এটি যেন ভোরের কুয়াশা কেটে গিয়ে প্রথম সূর্যরশ্মি গায়ে মাখার মতো এক অদ্ভুত চনমনে অনুভূতি!

রাগ ললিতধ্বনি রাগের শাস্ত্র

  • অন্যান্য নাম: রাগ ললিত ধ্বনি (পণ্ডিত রবিশঙ্করের নিজস্ব সৃষ্টি হওয়ায় এর আর কোনো প্রাচীন নাম নেই)।
  • ঠাট: কল্যাণ ঠাট (যেহেতু এতে শুদ্ধ ঋষভ ও শুদ্ধ ধৈবত ব্যবহৃত হয়, তবে এর চলনটি বিলাবল বা কাফীর কিছু অঙ্গকেও স্পর্শ করে। পণ্ডিত রবিশঙ্কর একে কল্যাণ ঠাটের কাছাকাছি বলে গণ্য করেছেন)।
  • জাতি: ষাড়ব-ষাড়ব (আরোহে ৬টি এবং অবরোহে ৬টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: সা রে গ ম ধ নি সঁ (নোটেশন: সা রে গ ম ধ নি সঁ — এখানে পঞ্চম বা ‘পা’ সম্পূর্ণ বর্জিত, বাকি সব স্বর শুদ্ধ)
  • অবরোহ: সঁ নি ধ ম গ রে সা (নোটেশন: সঁ নি ধ ম গ রে সা — নামার সময়ও পঞ্চম বর্জিত রেখে সরলভাবে নেমে আসা হয়)
  • বাদী স্বর: শুদ্ধ মধ্যম (ম)।
  • সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহ এবং অবরোহ—উভয় ক্ষেত্রেই পঞ্চম (প) স্বরটি সম্পূর্ণ বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: এই রাগের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এতে কোনো কোমল বা কড়ি স্বর নেই। ব্যবহৃত সবকটি স্বরই (রে, গ, ম, ধ, নি) একদম শুদ্ধ
  • সময়: প্রাতঃকাল বা সকালের প্রথম প্রহর (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৬টা, সূর্যোদয়ের সময়)।
  • প্রকৃতি: প্রশান্ত, আশাবাদী, উজ্জ্বল এবং ভক্তিপ্রধান।
  • চলন: সা, রে গ ম, ম ধ নি ধ ম, গ রে সা, রে গ ম ধ নি সঁ, সঁ নি ধ ম, গ রে সা।

 

রাগ ললিতধ্বনি সম্পর্কিত রাগের তালিকা

  • রাগ ললিত: এটি এই রাগের আদি প্রেরণা; তবে ললিত রাগে দুই মধ্যম ও কোমল ধৈবত লাগে, যা ললিতধ্বনিতে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
  • রাগ হংসধ্বনি: নামের শেষে ‘ধ্বনি’ শব্দের মিল থাকলেও এবং দুটি রাগই পণ্ডিত রবিশঙ্করের প্রিয় হলেও, হংসধ্বনিতে মধ্যম বর্জিত থাকে আর ললিতধ্বনিতে মধ্যমই হলো প্রধান বা বাদী স্বর।
  • রাগ বিলাবল: স্বরগুলো শুদ্ধ হওয়ার কারণে বিলাবল রাগের একটি হালকা ছায়া মনে হতে পারে, তবে পঞ্চম বর্জিত থাকায় এর চলন বিলাবল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
  • রাগ নট ভৈরব: ভোরের রাগ হিসেবে নট ভৈরবের কিছু স্বরসঙ্গতির সাথে মিল মনে হতে পারে, তবে নট ভৈরবের কোমল ধৈবত ও পঞ্চমের ব্যবহার একে ললিতধ্বনি থেকে পৃথক করে।

 

রাগ ললিতধ্বনি হলো ভোরের শুদ্ধ বাতাসের মতো এক পবিত্র সুর। পণ্ডিত রবিশঙ্কর যখন তাঁর সেতারে এই রাগের আলাপ বাঁধতেন, তখন মনে হতো যেন ভোরের আলো কেবল ফুটছে না, বরং সুরের হাত ধরে ধুয়ে যাচ্ছে রাতের সব অন্ধকার। চিরাচরিত ললিত রাগের যে মন কেমন করা কান্না, তাকে এক অনাবিল আনন্দ আর আধ্যাত্মিক শান্তিতে রূপান্তর করেছে এই রাগ। আধুনিক রাগের তালিকায় ললিতধ্বনি চিরকালই তার সরলতা ও আলোর জন্য এক অনন্য সৃষ্টি হিসেবে ভাস্বর থাকবে।

তথ্যসূত্র (Sources):

১. পণ্ডিত রবিশঙ্কর‘মাই মিউজিক, মাই লাইফ’ (My Music, My Life) এবং তাঁর নিজস্ব রাগ সৃষ্টি সংক্রান্ত সাক্ষাৎকার ও স্বরলিপি আর্কাইভ।

২. আইটিসি সঙ্গীত রিচার্চ একাডেমি (ITC SRA) — নতুন ও আধুনিক রাগের চলন এবং মাইহার ঘরানার সৃষ্টি বিষয়ক গবেষণা নথি।

৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী‘भारतीय संगीतकोष’ (ভারতীয় সংগীতকোষ)

৪. রাগ বিজ্ঞান ও আধুনিক রাগ সংগ্রহ — সমকালীন উচ্চাঙ্গ সংগীতের রাগ বিশ্লেষণ গ্রন্থ।

আরও দেখুন: